
জিএসটি সংস্কার: আলোর দিশা না কি মরীচিকা?
কমল বাবু একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি। একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেন। মাস গেলে, সীমিত আয়ে তাঁর সংসার চলে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সম্প্রতি, সরকার যখন জিএসটি-র হার কমানোর ঘোষণা করল, তখন তিনি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। ভাবলেন, এবার অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমবে, ফ্রিজ বা নতুন টিভি কেনার স্বপ্ন পূরণ হবে। সরকারও এটিকে ‘দিওয়ালির উপহার’ হিসেবে প্রচার করছে। টিভিতে মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছেন, এই সংস্কার অর্থনীতির জন্য একটি ‘বুস্টার শট’ এবং এটি দেশের জিডিপিকে ১ থেকে ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। কমল বাবুর মতো কোটি কোটি মানুষ আশার আলো দেখতে শুরু করেছে, কিন্তু সত্যিই কি এই সংস্কার তাদের জীবনে স্বস্তি আনবে? নাকি এটি কেবল নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চমক, যা অর্থনীতির জটিল জালে আরও কিছু সাধারণ মানুষকে আটকে দেবে?
জিএসটি: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
২০১৭ সালের ১ জুলাই ভারতে গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (জিএসটি) চালু হওয়ার পর থেকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোর বিভিন্ন ধরনের কর এক ছাতার নিচে আসে। এটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি জাতীয় বাজার তৈরি করে। জিএসটি চালু হওয়ার পর থেকে রাজস্ব সংগ্রহে ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, এটি প্রমাণ করে কর ব্যবস্থা আগের তুলনায় আরও সুসংহত ও স্বচ্ছ হয়েছে। গত পাঁচ বছরে কর আদায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে জিএসটি রাজস্ব ২২.০৮ লক্ষ কোটি টাকার রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৯.৪ % বেশি। এই পরিসংখ্যানটি জিএসটি ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সাফল্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্কেরও প্রমাণ দেয়। মোট সংগৃহীত রাজস্বের প্রায় ৭০.৫ % রাজ্যগুলো ফেরত পাচ্ছে। এই আর্থিক লেনদেন কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে।
জিএসটি ২.০: অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং কৌশলগত পদক্ষেপ
জিএসটি কাউন্সিলের নতুন সংস্কার, জিএসটি ২.০, ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সংস্কার অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার জন্য ‘ভোগ-চালিত বৃদ্ধি’ এবং ‘বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবিলা’ নীতিকে হাতিয়ার করা হয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতিতে “ভোগ-চালিত বৃদ্ধি”-র ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যার মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি করা। এই নীতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে গাড়ি বা বিমার মতো পণ্যের ওপর কর কমানো হয়। ফলে মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ পরিবারগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে। এই অতিরিক্ত অর্থ যখন পণ্য ও পরিষেবা ক্রয়ের জন্য ব্যয় হয়, তখন তা অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গুণক প্রভাব সৃষ্টি করে। এতে বাজারের কার্যকরী চাহিদা বাড়ে, যার হাত ধরে উৎপাদনের বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
আর বাহ্যিক ধাক্কা ঠেকিয়ে এই জিএসটি হ্রাস কীভাবে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? বর্তমানে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০% মার্কিন শুল্ক চেপেছে। স্বাভাবিক কারণে ভারতীয় পণ্যের রপ্তানি কমবে, কিন্তু জিএসটি কমানোর মাধ্যমে সেই পণ্যের একটি দেশীয় বাজার তৈরি করা সম্ভব। এতে রপ্তানিকারকরা তাদের অতিরিক্ত পণ্য দেশের অভ্যন্তরেই বিক্রি করতে পারবে, যা তাদের ব্যবসা ও কর্মসংস্থানকে সুরক্ষিত রাখবে। অর্থাৎ জিএসটি ২.০ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নেতিবাচক প্রভাব থেকেও দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করবে। এটি অর্থনীতিকে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর নির্ভরশীল না রেখে জনগণের হাতে ক্রয় ক্ষমতা তুলে দেবে, যার ফলে তারাই বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
