

শেষে দিল রা-(পাঁচ)
মানুষের জীবনগুলো এক একটা বহতা উপন্যাসের মতোই । এরা একে অন্যের সমান্তরালে বইতে থাকে বলেই হয়ত পাশের লোকটাও জানতে পারেনা নিকটতম দুরত্বের মানুষটা ভেতরে কি বহন করছেন।
ভাবলাম, আজ কোনও রোগের কথা না বলে বরং সেই কাছের মানুষজনের কথাই বলি । রোগের সমান্তরালে, রোগী বা রোগীনির বহু উত্তেজনার, উৎকন্ঠা উদ্বেগের দায় তো এঁরাই বইছেন !
রোগ বা রোগীর সূত্রে আটকে গেছেন এঁরা– অদৃশ্য মায়া আছে, দায় আছে, লোকের চোখে ছোট হয়ে যাওয়ার স্টিগমাও আছে। রোগটা যদি আদৌ না থাকত, রোগী বা রোগীনির মতোই এঁদের জীবনগুলোও হয়ত অন্য খাতে বইত।
টেবিলের উল্টোদিকে বসে সবই দেখি। ওঁরাও দেখেন সবটাই । দেখতে দেখতে নিজেরাই অনেক কিছু বুঝে নেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা রোগীদের মাঝেমধ্যে বাড়ির লোক বদলে যায়। হাসপাতালের রোগীদের বাড়ির লোকজন খুঁজে পাওয়াটাও একটা সমস্যা – প্রাইভেট ক্লিনিকে অবশ্য এ সমস্যা কম। আবার ‘বাড়ির লোক’ সঙ্গে সঙ্গে থাকার সমস্যাও যে নেই তা নয়–অনেক রোগী বা রোগীনিকেই দেখেছি একা কথা বলতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। রোগের বাড়াবাড়ি অবস্থায় অবশ্য অনেকেই গুছিয়ে বলতে পারেন না। দেখভাল, ওষুধ, সবেতেই তখন সঙ্গের মানুষটি ছাড়া গতি কি?
যেহেতু মানসিক রোগ ঘিরে আমাদের সংশয়ের শেষ নেই, তাই প্রশ্নচিহ্ন এবং হতাশারও শেষ নেই যেন।
ক্ষোভ বিক্ষোভও ঢের!
চিকিৎসক জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি দুঃখ শোক যাই-ই থাক না কেন, কাছের মানুষটাকে বাস্তব অবস্থাটা বিষয়ে ঠিকঠাক কমিউনিকেট করা যায় তবেই কিন্তু রোগী বা রোগীনির হাল-ও অনেকটা সামলানো যায়। কপালে করাঘাত বা ভাগ্য কে দোষ না দিয়েও তখন কোথাও যেন রোগের খোলসে ঢেকে থাকা আসল মানুষটার খোঁজ পাওয়া যায়।
অন্য পাঁচটা রোগেরও কেয়ার গিভারের কি চাপ নেই? অবশ্যই আছে, তবে মনের অসুখ সংক্রান্ত বিষয়গুলো অবধারিত ভাবেই কিছুটা আলাদা-বহু স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস লেখা আছে এখানে।
বছর ষোল সতের বয়সী একটা মেয়েকে দেখতাম একসময়। সবসময় উত্তেজিত, কারও কথা শোনেনা, বাড়ির অবস্থাটা অসহনীয় করে তুলেছিল। সঙ্গে আসত তার মা, তাঁকেও মারধর, গালিগালাজ। ওষুধ কখনও খেত, কখনও খেত না, মর্জিমাফিক সব।
কয়েকবার আসার পর বছর খানেক আর এলো না। ভুল বললাম, এলো সে– একেবারেই শান্ত হয়ে। এবার বাবা আর পিসি সঙ্গে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, মা আর নেই। কয়েক মাস আগেই সুইসাইড করেছে। মেয়েটির চোখে জল, আমার জন্যই মা চলে গেছে! এর পরের অংশ নিয়ে কিছু বলব না, কিন্তু এই চাপের কথা ক’জন শুনেছেন?
