ছোট থেকেই আমার দিদিভাই মানে দিদিমা বিন্দুবাসিনী ঠাকরুন নানা রকমের পদ্য প্রায়ই মুখস্থ বলতেন ৷ আর মুখে মুখে আমাকেও গোটা কবিতাটা মুখস্থ করাতেন ৷ বলতেন জীবনে কথা নয় কাজটাই বড় ৷ একদিন আমি জিজ্ঞাসা করলাম তাহলে সবাই সারাদিন কেউ কথা না বলে শুধু কাজটাই করে যেতে পারে ৷ তাহলে তো ঝামেলাই থাকে না ৷ ফোকলা মুখে একটা মিষ্টি হাসি হেসে দিদিভাই বললেন – তা বটে ৷ ঠিকই বলেছিস কথা না বললে অনেক ঝামেলাই মিটে যায় ৷
দেখিস না এই প্রকৃতির কাজের লোকেরা সারাদিন কত কাজ করে যাচ্ছে কেউ কি কথা বলে ?
সূয্যি চন্দ্র মেঘ হাওয়া কেউ বলে না , মুখ বুজে কাজটাই করে যায় ৷ বলেই একটা লাল পিঁপড়েকে দেখিয়ে বললেন – ওই দ্যাখ দলবল ছেড়ে ও একাই খাবার সন্ধান করছে ৷ বলেই আপন মনে বলতে লাগলেন ” পিপীলিকা পিপীলিকা / দলবল ছাড়ি একা /কোথা যাও , যাও তাই বলি ৷ / শীতের সঞ্চয় চাই / খাদ্য খুঁজিতেছি তাই / ছয় পায়ে পিলপিল চলি” দেখ পিঁপড়েটাও কাজ করছে আপন মনে আর তুই তোর কাজ না করে এখানে বসে আমার সঙ্গে পীরিত করে যাচ্ছিস ৷ যা না সোনা তিন পাতা হাতের লেখা আর ওই কবিতাটা মুখস্থ করে নে মানিক ,যা ৷ বলেই নিজেই বলে চললেন “আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে / কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে ” ৷
হুম এসব আমার জীবনের সেই সকালবেলার কথা ৷ এভাবেই আমার মনে কবিতাবীজের বুনন শুরু ৷ আমার দিদিমা যাকে আমি মা বলতাম পরে বাবার বকুনি তাকে দিদিভাই বলতে শেখালো ৷ আজ খুব জানতে ইচ্ছে করে যে কোনও পাঠশালায় না পড়া সেই বুড়ি এই সব কবিতা জানলো কিভাবে ! সেই ৭০-৭২ বছর বয়সে তার মুখস্থই বা থাকত কিভাবে ! আজও সে রহস্যের কিনারা আমার কাছে ফেলুদাও করে দিতে পারবে না হয়তো ৷
কত রকমের ছড়া গল্প তার স্টকে ছিল ৷ পরে বাংলা নিয়ে উচ্চশিক্ষা করতে গিয়ে আবার সেগুলিই নতুন করে পড়তে পড়তে দিদিভাইয়ের কথা মনে আসতো ৷
ক্লাস সেভেনএ আমি মোটামুটি নম্বর পেয়ে উঠেছিলাম ৷ তবে বাংলায় ভালোই পেতাম ৷ তখনকার মাস্টার মশাইদের পড়ানোর কায়দাটা ছিল অন্যরকম আর শাস্তিও ছিল বেশ মজার অথচ যন্ত্রণাদায়ক ৷
১ পেটে চিমটি , মোচড়ে মোচড়ে মধু ঝরে
২ কানের লতিতে বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে চাপ
৩ দুটো আঙুলের ভিতরে ছ’কোণা পিন্সিল ঢুকিয়ে চাপ দিতে দিতে পেন্সিল ঘোড়ানো
৪ চেয়ার ডাউন
৫ নীল ডাউন
৬ এক পায়ে বেঞ্চির ওপর দাঁড়ানো
৭ টেবিলের নীচে মাথা দিয়া দাঁড়ানো
এরকম আরও কত নতুন নতুন শাস্তি তাঁরা আবিস্কার করতেন ৷ পাশাপাশি সেই সব সামান্য মাইনে পাওয়া অতি সাধারণ জীবনযাপন করা মাস্টারমশাইদের স্নেহ ভালোবাসা আন্তরিকতা আজও ভুলতে পারবো না ৷ ঈশ্বরের মতো তাঁরা সবসময় মনের আসনে বসে থাকবেন ৷ বাবা শিক্ষক হওয়ায় আমার প্রতি কয়েকজন মাস্টারমশায়ের নজর ছিল সবচেয়ে বেশি ৷ তাঁদের শাসন ভালোবাসা আমায় মানুষ হতে সব সময় সাহায্য করেছে ৷ শিশিরবাবু , নিত্যবাবু গৌরবাবু , শ্যামলবাবু সুরেশবাবু , মনোজবাবু , শ্যামানন্দবাবু , চারুবাবু এঁরা সবাই আমার জীবনের চলার পথে অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন ৷
