

শেষে দিল রা-(চার)
দুনিয়াটাকে সাদাসাপটা , সরল করে দেখতে পারলে তো মিটেই গেল- অথচ নিত্যকার জীবনে ক’জন আর পারছি সেটা?
হয়না, চাইলেও হয়না!
ঘাড়ের ওপর একটা মাথা আছে না? ওই মাথাটাই কিছু না কিছু নিয়ে ঘেমেই চলেছে। মাঝখান থেকে বেঁচে থাকাটাই একটা বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়াল– ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক এই অনুকর্ষের দায় মশাই আমাদের! তাই নিজেদের বাঁচার তাগিদেই বড় বেশি কমপালসিভ হয়ে পড়েছি আমরা। মাঝেমধ্যেই বিপদ আর না-বিপদের ভেদ রেখাটা উধাও হয়ে যায়, এমনকি কোনটা স্বাভাবিক, আর কোনটাই বা অস্বাভাবিক, যেটা ভাবার কোনও সুযোগই নেই, তাও ভেবে চলি আমরা।
আসলে সন্দেহ বিষয়টা আমাদের মজ্জাগত। কথায় বলে সন্দেহবাতিক!
মানেটা কি?
সন্দেহ করার বাতিক!
একটু ভেঙ্গেই বলি?
এক মাঝবয়সী ব্যাঙ্ককর্মী ভদ্রলোক আমার কাছে আসতেন একসময়। ক্লিনিকের বাইরে যতক্ষণ বসে থাকতেন, ততক্ষণই ঘাড় সোজা করে, বেশ আরষ্ঠ হয়ে বসে থাকতেন। ওনার সর্বদাই ভয়– কোনও মহিলার শরীরের দিকে বুঝি খারাপ ভাবে তাকিয়ে ফেলছেন! এই বুঝি পাশে বসা কোনও মহিলার গায়ে ওনার গা ঠেকে গেল, যদিও সেই পরিস্থিতির মধ্যে পারত পক্ষে ঢুকতেন না উনি। এবার, শুধুমাত্র মনে হলেই তো হ’ল না, ভদ্রমহিলা কিছু মনে করলেন কিনা, খারাপ ভাবলেন কিনা সেটাও তো কনফার্ম করতেই হবে!
উনি মনে মনে জানেন যে এ ধরনের কাজ উনি করতেই পারেন না, অথচ মনের এই ভাবনাটাকে কিছুতেই সরাতে পারতেন না। কাজকর্ম লাটে উঠল, বাড়ি থেকে বেরোনোই বন্ধ করে দিলেন অবশেষে।
এই যে সব জেনেও মন থেকে সরানো যাচ্ছেনা চিন্তাটা, বারম্বার চেক করতে ইচ্ছে করছে, এটা বাতিক।
এই বাতিকের ঘোরেই সারাদিন ধরে কেউ হাত ধুয়ে চলেছেন, আবার কেউ বা দরজার বা আলমারির তালা টেনে দেখতে দেখতে ঝুলেই পড়ছেন প্রায়।
তা এতটাই যদি ডাউট, এতই সংশয়, তবে একে সন্দেহের অসুখ বলছিনা কেন?
আসলে ভেদরেখাটা এখানে ভীষণ রকমের সূক্ষ্ম! আমি লোকটা যে হান্ড্রেড পার্সেন্ট খাঁটি, আমার মনে এমন চিন্তার কোনও জায়গা থাকছে কি করে? হাত নিশ্চয়ই ধোওয়া যায়– কিন্তু মন?
এ যেন একই মুদ্রার দুটো দিক! অনেক সময় আবার সন্দেহ আর বাতিক দুটোই মিলেমিশে যায়।
ক’দিন আগে হাসপাতালের আউটডোরে দেখাতে এলেন বছর চল্লিশের এক ভদ্রমহিলা। আমার জুনিয়র রোগীনির হিস্ট্রি নিয়ে বললে, স্যার, প্যারানয়েড পেসেন্ট, স্বামীকে সন্দেহ করেন সবসময়। সে একটা ওষুধের নাম উল্লেখ করে বললে, এটা দিই স্যার?
বয়সের দোষ আমার– কোথায় একটা খটকা লাগল। কথার সঙ্গে ভাবটুকু যেন মিলছে না। কী যেন একটা মিস্ করছি আমরা!