একটা সময় অন্যান্য আরও কয়েকটা তথাকথিত উন্নত দেশের সাথেই আমাদের মতন উন্নয়নশীল দেশেও বড় ধরনের মানসিক অসুখ ( যেমন, সিজোফ্রেনিয়া) হলে তার ভবিষ্যত পরিণতি কি হতে পারে এ নিয়ে সমীক্ষা হয়েছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হ’ল সমীক্ষার ফলাফলে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের মতন কয়েকটা দেশের মনের অসুখে ভুক্তভোগীদের পরিণতি বেশ কিছুটা ভাল বলে দেখা গেল। বড়লোক এবং উন্নত দেশগুলোর অবশ্যই সেটা মানতে বেশ অসুবিধে । যাই হোক, আরও খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে জানা গেল, কথাটা ভুল না, বানিয়ে বলাও না। আসলে অসুখ ডাক্তার যাইই থাক না কেন, পরিবারের মধ্যে একজন মনোরোগীকে বাকিরা কিভাবে দেখছেন,কিরকম ব্যবহার, কতটা খিঁচখিঁচ করছেন, কথায় কথায় কতটা খোঁটা দিছেন, সেসব অনেক কিছুর উপরেও কার কতটা রিল্যাপ্স করবে, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হবে কিনা, তা নির্ভর করে। আজকের তুলনায় আজ থেকে চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগে বোধ করি আমাদের দেশের কালেক্টিভিষ্ট ধরণের সমাজে সেটা অনেকটাই সদর্থক ছিল, একে অন্যের জন্য সময় বের করা অথবা সহ্য করাটাও পরিবারের অঙ্গীভূত ছিল। আজ,এই দু’হাজার পঁচিশেও সেটা কতটা অবশিষ্ট আছে তা বুঝতে নিশ্চিত আরও সমীক্ষার দরকার।সময়ের ফেরে অনেক কিছুই বদলেছে। নতুন নতুন ওষুধের আবিষ্কার মনের অসুখের চিকিৎসা অনেকটাই সহজ করে তুলেছে। অন্যদিকে আবার পরিবার পরিজনের পরিধি কমে আসছে–কার হাতে এখন কতটুকু সময় আছে?

গত শতকের পাঁচের দশকে এদেশের একজন স্বনামধন্য মনোচিকিৎসক ডাক্তার গোবিন্দস্বামী বলেছিলেন, কোনও মানসিক রোগীর কাছে লোকে যা আশা করে ,তা হ’ল,
এক, সে জন্য প্রোডাক্টিভ থাকে অর্থাৎ কাজকর্ম করতে পারে –বিরাট রোজগারের দরকার নেই, চলে গেলেই হ’ল।
দুই, প্রতিবেশী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা। আজকের ফ্ল্যাট কালচারের যুগে এটা আরও ভাববার মতো।
তিন নম্বর কথাটা হ’ল, ম্যারেজিয়েবিলিটি, মানে তার বিয়ে দেওয়া যায় কিনা!
দেখুন, এর মধ্যে কোথাও ভায়োলেন্সের কথা নেই, হ্যালুসিনেশন, ডিল্যুসন কিচ্ছু না থেকেও যা আছে, আজকের যুগেও একজন মানুষের মানসিক রোগের ক্ষেত্রেও আমরাও এসবই ভাবি।
এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে বাড়ির লোকের, কাছের মানুষের কথা ভাবলে তবেই বোঝা যাবে আসল প্রতিবন্ধকটা কোথায়!
