
আশ

১
বেশ কিছুদিন ধরে এই তেরো চোদ্দটা সিঁড়ি ভাঙতেই বেশ কষ্ট হচ্ছে গঙ্গাধরের। হাঁফ ধরে যায় শেষের দিকে, বাড়ির সামনের চাতালটায় ওঠার পর বুকের মধ্যে কেমন ধড়ফড় করে ।
দুহাতে অবশ্য ঝোলানো থাকে দুটো দশ-লিটারি জলের বালতি।
কিন্তু সে তো দশ বছর আগেও থাকতো ।
তখন অবশ্য গঙ্গাধর তামাংয়ের অনেক জোশ ছিল…সারাদিনের মধ্যে পাঁচ-ছবার ওঠানামা করে প্রত্যেক বার কুড়ি লিটারের মতো জলের সংস্থান করা গঙ্গাধরের কাছে জলের মতোই সোজা ছিল।
বুকের মধ্যে হাঁফ ধরত না, বুক ধড়ফড় করতো না, প্রতিবার জল টানার পর একটুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তাগড়া শরীরটা আকুলিবিকুলি করতো না।
দার্জিলিং শহরের ম্যাল-এর দক্ষিণ দিকে যে রাস্তাটা নেমে গিয়েছে স্টেপ-অ্যাসাইড বাংলোটার দিকে, সেই রাস্তার ওপরেই সৈকত আর অণিমা মুখারজি দম্পতির বাংলোবাড়ি ‘শান্তিকুঞ্জ’ ।
কোলকাতার মানুষ, দার্জিলিং সেন্ট রবার্ট স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সৈকত মুখারজি, এই শৈলশহরের প্রেমে পড়ে রিটায়ারমেন্টের পরে এখানেই থাকবেন ঠিক করেছিলেন ।
ভাগ্য ভালো ছিল তাঁর ।
রিটায়ার্ড অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সহকর্মীর ছেড়ে-যাওয়া ছোট বাংলো বাড়িটা তিনি বাজারের দামের তুলনায় অনেক কম দামে কিনে ফেলেছিলেন । ‘অ্যান্টনি হ্যাভেন’ বদলে গিয়ে তখন সে বাড়ির নতুন নাম হয়ে যায় ‘শান্তিকুঞ্জ’ !
রাস্তা থেকে উঁচু একটা ছোট্ট টিলার ওপরে হওয়ার জন্য বাংলোটা পথচারীদের সহজেই নজরে পড়ে।
রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে, তাই মিউনিসিপ্যালিটির জলের প্রেশার বেশ কম। সে জলের সাপ্লাই আবার দিনে দুবার ।
খাওয়ার আর রান্নার জলের লাগাতার জোগানের জন্য তাই সৈকত মুখারজি বাংলোর কম্পাউন্ডের মধ্যেই কিছুটা নীচে একটা সমতল জায়গায় অনেক খরচা করে একটা টিউবওয়েল বসিয়েছিলেন ।
গত বারো বছর ধরে সেই টিউবওয়েল থেকে বাড়ির মধ্যে দুবেলা জল তুলে আনছে গঙ্গাধর তামাং, মুখারজি পরিবারের লোকাল কাজের লোক ।
সৈকত মুখারজির কিশোর ছেলে অনেকবার বলেছে বাড়ির পাশে পিলার তুলে উঁচু একটা ট্যাঙ্ক বসাতে । সেখানে মোটর দিয়ে সহজেই জল উঠে যাবে।
নানারকম খরচের ধাক্কা আর গঙ্গাধরের চাকরি চলে যাওয়ার চিন্তায় সহৃদয় সৈকত সেই পরামর্শে আমল দেননি ।
ভাবখানা এই…যতদিন চলছে চলুক…গঙ্গাধর তো আমাদের পরিবারেরই একজন, আমাদের পুরো পরিবারকে জল খাওয়াচ্ছে আজ কতো বছর ধরে !