আউটডোরের ভিড়টা একটু কমিয়ে নিয়ে আবার বসলাম।
“স্বামীকে সন্দেহ করো? সন্দেহ করার মতন কিছু দেখেছ, পেয়েছ নাকি?”
আমার প্রশ্নের জবাবে ফিক্ করে হেসে ফ্যালেন মহিলা।
“ডাক্তারবাবু, আমার স্বামীর চেয়ে সচ্চরিত্র আর কেউ নাই! আমার তো ওটাই ভয় লাগে! ভাবি কি…”
“বলেই ফ্যালো!”
অভয় দিই আমি।
“ভাবি, যদি অন্য কাউকে কখনও ভালবেসে ফ্যালে ও! কি হবে তখন?”
সলজ্জ হাসিতে মুখে কাপড় দেয় এমন যে দেখে মনে হচ্ছে সদ্য বিবাহিতা।
“সব জেনেও তুমি বারবার স্বামীকে একই কথা জিগ্যেস করো, কাজের মাঝে ফোন করো কেন? লোকে তো অন্যরকম ভাবছে!”
মনে মনে আমিও তো অঙ্ক মেলাচ্ছি..অসুখের অঙ্ক।
“সবসময় বলিনা তো! ওই দুচ্ছাই কথাটা মনে এলেই…
একটা কিছু বড়ি দেন না গো ডাক্তারবাবু, কথাটা মনেই না আসে ঝাতে!”
মেধাবী জুনিয়রটি আমার মুখের দিকে সপ্রশ্ন তাকিয়ে আছে দেখে বলি–
এও “ও সি ডি”…বাতিকের আরও একটা রূপ! এরেই কয় “নন ডিল্যুসনাল জেলাসি”!
আরও একজনের কথা বলে শেষ করব।
আমার এক চিকিৎসক বন্ধুই ফোন করে পাঠিয়েছিলেন তাঁকে। বিমা কোম্পানির চাকুরে। স্ত্রীর কিছু সমস্যার জন্য দেখাতে চান আমায়।
ভদ্রলোক স্ত্রীকে না নিয়েই এলেন। কারণ স্ত্রীর সামনে নাকি কিছুই বলা যাবে না।
ঘটনা জটিল।
বেশ কিছুদিন থেকেই ভদ্রলোকের মনে হচ্ছিল তাঁর স্ত্রী ঠিক আগের মত নেই। মানে, বাইরে থেকে সব ঠিক লাগলেও কেমন যেন ছাড়াছাড়া ভাব একটা। ওঁদের বাড়ির একটা অংশে ভাড়া দেওয়া ছিল। মেডিক্যাল সেলস-র চাকুরে এক যুবক সম্প্রতি ভাড়া নিয়েছেন ঘর দুটো। একই ফ্লোর হলেও যাতায়াতের রাস্তা আলাদাই।

স্ত্রীর আচরণের পরিবর্তন দেখে ভদ্রলোক এবার চিন্তা করে দেখলেন, বাড়ির এই দুটো অংশের মধ্যে একটা কমন্ দরজা আছে, যেটা দু’দিক থেকেই তালা বন্ধ। তার চাবি টাবি অবশ্য আলাদাই থাকে, তবুও মনে হ’ল, আচ্ছা, ঐ দরজা দিয়েই এরা যোগাযোগ করছে না তো? এবার একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন তিনি।
দরজার পাশের পেরেকে এপাশের তালা-র চাবিটা রেখে ওৎ পেতে রইলেন। যখন তখন বাড়ি ঢুকতে শুরু করলেন।
“কিছু পেলেন?”
এতক্ষণে আমি জিগ্যেস করি।
“ওরা কম চালাক? কিভাবে যেন জানতে পেরে যায় আমি কখন বাড়ি ঢুকছি! তবে চাবির পজিশনটা যেন একটু সরে যেতে দেখি! ওটাই ক্লু স্যার! আপনি আমার ফ্যামিলিটা বাঁচান ডাক্তার সাহেব!”
বোঝো! এ যে রুমালের ম, বেড়ালের চ! তবুও জিগ্যেস করি,
“আপনার স্ত্রী কি বলেন? ওঁকে জিগ্যেস করেননি?”
