
অঙ্গে শোভা

শাড়ি শব্দটার সাথে অসীম মায়া জড়িয়ে থাকে। অপত্য স্নেহের মতো। তাকে ছেঁড়া যায়না,অতিক্রম করা যায়না।
একটা শাড়ি যেন একটা মহাকাব্য। ভাঁজে ভাঁজে গল্পের নিপাট বুনন। কতদিনের কত ঘটনার সাক্ষী !
আমাদের স্কুলে ক্লাস এইট থেকে শাড়ি পরতে হতো। ইলেভেন ক্লাস থেকেই বাড়িতেও শারি পরা ধরলাম। তখন ঘরে শাড়ি পরাটা ছিল মেয়ে বড়ো হয়ে যাবার মাপকাঠি ।
কিন্তু আমি বড় হবার আগেই বড়ো হয়ে গিয়েছিলাম। বাবার সামর্থ ছিল না পুজোতে শাড়ি আর জামা দুটোই দেবার। তখন ইলেভেন ভর্তি হয়েছি। সকাল বা বিকালে কোনো কাজে বা অকাজে বাজারে গেলে যদি স্কুলের টিচারদের সাথে দেখা হয়ে যেত তো জামা পরে ভারি লজ্জা পেতাম। ছোটবেলায় ছিলাম রোগা, তেধ্যাঙ্গা লম্বা । গায়ে মাস লাগাবার জন্য জন্য বাবা মা কী চেষ্টাই না করতেন!
টিচারদের দেখে তখন মনে হতো কি করে জামাটা টেনে ঠেংঠেঙে পা দুটো আড়াল করি। বাইরে বেরোলে তাই মায়ের শাড়ি নিয়ে টানাটানি করতাম, এবং শাড়ি ছেঁড়ায় আমি ছিলাম সিদ্ধহস্ত। মায়ের ও তো তোলা শাড়ি বলতে সাকুল্যে একটাই। স্বাভাবিক কারণেই মা গররাজি হতেন। সুতরাং ঘরে শাড়ি পরা ধরে সময়ের আগেই বড়ো হয়ে গেলাম।
তখন দুটো করে শাড়ি বরাদ্দ হলো একটা তোলা আর একটা ঘরে পরার।
একুশ শতকে এসে বিলুপ্তপ্রায় অভ্যাসগুলির মধ্যে একটা হচ্ছে ঘরে শাড়ি পরার অভ্যাস। কোন ফ্যাশন ডিজাইনারের মাথা থেকে যে ম্যাক্সির কনসেপ্ট বেরিয়েছিল তাকে লক্ষ কোটি স্যালুট। তৎসম শব্দ থেকে যেভাবে তদ্ভব শব্দের জন্ম হয় ম্যাক্সি থেকে সেভাবেই জন্ম হয়েছে নাইটির। একটি লম্বা কাপড় গলার জায়গায় কেটে দাও ,আর হাত দুটোকে হাতের জায়গায় কেটে সেলাই করে দাও ,ব্যাস হয়ে গেল নাইটি। দামেও সস্তা । সুতরাং সেই দাদু খায় নাতি খায় থিন এরারুট বিস্কুটের মত দিদা পরে নাতবউ পরে ,বৌমা পরে, রান্নার মেয়ে কাজের মেয়ে আয়া সুইপার সব্বাই পরে। সবার অঙ্গে আদরের সঙ্গে এখন জাতীয় পোশাক হয়ে গেছে নাইটি। আর সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ঘরে পরার শাড়ির ব্যবস্থাপনা।
সেই তখন আমরা, মা-বোনেরা ভালো শাড়ি কেনার সময় সেই জাতীয় শাড়ি পছন্দ করতাম যেটা পুরনো হয়ে গেলে, ঘরে পরা যায়। অর্থাৎ বেশি জরি, বেশি জব্বর কাজ থাকবে এমন শাড়ি মোটেই নয়। তাঁতের শাড়ি সেক্ষেত্রে ছিল ফার্স্ট প্রেফারেন্স।
ঘরে পরার জন্য সুতির ছাপা কিনতাম।
কোথায় কোথায় না গেছি সস্তায় পুষ্টিকর খ্যাদের জন্য! শিবপুরে থাকতে দলপতিদি দের সাথে আমি আর আমার দিদি যেতাম মঙ্গলা হাট। সেখানে কুড়ি টাকায় জোড়া দেওয়া শাড়ি পাওয়া যেত। দিব্যি মজবুত। আমরা তিন চারখানা বগলদাপা করে নাচতে নাচতে ঘরে ফিরে আসতাম। এক বছরের দায়ে নিশ্চিন্তি । সাথে ব্লাউজ বা পেটিকোট সে তো হামেশা পুরনো হতেই থাকে।
সুতির ছাপার দিকে তখন আমাদের তীক্ষ্ণ নজর এবং অপরিসীম ভালোবাসা ছিল। নতুন অবস্থায় দিব্যি পরে যাতায়াত করা যায়। প্রতিবেশীর বাড়ি যাও, টুকটাক দোকান বাজারও যাও । অবশ্য সুতি শাড়ি পরে যে আমন্ত্রিত বাড়িতে যাওয়া যায় সেটাও প্রথম আমাদের মাথায় এসেছিল শিবপুরেই, দিদির কাছে।

