
বৃষ্টি অনুষঙ্গে মে দিন
বই প্রকাশ অনুষ্ঠান সেরে বেরিয়ে এসে যখন টোটোয় উঠলাম তখন বৃষ্টিটা বেশ জাঁকিয়ে নেমেছে। একটু অপেক্ষা করেই বেরোতে পারতাম। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে তার একটু আগেই। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কেউ কেউ বেরিয়ে গেছেন, বাকিরা নিজেদের মধ্যে টুকরো টুকরো ভাগে ভাগ হয়ে গল্প আড্ডা চলছে। আমাদের শহরের বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা চলে যায় হাঁটু জলের দখলে। অনেকটা সেই কারণেই আড্ডা কেটে বেরিয়ে পড়লাম।
টোটো তে উঠে দেখি বাঁদিকের পর্দা নেই, ডানদিকের পর্দা আছে। একজন মাত্র সওয়ারি। বছর ৩৫ এর এক মহিলা। তিনি মোটামুটি ডান দিক ঘেঁষেই বসে আছেন। কিন্তু এত এলোমেলো ছাট কিছুতেই আর সামলানো যাচ্ছে না। জলের ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে সব। সিল্কের শাড়ি মায়া ছেড়ে দিয়ে তখন নিজেকে নিয়ে পড়লাম। খানাখন্দে সাজানো রাস্তা আর তুমুল হওয়ার তাণ্ডবে টোটো বালান্স রাখতে পারছে না, সেটা বুঝতে পারছি। বাঁ হাতে ছাতা ধরে ডানহাতে সিট আঁকড়ে বসে আছি।
বটতলা পেরিয়ে ধর্মতলা আসতে না আসতেই বৃষ্টির জোর যেন ১০ গুণ বেড়ে গেল, সাথে পাল্লা দিয়ে হাওয়া। টোটোওয়ালার সাথে টুকটাক কথাবার্তা চলছে। আচমকা বৃষ্টি, মানুষকে অপ্রস্তুত করা নিয়ে আক্ষেপ করতেই, টোটোর ছেলেটি বলে উঠলো ভগবান কি করে বলুন তো? এই এতদিন রোদ্দুর ছিল,প্রচণ্ড গরম , মানুষ অস্থির হচ্ছিল এখন আবার বৃষ্টি নামলো, আপনি বলছেন কি ঝামেলা! মানুষকে সন্তুষ্ট করা ভগবানেরও কম্ম নয়।
এই সমস্ত তাত্ত্বিক কথাবার্তা হালকা চালে যখন চলছে , আচমকা ঝড়ের বেগ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল । হঠাৎ দেখি ১০/১১ মিটার দূরে থাকা ট্রান্সফারমারে আগুন লেগে গেল আচমকা। তুবরির মত আগুন উড়ছে উপরে, ফুল্কি ছিটকে পড়ছে রাস্তায় চারিধারে ।ছেলেটি টোটোটা নিয়ে হঠাৎ একটা বাঁদিকে রাস্তায় ঢুকিয়ে দিল ।
সঙ্গি মেয়েটি এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। আমার সাথে চোখাচোখি হতে একটু হাসি ছাড়া আর কোন বিনিময় হয়নি। সে চিৎকার করে উঠলো, আরে আপনি কোথায় ঢুকাচ্ছেন টোটো? তার ওপরে গলা তুলে টোটোওয়ালা বলল দেখছেন না আগুন লেগে গেছে সামনের পোস্টে! ওর নিচে দিয়ে গেলে আগুনে পুড়বো আর না হয়তো ঝড়ে টোটো উল্টে আমরা তিনজনেই মারা যাবো। যান শেডের তলায় যান, বলে সে টোটো ঢুকিয়ে দিল একটা জায়গায় ।
আমি শ্রীরামপুরের ভূমি কন্যা নই, অতো অলিগলি চিনি না। কিন্তু বহুবার যাতায়াতের প্রেক্ষিতে রাস্তাঘাট মোটামুটি সরগড় । তবুও এই রাস্তাটা চিনতে পারলাম না। রাস্তা জুড়ে একটা বড় নীল পাঁচিল, টিনের শেড দেওয়া, বোঝাই গেল গ্যারেজ । দৌড়ে গিয়ে লম্বা টানা সিঁড়িতে দাঁড়ালাম। সিঁড়ির পেছনে কোন বিল্ডিং এর অব্যবহৃত বড় বড় ঘর অনেকটা গোডাউন গোছের। বাইরের গেট খোলা ভেতরটা ঘুটঘুট্টে করছে অন্ধকার।
