ধারবাহিক অনুবাদ গল্প সংকলন (৯ম পর্ব)

অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান
অনুবাদঃ

ছিদ্দা’র মা
গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে আমি মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। তাঁর সহিসের মাকে সবাই ছিদ্দা’র মা বলে ডাকত। সে পাখা টানার কাজ করে। সে বসে বসে পাখার দড়ি টানে আর গল্প করতে থাকে। একদিন সে মামিমাকে বলল, ‘হুজুর, ছিদ্দাকে দয়া করে চারদিনের ছুটি দিন। ও গ্রামে যাবে।’
‘কিন্তু ও তো কিছুদিন আগেই ঘুরে এল। কেন প্রায়ই ওর ছুটি দরকার?’। ঝিমোতে ঝিমোতে মামিমা ক্রুদ্ধভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘হুজুর, আমি আপনাকে কি বলতে পারি? আমার স্বামীর ছোটভাই এসেছে। সে জোর করছে যেন ছিদ্দা ছাজ্জু’র বিধবা স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে আসে। পরিবারের মহিলাকে পরিবারের মধ্যেই থাকা ভাল।’
‘কতজন মহিলাকে ছিদ্দা বাড়িতে নিয়ে আসবে?
‘ছিদ্দার কোন দোষ নেই। ওর ভাগ্যেরই ক্ষয়রোগ ধরেছে। শেষ হতভাগা…’
‘তোমার কথায় তো সবাই খারাপ। তুমি তোমার সব বৌমাদের দোষ খুঁজে বেড়াও। তুমি তো তাদের কাউকেই থাকতে দাও না’, মামিমা বললেন। ‘যাও, ছিদ্দাকে গিয়ে বল কোন ছুটি সে পাবে না।’
ছিদ্দার মা চুপ করে গেল, যেই মামিমার চোখের পাতা পড়তে শুরু করল আবার বলতে শুরু করল, ‘বেগম সাহেব, আমি আপনাকে সত্যি কথা বলছিঃ সে অদ্ভূত মেয়ে, টয়লেটে যাবার পর হাত ধোয় না। এই কারণে আমার ওকে দশ বার মারা উচিত ছিল।’
‘আর তোমার ছেলেকে দিয়ে ওকে আরও একশ’ বার পিটিও!’
ছিদ্দার মা দেঁতো হাসি হেসে বলল, ‘আরে না, বেগম সাহেব।’ যখন সে এইভাবে কথা বলে, তিনখানি হলুদ দাঁত মুখ থেকে বেরিয়ে আসে আর তার কুৎসিত মুখ স্বাভাবিকের থেকে আরো ভয়ঙ্কর দেখায়।
‘আর সেই ইগলাস’-এর মেয়েটি কী দোষ করেছিল? সেই মেয়েটির কি সুন্দর মুখ ছিল!’
‘সে ট্যাড়া ছিল, বেগম সাহেব। রাতে ওকে দেখলে আপনি ভয় পাবেন।’
‘আর তুমি কি সুন্দর পরী! ডাইনি, তুমি কি আয়নার নিজের মুখ দেখেছ?’ মামিমা হেসে বললেন। ‘তোমার মুখ শয়তানির মত। শিশুরা তোমাকে দেখে ভয় পায়। তুমি অন্যের দোষ ধরতে খুব দড়। আয়েষা, আমি তোমাকে বলছি সেই মেয়েটর মিষ্টি নিষ্পাপ মুখ ছিল।’
বৃদ্ধা মহিলা হাসল এবং দড়ি পালটে অন্য হাত দিয়ে পাখা টানতে শুরু করল। সে বলল, ‘হুজুর কেউ কি বৌমার মুখ দেখবে না দেখবে তার লক্ষণ? কোন স্ত্রীর যদি সন্তান না হয়, তাহলে তাকে রেখে দুবেলা খাওয়ানোর কোন দরকার নেই। মহিষ যেমন যতদিন বাচ্চা দেয় ততদিন ভালো তেমনি এক বউ ভালো যতদিন সে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়।’
‘বেচারা মেয়েটা তোমার সঙ্গে তিনমাসও থাকেনি। তাহলে কী করে সে সন্তান গর্ভে ধরবে? ওসব ছাড়, আমাকে ঘুমোতে দাও।’
ছিদ্দার মা তার প্রশ্নের উত্তর দিল, ‘তাহলে হুজুর, কাল কি ছিদ্দা যাবে?’
