বিয়ে বাড়ির জন্য জয়পুরে যেতে হয়েছিল গত নভেম্বরে । তখনই ভাবনাটা আসে যে যদি কয়েক দিনের জন্য ছুটি নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে রাজস্থান একটু ঘুরে দেখলে কেমন হয় । সবাইর কাছে এত কথা শুনেছি। দেখারও ইচ্ছে ছিল বহুদিন । কিন্তু হয়ে ওঠেনি । এবারে সেই সুযোগটা এসে গেল । জয়পুরের হোটেল আরনা থেকে বেরিয়ে পড়লাম ঠিক সাড়ে নটা নাগাদ । ড্রাইভারজি দীপেন্দ্র সিং। এক্কেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে বাইরে হাজির । শক্তপোক্ত সুন্দর চেহারা । হাসি হাসি মুখ । বয়স ৪৫ এর আশেপাশে। একটা সুন্দর ঝকঝকে পরিষ্কার টয়োটা ইনোভা ক্রিস্ট। গাড়িটাতে আরও কয়েকজন থাকলে হয়তো ভাল হত। ছোটমামা শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেলেন । মেয়েদের পক্ষেও বিয়ে বাড়ির সব অনুষ্ঠানের শেষ না করে যাওয়া সম্ভব ছিল না । অগত্যা আমরা দু’জন। একটু চলার শুরু করতেই ওঁর সম্বন্ধে জানা গেল। ওঁরা আটজন ভাই বোন । তিন ভাই এবং পাঁচ বোন। দেশের বাড়ি মাকরানা । পড়াশোনা করেছেন দশ ক্লাস পর্যন্ত । তারপরে এখানে জয়পুরে এসেছেন । বাবা এখনো বেঁচে । মা মারা গেছেন তিন মাস আগে । শ্বশুর বাড়ি জয়পুরে । তিন মেয়ে এক ছেলে । বড় মেয়ে ইউপিএসসি পরীক্ষার জন্য ট্রেনিং নিচ্ছে । পরের মেয়ে ইলেভেনে পড়ে , পরেরটি এইটে এবং ছেলেটি সিক্সে পড়ে । উনি এই কাজ করছেন প্রায় কুড়ি বছর । আগে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন । কয়েক বছর হল জয়পুরে বাড়ি করেছেন । বাবা ওঁর সঙ্গেই থাকেন। এই কাজের জন্য প্রচুর ঘুরে বেড়াতে হয় । কেউ কেউ একেবারেই ওর সঙ্গে কথা বলেন না । ভাল হিন্দিতে বললেন তখন উনি চুপ থাকেন । এমনকি গানও না শুনতে চাইলে চালান না। তবে আগেই জানিয়ে দেন যে প্রতি দু’ঘণ্টা চলার পর দশ পনের মিনিটের ব্রেক । সেটাতে ওয়াশ রুম যাওয়া যেতে পারে বা চা খাওয়া যেতে পারে । আমরা কথা বলছি দেখে খুশি হয়েছেন । বলেই ফেললেন বাঙালিরা সাধারণত খুব মিশুকে হন । তবে। বলতে ইতস্তত করলেন । জানতে চাইলাম । বললেন মাসখানেক আগে এক বাঙালি তরুণ তরুণীর সঙ্গে ঘোরাটা ততো জমে নি । ওনার মনে হয়েছে হয়তো তরুণী বিশেষ সুন্দরী ছিলেন বলে সব সময়ই একটু বেশি গর্বিত থাকতেন। এই সঙ্গে এটাও জানালেন যে বাড়িতে থাকলে বেশিরভাগ সময় বাড়ির লোকের সঙ্গে দিনকাটানো । একটুখানি সময় বন্ধুদের সঙ্গে ।


দীপেন্দ্রজি জানালেন যে গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয় বলে জেলাগুলো জানা হয়ে যায় । বললেন এখন রাজস্থানে সাতটি ডিভিশন। আজমের, ভরতপুর , বিকানির , জয়পুর , যোধপুর , কোটা এবং উদয়পুর। প্রত্যেকটি ডিভিশনে চার থেকে ছ’টি করে জেলা । প্রশ্ন করি তাহলে মারওয়াড় , মেওয়ার এই ভাগগুলো এলো কোত্থেকে। গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলছিলেন দীপেন্দ্রজি । খেয়াল রাখছিলাম যে কথা বলতে গিয়ে যেন গাড়ি চালানোতে মনঃসংযোগের ব্যাঘাতটা ঘটে । রাস্তা ঝকঝকে এবং চমৎকার । ন্যাশনাল হাইওয়ে । খুব বেশি গাড়ি