জিএসটি ২.০: পণ্যভিত্তিক প্রভাব
এই সংস্কারের ফলে, প্যাকেজড খাদ্য, দুগ্ধজাত পণ্য এবং রূপচর্চার সামগ্রীর মতো ভোগ-ভিত্তিক পণ্যগুলোতে করের হার ১২-১৮% থেকে কমিয়ে ৫% স্ল্যাবে আনা হয়েছে। একইভাবে, ছোট গাড়ি, ৩৮০ সিসির নিচের দুই-চাকার গাড়ি, ফ্রিজ, এসি ও টিভির মতো ইলেকট্রনিক পণ্যগুলোর কর ২৮% থেকে কমিয়ে ১৮% করা হয়েছে, যার ফলে এসব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে, বীমা (জীবন ও স্বাস্থ্য) প্রিমিয়ামকে কর-মুক্ত করা এবং ৩৫-৩৬টি জীবনদায়ী ওষুধকে শূন্য-হারের আওতায় এনে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জিএসটি ২.০-এর আগে ডেভেলপাররা বা নির্মাণ কোম্পানিগুলো ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (ITC) পুরোপুরি ফেরৎ পেত না অর্থাৎ নির্মাণ সামগ্রী (যেমন: সিমেন্ট, লোহা, ইট) কেনার সময় যে জিএসটি দিত, তার পুরোটা তারা ফেরত পেত না। ফলে, তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেত। জিএসটি সংস্কারের ফলে, নির্মাণ কোম্পানিগুলো আগের চেয়ে বেশি ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট ফেরৎ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে তাদের নির্মাণ সামগ্রী কেনার খরচ কমে যাবে। যেহেতু খরচ কমছে, ডেভেলপাররা কম দামে বাড়ি বা ফ্ল্যাট তৈরি করতে পারবে, যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের জন্য দাম কমাবে। আবাসন ও পরিকাঠামো খাতেও গতি আসবে। তবে, এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। গাড়ির জিএসটি কমার ফলে বিক্রি বাড়বে এবং সেই সঙ্গে পেট্রলের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে। কিন্তু, পেট্রলে ইথানল মেশানোর কারণে গাড়ির মাইলেজ কমে যাচ্ছে। এটি ক্রেতার প্রতিদিনের পেট্রল খরচ বাড়াবে। তাই, গাড়ি কেনার সময় এককালীন খরচ কম হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে পেট্রলের জন্য তার খরচ বাড়তেই থাকবে, যা ক্রেতার ওপর একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
অন্যদিকে, এই সংস্কারের ফলে কিছু খাতে উচ্চ করের বোঝা চেপেছে। বিলাসবহুল সামগ্রী যেমন ২,৫০০ টাকার বেশি মূল্যের পোশাক এবং নির্দিষ্ট চিনিযুক্ত পানীয়কে ৪০% নতুন স্ল্যাবে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন বাইকগুলোর ওপর জিএসটি ৩১% থেকে বেড়ে ৪০% হওয়ায় এগুলোর দাম বাড়বে। এছাড়া, কয়লার ওপর জিএসটি ৫% থেকে বাড়িয়ে ১৮% করা হয়েছে, যা কয়লা-ভিত্তিক শিল্পগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই নীতি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ভোগকে উৎসাহিত করবে। একই সাথে এই সংস্কার উচ্চবিত্তদের ব্যবহৃত পণ্য এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ করে অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও তার প্রচার
গত ২১শে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তাঁর ভাষণে নতুন জিএসটি সংস্কারকে “পরবর্তী প্রজন্মের সংস্কার” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এই পরিবর্তনকে “জিএসটি সেভিংস ফেস্টিভ্যাল” বা “জিএসটি সঞ্চয় উৎসব” বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, এই নতুন কর ব্যবস্থা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে দেবে। এর ফলে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একইসাথে, তিনি দেশবাসীকে দেশীয় পণ্য কেনার ওপর জোর দিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, “স্বদেশী মন্ত্রই ভারতের সমৃদ্ধিতে শক্তি জোগাবে।” অর্থাৎ দেশীয় উৎপাদনকে প্রাধান্য দিয়ে ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাঁচির সাংসদ সঞ্জয় শেঠ জিএসটি সংস্কার এবং ‘স্বদেশী’ প্রচারণাকে ভারতের আত্মনির্ভর হওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। সংস্কারের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ওপর কর কমার ফলে গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা সরাসরি উপকৃত হবেন, এটিকে প্রচারে এনে আসন্ন নির্বাচনে শাসক দল ফায়দা তুলতে চাইছে।
