
তত্ত্ব থেকে নাট্যে – কার্ল মার্ক্স-এর ‘ডাস ক্যাপিটাল’ নিয়ে থিয়েটার
কাব্য থেকে নাট্যের জন্মসূত্র চিরাচরিত। সময়কাল ও চিন্তার প্রেক্ষাপট যত পাল্টে গেছে, নাটকের কাব্যের উপর নির্ভরশীলতা কমেছে। থিয়েটারের জগতে এসেছে গদ্য। গদ্যের জোর অনেকবেশি জনমুখী। থিয়েটার তার রসদ পেয়েছে ইতিহাস ও দার্শনিক গদ্য থেকে নবজাগরণের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে। তবে কাব্যের থেকে মুক্ত হয়ে কোনও চিন্তাই তার সঠিক পথ খুঁজে পাবে না।
কার্ল মার্ক্স যেমন খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ‘পুঁজি’র দর্শন উইলিয়াম শেক্সপীয়ার-এর মহান কাব্য থেকে, নাট্য থেকে। গ্রীক সাহিত্য ও শেক্সপীয়ার তাহলে শুধু মাত্র রোমান্টিক কাব্যই রচনার পথকে সুগম করে নি, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে চর্চিত সমাজতত্ত্বের বাইবেল ‘ডাস ক্যাপিটাল’ তৈরি করতেও সাহায্য করে। ডায়ালেকটিক্সের ধারণা তো মার্ক্সের শ্রেণী সংগ্রামের ধারণকে যেমন পুষ্ট করে তেমনভাবেই আধুনিক নাট্যের চালিকা শক্তিও হয়ে ওঠে এই দ্বান্দ্বিকতা। তাই তত্ত্ব হোক বা কাব্য – নাট্য সমানভাবে তার রসদ গ্রহণ করে নিতেই পারে।
তাহলে ‘ডাস ক্যাপিটাল’ থেকে কীভাবে গড়ে উঠলো নাট্য? এর ইতিহাস একটু দেখা যাক।

কার্ল মার্ক্স বললেই যে বইয়ের নামটা আমাদের মনের মধ্যে আসে তা হলো ‘ডাস ক্যাপিটাল’। যার প্রথম খন্ডটি শুধুমাত্র মার্ক্স সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। বাকি দুখন্ডের জন্য ছিল মার্ক্সের লেখা নোটবুক – শেষ করেছিলেন তাঁর বন্ধু ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস এবং কার্ল কাউটস্কি। তো এই জটিল বই পড়তে গেলে যে পরিমাণ শ্রম ও জ্ঞানের প্রয়োজন সে কথা বলাই বাহুল্য । তাই সাধারণ স্তরে এই বইয়ের পাঠ একদমই নেই বললেই চলে। অর্থনীতির এমনই এক জটিল বিষয়কে নিয়ে নাটক হলে কেমন হয়? কি অবাক হচ্ছেন – ‘ডাস ক্যাপিটাল’ নিয়ে থিয়েটার ! হ্যাঁ এমনই একটি প্রযোজনা করেছেন জার্মান থিয়েটার গ্রুপ ‘রিমিনি প্রোটোকল’।
নাটকটা প্রস্তুত করার জন্য রিমিনি নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে হিল্ডেগার্ড হগ ও ড্যানিয়েল ওযে়টজেল ১০০ জন মানুষের মতামত কিংবা ইন্টারভিউ নিয়েছেন । সেখান থেকে তুলে এনেছেন মোট আটটি কাহিনী। নাটকের দৃশ্যগুলিকে ‘দৈনন্দিনের অংশ’ হিসেবে তুলে আনা হয়েছে ।
থমাস কুজিনস্কি পূর্বতম পূর্ব জার্মানির অর্থনৈতিক ইতিহাসের অধ্যাপক যিনি বুঝিয়েছেন কিভাবে সময় রূপ নেয় অর্থের। তাঁর একটি নাটকে ডাস ক্যাপিটাল নিয়ে আসতে গেলে ১৫০০ কর্ম সময় কিংবা ওযা়গনারের সুরের ৯০টি ‘বৃত্ত চক্র’এর প্রয়োজন । ক্রিশচান স্প্রেমবার্গ, যিনি দৃষ্টিহীন, হাওয়াই যন্ত্রের সাহায্য ২০,০০০ নোট তৈরি করেছেন যা থেকে উঠে আসবে অর্থ/টাকার এক নিজস্ব ‘শব্দ’ ।