কত রকমের মানুষই যে দেখলাম! বছর বিশেক আগে দেখা এক পরিবারের কথা মনে পড়ছে। বাড়ির বড়ছেলের বৌ, যথেষ্ট অস্বাভাবিক। কয়েক বছর আগে রোগ লুকিয়ে বিয়ে এবং তৎপরবর্তী কোর্ট কাছারি। মেয়েটির দায় তার বাপ মা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। স্বামীটি চূড়ান্ত বিরক্ত, তিনি তো প্রতারিত, এমনই ভাবছিলেন তিনি– একেবারে অযৌক্তিক নয় কথাটা। এই টানাটানির মধ্যেই এসে দাঁড়ালেন যিনি, আশ্চর্যের হলেও তিনি শাশুড়ি মা– তিনিই আশ্রয় দিলেন, চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্বও নিলেন। আমার যদি এমন একটা মেয়ে থাকত ডাক্তারবাবু? ফেলে দেব? ও যাবে কোথা? যুক্তি এনারও অকাট্য!
দীপক নামের ছেলেটাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে আমার। বহুকাল আগের পেসেন্ট, হাসপাতালের আউটডোরে আসত। জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলত, লালা পড়ত মুখ দিয়ে। চলাফেরায় জড়তা ছিল, ভীষণ রকম ঝাঁকুনি, খিঁচুনি। দীপকের হাতে একটা দড়িবাঁধা ফাইল থাকত, প্রাণপণে ও সেটার ফাঁস খোলার চেষ্টা করত। যতই করত ততই হাত কাঁপত ভয়ানক ভাবে। একটু আধটু ভিটামিন বড়ি ছাড়া দীপককে বিরাট কিছু ওষুধ দেওয়ার ছিল না হাসপাতালের । ওর রোগটা সারবার নয়, নার্ভের কিছু অসুখ এমনই। একে বলে হান্টিংটনের অসুখ, মাঝবয়সে শুরু হয়। আগে তো ও চাকরি করত একটা প্রিন্টিং প্রেসে। কাজটা গেছে।
দীপক তবুও আসত। লাল পড়া মুখটা মোছার চেষ্টায় বাঁ হাত টা প্রবলভাবে কাঁপত, ওর মাঝেই হাসত সে– ভাল আছেন তো, ডাক্তারবাবু? কথা ভাল বোঝা যেত না, সবই তো জড়ানো।
শুরুতে ওর সাথে আসত বৌ, কখনও মেয়ে। একদিন সব আসা বন্ধ হ’ল। একসময় দীপকের আসাটাও বন্ধ হয়ে গেল।
মাস কয়েক পর হাসপাতালের এ বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংএ যাওয়ার পথে দেখি মহা হৈচৈ।
জায়গাটা কলতলা গোছের। সেখানেই জটলা, মূলত মহিলারাই সেখানে জল ভরেন, কাচাকাচি করেন। সেই উঠোনেই আছারি বিছারি পড়ে পড়ে বাঁশ, লাঠি, ঝাঁটার মার খাচ্ছে একজন উলঙ্গ মানুষ। ভয়ার্ত সে– অথচ নিজেকে কেমন করে সুরক্ষা দেবে তাও জানেনা।
“কি হচ্ছে এসব?”
গলা তুলতেই একটু চুপ সবাই, তারপর আবার কলরব–ভীষণ বদমাস এটা, আজ মেরেই ফেলব! এখানে এসেছে উদুম হয়ে চান করতে!
মারধর থামতে ভাল করে লোকটার মুখের দিকে তাকাই, দীপক না? এ কি অবস্থা হয়েছে দীপকের?