মামিমা উঠে বসল। সে নিজেই সুরাহি থেকে কিছু জল ঢেলে খেল এবং আবার শুয়ে পড়ল। ‘গত কয়েক বছরে তুমি কম করে আট থেকে দশবার ছিদ্দার বিয়ে দিয়েছ। তারপর তুমি সব কনের দোষ খুঁজে বার করেছ। তুমি যদি তোমার স্বভাব না পালটাও তাহলে তোমার বাড়িতে কোন বউ আনার দরকার নেই। তুমি সমাজের ভয়ে বাড়িতে বউ আনো, কিন্তু তুমি সেই সব হতভাগাদের টিকতে দাও না। যে কোন শাশুড়ির থেকে তুমি বেশি ঈর্ষাপরায়ণ!’

আরও ক্রুদ্ধ হয়ে মামিমা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আগে বল, তোমার সমস্যা কী? তুমি আমার কথা ভালভাবে শোন এবং ছিদ্দাকেও গিয়ে বল যে এইবার যদি তুমি বউকে বের করে দাও তাহলে আমি তোমাকেও বাড়ি থেকে বের করে দেব।’
বৃদ্ধা মহিলা দড়ি পালটে অন্য হাত দিয়ে পাখা টানতে লাগল এবং দেঁতো হাসি হেসে বলল, ‘বেগম সাহেব, কেন আপনি এক বউমার জন্যে নিজের ছেলেকে চলে যেতে দিলেন? ছিদ্দা তোমার ছেলের মত। একমাত্র মারা গেলেই সে তোমার দোরগোড়া ছাড়বে, ঠিক যেমন তার তার আগে বাবা করেছিল।’
এই কথা শুনে মামিমা খুব সন্তুষ্ট হল। চোখ থেকে হাত সরিয়ে সে বলল, ‘তাহলে সে কখন যাবে?’
যুদ্ধে জয় হয়েছে বুঝতে পেরে বৃদ্ধা বলল,’যখন আপনি ওকে যেতে দেবেন।’
‘আমার ভাই আগামীকাল আসবে। তাই গাড়িটা লাগবে। ওকে তার পরদিন যেতে বল। ও কিন্তু দুইদিনের বেশি ছুটি পাবে না। যদি সে ছুটি বাড়ায়, আমি বেতন কাটব। ঘন ঘন ছুটি নেওয়া আমি পছন্দ করি না। আমি জানিনা কতজন মেয়েকে ও বিয়ে করেছে আর ডাইনি তুমি তাদের কাউকে টিকতে দাওনি। ছিদ্দা এক মাটির চড়াই পাখির মত। ডাইনির কথা অনুযায়ি সে সবকিছু করে…’
বৃদ্ধার বুক গর্বে ভরে উঠল এবং সে বলল, ‘না, না, হুজুর, প্রথম জনের কিছুই ভাল ছিল না। আর যে মেয়েরা বউ হয়ে এসেছিল তাদের কোলে দুই বছরে দুই শিশু এসেছিল, কিন্তু সেই মেয়েটির কোন একটি ইঁদুর পর্যন্ত জন্মায়নি।”
‘সেই বেচারার অভিশাপ তোমার উপর পড়েছে। এটা ভাল কথা যে তোমার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। তুমি কীভাবে সে বেচারা মেয়েটিকে মারতে!’