দিদিরা তখন শিবপুর হাউসিং এ থাকে। পাশের কোয়ার্টারের রায়বৌদি দিদির ছোট ছেলের জন্মদিন পালনের উৎসবে এসেছিলেন। তখন কিন্তু কোন কিছুতেই এত বাহুল্য ছিল না । আসলে সেগুলো ছিল জন্মদিনের নেমন্তন্ন, বার্থ ডে পার্টি নয়। দিদি ঘুগনি বানালো পায়েস বানালো, জামাইবাবু দই সিঙ্গারা আর মিষ্টি আনলেন। কাগজের প্লেটে ভাগ করে সবাই মিলে কী হই হই করে খাওয়া !
ততক্ষণে বাচ্চাদেরও গিফটের প্যাকেট খুলে খেলা শুরু। কোনটাই বল ,কোনটাই ঘাড় নাড়া বুড়ো, দুটো তিনটে বই ,একটা বিল্ডিং সেট । কোন কিছুতেই কিছু দেখনদারি নেই। রায়বৌদির পরনে চমৎকার একটা সুতির ছাপা দেখে আমি আর দিদি হতবাক। তাহলে সুতি ছাপা পরে ও নেমন্তন্ন খেতে যাওয়া যায় বল!
এরপর একটু আর্থিক সচ্ছলতা এলে আমরা ঘরে পরার শাড়িও চেষ্টা করতাম ম্যাচিং ব্লাউজ পিস সমেত কিনতে। যাতে সেটা পরে কিছুদিন টুকটাক ঘরবার করা যায়।
কখনো কখনো আমরা দলবদ্ধ হয়ে অভিযান চালাতাম ঘরে পরা শাড়ি সস্তায় সংগ্রহ করার জন্য।
শাড়ি অঙ্গে নিয়ে আমরা অনেক ঐশ্বর্যবান ছিলাম! আমাদের একটা করে আঁচল ছিল। চোখের জল মোছার ,উদগত হাসি চাপা দেবার, লজ্জা পেলে আঁচলের খুঁট আঙুলে জড়িয়ে ব্রীড়া প্রকাশ করার !কর্মক্লান্ত বাবার বা ছেলের কপালের ঘাম মুছে দেবার জন্য আঁচলের কোন বিকল্প ছিল না।
আঁচল ছিল আশ্রয়ও। আমার ছেলেটাকে ঘুম পাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে যখন উঠে আসতাম দেখতাম সে আমার শাড়ীর আঁচলটাকে আমার অজান্তে কখন তার আঙুলে জড়িয়ে নিয়েছে। উঠে আসতে গেলেই টান পড়ছে শাড়িতে। আগে আগে আমার বাড়িতে এসে কয়েকদিন থেকে আমার মা যখন আবার ফিরে যেত তখন মায়ের রেখে যাওয়া ঘরে পড়ার শাড়িগুলো তে আমি মায়ের গায়ের গন্ধ পেতাম।
জীবনে ব্যস্ততা যখন বাড়লো আস্তে আস্তে পোশাকের ও পরিবর্তন হলো। গ্লোবালাইজেশন ঢুকে গেল আমাদের নিজস্ব ওয়ার্ডরোপে । এখন আমি যখন কোন অনলাইন মিটিংয়ে বসি তখন দেখি আমরা দু তিনজন ছাড়া বাকি সবাই রকমারি ঘরের পোশাক পরে আছে। সালোয়ার, লং স্কার্ট, কুর্তি, টি শার্ট আর কত কি!
শুধু আমরা কয়েকজন আজও পুরনো অভ্যাসে, স্নানের পরে শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিতেই ভালোবাসি। যদিও এখন আমি শখ করে অন্য পোশাকও করি। কিন্তু শাড়ির প্রতি একটা আলাদা পক্ষপাতিত্ব আমার থেকেই যায় সবসময়। আমার প্রাণের ‘পরে বসন্ত বাতাসের মত খেলে বেড়ায় সে ছোট্টবেলা থেকে।


শাড়ি নিয়ে লেখা খুব ভালো লাগলো।
ওই জায়গা যেখানে শাড়ীর আঁচল এর কত উপযোগিতা
বর্ণনা করেছো, দারুন! ছেলে মেয়ের ঘাম পুঁছিয়ে দিতে মায়ের আঁচলের তুলনা নেই!
ধন্যবাদ দাদা
Khub shundor lekha. Amar maa er mukhe shei shomoy er meyeder golpo onekta erom e shunechilam. Apnar lekha poreo onekta mil pelam.
Onek subheccha roilo.
আমার ভালবাসা জানালাম।
খুব ভাল লাগল। নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।