

যে পাহাড়ের গায়ে তোমার অপেক্ষার সুগন্ধ লেগে আছে!
“অনেকটা পথ ঘুরে ঘুরে উঠতে হবে,
ধ্বসের স্তুপ, তিস্তার বালি পাথর
গাছের নীরবতা ফেলে আমরা উঠছিলাম, খরজলে ভেসে যায় ভেলা গাড়ি, হাওয়া ভরা নৌকো” (‘স্বরচিত পাহাড়ের আলো’)
পাহাড়ের দেওয়াল ঘিরে তোমার জন্য অপেক্ষার ফ্রেস্কোচিত্র। আঁকাবাকা পথঘাট পার হয়ে আনন্দী আসছে অসংখ্য চাপা অক্ষরে, নীরবতায় ভাগ হয়ে। এখন শুধু অর্জুনের অন্তরের কথা লিখতে চায় এসরাজের আদররাঙা ছোঁয়ায়। আলো আর অন্ধকার মুছে গেছে, বাস্তবের ক্যালেন্ডারে ধুলো না ঝেড়ে পাহাড়ী নদীর মতো হাত জড়িয়ে অর্জুনের অভিমান ভরা চোখের দিকে আবার তাকায় আনন্দী। মাঝে বয়ে গেছে কুড়ি কুড়ি বছর-ভরা অস্পষ্ট ঘড়ির কাঁটা।
একটা গাড়ি এগিয়ে চলেছে জীবনের দিকে। যার সঙ্গে জীবন কাটাতে পারেনি আনন্দী বাস্তবের ক্রুশ কাঠে বিদ্ধ হয়ে— তার সঙ্গে বাইশ দিনের সংসার যাপন করে খুঁজবে সংসারের অন্যরঙ। জীবনের পথ মানুষের হাতে থাকে, মনের মধ্যে থাকে যাপনের ক্যানভাস। রঙের ব্যবহার তো তাকেই জানতে হয়— সে তো একা, আর একা মানুষের পাশে থাকে বাস্তবের জাল। জালকে উপেক্ষা করতে অর্জুন-আনন্দীরা হয়তো সময়ে সময়ে অক্ষম হয়ে যায়। ইন্দ্রাশীস আচার্য এখান থেকেই স্থির করেন তাঁর ক্যামেরার লেন্স।
একটা মানুষ কি গাছের ঝরে যাওয়া পাতার মতো অসহায়, নাকি ঝরে যাওয়ার পরেও গাছের সঙ্গে তার আত্মার আত্মীয়তা থাকে। ‘গুডবাই মাউন্টেন’ খুব সহজ সরল একটি ফিরে আসার গল্প, বেঁচে থাকার গল্প। ইন্দ্রাশীসের ‘পিউপা’ থেকে ‘নীহারিকা’ হয়ে ‘গুডবাই মাউন্টেন’ অবশ্যই মানুষ নামক নদীর গল্প। যে নদী তাদের দুজনের হৃদয়ে বয়ে চলে, বয়ে চলতে চলতে গোটা পৃথিবীর মানুষের হৃদয়ের অববাহিকায় এসে মিলে যায়।