‘বেগম সাহেব, সত্যি কথা বলতে গেলে আমি তাকে কোনদিনই বের করে দিতাম না। তার বাবা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি শ্রাবণ মাসে মেয়েকে নিতে এসেছিলেন এবং কখনও তাকে ফেরত দেননি। তিনি তাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়েছেন।’
‘তিনি তাকে বিয়ে দিয়ে ভাল করেছেন! বেচারা মেয়েটি তোমার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। নারনিয়া’র স্ত্রী আমাকে বলছিল ওর এখন একটি সন্তান আছে,’ মামিমা বলল।
‘ওয়ারিপুর-এর মেলায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সে আমাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আমি ওকে আর ওর বাবাকে জেলে পাঠাতে পারতাম। কিন্তু ওর বাবা আমাকে দেড়শ টাকা দিয়েছিলেন। আর সেই কারণেই আমি সমাজের বয়স্কদের ওদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিই। নিশ্চয়ই, এটা হাসির ব্যাপার নয়!’
‘আর তার কী খবর? কী যেন নাম তার? সেই লম্বা মেয়েটা?’
‘সেই মেয়েট! হুজুর, ওর নাম নেবেন না। সে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ছিদ্দার বাবাকে কামড়ে মেরে ফেলেছে।’
‘কেন? সে কি সাপ?’ আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
‘বিবি, সাপের কামড়ের তো চিকিৎসা আছে। কিন্তু ডাইনির কামড়ের কোন চিকিৎসা নেই।’
কৌতূহলের সঙ্গে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করে সে ছিদ্দার বাবাকে কামড়ে মারল?’
‘বিবি, তুমি আর এসবের কী জানবে? তুমি স্কুলে পড়। সে এক ডাইনি ছিল, ছিদ্দার বাবার এমন ভীষণ জ্বর হল যা আর কমল না। তিনদিনের মধ্যে সে মারা গেল’, ছিদ্দার মা কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল মুছে এবং মুখ কুঁচকে উত্তর দিল।
অর্ধেক ঘুমন্ত মামিমা বলল, ‘তুমি নিজেই ডাইনি ছাড়া কিছু নও।’
‘ওর কারণে না হলে সে কেন মারা গেল? মেয়েটা বাড়ির চৌকাঠে পা দিতেই ছিদ্দার বাবার পেটে ব্যথা শুরু হয়। পরের দুই থেকে তিন দিন সে ব্যথায় দাপাদাপি করেছে আর তার পরেই জ্বর বাড়ে। কত চেষ্টা করা হল, কোন ভাবেই জ্বর কমল না। বেগম সাহেব নিজে তাকে হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছেন। শহরের সমস্ত গুণিনদের আমরা দেখিয়েছি। প্রত্যেকেই বলেছে, ছিদ্দার বাবার উপর ডাইনি ভর করেছে।’
‘দূর হও, বুড়ি, ডাইনিরা এত বোকা নয়। যদি সে কাউকে খেতে চায় তাহলে তোমাকেই খাবে। কেন সে সেই বেচারা মানুষকে খেতে যাবে? তার আন্ত্রিক জ্বর হয়েছিল। কেন আমি এই বোকাগুলিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলাম! কিন্তু তোমরা কি কারুর কথা শুনেছ? ছিদ্দার বাবার শুধু আন্ত্রিক জ্বর হয়েছিল।’