এই চারুবাবু মানুষটি ছিলেন ভারি মজার ৷ আমাদের স্কুল খেলাধুলোয় তখন চাম্পিয়ণ ৷ মাঠে ফুটবল খেলা হলে চারুবাবু উপস্থিত , তাঁর হাতে একটা বিরাট ছাতা ৷
বিশাল লম্বা বিপুল দেহ , মধ্যপ্রদেশটি ততধিক বিপুল , ধুতি সার্ট পরা মানুষটির ক্ষমতা ছিল প্রবল ৷ স্কুল যদি কোনও খেলায় হাফ টাইমে বা খেলা শেষের ৫-৬ মিনিট আগে হারতো বা ড্র হয়ে যেত , তাহলে হঠাৎ চারুবাবুর ছাতা যেত খুলে ৷ সারা মাঠ জুড়ে রাশিরাশি ছেলে নেমে যেত ৷ হঠাৎ যেই ছাতা বন্ধ অমনি মাঠ ফাঁকা ৷ বিপক্ষের খেলোয়াড়েরা কম বেশি আহত ৷ আবার খেলা শুরু ইস্কুল জিতে ফিরতো ৷
চারুবাবুর জীবনযাপন ছিল অতি অবিবেচকের মতো ৷ একছেলে , একমেয়ে ৷ স্যার এত অর্থ অপচয় করেছিলেন এবং বাজার থেকে বিভিন্ন মানুষের থেকে এত টাকা ঋণ করেছিলেন যে শোধ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না ৷ ফলে আত্মহত্যা করতে হয় তাঁকে ৷ তাঁর মৃত্যুর পর
শ্মশানে তাঁকে যখন চিতায় তুলে আগুন দেওয়া হল ৷ আগুনের শিখা দেখে আমাদের ইস্কুলের একজন মাষ্টারমশাই বলে উঠলেন – ওই দ্যাখ আমার দশ হাজার টাকা পুড়ছে ৷ শুনে আর একজন বললেন – আমারও আড়াই হাজার ৷

যাই হোক আমি সেভেন থেকে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেই ক্লাস এইটে উঠে গেলাম ৷
এই ক্লাসটা আমার জীবনে বিভিন্ন কারনে উল্লেখযোগ্য ক্লাস ৷
কারন সেই প্রথম আর সেই শেষবার আমি অলৌকিকভাবে ক্লাসে যুগ্ম ২য় হয়েছিলাম ৷ পঞ্চম থেকে একাদশ শ্রেণীতে ১ম আর ২য় স্থান পরিমল আর স্বপনরাই দখল করে রেখেছিল ৷ আর আমার মনে হত অঙ্কের স্যারেরা যেন তাদের ১০০ য় ২০০ দিতে পারলে ভীষণ খুশি হতেন ৷ কারন আমার জন্যে চিরকালের বরাদ্দ ছিল ৬৮ – ৭০- ৭৩ ! তার বেশি তাঁরা আমায় কিছুতেই দিতেন না ৷ ভাগ্যক্রমে উচ্চ মাধ্যমিক টেষ্টে ৮০% পেয়ে গিয়েছিলাম ৷
সেই অঙ্কে মাথামাটি হওয়া আমি এক কাণ্ড বাধালাম , একদিন ক্লাসে শ্যামলবাবু ( সবাই যাকে অঙ্কের এনসাইক্লোপিডিয়া বলতেন ) বোর্ডে অঙ্ক করাচ্ছেন ৷ পিন ড্রপ সাইলেন্ট ক্লাস ৷ আমি ফাস্ট বেঞ্চে বসে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে অঙ্কটা বোঝার চেষ্টা করছি ৷ স্যার অঙ্কটা করে নাকে একটিপ নস্যি নিয়ে সবে চেয়ারে বসেছেন ৷
হঠাৎ আমার মাথার ভিতরে একটা মামদো ভূতের ছানা যেন এক কাণ্ড বাধিয়ে দিলো ৷ আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম বোর্ডের দিকে ৷ খালি মনে হতে লাগলো অঙ্কটা স্যার ভুল করেছেন ৷ আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্যার জিগ্যেস করলেন – কি হে দাঁড়িয়ে কেন ! অঙ্কটা কোথায় বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে ?
