বেশ লজ্জা-লজ্জা মুখ করে বিয়ের কার্ডটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় শ্রাবণী।
–স্যার,সামনের আঠাশ তারিখ সন্ধেবেলা আর কোনও কাজ রাখবেন না প্লিজ! আপনি না এলে খুব কষ্ট পাব।
শ্রাবণী আমার পেসেন্ট,কোভিডের সময় থেকে দেখছি ওকে। এখন অনেক ভাল। একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছে। কোভিডের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও চুপ করে যায় শ্রাবণী। ওর সবচে কাছের ছিল মা, তাকেই হারিয়েছে। অনেক দিন মানতেই পারেনি সেটা। বাবার উপর সাংঘাতিক রাগ তখন, ওর ধারণা বাবার জন্যই মা-কে হারিয়েছে ও। খেত না , রাতের পর রাত ঘুমোতো না তখন । তারপর একদিন আমার ক্লিনিকে।
খুব কান্নাকাটি করত শ্রাবণী , সময়ের সাথে সবই অবশ্য কমল। ওর বন্ধুবান্ধব বলতে কেউই ছিল না সেসময়, ক্রমে তাও হ’ল। শোভন এলো জীবনে। তার সাথেই বিয়ে হচ্ছে।
কার্ডে চোখ বোলাতে বোলাতে বলি,
— যেতে তো বলছো, সমস্যা হবে না তো?

শিল্পী- মহুল হাওলাদার

শ্রাবণীর মুখের আলোটা মুহূর্তের জন্য কমে এলেও আবার ফিরে আসে,
— শোভনদের বাড়িতে সব জানে স্যার! ওরা বেশ প্রোগ্রেসিভ কিন্তু!

—প্রোগ্রেসিভ!!

অনেক বছর আগের একটা ভোর মনে পড়ে যায়। নামজাদা এক ইন্সটিটিউটে রেসিডেন্ট ডাক্তার তখন আমি। অ্যাডমিশন ডে ছিল সেদিন, সারাদিন চাপের পর ভোর রাতের ঘুম ভাঙল অ্যাটেনডেন্ট রমেশের ঠকাঠকে–ফিমেল ওয়ার্ড মে অ্যাডমিশন হুয়া স্যার!

অবাক হই, ইতনা সুবাহ্?

— স্যয়দ কোই ভি আই পি ফ্যামিলি হোগা …আইয়ে স্যার!

ওয়ার্ডে ঢোকার আগেই প্রবল হৈচৈ এর আওয়াজ শুনলাম। তিনচার জন নার্সিং স্টাফ, ওয়ার্ডের ফিমেল জিডিএ দলের সকলেই তটস্থ। সবাই কে ছাপিয়ে চোস্ত ইংরেজি আর দেহাতি হিন্দি গালিগালাজের বন্যা বইছে ওয়ার্ডে। আমি ঢুকতেই আরও এক প্রস্থ শুরু হয়– ডক্টর! আর ইউ এ ডক্টর? আয়াম অলসো এ ডক্টর !! প্লিজ টেল দেম টু রিমুভ অল দ্য্ রেসট্রেইন্টস্, আদারওয়াইজ আই উইল ক্রিয়েট…
ততক্ষণে ইঞ্জেকশন পড়েছে। মিনিট দশেক পর ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটি। অপাপবিদ্ধ একটা মুখ, মাথায় মেটে সিঁদুর মাখামাখি, হাতে মেহেন্দি–সদ্য বিবাহিত?

ব্রেকফাস্ট সেরে ফেরত আসার পথেই আমার সিনিয়র ডা. সুদ এর মুখোমুখি ,দিদিটি খুবই সিরিয়াস ,মীরাটের মেয়ে। দেখামাত্র হরবর করে বলতে থাকে, গাউথাম, ডু ইউ নো সি ওয়াজ অন লিথিয়াম?
ভেরি এডুকেটেড ফ্যামিলি…হার ব্রাদার ইজ আ ফিল্ম মেকার! সো স্যাড! সো স্যাড! লেট প্রফেসর কাম!