‘না বেগম সাহেবা, আপনি একজন উঁচু শ্রেণীর মানুষ। আপনি আমাদের প্রভু। আপনি যা বলবেন তা সত্যি। কিন্তু আমি আপনাকে বলছি তার ‘আন্ত্রিক-ফান্ত্রিক’ জ্বর হয়নি। সে সেই ডাইনির কামড়েই মারা গেছে।’ এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে বলল, ‘ও বিবি, তুমি হয়তো এসব বিষয় জানবে। জ্বর যখন কমল না, গুণিন তাকে জিজ্ঞাসা করল সে কিছু দেখতে পারছে কি না। সে বলল কিছু দেখতে পারছে না। শেষ কয়দিনে, বউ ঘরে পা দিলেই সে খাট থেকে নেমে পড়ত এবং চিৎকার করতে শুরু করত। আমি কী জানি? আমি কিছুই জানি না। আমি তাকে চলে গিয়ে দুধ আনতে বলতাম। যে মুহূর্তে সে দুধ আনত, ছিদ্দার বাবা হাত ছুঁড়ে পাত্র ফেলে দিত। আর আমি যখন দুধ দিতাম, সে শান্তভাবে তা পান করত। সে জল দিলেও ছিদ্দার বাবা ভয়ে চিৎকার করত। আর, বিবি, আমি তোমাকে বলছি, সে আমার ছিদ্দার উপর এমন ভাবে ভর করেছিল যে সে তাকে পাগলের মত ভালবাসত। ছিদ্দা সব সময় ওর প্রশংসা ছাড়া কিছুই করত না। আমি বলতামঃ একজনকে তো কামড়ে মেরেছ; আর কতজনকে তুমি মারতে চাও? এত উদ্বিগ্ন ছিলাম যে রাতে আমার ঘুম হত না। একদিন ছিদ্দাকে না বলে আমি মাতরু-এর কাছে গিয়েছিলাম। সে একজন ধূর্ত গুণিন ছিল। আমি তার পায়ে পড়লাম এবং তার কাছে আমার ছেলের জীবন ভিক্ষা চাইলাম। সে আমার থেকে একটাকা নিল। আমি তাকে বললাম, “যেদিন এই ডাইনি আমার বাড়ি ছাড়বে সেইদিন আমি তোমাকে আরও এক টাকা দেব।”’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে, কী করে ওর থেকে মুক্তি পেলে?’
‘কী বলব বিবি? এই কাজে আমাকে কত যে মেহনত করতে হয়েছে! খুব কষ্টের সঙ্গে ছিদ্দাকে আমি ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, বিশ্বাস কর। এখনও, যখনই সে তার কথা ভাবে, সে আমার সঙ্গে লড়াই করতে উদ্যত হয়।’
‘বল, তুমি কী করলে।’ এমন কথা আমি আগে শুনিনি। কারণ আমার কাছে বৃদ্ধা মহিলাদের গল্প মানেই আলিফ-লায়লার কাহিনি।
‘ও, বিবি, কী আর বলতে পারি?’
আমি লেগে রইলাম, ‘বল, বল।’
‘মাতরু আমাকে যেরকম পরামর্শ দিয়েছিল আমি সেইরকম করেছিলাম, আর কী আমি করতে পারি?’ ছিদ্দার মা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করল।
আমি অটলভাবে বললাম, ‘আমি শুনতে চাই মাতরু তোমাকে কী করতে বলল?’
বৃদ্ধা মহিলা হাসল এবং বলল, ‘সে আমাকে বধ-বধ শাহ-এর মসজিদে ইবাদত দিতে বলল। সে আমাকে একটি সুরমা দিয়েছিল এবং কারণ না জানিয়ে ছিদ্দাকে সেটা দিতে বলেছিল। সুরমা তাকে তার স্ত্রীকে প্রকৃত রূপে দেখাবে।’
‘দুর্ভাগ্যবশতঃ, সেই ডাইনি ভুল করে সেই সুরমা মাখে এবং তার পরে ছিদ্দা তার প্রতি আগের চেয়ে আরও বেশি করে অনুরক্ত হয়। আরও খারাপ হল, ছিদ্দা আমাকে মারতে শুরু করল! আমি আবার দৌড়ে মাতরুর কাছে গেলাম। সে বলল এই ডাইনি সহজে পালাবে না। সে আমাকে কিছু গুড়ো দিল এবং বলল এই গুড়ো যেন নিশ্চিতভাবে ছিদ্দা খায়। আর যে মুহূর্তে ছিদ্দা এই গুড়ো খেল তার পেটে ভীষণ ব্যথা শুরু হল এবং তার রক্তবমি