“ও আর কি বলবে? বলার মুখ আছে? হাঁটুর বয়েসি একজনের সাথে প্রেম করছে, আবার বলবে? বললেই কাঁদে, বিষ খাবে বলে!”
আমার এইসব কথাবার্তা অবশ্যই ভাল লাগছেনা তাঁর।
বুঝতেই পারছি মামলা গম্ভীর, কিছু একটা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা যথেষ্টই। মুখে বলি,
দেখুন, এভাবে তো হবে না। আপনি ওনাকে আনুন বরং! আপনি যা বলছেন, তা থেকে কাউকে রোগী সাব্যস্ত করা আমার পক্ষে অসম্ভব!
আমার মুখমন্ডলে হয়ত খানিক বিরক্তি বা অবিশ্বাসের ছাপ দেখেও ক্ষান্ত হন না মানুষটা—
তাহলে আপনাকে আরেকটু খুলে বলি। মানে, আমি এতটা নিশ্চিত হচ্ছি কিকরে!
কথাটা মাথায় ছিলই– একদিন দুপুরের দিকে ফিরছি। পাড়ার মোড়ে কয়েকটা বেকার ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। কী মনে হ’ল, আমার মানিব্যাগে স্ত্রীর একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি রাখা থাকে, বের করে ওদের দেখালাম। এনাকে দেখেছ কেউ? আমার স্ত্রী কখনও বাড়ির বাইরে যায়না, পাড়ার কিছুতেই থাকিনা আমরা…ওদের তাই চেনার কথাও নয়।
ওরা মুখ চাওয়া চাইয়ি করল…তারপর একজন বললে, হ্যাঁ কাকু, দেখেছি মনে হচ্ছে!
আমার মনেই হ’ল, কিছু একটা চেপে যাচ্ছে এরা…জিগ্যেস করলাম, দুপুরের দিকে একটা জিন্স টিশার্ট পরা লোকের সাথে দেখেছ কখনও?
তা ওদের মধ্যে একটা ঝাঁকড়া চুলো ছেলে ছিল, একটু রাফ। সে হঠাৎ বললে, কাকু, এইসব আটভাট জিগ্যেস না করে বাড়ি যান তো! বাকি দুটো ছেলে ওর কথায় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল। এরপরও বলবেন, কিছুই না?
আমার স্ত্রী খুব ভাল ছিল জানেন– ও একটা চক্করে পড়েছে!
আমি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে থেমে যান অবশেষে–
ঠিক আছে, আপনি যখন ওকে না দেখে ওষুধ দেবেন না বলছেন, দেখব চেষ্টা করে, যদি আসে!
ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর বন্ধুটিকে ফোন করলাম,
শোনো, তুমি যাকে পাঠিয়েছ,তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন, ওঁর স্ত্রীর না! তবে এভাবে তো চিকিৎসা হয়না…
বন্ধু ডাক্তারবাবু বেশ খানিকটা অবাক হলেন,
বাকি সব কাজকর্ম তো পারফেক্ট! দারুণ বিনয়ী লোকটা, ভদ্রও বটে! দ্যাখো, মেন্টাল পেসেন্ট হলে বাকিসব কাজ করছে কি করে?
বন্ধুটিকে অবশেষে বোঝাতে পেরেছিলাম, ডিল্যুসনাল ডিসঅর্ডার এর যাবতীয় লক্ষণ নিয়েই ঘুরছেন ভদ্রলোক, ওঁর সত্যিই চিকিৎসা দরকার। ইত্যাদি ইত্যাদি।
ভদ্রলোক আর আসেন নি। কিন্তু ক’দিন পর ওনার স্ত্রী এসেছিলেন। কান্নাকাটি করলেন। ভদ্রলোকের এই আচরণ নতুন নয়, অনেক বছর ধরেই চলেছে। বাইরে থেকে কেউ বোঝেনা। মাঝেমধ্যেই মাত্রা ছাড়ায়, তখন মারধরও করেন স্ত্রীকে।
ভদ্রমহিলা অত্যন্ত ডিপ্রেশড।
কবে কি হবে জানেন না।
বাস্তবিক, আমিও জানিনা এর পরিনতি কি হ’ল।
রুমালের ‘ম’ তো উদ্ধার হ’ল, কিন্তু রুমালটাই যদি ডেসডেমোনা-র হয়, তখন?

