
আঁতুড়ঘর
রবিবার। ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ। শীতকাল। বছরের এই সময়টা শহরে শীতের ভাল আমেজ আসে এ বছর শীত বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। বিকেলে অমলদের বাড়িতে আমাদের রবিবারের সান্ধ্য আড্ডা বসেছে।
অমল আমার একেবারে ছোটবেলার বন্ধু। আমরা এক পাড়াতেই থাকি। স্কুল থেকে কলেজ দুজনে এক সঙ্গেই পড়েছি। ওর বাড়ি আমার বাড়ি ছেড়ে কয়েকটা বাড়ি পরেই। অমলের বাড়ির একতলার বৈঠকখানায় বসে আমাদের আড্ডা। সভ্যসংখ্যা চারজন। আমি, অমল, প্রবীর আর মিহির। প্রবীর আর মিহির আমাদের পাড়াতেই থাকে, তবে একটু দূরে। ওরাও আমার বন্ধু। তবে অমলের সঙ্গে আমার পরিচয় যত পুরনো, প্রবীর আর মিহির সঙ্গে ততটা নয়। ওরা আমাদের পাড়ায় এসেছে এই বছর দশেক হল। প্রবীর আর মিহির আবার পরস্পর জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাই হয়। আমাদের আড্ডা মূলত রবিবার বিকেলে বসে। ছটা থেকে সাড়ে সাতটা আটটা পর্যন্ত জমিয়ে আড্ডা দেওয়া হয়। এখন ছুটির সময়। তাই আড্ডার সময়ও আমাদের একটু বেশিই হচ্ছে। তবে সব সময় যে আড্ডা হয় তা নয়, আড্ডার পাশাপাশি ইনডোর গেমস খেলার ব্যবস্থাও আছে। তাস, দাবা, ক্যারাম নানান ধরনের খেলার সরঞ্জাম আছে অমলের বাড়িতে। এর সঙ্গে আরো দুটি জিনিস থাকে। তা হল চা আর সিগারেট। চা-টা আসে অমলদের বাড়ি থেকে। আর সিগারেটটা এক-একজন এক-একদিন আনে। তবে আমি বাদে, ওই নেশা থেকে আমি বঞ্চিত।
সেদিন অমলদের বাড়িতে গিয়ে দেখি ইতিমধ্যেই প্রবীর আর মিহির এসে গেছে। আর একজন অপরিচিত ভদ্রলোককে দেখলুম অমলের বৈঠকখানায়। বেশ বয়স্ক। বয়স আন্দাজ বছর ষাটেক। মাঝারি গড়ন। গায়ের রং ফর্সা। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি আর গায়ে একটা খয়রি রঙের শাল । আমি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতেই অমল আমার সঙ্গে অপরিচিত ব্যক্তিটির পরিচয় করিয়ে দিল। ভদ্রলোকের নাম শিবতোষ বিশ্বাস। অমলের কী রকম দূর সম্পর্কের মামা হন। থাকেন হুগলি জেলার তিরিশ বিঘেতে। সম্প্রতি অমলদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। কথায় কথায় অমল বলল শিবতোষবাবু নাকি খুব ভাল গল্প বলতে পারেন। তাই অমল আমাদের আড্ডায় ওঁকে নিয়ে এসেছে।
অমলের মামার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বুঝলুম অমল ভুল বলেনি। ভদ্রলোক রীতিমত মিশুকে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন। কথা বলতে বলতে আমাদের একবারও মনে হলো না যে তাঁর সঙ্গে আমাদের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর বয়সের তফাৎ। কথার ফাঁকে হঠাৎ প্রবীর বলে উঠল-“আচ্ছা মামাবাবু, আপনি কোনো ভূতের গল্প জানেন?”