দিদির কথায় আরও কনফিউজড হয়ে যাই। ওয়ার্ডে ঢুকে দেখি ভয়ানক কান্ড! উন্মত্ত পেসেন্টদের হাত এবং পা আটকে রাখার জন্য সেকালে একরকম ভারী চেয়ার থাকত ওয়ার্ডে,যাতে নিজেদের কোনও ক্ষতি করতে না পারে রোগী, মেয়েটি সেই চেয়ারেই। শরীরে কোনও পোশাক নেই, ছিঁড়ে কুটিকুটি করেছে মেয়ে। সিস্টার কোনও রকমে গায়ে একটা বেডসিট দিয়ে দেন আলগা করে। সে এক অদ্ভুত উন্মাদ অবস্থা তার।
বেলার দিকে বাড়ির লোকের সাথেও কথা হ’ল–ডা.শর্মা, ডা. সুরেশ, এঁরাই সব বললেন আর কি! বছর চারেক ধরেই মেয়েটি চিকিৎসায় আছে, এম ডি পি, অর্থাৎ ম্যানিক ডিপ্রেশিভ সাইকোসিস! লিথিয়াম চলছিল, ভালই ছিল সে। বিয়ের ক’দিন আগে বাড়ির লোকে বন্ধ করে দেন ওষুধ, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা ভাবেননি কেউ। বিয়ের দিন অবদি সব ঠিকঠাক, সমস্যা হ’ল শ্বশুরাল পৌঁছে…কথা বাড়ল, শাসন করতে এসে খোদ শ্বশুরমশাই খেয়ে গেলেন থাপ্পড়। তারপর, তার আর পর কি? যা দেখছি তাই।

দু তিন দিন পর থেকেই মেয়েটির সাথে খানিক ভাব হয়ে গেল। ওর নাম অমৃতা। আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর সাবজেক্টের মধ্যে সাইকোলজিও ছিল ! সাহিত্য ভালবাসে, পড়েও নিয়মিত। কোথা থেকে কিই যে হয়ে গেল বুঝতেই পারছে না ও।

কয়েক দিন কাটল। ফিমেল ওয়ার্ডের বাকি অনেকের সাথেই অমৃতার বেশ দোস্তি।
নবম দিনে একটা চিঠি এল ওর নামে, উকিলের চিঠি।
পরের ক’টা দিন একেবারে থম মেরে গেল মেয়েটা। চুপচাপ বসে থাকত, কাঁদতে দেখিনি কখনও। হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হওয়ার পর আর অমৃতার দেখা পাইনি। তার জীবনের বাকি অধ্যায় জানার সুযোগ ছিল না আমার। এমন কতই তো ঘটছে রোজ, কজনের আর খোঁজ রাখছি! তবু মাঝে মাঝেই সিঁদুরে মেঘ হয়ে ভেসে আসে তারা।

— কি হ’ল স্যার, কিছুই তো বললেন না! আপনার হয়ত মনে নেই, কিন্তু আপনিই একদিন আমায় বলেছিলেন, লুকিয়ে রাখার মতো কোনও অন্যায় তো করো নি তুমি। মানুষের অসুখের বেশিরভাগই ক্রনিক, অতএব ডাক্তারবাবু বললে যেমন প্রেসার, সুগার, থাইরয়েড কি আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা করিয়ে যেতে হয়, এও তো তেমনই অসুখ! নিজের খুশিমতো বন্ধ করবে কেন ওষুধ?
কথাগুলো আমার মনে ছিল বলেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই শোভনকে সব বলেছি। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বলেছিল , ভাল মন্দ,তোমার সবটুকু নিয়েই তো চাইছি তোমায়…তোমার অসুখটাই কি শুধু তুমি, আর কিছু নও?

এতক্ষণে শ্রাবণীর মুখের দিকে তাকাই। কথাগুলো বলতে পেরে আরও যেন উদ্ভাসিত সে। অথচ কত মানুষই তো হাজার সংশয়ে কিভাবে যেন জটিল করে ফেলে সব। বিয়ে করাটা যে একটা চয়েস, একটা সিদ্ধান্ত, তাই-ই তো ভাবেনা কেউ! এ সমাজে বিয়ে হয়, বিয়ে দেওয়া হয়, বিয়ে করে আর ক’টা লোকে?

কার্ডটা ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখতে রাখতেই শ্রাবণীকে বলি, যাব গো যাব !
যেতে তো হবেই আমায়।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Ratna Mitra
Ratna Mitra
1 year ago

খুব ভাল লাগল।