আর এখন ছেলেমেয়ে দুজনেই দেশের বাইরে চলে গেছে ।
জলের খরচ আর জোগান দুইই কমেছে, কেবল সকালবেলাতেই লাগছে। ইদানীং কালে সেটুকু করতেই গঙ্গাধরের বেশ কষ্ট হয়।
২
একযুগ পেরিয়ে গঙ্গাধর এখন সত্যিই মুখারজি পরিবারের একজন, সারাদিনের জন্য মাইজির হাত-নুড়কুত কাছের লোক ।
জল তোলার কাজটুকু হয়ে গেলে সে সামনের ছোট্ট বাগানটার ফুলগাছগুলোর পরিচর্যা করে, ঘরের টুকটাক কাজে অনেক সাহায্য করে।
সৈকতের ছেলেমেয়ে যখন স্কুলের নীচুক্লাসে পড়তো তখন আধমাইল দূরে তাদের স্কুলে পৌছনোর কাজটাও ছিল তার ।
এই সব কারণে অণিমা দেবী গঙ্গাধরকে খুব পছন্দ করেন।
ইতিমধ্যে গঙ্গাধরেরও পরিবার বেড়েছে ।
তার ফুটফুটে দুটো ছেলে হরতাজ আর তিলককে গঙ্গাধরের মাইজি খুব ভালবাসেন ।
তাদের জন্য গঙ্গাধরের হাত দিয়ে প্রায়ই এটা-ওটা পাঠিয়ে দেন।
রবিবারের এই সকাল থেকে শান্তিকুঞ্জে যেটা শুরু হয়েছিলো, গঙ্গাধরের বুকের সেই ধড়ফড়ানি, নেপালি বস্তি যাওয়ার দুমাইল পাহাড়ি উঁচুনিচু পথে বাড়লো বই কমলো না।
উপরন্তু মাঝপথে শুরু হয়ে গেলো বুকের মাঝখানটায় তীক্ষ্ণ শলাকা বিঁধে যাওয়ার মতো ঘন ঘন ব্যথা।
রাস্তায় অনেকবার জিরিয়ে নিয়ে গঙ্গারাম যখন অসংবৃত পায়ে ভরদুপুরে তার দু কামরার ছোট্ট ঘরের দাওয়ায় পৌঁছলো তখন তার পরনের আধময়লা জামা, বেনিয়ান সব ঘামে ভিজে জবজব করছে।
বৌ ধানভি তাড়াতাড়ি খাবার জলের ঘটি নিয়ে ফিরে এসে দেখলো গঙ্গারাম দাওয়ায় পাতা শতরঞ্চির ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে, দুচোখ তার বন্ধ, শরীর নিস্পন্দ, যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ব্যাপারটা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো ধানভির ।
মায়ের কানফাটা কান্নার আওয়াজ শুনে দুই ছেলে হরতাজ আর তিলক ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো।
হরতাজের বয়স দশ। সে গরীবের ছেলে ।
তাই বয়সের হিসেবে বুঝদার হয়েছে তাড়াতাড়ি।
মায়ের মুখচোখের অবস্থা দেখে এক মুহূর্ত নির্বাক থেকে সে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বাবার প্রাণহীন শরীরের ওপর আছড়ে পড়লো ।
আর চার বছরের তিলক, বোধহয় কিছু না বুঝে, এই রকম অপরিচিত একটা দৃশ্যের সামনে হতবাক হয়ে মুখে দুটো আঙ্গুল পুরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।

৩
নেপালি বস্তি থেকেই কেউ একজন বিকেলের দিকে শান্তিকুঞ্জে খবরটা পৌঁছে দিয়েছিলো ।
শরীরটা একটু খারাপ করছে মাইজি বলে গঙ্গাধর বেলার দিকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যাবার সময় সৈকত বা অণিমা তেমন কিছু ভাবেননি । যদিও সেটা একটা খুবই বিরল ঘটনা।
মাসে চারটে দিন ছাড়া গঙ্গাধর ছুটি নিতো না পারতপক্ষে।
এখন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো গঙ্গাধরের মৃত্যুর খবরটা হঠাৎ পেয়ে দুজনে নিদারুণ দুঃখে প্রায় মুহ্যমান নির্বাক হয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ ।
কিছুটা সামলে ওঠার পর অণিমা বললেন, আমি ভাবতে পারছি না…বাইরে থেকে শক্তপোক্ত চেহারা গঙ্গার…ওইটুকু দুটো ছেলে রয়েছে ওর…বৌ-টা তো বোধহয় কোন কাজকর্ম করে না…কি হবে এখন ওদের…কি করে দিন চলবে !