নেই । মাঝে মাঝে লরি রয়েছে । মোটামুটি লেন মেনে চলেছে । আমরা আজকে চলেছি জয়পুর থেকে প্রথমে পুষ্কর । তারপর ওখান থেকে আজমের । অনেকে আজমীর বলেন । রাজপুতনা থেকে রাজস্থান । একদিনে রাজারা সব ক্ষমতা ছেড়ে এক হয়ে যান নি । এই এক রাজ্য হওয়াও সোজা ছিল না । সাতটি ধাপে ধীরে ধীরে একসঙ্গে হওয়া । পয়লা নভেম্বর ১৯৫৬ । সালটা শুনে একটু চমকে উঠি । ওঁকে কিছু বলি না । আমার প্রশ্ন শুনে মুচকি হেসে পরিষ্কার হিন্দিতে জানালেন যে প্রাকৃতিক অবস্থা , কথাবার্তার ধরন ধারণ , পোশাক আশাক , খাওয়া-দাওয়া , আচার অনুষ্ঠানের তফাৎ থেকেই সেই আগেকার অঞ্চল ভাগ। অনেকেই পাঁচ ভাগে ভাগ করেন । কেউ কেউ প্রায় ন’ ভাগে ভাগ করেন । প্রথমটি ধুঁডাড় যেটি জয়পুর এলাকা । পরেরটি গোডাড । তারপর হাডোতি , যেটি কোটা এলাকা। জানতে চাইলেন যে কোটা অঞ্চলটার কথা আমরা শুনেছি কিনা । খুব পরিষ্কার করে বললাম যে শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সারা ভারতবর্ষ এই কোটা অঞ্চলকে অবশ্যই চেনে । কারণ কোটা অঞ্চলের ট্রেনিং থেকেই তো কম্পিটেটিভ পরীক্ষাগুলোতে এত ভাল রেজাল্ট হয় । ঠিক বলেছেন । কিন্তু কতোটা কম্পিটিটিভ তা জানেন কি । বললাম আমরা জানি । উনি জানালেন ওনার বড় মেয়েকে এখানে পড়াতে চেয়েছিলেন । কিন্তু টাকা পয়সা এবং| অন্যান্য কারণে দিতে পারেন নি । অন্য অনেক ঘটনা নিয়মিত ঘটে । এ খবরটি কী জানি । বললাম , বেশ ভাল করেই জানি।
এর পরের অঞ্চলটা মারওয়াড়। বলে একটু থামলেন উনি। এটি আগেকার পশ্চিম রাজস্থান। যোধপুর, জয়সালমের, পালি এলাকা। খুব গর্বের সঙ্গে বললেন আমিও কিন্তু মাড়োয়ারি। বললেন একটা কথা খুব প্রচলিত আছে ‘যাহা গিয়া রেলগাড়ি , জাঁহা পৌঁছা মারোয়াড়ি । তারপর একটু হেসে বললেন জাঁহা নেহি ভি পৌঁছা রেলগাড়ি , উঁহাভি পৌঁছা মারওয়াড়ি । আসলেই জানেন কী, মারোয়াড়িরা ব্যবসা করতে ভালবাসে । এরপর মেরওয়াড়া তারপর মেওয়ার । এই মেওয়ার অঞ্চলে আমরা আগামীকাল যাবো । সাত নম্বরটি মেওাট । এরপর শেখাওয়াড়ি । এবং শেষটি ভেগাড় । আমরা এগিয়ে চলেছি আটচল্লিশ নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে । আগে এটি ছিল আট নম্বর । দিল্লি থেকে মুম্বাই। দু’দিকে বিস্তীর্ণ চাষের মাঠ । অনেক জোরে চালাচ্ছেন না । ঘণ্টায় আশি কিলোমিটারের মধ্যে গতিবেগ । জানালেন ভাল রাস্তায় এই গতিতে সবচেয়ে ভাল কন্ট্রোল থাকে এবং ফুয়েল ইকনমিও হয় । এটা আমার জন্য ছিল এক বিশেষ চমক । এ কথা তো ইংল্যান্ডে গাড়ি চালানো শেখার সময় বারেবারে শুনেছি। বুঝলাম ভাল কিছু যাঁরা ভালবেসে করতে চান তাঁরা নিজেদের আগ্রহেই হয়তো অনেক কিছু শিখে যান । বজরা , গম বা গেঁহু , সরষে , ছোলার চাষ হয়েছে অনেকখানি জায়গায়।


ঠিক সাড়ে এগারোটায় থামল । লক্ষ্মী ভিলা প্যালেস । ওয়াশরুম ব্রেক । একটা বড় গাছের নিচে পড়ে আছে অনেক ফল । কয়েকটা কুড়োলাম । জিজ্ঞেস করতে বললেন ‘আমলা’। ঠিকই ধরে ছিলাম । আমলকি । সামনের একটা গাছে অনেক রক্তকাঞ্চন ফুল । আজই ভোরে জয়পুরে শিউলি ফুল দেখেছি । আহা শিশিরভেজা শিউলি ফুল !
