পত্রিকাটা তারপর থেকে যত্নেই রাখা ছিল ৷ ২০০২ সালে আমি নতুন বাড়িতে আসার সময় অনেক কিছুই হারিয়ে ছিল তার সঙ্গে পত্রিকাটিও আবার হারিয়ে যায় ৷ এখন মাঝে মাঝে মনে হয় বাবা সম্ভবত অতি যত্নে পত্রিকাটি ওই ভাবে রেখেছিলেন আমার পরবর্তীকালের লেখালিখি যেন ভালো হয় ৷
কিন্তু আমি নিজেই সেটা রাখতে পারি নি ৷

এগারো বছর বয়সে আমার পৈতে হল ৷ আমি তখন অষ্টমে ৷ সে এক নতুন জীবন ৷ বাবা বললেন দ্বিজ হলে ৷ আমার ভিক্ষে মা ছিলেন একজন রাঁধুনী ৷ আমি তাঁকে মাসিমা বলতাম ৷ আমার মনে আছে সেই অতি দরিদ্র মানুষটিকে আমার ভিক্ষে মা হবার জন্যে বাবা যখন প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রথমে এক বিশ্ব বিস্ময় তাঁর মুখে ৷ তারপর তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন ৷ আজও মনে আছে প্রথম ভিক্ষাটি দেবার সময় তাঁর মুখে ছিল অপার আনন্দ ৷ কাঁসার থালায় গোবিন্দভোগ চাল সব্জী সোনামুগের ডাল (তখনও প্রকৃত সোনামুগের ডাল পাওয়া যেত ) গাওয়াঘি আর একটি ন্যাড়ারাজার চিহ্ন দেওয়া রূপোর টাকা ৷ সব তিনি নিজের রোজগারের পয়সায় কিনে আমায় ভিক্ষে দিয়েছিলেন ৷ বাবা আর দিদিভাই বলেছিলেন এটাই তোমার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ৷ পরে জেনেছিলাম ওই একটা রূপোর টাকা তাঁর ছিল তাঁর বাবার আমলের ৷ যত্ন করে রেখেছিলেন স্মৃতি হিসেবে , সেটিই আমার ভিক্ষের ঝুলিতে এক পৃথিবী খুশি নিয়ে ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি ৷ পরে বলেছিলেন ওই টাকাটা যত্নে রাখিস সোনা ৷ আমি আজও সেটা যত্নে রেখেছি ৷ ওই সময়ে অনেকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছিলেন ৷ বেশ কয়েকজন রূপোর টাকা ও অন্যান্য জিনিস ৷
তবে সেই সময়ের বিখ্যাত চিকিৎসক ও কংগ্রেস নেতা গোপালদাস নাগ আমায় নতুন জামা কাপরের সঙ্গে একটা ডাকটিকিট ভর্তি খাতাও উপহার দিয়েছিলেন ৷ যেটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ ৷ খুব বেশি ডাকটিকিট না থাকলেও সেটি দিয়ে তিনি আমায় বুঝিয়ে ছিলেন ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রহের উপকার কি ৷
সেই আমার ডাকটিকিট জমানো শুরু ৷ আমার দুর্ভাগ্য সেই খাতাটি আমার এক মাসতুতো দাদা প্রায় একহাজার ডাকটিকিট সহ চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল ৷ খাতাটি আর উদ্ধার করতে না পারলেও ওই খাতার অধিকাংশ ডাকটিকিটই আমি দেশ অনুযায়ী অন্য এলবামে রেখে ছিলাম ৷ এগারো বছর বয়স থেকে ডাকটিকিট জমানো শুরু করে আজ আমার দেশ বিদেশের ডাকটিকিটের সংখ্যা এক লক্ষ আঠারো হাজারের কিছু বেশি ৷ আর তাদের বৈশিষ্ট না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না ৷
পৈতে হবার পর যে কদিন ব্রহ্মচারী হিসেবে ছিলাম সে বড় নিয়ম বাঁধা জীবন ৷ সকাল সন্ধ্যা গায়ত্রী জপ ৷ খাওয়াদাওয়া নিয়ম সব মিলিয়ে ওই বয়সে একটা ভয়ঙ্কর জীবন ৷
এই সময় একটি ঘটনা আমার অনেক কিছু বদলে দিয়েছিল ৷ আমার বাবা প্রতিদিন ভোরে উঠে সম্পূর্ণ চন্ডীপাঠ ও আমাদের গৃহদেবতা শিবের পুজো করতেন ৷ সন্ধায় জপ ও যোগ করতেন ৷ বেনারসের মানুষ বাবা শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মন্ত্রশিষ্য ছিলেন ৷ বঙ্গদেশে আসার আগে বাড়ির কাছেই হরিশ্চন্দ্রঘাটের শ্মশানে তিনি নিয়মিত যোগসাধনা করতেন ৷