সামনের বিস্তৃত জায়গাটাতে অন্তত কুড়ি পঁচিশটা অটো আর টোটো বেশ গুছিয়ে রাখা এবং চালকেরা সবাই মদ ,মদের বোতল, চাটের প্লেট নিয়ে গুছিয়ে বসেছে । বাইরের দুর্যোগের জন্য তাদের ভিতরে কোনো ব্যস্ততা নেই। একটা ফেস্টিভ মুডে চলছে পানপর্ব।

আমরা ঢুকতেই তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ যেন একটু বেড়ে গেল। কেউ মুখ বাড়িয়ে দেখলো কেউ নড়েচড়ে বসলো । আমাদের তো মুখ শুকিয়ে চুন। বুকের ভেতরটাতে যেন হামানদিস্তার কারসাজি চলছে। আর বাইরের প্রকৃতিতে তখন চলছে প্রলয় নাচন। অন্তত ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড় আর সাদা হয়ে বৃষ্টি পড়ছে। দশ ফুট দূরের মানুষ দেখা যাচ্ছে না। সাথে সাথে তীব্র বিদ্যুতের ঝলকানি। হয়তো আমাদের উদ্দেশ্য করে নয়,কিন্তু পানাসক্ত মানুষগুলোর উল্লসিত চিৎকার ক্রমশ বেড়েই চলছিল। কে না জানে অতিরিক্ত মদ্যপান মানুষের শুভ বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়।
মেয়েটির সাথে আমার চোখে চোখে কিছু কথা হলো। আমাদের সেই মুহূর্তে বেরিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। কিন্তু এতো বৃষ্টি আর ঝড় যে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কোথায় ফেলবে তার হিসেব করা তখন আমাদের ক্ষমতার বাইরে।
অগত্যা কথা শুরু করলাম। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় গিয়েছিলে তুমি ?
প্যারামাউন্ট নার্সিংহোমে দিদি, হাজবেন্ডের গলব্লাডারের স্টোন হয়েছে। আজকে দুপুর থেকে তুমুল যন্ত্রনা। ভর্তি করে দিয়ে বাড়ি ফিরছি পথেই তো টোটো তে আপনার সাথে দেখা।
ততক্ষণে আরো বেশ কয়েকটা টোটো এসে দাঁড়ালো সেইখানে। সেই মুহূর্তে বেশ ভিড় এবং তার মধ্যে সপাটে ভিজে যাওয়া আমরা দুটি মেয়ে।
প্রাণপনে ইষ্ঠ নাম জপ করছি কারণ সেটা ছাড়া তখন ভেতরের থেকে শক্তি আনবার মতো আর কিছু নেই। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে থরথর করে কাঁপছি, যত মেঘ ডাকছে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে পানরত ছেলেদেরও উচ্ছ্বাস তত বাড়ছে। বুঝতে পারছি তাদের মাথার ভেতর শুভ বুদ্ধি একটু একটু করে কমে আসছে।
আমি মেয়েটিকে ইশারা করলাম। চলো,আমরা নেমে যাই। আমি হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে ধরতে চাইলাম। তার পাংশু মুখ ক্রমশ আরো পাংশু হচ্ছে। কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটির আর আমার মাঝে দাঁড়িয়ে গেছে আরো অনেক কটা ছেলে। ছাতাতেও আর বৃষ্টি আটকানো যাচ্ছে না।