নাম ধরে ডাকতে সে আমার মুখের দিকে তাকায়, ফ্যালফ্যালে শূন্য দৃষ্টি! চিনতে পারেনা আমায়। কপাল থেকে রক্ত ঝরছে, গোটা শরীরেই কাটাছেঁড়া। হেঁচড়ে পেঁচড়ে শরীরটাকে তুলে থম্ ধরা দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার দেখেই হঠাৎই দৌড় দেয় সে।
ভিড়ের লোক হারিয়ে যায় ভিড়ে, আর তাকে কখনও দেখিনি।
ঘটনার তো শেষ নেই।
সেদিনই একজন বয়স্ক মানুষ এসে হাজির।
“ডাক্তারবাবু, আপনার হয়ত আমাকে মনে নেই, কিন্তু আপনি আমার মেয়েকে দেখতেন। ও মারা গেছে দু বছর হ’ল।”
মনে পড়ে যায় মেয়েটির কথা। বছর চল্লিশের মেয়ে, কাঠি চেহারা। দিনের পর দিন কিচ্ছু খেত না, সারাদিন পরিস্কার করে চলেছে, খাবার দিলে সমানে পোকা, নোংরা খুঁজে বেড়াত, খাবে কি! নিউট্রিশনাল কারণেই মারা যায় মেয়েটি। বিয়ে হয়েছিল, স্বামীর ঘর করতে পারেনি, তবে একটা ছেলে হয়েছিল।
সমস্যা এখন সে ছেলেকে নিয়েই, পুরোপুরিই মায়ের হাত ঝাড়া যেন– দাদু তাই ছুটে এসেছেন এখন থেকে দেখলে যদি কিছু হয়।
ভদ্রলোকের হতাশ মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি, আশ্চর্য! পঁচাত্তর বছরের কেয়ার গিভার এবার যেন দ্বিতীয় ইনিংসের জন্য মাঠে নেমেছেন। মুখে বলি, দেখতে তো হবেই, নিয়েই আসুন!
কত ঘটনাই যে ভিড় করে আসছে মনে! তবে আর না, আরেকটি মেয়ের কথা বলে শেষ করব।
মেয়েটির বাড়ি গিয়ে দেখেছিলাম প্রথম দিন। তার বাবার অনুরোধ ফেরাতে পারিনি। গিয়ে জানলাম, সে ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, মেধাবী।
শেষ তিন চার দিন জলস্পর্শ করেনি সে। কারণটা নিজে মুখেই বললে, ওর যত পুতুল, বইয়ের আলমারি সর্বত্র ক্যামেরা লাগানো আছে, ওকে পুরোপুরি নজরে রেখেছে সবাই। খাবার, জল সবেতেই নাকি বিষ দেওয়া আছে– খেলেই মৃত্যু!
সেই যুগে কিন্তু মোবাইল ফোন ছিল না, আর মধ্যবিত্তের বাড়িতে সিসি টিভিরও প্রশ্নও ছিল না।
যাই হোক, কোনও কারণে সে আমায় একটু বিশ্বাস করল, আমাকে চা দেওয়া হয়েছিল, আমার কথায় সে বিস্কুটও খেল।
খুব তাড়াতাড়িই সেরে উঠল মেয়েটি,অভাবনীয় উন্নতি– বাপ মা খুশি যথেষ্টই।
এরপর বছর চারপাঁচ কেটে গেছে– সে মেয়েই ফোন করল একদিন। ডাক্তার আঙ্কেল, মাকে একবার দেখতে হবে আপনাকে।
দেখলাম — একেবারে ক্লাসিকাল সিজোফ্রেনিয়া যেন!
কিভাবে সম্ভব? জেনেটিক পাজল্?
মেয়েটির বাবা বললেন, আপনাকে বলা হয়নি ডাক্তার সাহেব, আমার বড় শালারও একই রকম সমস্যা আছে !
মেয়েটি এখন একটা স্কুলের টিচার। যাবতীয় ব্যবস্থা সব ওইই করল- ওর যত্নেই নির্ঘাৎ ওর মা সেরে উঠবেন।
সমীকরণের বদল হলেও এইসব দেখতে দেখতেই আমার দিন কাটে আজও।
মনের রোগ ভাল করতে ওষুধপত্তর তো লাগবেই, তবে পাশাপাশি আরও কিছু সংবেদনশীল মনেরও তো প্রয়োজন– নইলে সব সংবেদন যেখানে ভোঁতা হয়ে যায়, কাছের মানুষজনও যখন ক্লান্ত, বিষণ্ণ, তখন মনসঞ্জীবনীর কলসটা বইবার লোক পাওয়া যাবে কোথায়?


প্রণাম গৌতম দা।অসাধারণ একটা পর্ব পড়লাম ।