
জয় মা তারা

১
আজ স্কুলের জন্য বেরোতে বেশ একটু দেরি হয়ে গেল নরেনবাবুর। নরেন সান্যাল। শিউলিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক। ছেলেদের মাধ্যমিক পরীক্ষার টেস্ট সামনে। প্রশ্ন বানানো, মক টেস্ট ইত্যাদি নানান কাজ থাকে, যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। কাল রাতে একটি আধ্যাত্মিক উপন্যাস পড়তে গিয়ে সময়ের খেয়াল ছিল না। তাই উঠতেও দেরি হয়ে গেছে। নরেন বাবু দ্রুত পা চালালেন।
নরেন সান্যাল শিক্ষক হিসেবে ছাত্র মহলে বেশ জনপ্রিয়। বাংলা পড়ান। পড়াশুনো ছাড়াও নানান অন্যন্য কাজে যেমন শিক্ষামূলক ভ্রমণ, শরীরচর্চা ইত্যাদি সব বিষয়ে তার ইনভলভমেন্ট চোখে পড়ার মতো। তবে আধ্যাত্মিক বিষয়ে নরেন বাবুর বেশ খানিক ঔৎসুক্য আছে।
মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষার পর স্কুলের বেশ সামনের সারিতে থাকা ছাত্র সুনির্মল লক্ষ্য করল নরেন বাবু ক্লাসের মধ্যে বা বাইরে বিভিন্ন সময়ে ছোট একটি ডায়েরিতে কি যেন লিখে রাখছেন। আর অদ্ভূত ভাবে ক্লাসে পড়ানোর সময়ে বা অন্যান্য কথা বার্তার মাঝে ‘জয় মা তারা’ কথাটি উল্লেখ করছেন। অনেকে যেমন ঠিক গালাগাল নয়, স্মার্টনেস দেখাতেই কথায় কথায় ‘শালা’ বলে। যেমন সেদিন ক্লাসে সুনির্মলকে নরেন স্যার বললেন ‘ জয় মা তারা, সুনির্মল, তোমার বাংলার এই রচনাটিতে জয় মা তারা বেশ ক’টি ছোটো বানান ভুল আছে। তোমার সময় মতো একটু ঠিক করে জয় মা তারা আমাকে দেখিয়ে নিও। ‘ সুনির্মল কিছু বোঝার আগেই সারা ক্লাস হাসতে লাগল। স্যার অবশ্য নির্লিপ্ত। এক মনে খাতা দেখছেন ছাত্রদের একটি প্রবন্ধ পড়তে দিয়ে। এরপর কানাঘুষো শোনা গেল নরেন স্যার নাকি অন্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথেও এক- ই ভাবে কথা বলছেন। পিওন ষষ্ঠীকে সেদিন ডাকলেন, ‘জয় মা তারা’ ষষ্ঠী, আমার জলের বোতল টা একটু ভরে আনবি প্লিজ। ‘ নিজের নাম শুনে ষষ্ঠীর তো ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। কলিগ শ্যামলবাবুকে মাসের পয়লা তারিখ বললেন ‘ জয় মা তারা শ্যামলদা, এখন এক তারিখ তো বাদ দিন, মাসের ১০ তারিখেও জয় মা তারা মাইনে ঢোকে না, ‘জয় মা তারা।’

২
বিকেলবেলা আজ স্কুলের সামনে সুনির্মল, দেবব্রত, সুকান্তদের জোর আড্ডা বসেছে। সুনির্মল বলল, ” নরেন স্যারের এমন বদলে যাওয়ার কারণ কি বল তো!” সুকান্ত’র মতে ‘ কিছু একটা কেস আছে জানিস তো! স্যার না আবার মাঝে মাঝে ডায়েরি তে কিসব লেখেন। ‘ এরা প্রত্যেকেই সামনের সারির ছাত্র। দেবব্রত নাটকও করে চমৎকার। এরা নরেন স্যারের বেশ প্রিয় ছিল এক সময়ে। এখন তো স্যার তেমন আর গল্প গুজব করেন না। তবে স্যার হঠাৎ করে কেন যে এমন হয়ে গেলেন! দেবব্রত সংযোজন করল, ‘তোরা তো জানিস না! ক্লাস ফাইভের একটি ছেলে স্যার পিছন ঘুরে বোর্ডে লিখছিলেন শব্দার্থ, তখন ডায়েরি নিয়ে দেখেছিল। দেখেছে ১,২,৩ নানা সংখ্যা লেখা। আমি কাল শ্যামলস্যারকে বলছিলাম। আমাদের ফুটবল টিমের জন্য অনুদান নেওয়ার সূত্রে কথা বলার সময়ে এই বিষয়টি জিজ্ঞাসা করে দেখবে। আগামীকাল জানাবে আমাকে। দেখি কি বলে!” রূদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করল তিনবন্ধু। পরের দিন যা জানা গেল তা সত্যিই বেশ রোমাঞ্চকর।
নরেন বাবুর নাকি বহুদিন যাবৎ মা কালীকে দর্শন করার অদম্য ইচ্ছা। তাই উনি তারাপীঠের কোনও এক তান্ত্রিকের সাথে দেখা করেন। এবং তিনি নরেন বাবুকে বলেছেন যে এক লক্ষ বার ‘জয় মা তারা’ জপ করার শেষে উনি মা কালীর দেখা পাবেন। সেইজন্য নরেনবাবু প্রায় প্রতি লাইনেই ‘জয় মা তারা’ বলেন দু’তিন বার এবং দিনে ক’বার বলছেন তা মাঝে মাঝে লিখে রাখেন। এই হল কার্যকারণ বিশ্লেষণ। এই শুনে দেবব্রত এবং তার দুই বন্ধু তো হতবাক। এই কারণেই সম্ভবত নরেন স্যার এখন এত নির্লিপ্ত হয়ে যাচ্ছেন। এবং অতি দ্রুত। এই তো ক’দিন আগেও খেলাধুলা নিয়ে কত গল্প করতেন। দেবব্রত কে নাটকের কথা জিজ্ঞাসা করতেন। টেস্টের সময়ের কথা। আর দু’সপ্তাহ পরে মাধ্যমিক। এর মধ্যেই সব কেমন যেন বদলে গেল।
সেদিনের আলোচনার পর আবার তিন বন্ধুর অনেক দিন দেখা সাক্ষাৎ হল না। পরীক্ষার দিন-ক্ষণ এগিয়ে এল। কোনও এক অনিবার্য কারণ বশত: নরেন স্যার এবার ইনভিজিলেশান ডিউটিতে নেই। তিন বন্ধুর এই ঘটনাটি চোখে পড়লেও আর এই নিয়ে আলোচনা করবার সময় হয় নি। ঠিক হয়েছে যে পরীক্ষার পর স্যারের সাথে দেখা করবে।