আমার মাথার ভিতরের সেই প্যাংলা মামদো ভূতের ছানাটি ভয়ঙ্কর এক দুঃসাহসিক অপকর্মটি করিয়ে নিলো ৷ আমি বলে ফেললাম – স্যার অঙ্কটায় কোথাও একটু ভুল আছে মনে হচ্ছে ৷
ব্যাস সারা ক্লাসের বিয়াল্লিশ জোড়া চোখ আমার দিকে , আমার চোখ বোর্ডের দিকে , শ্যামলবাবু আবার নাকে একটিপ নস্যি নিলেন ৷ বোর্ডের অঙ্কটার দিকে আবার একবার তাকালেন ৷ তারপর চকটা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন – যাও ভুলটা ঠিক করে দাও ৷
বলে আমাদের বেঞ্চে আমার জায়গায় এসে বসলেন ৷ আমি আসতে আসতে বোর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ৷ হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমার মাথার ভিতরের মামদো ভূতের ছানাটি আমায় অসহায় রেখে পালিয়েছে বা ঘুমিয়েছে ৷ দু’মিনিট চেষ্টা করেও খুঁজে পেলাম না ভুল ৷ স্যার উঠে এলেন আমার পাশে ৷
বললেন – কই হে ভুলটা ঠিক করলে না !
আমি অসহায় ভাবে বললাম – খুঁজে পেলাম না ৷

হঠাৎ গালের ওপর একটা প্রবল বজ্রাঘাত ৷ সরষে ফুলের সমারোহ চারদিকে ৷ বুঝতে পারছিলাম ডানদিকের গালটা দ্রুত ফুলে যাচ্ছে ৷ ভিতরের দাঁতগুলোতে জিভ ঠেকিয়ে বুঝলাম তারা স্বস্থানেই আছে ৷ নিজের জায়গায় এসে বসলাম মাথা নিচু করে ৷ স্যার বললনে – মাথা নিচু করে বসলে হবে না ৷ অঙ্কটা টুকে নাও ৷ আমি কাল বোর্ডে তোমাকেই করতে দেবো ৷
স্কুলে সেই প্রথম মার খেলাম ৷
বিকেলে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরলাম ৷ আমার গালের দিকে তাকিয়ে মা বললো – এভাবে কে মেরেছে ! গালটা ফুলে গিয়েছে ! পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গিয়েছে ৷ অমানুষের মত মেরেছেন কে !
বাবা বললো – শ্যামলদা মেরেছেন ৷ বেশ করেছেন ৷ আর একগালে মারেননি কেন ? অঙ্কে গাড্ডু পাওয়া ছেলে শ্যামলদার ভুল ধরতে গেছে ৷ আমার তো ইচ্ছে করছে অন্য গালটায় আমিও
একটা বসিয়ে দিই ৷ আমি তো শ্যামলদাকে বললাম – শুধু একগালে দিলেন ৷ আর এক গালে আর একটা দিতে পারলেন না !
