
প্রজাপতি
প্রতিদিনের মত আজও বিকেলের চা পর্ব সেরেই নবীনবাবু এসে বসলেন স্বদেশ পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের কদম গাছের নিচের সিমেন্টের বেঞ্চে।
এই সময়টায় ওঁর মতো বয়স্ক মানুষ আর একদম ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের মা বা কাজের লোকের ভীড়। সন্ধে নামার আগে থেকে গুটি গুটি পায়ে কয়েক জোড়া তরুণ তরুণীর আনাগোনা শুরু হয়।
দু হাঁটুর বাতের ব্যথায় কাবু নবীন সেন মশাই সকালে বাজার যাওয়া ছাড়া এই দ্বিতীয় ও শেষ বারের জন্য বাইরে বের হন।
হেমন্তের রোদ পড়ে আসা বিকেলে ঠান্ডার আলতো ছোঁয়া। ছোটদের ছোটাছুটি, বড়দের হাঁকাহাঁকি আর বুড়োদের বকবকানি নিয়ে পার্কটা সরগরম। রোজ যেমন হয় আর কি।
কিন্ত আজকের বিকেলটা নবীন বাবুর কাছে একেবারে অন্যরকম হয়ে উঠল একটা ঘটনায়।
হঠাৎ চোখে পড়ল এক ভদ্রলোককে। একটা আট-নয় বছরের ছেলেকে নিয়ে। বেশ লম্বা আর সুন্দর চেহারা। বয়স ওনার মতো ষাট না পেরুলেও মধ্য-পঞ্চাশ তো বটেই। একদম নতুন মুখ। দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলে নিত্যনতুন ফ্ল্যাট গজিয়ে ওঠার সুবাদে অচেনা মানুষের ছড়াছড়ি। নবীনবাবু বুঝলেন তেমনই একজন ইনি নাতির আবদার মেটাতে হাজির হয়েছেন।
এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে বেশ খানিক পরে ওরা দুজন এসে বসল নবীনবাবুর পাশের বেঞ্চে। নতুন জায়গায় এমন চমৎকার খেলার জায়গা পেয়ে আনন্দ আর উত্তেজনায় অস্থির নাতির সঙ্গে পেরে উঠবে কি করে দাদু?
নবীনবাবুর অমনি মনে পড়ে যায় তিতলিকে।
একমাত্র ছেলের ছ বছরের ফুটফুটে মেয়ে। বাপ-মা দুজনেই চাকরি করায় কাজের মাসির কাছে মানুষ হচ্ছে তিতলি বেঙ্গালুরুতে। হয়ত এই মুহূর্তে তিতলি উমা রাওয়ের হাত ধরে কোন এক পার্কে। আর ওর দাদু একলা বসে কলকাতার আর এক পার্কে।
চশমাটা খুলে মুছে নিলেন রুমালে।

ভদ্রলোক বসার জায়গা পেয়ে শান্তি পেলেও, এঁকেবেঁকে উড়তে থাকা একটা প্রজাপতি ধরার জন্য ছোট্ট ছেলেটি অশান্ত। প্রজাপতির ওড়ার তালে তালে তিড়িং বিড়িং করেই চলেছে।
“ছেড়ে দাও বাবু”
“কেন? কেন?”
“প্রজাপতি ধরা যায় না। ধরতে নেই”
“কেন? প্রজাপতি তো পাখির মতো। পাখি ধরা গেলে প্রজাপতিদের কেন ধরা যাবে না বাবা?”
শেষ শব্দটা কানে যেতেই চমকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন নবীনবাবু।
এই ছোট্ট ছেলেটির বাবা এই ভদ্রলোক?
আরে এতো ওর নাতির বয়সী।
ঠিক সময়ে বিয়ে হলে…।
নিশ্চয়ই হয় নি অথবা দেরিতে এনেছেন ওকে পৃথিবীতে। তবে বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। কিংবা স্ত্রীর বিশেষ কোন সমস্যার জন্যেও দেরি হয়ে থাকতে পারে। বেশ আশ্চর্য আর আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন সেনবাবু।
এমনটাই হয়, আমরা, সাধারণ মানুষরা নিজের থেকে অপরের সমস্যায় নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলি অনেক বেশি আর তাড়াতাড়ি।
ছেলেকে সামলাতে এবার ছেলে ভুলনো গপ্পো ফাঁদেন ভদ্রলোক,” ভগবান আকাশ থেকে ওদের এখানে পাঠান এখানে কে কি করছে দেখার জন্য।”
“তাহলে এই প্রজাপতিটাই মনে হয় দাদা। তাই না বাবা?” শিশুমনের অবুঝ জিজ্ঞাসা।
“কেন?” হঠাৎই এমন প্রশ্নে অবাক বাবা।
“তুমিই তো বলেছিলে দাদা আকাশে চলে গিয়ে আমাকে পাঠিয়েছে। তাই মনে হয় ভগবান দাদাকে পাঠিয়েছে আমার দুষ্টুমি দেখার জন্যে। কেমন বিরক্ত করছি তোমাকে। হিঃ হিঃ হিঃ ….তাই না বাবা?”
বাবার মুখে নেই কোন জবাব।
নবীনবাবু উঠে পড়লেন বেঞ্চ থেকে।