নাটকটি একটি লাউনজ রুমের মধ্যে দেখানো হয় যেখানে সারা ঘর ভরে আছে জুয়ার মেশিন, টেলিভিশন এবং অগুন্তি ‘ডাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ । দর্শকদের হাতে পরে বইগুলি তুলে দেওয়া হয়। ইন্টিমেট থিয়েটারটি বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে জার্মানির ডাসেলডরফার স্কসফেলহউসে। নাটকটির মূল লক্ষ্য বিভিন্ন বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যাকে সামনে রেখে শ্রম, অর্থ, শোষণ ও বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে দর্শকাভিনেতাদের (Spectactor) মধ্যে তর্ক ও সংলাপ বিনিময়।
এবার চলে যাবো জুরিখ, ভেরিন ফ্রিইযে়স মিউজিক থিয়েটার। এখানে প্রদর্শন হবে ‘কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল : দ্য মিউজিকাল’ । ক্যাপিটালের গীতিনাট্য, ভাবতেই কেমন শিহরন হয়। নাটকটি প্রযোজনা করেন আর্নল্ড, কোমারভ, শ্রোডার ত্রয়ী। একটা পুঁজিবাদী সমাজের দোলাচাল সঙ্গীতের তরঙ্গের মাধ্যমে তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে । সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে যেকোনও জটিল বিষয়ও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে বলে নাট্য নির্দেশক মনে করেন, আর মঞ্চসজ্জা, নৃত্য, অভিনয়, সঙ্গীত পরিবেশন শুধু মাত্র বিনোদন সর্বস্ব সমাজের অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে তাকেই ঘায়েল করার চেষ্টা। পুঁজিবাদী সমাজে একজন শিল্পী বা শিল্প( এখানে থিয়েটার) যে পণ্য সে কথা মার্ক্স তার ডাস ক্যাপিটাল গ্রন্থে দেড়শো বছর আগে লিখে গেছেন। এই নাটককে নির্মাণের পিছনে কমোরভ ও আর্নল্ড প্রায় দুহাজার পাতা থেকে খুঁড়তে খুঁড়তে বার করে এনেছেন ক্যাপিটালের ‘লিবের্তো’ বা মঞ্চের টেক্সট । গানগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নাম বলি ছাব্বিশ অধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক সমাজ ব্যবস্থায় সঞ্চয়’ থেকে ‘আহরণ ও বেগ’, তারপর ধরুন বত্রিশ অধ্যায় থেকে ‘একচেটিয়া পুঁজি’ কিংবা এক নম্বর অধ্যায় ‘বস্তু’ থেকে ‘বস্তুর মূল্যমান’ ইত্যাদি । বর্তমানে মার্ক্স প্রাসঙ্গিক কি না, সাধারণত জন্মদিন এলে একটা অনুষ্ঠান করতে কয়েকজন বসে পরে। সারাবছর চুপ তারপর। কোনও বিষয়ই প্রাসঙ্গিক বলে কিছু হয় না – কিন্তু কত অভিনব পদ্ধতিতে ক্যাপিটাল-কে এই জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় যেখানে জনগণের পক্ষে মার্ক্সের অর্থনৈতিক দর্শন বুঝতে ততটাও অসুবিধা হবে না – কারণ নাটকের লক্ষ্যই বিভেদ ও শোষণের সমাজে ক্যাপিটাল বোঝা একজন মানুষের নিজের জন্য প্রয়োজনীয় । এমনভাবেই তো মহান নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেশট্ ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’কে কবিতার আকারে লিখেছিলেন জনগণের জন্য। চাইলেই এই বই একবার কিনে আপনিও পড়তে পারেন।