“কেন, তোমার কি ভূতের গল্প শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে? অল্প হেসে প্রশ্ন করেন শিবতোষবাবু।
“হ্যাঁ, আজ বেশ শীত পড়েছে। এই শীতে ভূতের গল্প কিন্তু জমবে ভাল।”
প্রবীরের কথার সুর ধরে আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি, অমল আর মিহির শিবতোষবাবুকে ভূতের গল্প বলার জন্য অনুরোধ করলুম। আমাদের সবার অনুরোধে ভূতের গর বলতে রাজি হলেন শিবতোষবাবু।
“ভূতের গল্প তো বলব, কিন্তু তার আগে এক কাপ চা পেলে মন্দ হতো না। চা-টা খেয়ে বেশ ভাল করে বলা যেত।”
শিবতোষবাবুর কথায় অমল বাড়ির ভিতরে দৌড়ে গিয়ে চায়ের কথা বলে এলো। কিছুক্ষণ পরে অমলের বোন মিনু চা আর সঙ্গে করে মুড়ি, বেগুনি, পাঁপড়ভাজা নিয়ে এল। দেখে আমাদের মনটা আরো চনমনে হয়ে উঠল। চা খেয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে শিবতোষবাবু ধীরে সুস্থে গল্প বলতে শুরু করলেন। লক্ষ করলাম ওঁর গল্প বলার এক অদ্ভুত সহজাত ক্ষমতা আছে। যাকে বলে রীতিমত ভাল গল্প বলিয়ে। পরিবেশটা আরও রোমহর্ষক করার জন্য আমাদের কথায় অমল গল্প বলার সময় ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল, আর ঘরের কোণে একটা বাতি জ্বেলে দিল। একেবারে ভূতের গল্পের আদর্শ পরিবেশ। শিবতোষবাবু গল্প বলতে শুরু করলেন-

“আজ আমি তোমাদের যে ঘটনার কথা বলব সেটা কিন্তু গল্প নয়, এটি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। একে তোমরা ভূত বলবে কি অন্য কিছু বলবে তা তোমাদের ব্যাপার। আমি কোনো মতামত দেব না। ঘটনাটি ঘটে আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি আগে। আমরা দুই ভাই। আমার ছোট ভাই মহীতোষ আমার থেকে দশ বছরের ছোট। আমরা ছাড়া আমাদের সংসারে ছিলেন মা। বাবা ততদিনে গত হয়েছেন। আমি বিয়ে করিনি। নিজের কাজকর্ম নিয়েই থাকি। আমি বিয়ে না করায় মা মহীতোষের বিয়ে অল্প বয়সেই দিয়ে দেন। মহীতোষের যখন বিবাহ হয় তখন ওর বয়স সাতাশ ।মহীতোষের বিবাহের বছর দুয়েক পরে ওর স্ত্রী মায়ার প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে। একটি পুত্রসন্তান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সন্তানটি জন্মের ছয়দিনের দিন আঁতুড়ঘরেই মারা যায়। ছেলেটি জন্মেছিল সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায়। জন্মের সময় কোন অসুখ-বিসুখ হয়নি। হঠাৎই এই দুর্ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই, আমাদের সবারই মন খুব খারাপ হয়ে যায়।
এর প্রায় বছর দুয়েক পরে মহীতোষের দ্বিতীয় সন্তান জন্মায়। এবারেরটিও পুত্রসন্তান। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে দ্বিতীয় সন্তানটির পরিণতি প্রথম সন্তানটির মতনই হয়। এবারেও ছেলেটি আতুড়েই মারা যায়। অথচ ছেলেটি জন্মের সময় সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। পর পর দুবার এই ঘটনাটি ঘটার পর আমাদের সবার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। বিনা অসুখে এইভাবে পর পর দু-বার সদ্যোজাত দুটি শিশুর মৃত্যু আমাদের একেবারে বিমূঢ় করে দেয়।