বলে বাবা আমায় আর্ণিকা খাইয়ে দিলো ৷ গালে লাগিয়েও দিলো ৷
রাতে প্রবল জ্বর ৷ মাথার ভিতরে ভূতের ছানাটি তখন বেপাত্তা ৷
পরদিন মা বললো – ওর বেশ জ্বর আছে আজ স্কুল যেতে হবে না ৷
বাবা বললো – না স্কুল যাবেই ৷ অন্যায় করেছে শাস্তি পেয়েছে ৷ তার জন্যে ক্লাস কামাই করা চলবে না ৷ আমি আমার ছাত্রদের কামাই করতে দিই না ৷ ও আমার ছেলে হয়ে এটা করতে পারবে না ৷ আমার ওই অবস্থা দেখে বোনরা মুচকি মুচকি হাসছে ৷
মাথার ভিতরে হঠাৎ ভূতের ছানাটির আবির্ভাব ৷ সে আমায় ভাবাতে লাগলো – আমার বাবা সবচেয়ে খারাপ মানুষ ৷ অন্যের বাবারা অনেক ভালো ৷ আমার বাবার মতো মন্দ মানুষ আর হয় না ৷
যাই হোক স্কুলে এলাম ৷ ৩ য় পিরিয়ডে রামদা (আমাদের স্কুলের প্রবল প্রতাপের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ৷ শৈশব থেকে বিহারের এই মানুষটির কোলে কাঁধে মানুষ হয়েছি) এসে আমায় ডাকলো – রামকিশোর , শ্যামলবাবু তোকে ডাকছেন ৷ চল ৷
ব্যাস এবার আমার অবস্থা খুবই খারাপ ৷ মনে হল গালটা এবার একটু বেশি টনটন করে উঠছে যেন ৷ গিয়ে দাঁড়ালাম স্যারের সামনে ৷

দেখি গালটা ৷
দেখলেন ৷ একবার কপালটা দেখলেন হাত দিয়ে ৷ একটা ছোট্টো মিষ্টির বাক্স হাতে দিয়ে বললেন – সন্দেশ দুটো খেয়ে নাও ৷
আমি বললাম – খেতে পারছি না স্যার ৷
অন্য দিক থেকে উত্তর এলো – এক্ষুণি খাও , তা নইলে এবার আর এক গালে আর একটা দিয়ে দেবো ৷
ফলে খেতেই হল ৷ শ্রীরামপুরের বিখ্যাত মহেশ চন্দ্র দত্তের মনোহরা সন্দেশ সেদিন মুখে অতি বিস্বাদ লাগলেও খেয়ে নিয়েছিলাম ৷ স্যার তাঁর পকেট থেকে একটা ওষুধের টিউব বের করে ৷ পরম মমতায় লাগিয়ে দিলেন গালে ৷ যে হাত আগের দিন কঙ্কাল আর দানবের হাত মনে হয়েছিল , সেই হাতই আজ মনে হল দেবদূতের হাত ৷ আমি হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিলাম ৷ ক্লাসে এসে বসে মাথা নীচু করে কাঁদতে কাঁদতে মনে হচ্ছিল আমার জ্বর নেই , গালের ব্যথা নেই , শুধু কঙ্কালের মতো কয়েকটা আঙুলের মমতা আমার সব যন্ত্রণা নিরাময় করে দিয়েছে ৷ এখনও জীবনে যত ঠিক অঙ্ক ভুল মনে করে শোধরাতে যাই ডানদিকের গালটা টনটন করে ওঠে ৷গণিতে আমি চিরকালই শূন্য পেয়ে
গেলাম ৷
অষ্টম শ্রেণীতে আমার বাবা আমাদের সংস্কৃত ক্লাস নিতেন ৷ সপ্তাহে তিনদিন সোম বুধ শুক্র ৷ সোম শুক্র ব্যাকরণ মঙ্গলবার টেক্মট ৷ বই বাবারই লেখা ‘সংস্কৃত সৌরভম’ ৷ বাবার বই তখন বাংলা এবং ত্রিপুরায় খুব পড়ানো হত ৷ বাবার ক্লাসের নিয়ম ছিল যে প্রথম দিন পড়া পারবে না তার ডান বা বাম পাশের যে ছেলেটি পড়া পারবে সে কান ধরে পড়া না পারা ছেলেটিকে বেঞ্চির ওপর দাঁড় করিয়ে দেবে ৷ পরেরদিন সে পড়া না পারলে চেয়ার ডাউন হয়ে ১০ মিনিট থাকবে এবং পড়া মুখস্থ করবে ৷ পরপর তিনদিন পড়া না পারলে ক্লাসের বাইরে মাঠে এক কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে পড়া মুখস্থ করবে ৷ বাড়িতে আমি কখনই বাবার কাছে পড়া মুখস্থ করতে যেতাম না , মা-ই পড়া করিয়ে দিত ৷
সেদিন ছিল বর্ষার দিন সোমবার , দু’দিন ধরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে ৷ আমি নিশ্চিত ছিলাম সেদিন রেনি ডে হবেই ৷ ফলে পড়াটা সেভাবে হয়নি ৷ ইস্কুলে গিয়ে দেখি অনেকগুলো ছেলে এসেছে ফলে প্রথম ঘন্টায় ছুটি হবার সম্ভাবনা চলে গেল ৷ ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে দেখি ঘরের দরোজা বন্ধ ৷ জোরে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল ৷ আমি বাইরে থেকে দেখলাম ভিতরে বেশ অন্ধকার ৷ বাইরে ঘন মেঘের অন্ধকার ঘরেও তাই ৷ যাই হোক যেই ঘরে ঢুকেছি অমনি দরজা বন্ধ হয়ে গেল ৷ তারপরেই আমার মাথায় হঠাৎ বেশ কয়েকটা গাঁট্টাবর্ষণ হয়ে গেল ৷ অন্ধকালেও সর্ষেফুল দেখা যায় সেদিন বুঝলাম ৷
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বোকার মতো বেঞ্চে বসতেই দেখলাম সাত আটজন ছেলে উপস্থিত ইতিপূর্বে তাদের পূর্ববর্তীরা তাদেরও একই অবস্থা করেছে ৷ এরপর সেই গাঁট্টামেঘের দলে বর্ষণের জন্য আমিও যোগ দিলাম ৷ ফলে ক্রমে ছাত্র যত বৃদ্ধি পেয়েছে পরের ছেলেদের মাথায় বর্ষণও হয়েছে প্রবল ৷ অনেকেই বেশ যন্ত্রণায় কাতর ৷ ক্লাস টিচার দেবাদিদেববাবু এসে তাদের অভিযোগ শুনে আমায় স্যার জিজ্ঞাসা করলেন – কে কে ছিল ?