তবে কংগ্রেসে নেতা জয়রাম রমেশ জিএসটি কমানোর সুফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন এই সংস্কারটি অনেক দেরিতে এসেছে। তাঁর ধারণা, জিএসটি কমানোর যে সুবিধা তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না, উল্টে কোম্পানিগুলো মুনাফা করার সুযোগ পাবে। কারণ, ২০১৭ সালে জিএসটি চালু হওয়ার পর সরকার National Anti-profiteering Authority (NAA) গঠন করেছিল, যার কাজ ছিল কর কমানোর সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মোদি সরকার এই সংস্থাকে “ক্ষমতাহীন” করে দিয়েছে। ফলে, জিএসটি কমার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। জয়রাম রমেশের মতে, একদিকে শাসক দল (বিজেপি) নির্বাচনী সংস্কারের নামে “ভোট চুরি” করছে, অন্যদিকে জিএসটি সংস্কারের নামে “মুনাফাখোরি” (যারা মুনাফা করেন) দের সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব এবং চ্যালেঞ্জ
জিএসটি কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে কর কমানোর এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নানা মত রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে জিডিপি বৃদ্ধি ০.২% থেকে ১.২% পর্যন্ত হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সম্পর্কে বেশিরভাগ বিশ্লেষক একমত যে, যদি কর কমানোর সুবিধা পুরোপুরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়, তাহলে এটি ১.১% পর্যন্ত কমতে পারে।
তবে পরোক্ষ কর ছাড়ের এই সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করে পণ্যের দাম স্থিতিস্থাপকতার (price elasticity) ওপর। এই প্রসঙ্গে দিল্লির RIS-এর অর্থনীতির অধ্যাপক প্রবীর দে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বা ওষুধের মতো যেসব পণ্যের চাহিদা অস্থিতিস্থাপক, সেসব ক্ষেত্রে বিক্রেতারা কর কমলেও দাম কমানোর কোনো প্রয়োজন মনে করেন না, কারণ ক্রেতারা সেই পণ্যগুলো কিনতে বাধ্য। কিন্তু, যদি কোনো পণ্যের চাহিদা স্থিতিস্থাপক হয় (যেমন: বিলাসবহুল দ্রব্য), তখন বিক্রেতারা দাম কমাতে বাধ্য হন। কারণ, দাম না কমালে ক্রেতারা সহজেই বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাই, কর কমানোর সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর জন্য পণ্যের বাজারের প্রকৃতি এবং দ্রব্যের দাম স্থিতিস্থাপকতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার জিএসটির এই সংস্কারকে একটি ‘বুস্টার শট’ হিসেবে দেখলেও, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা এর কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। জিএসটি ২.০-এর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এর আর্থিক প্রভাব। সরকারের অনুমান অনুযায়ী, এই সংস্কারের ফলে বার্ষিক ৪৮,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। তবে, বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলো আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছে, যা সম্মিলিতভাবে ১.৫-২ লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই বিপুল রাজস্ব ক্ষতি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জেএম ফিনান্সিয়ালের মতো বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য যদি সরকার পরিকাঠামোতে মূলধন ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে। তখন স্বল্পমেয়াদী ভোগ বৃদ্ধির লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের মধ্যে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে । এ থেকে বোঝা যায়, কর কমানোর এই রণনীতি রাজস্ব ঝুঁকির কারণ হয়েছে।
জি এস টি সংস্কারের সাফল্যের পথে অন্য যে বাধা তা হল – সংস্কারটির সময় নির্বাচনে ভুল। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, এখন মানুষের সঞ্চয় কমেছে এবং ঋণ বেড়েছে, ফলে শুধু দাম কমিয়ে চাহিদা বাড়ানো কঠিন। কারণ মানুষ হয়তো কর ছাড়ের বাড়তি অর্থ ভোগ বাড়ানোর কাজে না লাগিয়ে, বরং ঋণ পরিশোধ বা দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ব্যবহার করবে।
জিএসটি সংস্কারের নেতিবাচক প্রভাব