সৈকত মাথা নাড়লেন । স্ত্রীর এ প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই।
অণিমা একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি এখন ওদের ঘরে একবার যাবে তো ? এ মাসের মাইনেটা দিয়ে এসো আর আলাদা বেশি করে কিছু টাকা দিয়ো। গঙ্গাটা আজ দুপুরের খাবারটাও খেয়ে গেলো না…বলতে বলতে অণিমার চোখে জল এসে গেলো।
আর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তিনি চুপ করে গেলেন।
সৈকত দুঃখের গলায় বললেন, মনে তো হচ্ছে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক…বললো ডাক্তার ডাকার সময়ও পায়নি…কি আর করা যাবে…আমি যাচ্ছি…ছেলেদুটোর জন্যে কিছু খাবারদাবারও কিনে নিয়ে যাবো ।
দুটো বড়ো সাইজের পাউরুটি, অনেকগুলো বিস্কুট আর গুঁড়ো দুধের প্যাকেট আর কিছু ফল নিয়ে সৈকত বিকেল বেলায় যখন নেপালি বস্তিতে গঙ্গাধরের বাড়িতে পৌঁছলেন তখন গঙ্গাধরকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় চলছে ।
মহল্লার অনেক মানুষ ঘরের দাওয়ায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে । সৈকতকে প্রায় সকলেই চেনে।
মাস্টারবাবুকে দেখে সকলে ভিড়ের মধ্যে রাস্তা করে দিলো।
দাওয়ার নীচে সামনের উঠোনটায় একটা বাঁশের মাচার ওপর গঙ্গাধরের ছোটখাটো দেহটা শয়ান।
বন্ধ চোখের ওপর তুলসীপাতা, দুই নাসারন্ধ্রে তুলো।
এক মুহূর্তের জন্য সৈকতের চোখের ওপর ভেসে উঠলো সেদিন সকালের দৃশ্য…হাতে জলের ঝারি নিয়ে গঙ্গা একটু ঝুঁকে বাগানের ফুলগাছগুলোতে জল দিচ্ছে…আচ্ছা ও কি তখন জানতো যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই শরীরটার, স্ত্রী-ছেলেদের মায়া ত্যাগ করে ওকে চলে যেতে হবে ? জীবনের শেষ মুহূর্তে সেটা কি ও বুঝতে পেরেছিল ? মানুষ কি তার শেষ সময়ের আগমন বার্তা পায়, বুঝতে পারে ?…
সত্তরোরধ সৈকত এই অস্বস্তিকর ভাবনাগুলো মন থেকে জোর করে সরানোর প্রচেষ্টায় গঙ্গাধরের মৃতদেহের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে চারদিকে তাকালেন।
গত বারো বছরে বারতিনেক বোধহয় এই বাড়িটায় এসেছেন তিনি। বিশেষ কোন কিছু পরিবর্তন হয়েছে কি না মনে করতে পারলেন না।
৪
গঙ্গার বৌ ধানভি সৈকতের ভালোরকম পরিচিত ।
শান্তিকুঞ্জে কোন বিশেষ অতিথি আপ্যায়ন খাওয়াদাওয়ার অনুষ্ঠান থাকলে ধানভি এসে ঠিকে কাজের লোকটার সঙ্গে কাজে লেগে পড়ে । অণিমা তাদের যাওয়ার সময় ছেলেদুটোর জন্যে হাত ভরে খাবারদাবার দিয়ে দেন। এতোগুলো বছরে এরকম ঘটনা অনেকবার হয়েছে ।
এখন দাওয়ায় বসে আছে ধানভি, তার চোখ দৃষ্টিশূন্য, চোখের কাজল-মাখা জলের দাগ যেন শুকিয়ে রয়েছে তার ফরসা লালাভ গালের ওপর।