রাস্তার ধারে বিজ্ঞাপন । ‘মিলেনিয়াম মার্বেলস’ , ‘স্কোয়ার ফিট , এক্সোটিক ইম্পোটেড মার্বেল’ , ‘সূরজ মার্বেলস’ । টোল প্লাজা পের হলাম । ডানদিকে মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাহাড় । দীপেন্দ্রজি জানালেন যে আমরা পার হয়ে যাবো ‘কিষাণগড়’। এশিয়ার সবচেয়ে বড় মার্বেল মার্কেট । এক্সপোর্ট , ইম্পো্রট , কাটিং , স-ব-ব। সামনে লেখা কিষাণগড় ৭ কিমি , আজমের ৩৩ কিমি । জয়পুরর থেকে আজমের ১৩৫ কিলোমিটার। জিজ্ঞেস করলাম আমরা কি আজমের হয়ে পুষ্কর যাবো । বললেন এখন একটা বাইপাস হয়েছে। তাই আগে পুষ্কর , তারপর আজমের । এখান থেকে মাকরানা প্রায় ৬০ কিমি । দীপেন্দ্রজির গাঁও । বুঝলাম , অনেকেরই ছোটবেলায় কাটানো জায়গার একটা স্মৃতিমেদুরতা আছে । অনেকের কাছে সেটি দেশের বাড়ি । শিকড় । সেই শিকড়ের টান । মনকেমন করা অনেক বিকেল – সন্ধে ।
পেছনের চাকায় একটু কম টায়ার প্রেসার মনে করে গড়ি দাঁড়াল । মাইলফলকে দেখাচ্ছে মুম্বাই ৮৮৮ কিমি , আজমের ২১ । বেশ কড়া রোদ্দুর । ১২-১০ এ আবার টোল প্লাজা । একটু পরে বাঁদিকে ছোট পাহাড় , ডানদিকে প্রেসিডেন্সি স্কুল। দশ মিনিট পরেই গাড়ি বেঁকে পুষ্করের দিকে চলতে শুরু করলেন । হঠাৎ যেন ভূ-প্রকৃতি খানিক বদলে গেল । চারিদিকে আরাবল্লী পাহাড় ! কতো নাম শুনেছি । এই সেই আরাবল্লী। যে পর্বতমালা ভারতের উত্তর পশ্চিমে দিল্লি থেকে শুরু হয়ে , দক্ষিন হরিয়ানা , রাজস্থান হয়ে গুজরাটে শেষ হয় । প্রায় সাড়ে ছ’শো কিমি দৈঘ্যে। চমৎকার রাস্তা। বেশ কিছু নতুন রিসোর্ট তৈরি হচ্ছে। জানলাম যে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে চলেছে । কারণ পৃথিবীর এক এবং একমাত্র ব্রহ্মা মন্দিরটি এখানেই অবস্থিত । মাথায় খেলে গেল একটি প্রশ্ন । এই ত্রিদেব ভাবনা কবে থেকে? তার আগে কী ছিল? শুধু প্রকৃতির আরধনা? সূর্য , অগ্নি , বায়ু , বরুণ ইত্যাদি । নিজের অজ্ঞানতাকে ধিক্কার দিলাম । পড়তে হবে । মন মনে এটুকু ভেবে দুপুর বারোটা চল্লিশে পৌঁছলাম পুষ্কর।


দীপেন্দ্রজি ফোন করে ডেকে নিয়েছিলেন এক যুবককে । রাসু পরাশর । উনিই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। আমাদের গাইড । আগেই জানতাম যে পৃথিবীতে সম্ভবত একটিই ব্রহ্মার মন্দির আছে এবং সেটি এই পুষ্করেই । পুষ্কর কথাটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ থেকে । মানে নীল পদ্ম । পুরাণ কথায় নানা