করতে শুরু করল। মাতরু আমাকে একটা ন্যাকড়ার পুতুলও দিয়েছিল, এর সারা গায়ে সূচ লাগান ছিল। মাতরু আমাকে বলেছিল কেউ যেন না দেখে এমনভাবে একে বাড়িতে লুকিয়ে রাখতে। সঠিক মুহূর্তে তুমি চিৎকার করবে আর দেখবে কতক্ষণ সেই ডাইনি ঘরে থাকে। ছিদ্দার জ্বর বাড়তে থাকে আর রক্তবমিও বন্ধ হবার কোন লক্ষণ দেখা যায় না। আমি ঘরে ঢুকে এক নাটক শুরু করলাম। দেখ, দেখ, ও একজন ডাইনি। ও কালো জাদু জানে। সে এক শিকার ধরেছে, আর একজনকে মারবার ফন্দি করছে। সব চাকর সমবেত হল। তারা পুতুলটার দিকে তাকাতে থাকল। তারা ছিদ্দাকে বলল, “এমন মহিলাকে তোমার বাড়িতে রেখ না।” সেই সময় ছিদ্দাও ভীত হয়ে পড়েছে। সে তার বউকে তার কাকার সঙ্গে বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।’
‘আয়েষা, শুধু তার গল্প শোন। সে একজন মহা- জালিয়াৎ! সে নিজের হাতে ছেলের মন বিষিয়ে দিয়েছে। ছিদ্দার বাবা মৃত্যুর মুখেই ছিল। একমাত্র যখন তোমার মামা পুলিশ ডাকার ভয় দেখায় তখন সে ছিদ্দার বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’
‘সে সেখানে দুই সপ্তাহ ছিল। আমি সত্যি বলছি, বেগম সাহেব। ছিদ্দা পনের দিন হাসপাতালে ছিল,’ ছিদ্দার মা এমনভাবে বলল যেন ছিদ্ধা নিজেই দুই সপ্তাহ কবরে ছিল।
‘সে মৃত্যুর মুখ থেকে কত দূরে ছিল? তোমার মামার চেষ্টাতেই তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।’
‘না, বেগম সাহেব, সে কীকরে মারা যেত? শুরুতেই মাতরু আমাকে সবকিছু বলেছিল’, বৃদ্ধা মহিলা পূর্ণ বিশ্বাসে উত্তর দিল।
‘দাঁড়াও, তোমাকে দেখাচ্ছি, নচ্ছাড় বুড়ি। আমি তোমার সব কথা ছিদ্দাকে বলে দেব। এতদিন আমি জানতাম না, তুমি নিজের ছেলের মন বিষিয়ে দিয়েছো,’ মামিমা ক্রুদ্ধ ভাবে বলল। আমি জানতাম মামিমা ভৃত্যদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা আগ্রহ সহকারে ভাবত।
‘ছিদ্দা কয়েকদিন আগেই জানতে পেরেছিল। কার্যত, সে আমাকে মেরেছিল এবং বউকে আনতে গিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে সে অন্য মানুষের ঘরে চলে গেছে,’ বৃদ্ধা মহিলা হেসে বলল।
মামিমা আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে বল, সেই মেয়েটি কি দুষ্ট ডাইনি না এক বেচারা হতভাগিনী?’
‘বেগম সাহেব, সত্যি কথা বলতে গেলে, আমার ছিদ্দা অনেক চেষ্টা করেছিল। সে তার গ্রামে গেছে এবং তার বাড়ির চারপাশে ঘুরেছে। এমনকি সে তার বাবাকে অর্থ দিতে চেয়েছে। কিন্তু সেই শুয়োরি আসতে চায়নি। ছিদ্দা এখনও আমার সঙ্গে ওকে নিয়ে ঝগড়া করতে পারে। আমি তাকে বলেছি, “তুমি আমাকে মার আর যাই কর আমি তোমার সঙ্গে সেই ডাইনিকে থাকতে দেব না।”’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে কেন ডাইনি হবে? আমি এখনও বুঝতে পারিনি।’
‘বিবি, তুমি বুঝতে পারবে না। সে ডাইনিই ছিল।’
‘কিন্তু, কেন?’