জিএসটি সংস্কারকে একটি সুসংহত এবং স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু মাছ বিক্রেতা, মিষ্টি বিক্রেতা ও ছোট ওষুধের দোকানের মতো ‘ক্ষুদ্র ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের’ অভিজ্ঞতা ভিন্ন। এই সংস্কার তাদের জন্য ‘শাঁখের করাত’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে, সরকারের কঠোর হিসাবরক্ষণ এবং রিটার্ন দাখিলের চাপ তাদের ওপর বাড়তি প্রশাসনিক বোঝা তৈরি করেছে। অন্যদিকে, যখন করের হার কমে, তখন তাদের পুরোনো মজুত পণ্যের দাম নিয়ে ক্রেতাদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মনে করেন, জিএসটি সংস্কারের প্রধান সুবিধাগুলো বড় কোম্পানি এবং শপিং মলগুলোর কাছেই পৌঁছায়, কারণ প্যাকেজড পণ্য এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর মতো যেসব পণ্যের ওপর কর কমানো হয়, সেগুলোর প্রধান ক্রেতা এই ধরনের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। ছোট দোকানদারদের জন্য এই পরিবর্তনের ফলে লাভ বৃদ্ধির চেয়ে বরং প্রশাসনিক জটিলতা বেশি। তাই, জিএসটি সংস্কার বড় ‘রাঘব-বোয়ালদের’ আরও মুনাফা বাড়াবে এবং ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াইকে কঠিন করে তুলবে।
কয়লার ওপর জিএসটি বাড়িয়ে দেওয়ায় সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলে তা শুধু শিল্পোৎপাদন নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচকেও বাড়িয়ে দেবে। একই রকমভাবে কাগজের জিএসটি বাড়ায় দাম বাড়বে বই-খাতার, অর্থাৎ শিক্ষা উপকরণ আরও ব্যয়বহুল হবে। এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের “সবার জন্য শিক্ষা” নীতির পরিপন্থী, কারণ এর ফলে প্রান্তিক পরিবারের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে এবং স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
আলোচনায় একটা বিষয় পরিষ্কার, জিএসটি সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। এই বিষয়ে কলকাতার বিশিষ্ট চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অঞ্জন নাগ বলেন, “জিএসটি ২.০ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সরকার অর্থনীতির ভোগ-চালিত বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে চাইছে। কিন্তু কর হ্রাসের এই সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে করের হার কমলেও পণ্যের চূড়ান্ত দাম অনেক সময়ই কমে না। ফলে, বাজারে সঠিক তদারকি যদি না থাকে, তাহলে এটি কেবল একটি কাগজের সংস্কার হয়ে থেকে যেতে পারে। তাই এই সংস্কার শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও বটে।”
পরিশেষে
জিএসটি সংস্কারের পক্ষে সরকার জিডিপি বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরছে কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই জটিল ধারণাগুলো অর্থহীন। তাদের কাছে আসল মাপকাঠি হলো বাজারে গিয়ে জিনিসের দাম কতটা কমলো। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের ধারণা হয়েছে, জিএসটি সংস্কার শুধুই প্রচার, যা তাদের জীবনে তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। তাই এই পদক্ষেপকে ভোটের আগে জনগণের মন জয় করার একটি উপায় বা ‘ধাপ্পাবাজি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনার সারমর্ম হলো, জিএসটি ২.০-এর নামে সরকার যে সংস্কার করেছে, তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট। সমালোচকরা এটিকে নোট বাতিলের মতো একটি বহুল প্রচারিত কিন্তু কার্যকারিতার দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপের সঙ্গে তুলনা করছেন। জনগণ উপলব্ধি করছে যে, শাসক দল ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই লাগিয়ে ধনীদের দালালি করছে। এই রাজনৈতিক ফন্দিগুলো এখন আর সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারছে না, এখন তাদের মোহভঙ্গ হচ্ছে।
নিঃসন্দেহে, জিএসটি ২.০ ভারতের পরোক্ষ কর ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তূ এর বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে। সরকারের প্রচার অনুযায়ী, এই সংস্কার জনগণের আর্থিক বোঝা কমিয়ে অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে। একই সাথে, শাসক দলের প্রত্যাশা আসন্ন নির্বাচনে এটি তাদের হয়ে সমর্থন জোগাড় করে দেবে। অর্থাৎ জিএসটি ২.০ কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং শাসক দলের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক রণনীতি, যার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে আসন্ন নির্বাচনের ভোট বাক্সে।