রকমের বর্ণনা রয়েছে । পরাশরজির কথা অনুসারে , আদি শঙ্করাচারয্য এখানে বহুদিন সাধনা করেন । ব্রহ্মার এই মূর্তি কল্পনা তাঁরই এবং এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতাও তিনিই । কিছুটা পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম মন্দিরের সামনে । জুতো জমা রেখে , হাত ধুয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম । মন্দিরটি পাহাড়ের ওপর। অনেক উঁচু নয়। কিছু সিকিউরিটি চেক রয়েছে । পরাশরজি জানালেন যে এখনকার মন্দিরের কাঠামোটি চতুর্দশ শতাব্দীর । অনেক ভাঙ্গাভাঙ্গির কাহিনি ইতিহাসে আছে । তোরণের দুদিকে দুটি মূর্তি । মন্দিরটি মার্বেল এবং পাথরের স্ল্যাব দিয়ে তৈরি। লাল চূড়া রয়েছে । গর্ভগৃহে রয়েছে চার-মাথাযুক্ত ব্রহ্মার মূর্তি । এটি শঙ্করাচারয্যের কল্পনা । পাশে তাঁর স্ত্রী গায়ত্রী । এক পুরাণ কথা অনুসারে ব্রহ্মার দুই স্ত্রী । সাবিত্রী এবং গায়ত্রী । সাবিত্রীর অভিশাপের কারণেই নাকি গৃহীরা ব্রহ্মার পূজা করতে পারেন না । অন্য এক মতে শিব এবং বিষ্ণু অভিশাপ কাহিনি । এই দেবতাদের আশীর্বাদ এবং অভিশাপ কাহিনি বারেবারই মনকে বিভ্রান্ত করে । শুধু তাই নয়, বিব্রতও করে । মন্দিরটি এখন পুরোহিত দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রতি বছর কার্তিক পূর্নিমায়, ব্রহ্মাকে উত্সর্গ করে একটি উত্সব অনুষ্ঠিত হয় । সেই সময় হ্রদে স্নানের পরে প্রচুর সংখ্যক তীর্থযাত্রীরা মন্দিরে যান। এরপর উনি নিয়ে চললেন পুষ্কর হ্রদের দিকে । দুদিকে বেশ কিছু দোকান । তলোয়ালের বেশ বড় দোকান । সামনে এল ব্রহ্মা সরোবর । রয়েছে বাহান্নটি ঘাট এবং প্রায় এক হাজার মন্দির । পুজো দেব কিনা জিজ্ঞেস না করেই একটা দোকান থেকে ফুল এবং অন্যান্য সামগ্রী কিনে উনি হাজির করলেন এক পুরোহিতের সামনে । ভক্তি সহকারে পূর্ব পুরুষ এবং মহিলাদের , নিজেদের এবং উত্তর পুরুষ মহিলাদের মঙ্গল কামনা করা হল । ডোনেশন দেওয়া নিয়ে খানিক অস্বচ্ছতা অনুভূত হল । খুব মৃদু স্বরে উচ্চারণ করিয়ে তিন দিনের জন্য ক্ষীরভোগের রসিদ কাটানো হল । জেনে ভাল লাগলো যে আর কেউ কোন টাকা পয়সা নেন না। সত্যিই নিলেন না । মিউনিসিপালিটির সংগ্রহিত এই অর্থ পাঁচশোর বেশি পরিবারের ভরণপোষণে ব্যায় করা হয়। ক্ষিদে পেয়েছিল । শুনেছি অন্নই ব্রহ্ম । মন চলো তারই অন্বেষণে ।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]