‘এই অশিক্ষিত মেয়েছেলের সঙ্গে তর্ক করে কেন সময় নষ্ট করছ; ঘুমোতে যাও। নতুবা, তুমি আর সন্ধ্যে বেলায় উঠতে পারবে না’, মামিমা আমাকে বকুনি দিল।
চারদিন পরে ছিদ্দার নতুন বউ বাড়িতে এল। সুন্দর পুরন্ত চেহারা। মুখে বসন্তের দাগ থাকলেও প্রফুল্ল সেই মুখ। ছিদ্দার মা প্রথম দিনেই তাকে মামিমার কাছে নিয়ে এল, সালামির লোভে। মামিমা তাকে একটাকা দিয়ে বলল, ‘যে বছরে তিনজন করে বউমা আনে তাকে আমি এর থেকে বেশি দিতে পারি না। এইভাবে তুমি আমাকে দেউলিয়া করে দেবে। নচ্ছার মহিলা, এখন একে টিকতে দিও!’
‘এ কী বলছেন বেগম সাহেব! আমি কি তাদের তাড়িয়েছি না তারা নিজেদের কর্মফলে ভুগেছে?’
এখন ছিদ্দার মায়ের জায়গায় ছিদ্দার বউ বিকেল থেকে মামিমার পাখা টানতে লেগে গেল। সে আর আমি দুই মেরুতে। আমাদের জীবন পরস্পরের কাছে অজানা। সে আমার কলেজ জীবনের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। অন্যদিকে ওর গ্রামের কাহিনি শুনে আমি অবাক হলাম। একমাত্র ছিদ্দার বউয়ের সঙ্গে দেখা হবার পরেই আমি বুঝতে পারলাম ভারতে বাস করেও আমি কত কম জানি। আমরা উভয়ে অন্তরঙ্গভাবে কথা বললাম এবং মামিমাকে সারা বিকেল ঘুমোতে দিলাম না। ঘুমের ব্যাঘাত হওয়াতে মামিমা অস্ফূট স্বরে বলল, ‘হুম হুম…আমাকে ঘুমোতে দাও।’ মামিমাকে ঘুমোতে দেবার জন্য আমরা কয়েক মিনিট চুপ করে রইলাম। তারপর আবার কথা বলতে শুরু করলাম।
ওর সমস্ত কথা আমি উপভোগ করলাম।
একদিন সে এল। তার চোখ দুটি রক্তাভ লাল আর তার মুখ ফোলা। তার হাতের চুরি ভাঙা। আমি তার হাতে ছড়ে যাওয়ার এবং রক্তের দাগ দেখলাম। যখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে, সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল এবং বলল, ছিদ্দা তাকে মেরেছে। গত কয়েক দিন ধরে বৃদ্ধা মহিলা তার দিকে চিৎকার করে কথা বলত এবং তার সম্পর্কে বানানো কাহিনি ছিদ্দাকে শোনাত। রান্না করা ডালে সে নুন মেশাত বা তার নোংরা হাঁতে রুটি ধুতো। প্রতিদিনই সে কিছু না কিছু নষ্ট করত। যখন ছেলে এই সব কিছু শুনেও প্রতিক্রিয়া দেখাল না, বৃদ্ধা মহিলা নতুন চাল শুরু করল। ছিদ্দা বাড়িতে প্রবেশ করলেই, সে তার বউকে মারতে শুরু করল এবং বলল, ‘এই বেশ্যা এইদু-র সঙ্গে কথা বলছিল।’ রাগে ছিদ্দাও নববিবাহিত বউকে মারতে শুরু করল।