আচমকা একটা হাত এগিয়ে এলো আমার মুখের সামনে। আমি চমকে উঠলাম। ভাবলাম এইবার বুঝি ক্লোরোফরম দিয়ে অজ্ঞান করে দেবে, তারপরে কি জানি আবার একটা অভয়া কান্ড! আবার হয়তো পেপারে মাতামাতি, স্মরণসভা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হাতের এক ঝটকায় হাতটাকে সরিয়ে দিলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমাদের টোটোর ছেলেটির হাত। সে বলল ছাতাটা এক্ষুনি বন্ধ হয়ে মুখে লাগত যে কাকিমা। আমি একটু আশ্বস্ত হলেও পুরো বিশ্বাস করতে পারছি না। কি করা যেতে পারে এই মুহূর্তে ? আমি দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারি। কিন্তু মেয়েটাকে ফেলে রেখে আমি তো কিছুতেই যেতে পারবো না। সে মেয়ের সামনে তখন টোটো অটো আর ছেলেদের ব্যারিকেট হয়ে গেছে।
ভাবছি এইখানে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কাকস্য পরিবেদনা। ওদিকে বাড়ি ফেরার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে তারপর বাড়ির লোকের টনক নড়বে ।
ব্যাগ খুলে ফোন করে বাড়িতে বললাম, আমি একটু বিপন্নতার মধ্যে আছি। যতক্ষণ না আমি আবার ফোন করবো তুমি ফোন অফ করবে না। ও পাশের গলায় ততক্ষণে উদ্বেগের ছাপ। তুমি কোথায় আটকে আছো? আমি কি যাব ?
কোথায় আমি ঠিক চিনতে পারছি না । আর আসবে কি করে এই ভয়ংকর বৃষ্টিতে? তুমি ফোনটা কাটবে না তুমি ফোনেই থাকো।
টোটোকে দুবার তিনবার বললাম, চলো ভাই আমরা বেরিয়ে পড়ি , কিন্তু বাস্তবে তো বেরিয়ে আসার মত পরিস্থিতি তখন নয়। কিন্তু আমার অন্তরাত্মা বলছে আর একটা ঘটনার ইতিবৃত্ত তৈরি হবার আগে যত দুর্যোগই আসুক এই মুহূর্তে তোমাদের বেরিয়ে পড়া উচিত । পথ কখনো ধর্ষণ করে না। পথের দু’ধারে দোকানের আলো আছে, আচমকা আটকে যাওয়া মানুষ আছে , এই নির্জন গ্যারেজের থেকে এক হাঁটু জল ডোবা রাস্তা তোমাকে কম বিপর্যস্ত করবে।
একটু পরে ঝড়ের দাপটটা কমতেই যখন বেরিয়ে আসবার উদ্যোগ করছি তখন টোটো চালক বলল, চলুন আমি আপনাদের ফেরিঘাট পর্যন্ত অন্তত পৌঁছে দি।
ফেরিঘাটে এসে যখন পৌছালাম তখন হাঁটুর নিচে অব্দি জল রীতিমতো স্রোত বইছে । আর মনে বইছে বিপদ থেকে মুক্তি পাবার আনন্দ। জানি হাঁটু সমান জল ভেঙে ফেরিঘাট থেকে আমার বাড়ি পৌঁছানো খুব সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু প্রাণঘাতী তো নয়। কাজেই অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম ।
ফেরিঘাটে টোটো দাঁড়িয়ে আছে দুটো তিনটে রিক্সাও আছে। কিন্তু চালকরা মাথা বাঁচাতে যে যার নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে । পাশে মিষ্টির দোকানে দুজনে দাঁড়ালাম।
দুজনের শরীর দিয়ে তখন জলে ধারা গড়িয়ে যাচ্ছে, হাত পা ঠান্ডা কাঁপছে দুজনেরই ।সে আমার হাতটা ধরে বলল ভাগ্যিস তুমি ছিলে দিদি, আমিও বললাম তুমি না থাকলে তো আমিও একলা হয়ে যেতাম।