আমি খুব কাঁচুমাচু হয়ে বললাম – যে শেষে এসেছে সে বাদে সবাই ৷
স্যার বললেন – তুমিও ছিলে ?
আমি বললাম – হ্যাঁ
স্যার আমাকেই নির্দেশ দিলেন – যাও অফিস থেকে একটা বেত নিয়ে এসো ৷
আমি বেত নিয়ে এলাম ৷ স্যার আমাকে হাত পেতে দাঁড়াতে বললেন ৷ তারপর আমার হাত সেই প্রথম ও শেষবার বুঝতে পারল বেত্রাঘাত কি মধুর ৷
তারপর সবাই এক ঘা করে বেত খেল ৷ শেষ ছাত্র কালো স্বপনকে আমিই বাঁচিয়ে দিলাম ৷ (আমাদের ক্লাসে স্বপন দাশ ছিল আটজন তাই আমরা তাদের নামের সঙ্গে..বেঁটে …লম্বু…ঢ্যাঙা
..ফরসা বিশেষণ যোগ করেছিলাম )
আমি উঠে বললাম – স্যার ও তো সবার শেষে এসেছে তাই ও কাউকেই মারার সুযোগ পায়নি ৷
দেবাদিদেববাবু ক্ষানিক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে আমায় দেখলেন তারপর বললেন – বেশ তাহলে ওকে মারলাম না ৷
সেদিনটা আমার খারাপই ছিল ৷ তিন পিরিয়ডে বাবার ক্লাস ৷ যেহেতু সেদিন চার পিরিয়ডে ছুটি হবে তাই বাবার ক্লাসটি যথারীতি হল ৷
আর আমি অস্মদ শব্দের রূপটি বলতে পারলাম না ৷ আমার পাশেই বসতো সলিল ৷ যার সঙ্গে আমার কথা বন্ধ ছিল ৷ তার মেয়েলি স্বভাব এবং মেয়েদের মতো কথার জন্য সে আমার অপছন্দের ছিল ৷ এছাড়াও তার কাজ ছিল স্কুলের আমার যাবতীয় অপকর্মের কথা সে বিকেলে আমার বোনদের সঙ্গে পুতুল খেলতে এসে মায়ের কাছে বলে দিত ৷
মা যদি জিজ্ঞাসা করতো – আমায় এসে সব বলে দিস কেন রে !
মেয়েলি ভঙ্গিতে ওর উত্তর – বাঃ ও অন্যায় করবে সেটা আপনাকে না বললে আপনি জানবেন কি করে ? ওকে তো শাসন করবেন আপনি ৷ নইলে বাঁদর হয়ে যাবে না !
একদিন মা বলল – হ্যাঁরে পার্থ ( এখানে বলে রাখি এটা আমার দিদিমার দেওয়া ডাক নাম) যদি কোনদিন তোর বাড়ি গিয়ে তোর মাকে তোর দুষ্টুমির কথা বলে আসে ?
সলিলের উত্তর – ও কার কাছে যাবে ? আমার তো ভাই তো ওকে চেনেই না ৷ মাও চেনে না ৷

যাই হোক সেদিন আমার ভাগ্য এতটাই খারাপ যে আমি পড়া পারলাম না ৷ আর সলিল পড়া পারতেই ও সগর্বে আমার কান দুটো ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল ৷ সেই মুহূর্তে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভিলেন মনে হয়েছিল বাবাকে ৷

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]