আনন্দী আর অর্জুন শুধু কেন, আরও বেশি করে মেঘ জমে রথীজিৎ-দের চোখের দিকে তাকালে। ক্যামেরা যখন কলম হয়ে ওঠে, আর লেন্সের ঘন কালি দিয়ে রথীজিৎ-রা লিখে রাখে পেয়েও না পাওয়ার অপেক্ষা— পৃথিবীর ঘড়ির কাঁটাও মনে হয় চোখের জল ফেলে গোপনে দুফোঁটা।
সিনেমার অতল হৃদয়ে এখানে পাহাড় যেন কথা বলে— ক্যামেরার সবুজ ঘিরে, জলের স্থিরতায় আর পাথর বড়ো প্রাণের জন্য ছটফট করতে থাকে। আনন্দী আর অর্জুন-এর ঘুরে বেড়ানোর পরিবেশে জল (ঝর্ণা) আর গাছের যে প্রাণস্পন্দন, যে নিঃশ্বাস ভরা ‘শূন্য এ বুকে’ এক ফোঁটা এক ফোঁটা বাতাস খেলা করে; তবুও পাহাড়ের স্থবিরতা বুঝিয়ে দেয়— জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছর পার। অতীত কি সত্যিই তবে পাথর? যেন মনে হয় হাজার বছর ধরে প্রেমিকের অভিমান তাহলে পাহাড় হয়ে পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে আজও। শান্তনু দে-র ক্যামেরা যেখানে শান্ত হয় সেখানে আকাশের রঙ ভাঙে পড়ন্ত সূর্যের অবসাদে। আনন্দীর মাথা ঘষার সুগন্ধ এসে মিশে যায় অর্জুনের নতুন জীবনে।
অর্জুন ও আনন্দীর বাইশ দিনের জীবনের মাঝে রথীজিৎ যখন এসে পড়ে, মনে হয় এই বুঝি ভেঙে গেল যাপনের কাঁচঘর। ইন্দ্রাশীস আচার্য-এর ছবির দর্শন এখানেই অনন্য— তিনি কত সহজেই বুঝিয়ে দেন, চোখের জল দিয়ে লিখে দিতে পারেন— যে হৃদয় সুর দিয়ে বাঁধা, সেখানে শরীর জুড়ে আশ্লেষে চুম্বনও কতটা ম্রিয়মাণ। একলা বারান্দায় রথীজিৎ-এর বুকের কাঁপন কেমন যেন অস্থির করে আমাদের। মনে হয় জীবন তুমি কি অসহায়, নাকি তোমাকে পেয়েও আমি তোমার লুকোচুরি খেলায় বড্ড হেরে গেলাম।
প্রেমহীন পৃথিবীতেই তো ‘গুডবাই মাউন্টেন’-এর ছবি খোঁজেন একজন ভালো চাক্ষিক। এত জটিল নয় জীবনের চাওয়া পাওয়া, মানুষ তো বাঁচতে চায় শুধু। অর্থ, প্রেম, নিয়ম, সমাজ— বিভিন্ন ভাবে আমাদের মনের সিম্ফনি ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তবুও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জীবন খুঁজে পায় তার কাঙ্খিত নদীখাত। ফেলে আসা প্রেমিকার জন্য পাগলামি নিয়ে বাঁচতে বাঁচতে যদি আবার দেখা হয় সেই পুরোনো না-কাচা জামাকাপড়ের মধ্যে তবে বুঝতে হবে বেঁচে আছে মন, সেই আদিম জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মন। তীব্র আদরের জন্য হারিয়ে যাওয়া মন।

আনন্দী-র চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-র নমনীয় অভিনয়ে নিজের প্রতি অনুশোচনার বহুমুখী ভার যেন ভাঙতে ভাঙতে সমভূমির আকার নেয়। ততোধিক বিস্তারিত অভিমানের শিরা-উপশিরা নিয়ে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত অর্জুন চরিত্রে নিজেকে বিস্তৃত করে দেন। মাঝে মাঝে ফিরে আসা অতীত কত অনায়াসে ইন্দ্রনীল তার মুখের হাসিতে বাঁচিয়ে রাখে। রথীজিৎ-এর ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য আমাদের হেরে যাওয়া জীবনের কান্নাগুলোর সাথী হয়ে যায়। অনির্বাণ বড়ো বিস্ময়কর ভাবে দিন আর রাতের মধ্যে ভাগ করে নেয় তার চরিত্রের ওঠাপড়া।
প্রেমিকের পাগলামির পর একটা নিষ্ঠুর বাস্তব তো থাকেই। সেই বাস্তবতার দায়িত্ব তো নিতে হবে কাউকে। অর্জুন যে দৈহিক ভাবে জীবনের শেষ স্রোতে লড়াই করছে তার জন্য একজন ডাক্তার অর্পিতা-কে (অনন্যা সেনগুপ্ত অভিনয়) পাশে লাগে। কিন্তু ভালো ডাক্তার জানেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহৌষধের নাম প্রেম। নির্জন বাংলোর মধ্যে থাকা অর্জুনের জীবনের বাঁচার অবলম্বন যে তার অতীত, সেই অতীতের বর্তমান আনন্দী তাই অর্পিতার হাতে জীবনের শিশিরটুকু দিয়ে এগিয়ে যান। তমোঘ্ন চ্যাটার্জীর কথায়, রণজয় ভট্টাচার্য-র সুরে ও পৃথা চ্যাটার্জীর কন্ঠে ‘তুমি প্রশ্ন হয়েছো তাই উত্তর সাজি’ যেন অবলীলায় একটা গোটা সিনেমাভাষ্য হয়ে যায়।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