মা-কে জড়িয়ে ধরে দুপাশে পাশে বসে আছে দুই ছেলে।
ভিড়ের মধ্যে সৈকতকে প্রথমে লক্ষ্য করলো হরতাজ ।
মাকে হালকা ঠেলা দিয়ে বললো, মা, ওই দ্যাখো বাবুজি এসেছে।
ধানভি মাথা ঘুরিয়ে সৈকতকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো, কান্নার দমকের ভেতরেই তার মুখ থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ বেরিয়ে এলো, আমার কি হল বাবুজি, আমি ডাগদার ডাকার সময় তো পেলাম না…এখন কি হবে আমাদের…ছেলে দুটোর কি হবে। মা-র কান্না দেখে বাচ্চা তিলকও কাঁদতে শুরু করে দিলো ।
ভিড়ের মধ্যে বিলাপের মতো গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো।
এক মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠলো ।
সৈকত অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন ।
এই রকম পরিস্থিতিতে তিনি অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েন, মুখে যথাযথ কথা যোগায় না।
তিনি হাত তুলে হরতাজের দিকে ইঙ্গিত করলেন তাঁর কাছে আসার জন্য ।
সে কাছে এলে তিনি হাতের ব্যাগদুটো ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন ঘরের মধ্যে রেখে আসতে ।
ছোট ছেলে তিলক কান্না থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ।
হরতাজ ওর পাশ দিয়ে যাবার সময় ব্যাগের ওপর থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট তুলে নিয়ে ছোট ভাইয়ের হাতে দিলো।
তিলকের কান্না আগেই বন্ধ হয়েছিলো।
সে হাতের চকচকে বিস্কুটের প্যাকেটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো ।
সৈকত এগিয়ে এলেন ধানভির কাছে ।
একটু ইতস্তত করে বললেন, কেঁদো না ধানভি । তোমাদের মাইজি গঙ্গার এই অসময়ে চলে যাবার খবরটা পেয়ে খুব দুঃখ পেয়েছেন। তোমার, ছেলে দুটোর কথা চিন্তা করে চোখের জল ফেলছেন। তুমি কেঁদে কেঁদে শরীর খারাপ করো না। ছেলেদুটোকে এখন তো তোমাকেই সামলাতে হবে । আমাদের হাতে তো কিছু নেই। তুমি ভাবো পশুপতিনাথজি গঙ্গাকে কাছে টেনে নিয়েছেন ।
সৈকতের কথাগুলো শুনতে শুনতে ধানভি আবার ফোঁপাতে শুরু করলো ।
সৈকত এবার পকেট থেকে টাকার খামটা বার করে ধানভির হাতে দিলেন । বললেন, তুমি কেঁদো না। যাও, টাকাগুলো ঘরে গিয়ে ঠিক করে রেখে দাও । এখন তোমার টাকার অনেক দরকার । আর কাজকর্ম মিটে গেলে ছেলে দুটোকে নিয়ে শান্তিকুঞ্জে এসো, মাইজির সঙ্গে দেখা করে যেও । দেখি কি করা যায়।
সৈকত আর দাঁড়ালেন না ।
ভিড় ঠেলে বাইরের সরু রাস্তায় এসে পড়লেন ।
দারজিলিং-এ আজকাল ঘরে ঘরে বিসলারির কুড়ি লিটারের জলের জার দেওয়ার চল হয়েছে ।