আমরা গ্রামে থাকি। স্বভাবতই গ্রামবাসীদের মন কু-সংস্কারে আচ্ছন্ন। নানান লোকে নানান কথা বলতে লাগল। কেউ বলল আমাদের বাড়িতে ভূত আছে। কেউ বলল মহীতোষের স্ত্রী সম্পূর্ণ সুস্থ নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক, আমরা বিশেষ করে আমি অবশ্য এইসব গ্রাম্য অন্ধ কুসংস্কারে কান দিইনি। এইসব কথার কোন অর্থ হয় না। এক-একজন মানুষের বিশ্বাস এক এক রকম। গ্রামাঞ্চলের মানুষের অন্ধ কুসংস্কার বরাবর-ই বেশি। যাই হোক, এইভাবে আরো বছর দুয়েক কেটে গেল। মায়া আবার অন্তঃস্বত্ত্বা হল। মহীতোষের তৃতীয়বার সন্ধান জন্মাবার আগে থেকেই আমার মা সাবধান হতে লাগলেন। ঠিক হল যে এবারে আঁতুড়ঘর পরিবর্তন করা হবে। তৎসহ আরো কিছু কিছু পরিবর্তন হল। যেদিন মহীতোষের তৃতীয় ছেলে জন্মালো সেইদিন রাত্রে আমার মা একটা স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্ন দেখলেন যে একজন দীর্ঘকায় গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী মাকে বললেন যে, তুই যদি তোর নাতিকে বাঁচাতে চাস তাহলে সাতরাত আঁতুড়ঘরের দরজার সামনে পাহারা দিতে হবে। এই কথা বলার পরেই সন্ন্যাসী মিলিয়ে যান এবং মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। পরদিন সকালে উঠে মা আমাদের এই কথা জানান। প্রথমে আমরা বিশেষত আমি আমার মায়ের কথায় খুব একটা কান দিইনি। বুঝতেই পারছিলাম মায়ের আসলে উদ্বেগ হচ্ছে। মা আমার কোনো কথা শুনলেন না। স্পষ্ট আমাদের বলেন আঁতুড়ঘরের সামনে পাহারা দিতে। শেষ পর্যন্ত আমি মায়ের কথায় কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলুম।
আঁতুড়ঘরটি আমাদের মূল বাড়ি থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। মূল বাড়ি থেকে হাত দশেক দূরে। আঁতুড়ঘরের সামান্য দূরেই রয়েছে আমাদের বাড়ির পুরোনো গোয়ালঘর। সেখানে একটা গোরু আর তার দুটি বাছুর থাকত। যাই হোক, মায়ের নির্দেশ মত রোজ রাত্তিরে আঁতুড়ঘরের সামনে পাহারা দেওয়া শুরু হল। রাত্তির নটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত পাহারা। প্রথম রাত অর্থাৎ একটা পর্যন্ত আমি পাহারা দিই আর বাকি রাতটুকু পাহারা দেয় মহীতোষ। এইভাবে দেখতে দেখতে পরপর ছয়রাত কেটে গেল। এবার কিন্তু আর কোনো অঘটন ঘটল না। আমরা সকলেই ভাবলুম যে ছেলেটি এবারে নিশ্চয় বেঁচে যাবে। কারণ আগের দুবারই মৃত্যু হয়েছিল ছয়দিন বা তার মধ্যে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মা যেটা দেখেছিলেন সেটা নিছকই স্বপ্ন, তার বেশী কিছু নয়। আমি মাকে বলেছিলুম এই কথা। কিন্তু মা বিশ্বাস করেননি। তাঁর মতে ওই স্বপ্নের নিশ্চয়ই কোন-না-কোন অর্থ আছে। আমি আর মাকে কিছু বলিনি। আর তো মাত্র এক রাত্তিরের ব্যাপার। তারপর আর রাত জাগতে হবে না।
সপ্তম রাতের প্রথমটা বেশ নির্ঝঞ্ঝাটে কেটে গেল।কোনো কিছুই হল না। ঘড়িতে বাজছে প্রায় একটা। মহীতোষ আসবে বলে বসে আছি। মহীতোষ, এলে আমার পালা শেষ হবে। আমি বাড়ির ভিতরে ঘুমোতে যাব। এমন সময় হঠাৎ মনে হল যে গোয়ালঘরে গোরু আর বাছুর দুটো যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। প্রথমটায় আমি বিশেষ গা করিনি। মনে হয়েছিল, এমনই হয়তো গোরুটা আর বাছুরগুলো অমন করছে, আবার আপনা হতেই চুপ করে যাবে। অথচ বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল কিন্তু গোরু আর বাছুরগুলো শান্ত হল না। কী হল বুঝতে পারছি না। বাড়িতে চোর আসেনি