ছিদ্দার বউ অনেকক্ষণ ধরে কাঁদল। পরের তিন বা চারদিন সে খুব শান্ত ছিল। বৈধব্যের দুঃখ ঝেড়ে ফেলার এবং নববধূ হবার পর থেকে তার মধ্যে যে সুখ জাগরিত হয়েছিল এবং যা তার মুখে ঝলমলে হাসিতে প্রকাশিত হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে অন্তর্হিত হল। সে তার শাশুড়ির কারণে ভীত হয়ে থাকত এবং তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। প্রতিদিন শাশুড়ি চরকায় সুতো বুনে তা এত চতুরভাবে ছিদ্দার সামনে নিয়ে আসত যে সে তাকে বিশ্বাস করত আর প্রতিদিন নববধূ নির্দয়ভাবে প্রহৃত হত।
আমার কলেজ খুলে যেতেই আমি বাড়ি ফিরে এলাম। আমি ছিদ্দা, তার মা এবং স্ত্রীর সমস্ত কাহিনি ভুলে গেলাম। দীর্ঘদিন একদিনের জন্যও আমি মামিমার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। আমার ভাইয়ের বিয়ের সময়, মামিমা আমাদের বাড়ি এসেছিল। একদিন কথার ছলে আমার ছিদ্দার বউয়ের কাহিনি মনে পড়ল এবং আমি তার কথা জিজ্ঞেস করলাম। মামিমা হেসে আমাকে বললেন যে অনেককাল আগে সে তাকে বিক্রয় করে দিয়েছে।
কেন এমন মানুষদের মামিমা কাজে রেখেছেন জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ‘কতজনকে আমি বরখাস্ত করব? ধোপা কয়েকজন মহিলাকে ত্যাগ করেছে। মালির কাহিনিও একই রকম। এইদু দুজনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করেছে। এই শ্রেণীর মানুষের কাছে এটা লজ্জার ব্যাপার নয়। এই দেশে নারী এত সস্তায় পাওয়া গেলে আমি কী করতে পারি? ছিদ্দা আমাদের বাড়িতে জন্মেছে। তাছাড়া সে ঘোড়াদের ভাল বোঝে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর তার ডাইনি মায়ের কী খবর? সে জীবিত না মৃত?’
‘সে মরবার মত মেয়েছেলে নয়! কিন্তু এখন যে নববধূ এসেছে সে তাকে শায়েস্তা করে রেখেছে।’
মামিমা বলে চললেন, ‘বৃদ্ধা মহিলা তার পুরনো রীতি শুরু করেছিল। কিন্তু এই মেয়ে তার মত সেয়ানা। একদিন সে সারাদিন ধরে শাশুড়িকে এমন প্রহার করল যে আগের সমস্ত বধূর উপর অত্যাচারের সে প্রতিশোধ তুলল। সে শাশুড়িকে বলল,”আমি এই বাড়ি ছাড়ার মেয়ে নই। যারা এর আগে এসেছিল এবং চলে গিয়েছিল তারা অন্য ধাতুতে গড়া ছিল। আল্লা জানেন তারা কী ছিল এবং কেন চলে গিয়েছিল। যদি তুমি এই বাড়িতে থাকতে চাও, নিজেকে শুধরিয়ে নাও। না পারলে তুমি চলে যেতে পার…”’
‘পরের তিন দিন বৃদ্ধা মহিলা আমার বাড়ির চারপাশে ঘুরল। তার জানা সবরকমের ঝাড়ফুক এবং কবজ-তাবিজ ব্যবহার করল। এখন ছেলে আর বউয়ের সঙ্গে ভিজে বেড়ালের মত বাস করে এবং বউমাকে এমন যমের মত ভয় করে যে আমার মাঝে মাঝে তার প্রতি করুণা হয়।’
‘আর ছিদ্দা?’
‘সে বউয়ের দাস। এই ব্যাপারটাই তার মা মেনে নিতে পারে না। কিন্তু, কী জান, সব নারী সমান হয় না।’
টীকাঃ ১) ইগলাস আলিগড় জেলার একটি শহর।