ফেরার রাস্তায় একটা জল সাপ্লাই এজেন্সির আউটলেট পড়বে।
‘গঙ্গাধরটা অসময়ে চলে গেলো…অন্য কোন ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত ওদের কাছ থেকেই জল নিতে হবে।’
সৈকত চিন্তিত মনে ধীরে ধীরে রাস্তার চড়াই ভাঙতে লাগলেন ।

৫
ধানভি হরতাজের কপালের জলপটিটা বদলে দিলো।
তার কপাল এখনও আগুনের মতো গরম, এক মিনিটের মধ্যে জলপটি শুকিয়ে যাচ্ছে ।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি।
ধানভি চারপাশে তাকালো। ঘরে লন্ঠনের স্তিমিত আলো ।
বস্তিতে দশটা বাড়ি পিছু একটাই মিটার।
দুমাস বিলের টাকা মেটাতে পারেনি বলে গত সপ্তাহে ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিয়েছে বস্তির মুখিয়া।
ধানভি একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে চৌকি থেকে নামলো।
ওদিকটায় ঘুরে গিয়ে তিলকের মাথার কাছে দাঁড়ালো।
একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে তিলক অঘোরে ঘুমিয়ে আছে, চোখের কোণে শুকনো জলের দাগ। পাশে মুড়ির খালি বাটিটা পড়ে আছে।
ভাতের খিদে নিয়ে সন্ধ্যে থেকে একটানা কাঁদছিলো তিলক। । শেষে যখন বুঝলো ভাতের কোনো আশা নেই তখন সামনে রাখা মুড়ির বাটিটা টেনে নিয়েছিলো।
ধানভি আবার হরতাজের কাছে গিয়ে জলপটিটা বদলে দিলো।
জ্বর কমার কোন লক্ষণ নেই ।
আজ বিকেল থেকে ওকে ঘাড় ঘুরিয়ে শোয়ানোর অসুবিধা হচ্ছে।
আগুন জ্বর নিয়ে অজ্ঞানের মতো পড়ে আছে আজ দুদিন।
ধানভি মুড়ির টিন থেকে একবাটি মুড়ি বার করে চিবোতে লাগলো।
৬
গঙ্গাধর চলে গেছে ছমাসের বেশি হয়ে গেছে।
বাবুজি যে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন তা তো প্রথম কমাসেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
এর মধ্যে দুবার ছেলেদুটোর হাত ধরে শান্তিকুঞ্জে গিয়ে মাইজির সামনে দাঁড়িয়েছিলো ধানভি। দুবারই অণিমা ওর হাতে হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন। ঘরে ফল বিস্কুটের প্যাকেট যা ছিলো ভরে দিয়েছেন ছেলেদুটোর হাতে।
ধানভিকে বলেছেন বাড়ির কাছাকাছি কোন কাজ খুঁজে নিতে। তাহলে দুটো ছেলেকে বেশি সময়ের জন্য মা-কে ছাড়া থাকতে হবে না । কিন্তু ধানভি এমনই যে সে সেরকম কিছু কাজের জোগাড় এখনও করে উঠতে পারেনি। গঙ্গাধর এমন ভাবেই নিজের পরিবারকে চারপাশ দিয়ে আগলে রেখেছিলো যে বাইরের বড়ো আর কঠিন জগতটার আন্দাজ ধানভি পায়নি।
বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো রুঢ় বাস্তব এখন তার সামনে এসে দাঁড়াতে সে নিতান্ত অসহায় বোধ করছে। .