৩
আজ মাধ্যমিক শেষ হল। বাবা পরীক্ষার এই পুরো সময় টা স্কুলে যান নি। কি যেন লেখেন সারাক্ষণ এবং পড়েনও। সংসার, স্কুল, ছাত্র সব কিছু থেকেই যেন এক স্বেচ্ছা নির্বাসনের পথে। অমিত। নরেন মাস্টারের এক মাত্র ছেলে। ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে একটি ছোট কোম্পানীতে কাজ করে। বাবা’র এই পরিবর্তন তাকে বিচলিত করে সারাক্ষণ। মা ও কান্নাকাটি করে। ভালো লাগে না। বাবার এক প্রিয় ছাত্র আসে মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে। সুনির্মল। বাবার কাছে এক সময়ে এর কথা খুব শুনেছে। আজ সুনির্মলই এসেছে। ওর মাধ্যমিক শেষ হয়েছে। বাবার সন্ধ্যাহ্নিকের সময় বলে কিছুক্ষণ একাই বসে গল্প করছে অমিত। টিভিটা মা এসেই চালালেন। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে সুনির্মল ই হঠাৎ বলে উঠল ‘মাসিমা, জাস্ট চলে গেল তারাপীঠের মন্দিরে আজ অমাবস্যার পুজোর একটা কভারেজ দেখাচ্ছে মনে হল একটি চ্যানেলে। একবার দিন তো ওখানে। কিছু দেখলাম মনে হল।’ সুপ্রিয়া দেবী রিমোট টি সুনির্মলের হাতে দিলেন। একটি চ্যানেলে সত্যি ই দেখা যাচ্ছে তারাপীঠের পুজো। কিন্তু তার সাথে আর যেটি দেখা গেল তা দেখে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সুপ্রিয়া দেবী। ‘মাসিমা, অমিত দা তো জানাল স্যার বাড়িতেই আছেন, সন্ধ্যাহ্নিক করেই বেরোবেন। আমি তো স্যারের সাথেই কথা বলব বলে এলাম। কি আশ্চর্য! ওনাকে তো তারাপীঠে মা এর মন্দিরে দেখা যাচ্ছে।’ সুপ্রিয়া দেবী কাঁপতে কাঁপতে বলে ওঠেন ‘এই তো বিকেলে চা দিয়ে এলাম, আহ্নিক করে খাবেন বলে’। অমিত অন্যঘরে গিয়েছিল অফিসের একটি ফোন আসায়। সে মা’এর উচ্চ স্বরে কথোপকথনে দৌড়ে এল। ‘কি হয়েছে মা!’ ‘এই দেখ, বাবু তোর বাবা, যাকে একটু আগে ঘরে চা দিয়ে এলাম, তাকে তারা মা এর মন্দিরে দেখা যাচ্ছে। ” শুনেই কি মনে হতে অমিত ও সুনির্মল দৌড়ে গেল নরেন বাবুর ঘরের দিকে। আলতো ধাক্কা দিতেই খুলে গেল দরজাটি।
দুজনেই ঝুঁকে পড়ে দেখল চেয়ারের ব্যাকরেস্টে মাথা রেখে বসে আছেন নরেন বাবু। অমিত গিয়ে হালকা হাতে স্পর্শ করতেই ঢলে পড়লেন টেবিলে একটি ছোট নোটবুকের উপর। সেখানে লেখা একটি সংখ্যা। এক এর পিঠে ছয় টি শূন্য। বিস্ফারিত চোখে দেখল সুনির্মল সাড়হীন নরেন মাস্টারের মুখে এক প্রশান্তির হাসি লেগে আছে।


শেষের চমকটা দুর্দান্ত l ভালো লাগলো l