এখানেও সংসারী হবার পরেও সে সাধনা ছাড়েন নি ৷ তবে পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে নিয়েছিলেন ৷
আমার পৈতের পর বাবা নির্দেশ দিলেন ৷ সন্ধেবেলায় বাবা যখন ধ্যান করবেন তখন আমি বাবার ঘরে বসেই ১০০৮ বার গায়ত্রী মন্ত্র জপ করব ৷ সেভাবেই চলছিল ৷ তিনদিনের দিন ঘটে গেল একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ৷ আমার জপ শেষ হবার পর বাবার নির্দেশ ছিল ধ্যান করতে হবে ৷ আমিই জানি সে কেমন ধ্যান করতাম ও বয়সে ৷ কিন্তু বাবার অনুশাসনে সেটা ছিল আমার ভয়ঙ্কর শাস্তি ৷
সেদিন আমি ধ্যান করতে করতে হঠাৎ মিটিমিটি চোখে মনে হল বাবা আসন থেকে খুব সামান্য উঁচুতে বসে আছেন ৷ আমি ধীরে ধীরে উঠে নীচু হয়ে নানা ভাবে দেখে নিশ্চিত হলেও মনে হল একবার আসনটা টেনে দ্যাখা যাক ৷ যেমন ভাবনা তেমনই কাজ ৷ আসতে আসতে উঠে ধ্যানরত পিতৃদেবের আসনটা সামান্য টানতেই সেটা বেরিয়ে এলো আর আমায় একটা ভয়ঙ্কর বিদ্যুতের আঘাত উল্টে ফেলে দিতেই আমি আসনটা আবার ঠিক করেই নিজের জায়গায় এসে বসে পড়লাম ৷ সমস্ত শরীর কাঁপছে ৷ বাবার মধ্যে একটুও হেল দোল নেই ৷ আমি চোখ বুঁজে বসে রইলাম ৷ প্রায় কুড়ি মিনিট পর বাবার ধ্যান ভাঙলো ৷ এসময় বাবা তিনবার গলা খাঁকড়ি দিতেন ৷ পরে জেনেছিলাম ধ্যানের সময় কুম্ভকে থাকতেন বলে ওই ভাবে টাগরা পরিস্কার করতেন ৷
যাই হোক গলা পরিস্কারের পর বাবা মাকে ডাকলেন – চিন্ময়ী চিন্ময়ী
কুম্ভকের পর এসময় বাবার গলাটা ভয়ঙ্কর বদলে যেত ৷
যাই হোক বাবার ডাক শুনে মা এসে হাজির হলেন জিজ্ঞাসা করলেন – কি বলছো ৷
বাবা বললেন – আজ তুমি বিধবা হতে বা পুত্রহারা ৷
মা অবাক বললেন – ধ্যান করে উঠে কী যা তা বলছ সব ৷ বাবা বললেন – শ্রীমানকেই জিজ্ঞাসা করো কি করেছে ৷
মা জিজ্ঞাসা করলেন – কী করেছিস তুই !
আমি সব বললাম ৷ মা বললেন – সর্বনাশ, কি দরকার ছিল এসব করার !
বাবা বললেন – নব ব্রহ্মচারী বলে বেঁচে গেছে ৷ নইলে সর্বনাশ হয়ে যেতই ৷
কাল থেকে ও আর এ ঘরে ধ্যানজপ করবে না ৷ পাশের ঘরে করবে ৷ দিদিভাই ঘটনা শুনে এই প্রথম আমায় খুব বকলেন ৷ তারপর বুঝিয়ে দিলেন আমি কত গর্হিত অন্যায় করেছি ৷ ঠিক হল এবার থেকে দিদিভাইয়ের সামনে বসে আমি ধ্যান জপ করবো ৷
আমার তো শাপে বর হলো ৷ বাবার নিয়ন্ত্রনে থাকতে হল না ৷ তার কয়েকদিন পরেই ব্রহ্মচারী দশা শেষ হল ৷ আবার সব স্বাভাবিক হলেও এক বছর আমায় খুব নিয়মের বন্ধনে থাকতে হয়েছিল ৷

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]