তো! গ্রামের বাড়ি। চোর আসা খুব একটা কঠিন নয়। উঠে গিয়ে দেখব কিনা ভাবছি। আমার কাছে একটাই লণ্ঠন আছে। সেটা ঘরের দরজার সামনে রয়েছে। সেটা নিয়ে যাওয়া উচিত হবে কিনা বসে বসে ভাবছি। এদিকে মায়ের আবার কঠোর নির্দেশ ছিল যে আঁতুড়ঘরে অরক্ষিত রেখে কোথাও যাওয়া যাবে না এক পলকের জন্য। আবার সত্যিই যদি চোর এসে থাকে তাহলে তো লাঠি-টাঠি কাছে থাকলে ভাল হয়। কিন্তু সঙ্গে তো কিছুই নেই। কী করব কী করব ভাবছি, আঁতুড়ঘর ছেড়ে উঠে যেতেও পারছি না-কারণ মা বলে দিয়েছেন রাত জেগে পাহার দিতে। আঁতুড়ঘরকে অরক্ষিত করে উঠে যেতে বারণ করেছেন। আমি জানি এইগুলো মায়ের কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু তবুও মায়ের কথা অমান্য করতে মন চাইছে না। ইতিমধ্যে মহীতোষ এসে হাজির হয়েছে। মহীতোষও গোয়ালঘরে গোরুর ছটফটানি দেখে আমায় জিজ্ঞাসা করল কী হয়েছে। আমি তাকে এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলুম না। এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না। কিন্তু আমার উদ্বেগ বা চিন্তা যাতে সে টের না পায় তাই যতদূর সম্ভব হাল্কাভাবে বললুম, শেয়াল-টেয়াল এসেছিল বোধহয়। মহীতোষ আর কিছু বলল না।, কিছুক্ষণ পরে গোরুগুলো আবার আপনা হতেই শান্ত হয়ে গেল। আমরা আর ব্যাপারটা বিশেষ পাত্তা দিলুম না। ভাবলুম বুঝিবা এমনিই গোরুগুলো অমন করছিল। সেদিন বাকি রাতটা আমি আর মহীতোষ দুজনে মিলেই পাহারা দিলুম। আমি আর বাড়ির মধ্যে শুতে যাইনি। রাত্তিরবেলা আর কোনরকম গণ্ডগোল হয়নি। পরদিন সকালবেলায় পূর্বের আলো ফুটতে আমরা যে যার ধরে চলে গেলুম ঘুমোতে। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার ফাড়াঁ কেটে গেছে।

কিন্তু পরদিন বেলায় ঘুম থেকে উঠে যে খবর পেলাম তা শুনে একেবারে হতবাক হয়ে গেলুম। খবরটা হল যে গতকাল রাতে আমাদের গোয়ালঘরের দুটো বাছুরের মধ্যে একটি বাছুর মারা গেছে, কিন্তু মহীতোষের সন্তানটি সুস্থ আছে আর নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তখনই আমার মনে প্রশ্ন জাগল যে, বাছুরের মৃত্যু আর বাচ্চাটির বেঁচে যাওয়া এই দুটো ঘটনা কি সম্পূর্ণ কাকতলীয় না এর মধ্যে অন্য কিছু আছে! আমার মত ঘোর নাস্তিক এবং অবিশ্বাসী মানুষও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলুম না। গতরাত্রের ঘটনাটি কী নিছকই দুর্ঘটনা, না এর মধ্যে অন্য কিছু আছে যা মানুষের বর্ণনার বাইরে। কিন্তু কোনটা যে আসলে ঠিক তার উত্তর কে দেবে? আজ এত বছর পরেও এই প্রশ্নের উত্তর আমার অজানাই থেকে গেছে”।
শিবতোষবাবুর গল্প বলা শেষ হলে অমল ফুঁ দিয়ে বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিল। আমরা সবায় চুপ করে রইলাম। কেউ কোনো কথা বলল না।
এরপর শিবতোষবাবুর আমার আর কোনোদিন দেখা হয়নি। অমলদের বাড়ি আর এসেছিলেন কি না জানি না। কয়েক বছর পর অমলের কাছে শুনেছিলাম যে উনি ওঁদের গ্রামের বাড়ির সেই পুরোনো গোয়াল ঘরের কাছে পরে গিয়ে হঠাত মারা যান। চোখে মুখে ছিল আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ।


খুব ভালো লাগলো আপনার গল্প। ভূতুড়ে কিনা জানি না তবে আলোকিক বলতেই পারি। বেশ টানটান কি হয় কি হয় গোছের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ছিল। ভালো লাগলো