দুটো তিনটে টোটো কে অনুরোধ করলাম কিন্তু কেউ আসতে রাজি নয়। বললাম চলো আমরা হাঁটি। তারপর গয়লাপাড়ার ভেতর দিয়ে শিবতলা হয়ে মহাপ্রভুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে বলল আমি এবার সোজা যাব। তুমি বাঁদিকে বেঁকে যাও।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চলে গেল সে। আমার আচমকা পাওয়া বন্ধু। বিপন্নতার মুখে দাঁড়িয়ে চোখে চোখে আশ্রয় খোঁজার বন্ধু। ভালো থেকো রে মা, আত্মজনকে সুস্থ করে বাড়িতে নিয়ে এসো মহাপ্রভুর সামনে এই প্রার্থনা রেখে যখন বামদিকের পথে হাঁটা লাগালাম শরীরে আর তিল মাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। একবার ভাবলাম ওই রাস্তায় আছে মন্দিরার ফ্ল্যাট, ঢুকে যায়, কিন্তু তখন বাড়ি টানছে। আমি ভাবছি আমার বয়স্ক মা না জানি কত দুশ্চিন্তাই করছে!
জল ঠেলে ঠেলে স্টেশনে এলাম। যথারীতি চেনা রিকশো পায়ের উপর পা তুলে বসে , তারা কেউ এলো না। এক মাঝ বয়সি মানুষ একটি রিক্সার দাঁড় করিয়ে বললেন উঠে পড়ুন দিদি। উঠে বসলাম। গলাপোলের নিচে এসে দেখি হাঁটু ডুবে যাওয়া জলে স্রোত পশ্চিম মুখো। একটা বিরাট অশ্বত্থ ডাল ভেসে যাচ্ছে স্রোতে রাস্তা আটকে। তৈরি হয়ে যাচ্ছে যানজট। রিকশোটাকে আচমকা দাঁড় করিয়ে তিনি গেলেন ডালটিকে সরিয়ে ফেলতে। জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে রিকশো । ডান দিকেই আছে ঢাল। আমি চিৎকার করছি ,আরে কোথায় গেলেন রিকশা ভেসে যাচ্ছে যে! পথচারীরা দু একজন চিৎকার করছে। তার ভ্রূক্ষেপ নেই। তার ছাতাও ভেসে যাচ্ছে ।সে ডালটিকে নিয়ে ফেলতে গেছে দূরে কোথাও ,যাতে মানুষজনদের ওইটার জন্য নতুন কোন বিভ্রাট না হয়। চালকহীন রিক্সাও ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণহীন ডুবু ডুবু।একজন পথচারী দৌড়ে এসে ধরলেন ব্রেকটা। এক মহিলা ধরলেন তার ছাতাটা।
তারপর জল ভেঙে চলতে চলতে শেষ হলো রাস্তা। দেখা যাচ্ছে আমার বাড়ি। এতক্ষণের জমা কান্না যেন সর্ব শরীর ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সত্যি সত্যি এত নিরাপদে আজকে বাড়ি ফিরতে পারবো আমি কল্পনার মধ্যেও আনিনি।
আসলে বিচারহীন আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ তো ক্রমশ দুর্বিনীত হয়েছে । তবু তারই মধ্যে টোটোর কম বয়সী ছেলেটি, রিক্সার প্রবীণ মানুষটি আজও আছেন বলে সমাজ বেঁচে আছে।
বৃষ্টির অনুসঙ্গে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকলো আমার মে দিনের একান্ত ব্যক্তিগত লড়াই।


প্রতি মুহূর্তেই আতঙ্ক যাপন। নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরা, বর্তমান সামাজে যেন এক অলঙ্ঘ অভিযান।