আর ছোট ছেলে তিলক তো এখনও অবুঝ বয়েসের বাচ্চা।
সে তিনবেলা খেতে চায়। ভাত না পেলে কান্নাকাটি করে ।
কষ্ট করে টাকা রেখে-সেখে ধানভি মুদির দোকান থেকে ধারে চালডাল কিনে নিয়ে আসছিলো এতোদিন ।
এক সপ্তাহে ধার করে আর পরের সপ্তাহে শোধ করে দেয় ।
তার মধ্যেই আশা করে একটা অভাবিত কিছু এবার ঘটে যাবে…দুঃখের দিন কেটে যাবে ।
এখন গত সাতদিন ধরে এইরকম ধুম জ্বর হরতাজের ।
জমিয়ে রাখা প্রায় সব টাকাই চলে গেছে ছেলেটার জন্যে ডাক্তার আর ওষুধের পেছনে।
‘যেটুকু টাকা পড়ে আছে কাল কিছুটা চাল কিনে আনতেই হবে। তিলকটা এখনও শিশু, ওর কান্না আর সইতে পারি না। তারপরে হরতাজটা সেরে উঠলে না হয় আবার মাইজির কাছে গিয়ে দাঁড়াবো। বলবো আমি সকালে হরতাজের জন্য রান্না করে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে সারাদিনের জন্য শান্তিকুঞ্জে চলে আসবো। তোমার সব কাজ করে দেবো মাইজি। হরতাজটা বড়ো হয়ে গেছে। ও খুব বুঝদার হয়েছে। দিনের বেলাটা ও ঠিক নিজে নিজে সামলে নেবে । তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না মাইজি।
এইসব ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত ধানভি হরতাজের পাশে শুয়ে অতল ঘুমে তলিয়ে গেল।
৭
ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরতে গিয়ে শরীরে একটা ঠাণ্ডা স্পর্শ পেয়ে ধানভির চোখটা খুলে গেলো ।
খোলা জানলাদুটো দিয়ে ঝলমলে পাহাড়ি রোদ এসে পড়েছে ঘরের ভেতরে । আলোয় ভাসছে চারদিক। .
ঘুমচোখে ধানভি হরতাজের কপাল থেকে শুকিয়ে যাওয়া জলপটিটা সরিয়ে দিয়ে হাত দিয়ে দেখলো…ঠাণ্ডা কপাল ।
‘যাক, জ্বর তাহলে ছেড়ে গেছে ! কিন্তু…একটু বেশি রকম ঠাণ্ডা লাগলো যেন !’
এক অজানা আশঙ্কায় ধড়মড় করে উঠে বসলো ধানভি ।
চিত হয়ে শুয়ে থাকা হরতাজের শরীরটা নিজের দিকে ফেরাতে গিয়ে অনুভব করলো শরীরটা শক্ত হয়ে রয়েছে ।
পাগলের মতো ধানভি হরতাজের নাকের কাছে হাতটা নিয়ে গেলো। তারপর তার বুকের ওপর নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে শব্দ শোনবার চেষ্টা করলো ।
তারপর মাথাটা ওইভাবেই রেখে আর্তচিৎকার করে কেঁদে উঠলো ধানভি…সে বুকভাঙ্গা আওয়াজ ছড়িয়ে গেলো নেপালিবস্তির আকাশে বাতাসে।
কান্নার সেই ভয়ানক আওয়াজ শুনে তিলকের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
ধীরে বিছানার ওপর থেকে নেমে উলটো দিকে ঘুরে গিয়ে মুখে আঙুল পুরে কাছ থেকে দাদার শরীরটা ভালো করে দেখলো কিছুক্ষণ ।
ধানভি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে…ভগবান পশুপতিনাথের আমার ওপর এমন অবিচার কেন…
ধানভির সেই গুনগুনিয়ে কান্নার মধ্যেই তিলক বলে উঠলো, মা, মা, দাদাও তো মরে গেলো, এখন বাবুজি আবার অনেক খাবার, বিস্কুট, চকোলেট নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবে…তাই না মা ?


স্পর্শকাতর ভালো গল্প
লেখনী বেশ ভালো লাগলো। শিশুর সারল্যে সুন্দর ভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটি বেশ কষ্ট কল্পিত।
read the story. Nice one. Nice way to deliver for reading.
Golpota bhalo laglo.
কষ্ট হচ্ছে গল্পটা পড়ে…কিন্তু এটাই বাস্তব l ভালো লাগলো l