যে কোন শিল্পীর সঙ্গে তাঁর শিল্পকর্মের সম্বন্ধ অনেকটা যেন নদীর সঙ্গে নদীর স্রোতের মতোন। কখনো হয়তো পলি জমে সেই স্রোত বাধা প্রাপ্ত হয় – হয়তো প্রবল গ্রীষ্মে নদীর জল কমে যায়। কিন্তু আবারও বর্ষা নামে, নদীর জল বাড়ে। তখন ওই জমা পলির সাধ্য থাকে না সেই স্রোতকে বাধা দেওয়ার। সে তখন প্রবল উচ্ছাসে নতুন উদ্দীপনায় আবার পুরোনো চেনা ছন্দে ফিরে যায়। তারাশঙ্করও এর ব্যাতিক্রম নন।


ষাটের দশকের প্রথম দিকে ১৯৬২ সালের ১৩ই অক্টোবর তাঁর বড় জামাতার অকাল মৃত্যু হয়। এই ভয়ঙ্কর শোক তাঁকে মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। এই সময় তিনি রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। সেই সভারই কোন বিশেষ কাজে দিল্লি গিয়ে ফেরার পথে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। কোন রকমে চেনা জানাদের সাহায্যে কলকাতা ফিরে আসেন। ঘন ঘন রক্তচাপ ওঠা নামা করতে থাকে। কখনো তা ২৫০-এ গিয়ে পৌঁছয়, কখনো আবার তা ১০০-র নিচে নেমে আসে। রাতে ঘুম আসে না – সারাক্ষণ নানান দুশ্চিন্তায় কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগে। বাধ্য হয়েই এরপর তাঁকে ডাক্তারের শরাণাপন্ন হতে হয়। ডাক্তার নলিনীরঞ্জন সেনগুপ্ত ছিলেন তাঁর ডাক্তার। তিনি তারাশঙ্করকে পূর্ণ বিশ্রামের নির্দেশ দেন। একটানা বসে থাকা, পরিশ্রম করা সবেরই ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় – লেখালেখিও বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ওপর নিচ করতে পারবেন না বলে তাঁর শোয়ার ব্যবস্থা দোতলা থেকে নামিয়ে এনে তাঁর লেখার ঘরে স্থানান্তরিত করা হয়। ওই ঘরের মেঝেতে মোটা গদি পেতে বিছানা প্রস্তুত করা হয়। এর পর প্রায় মাস তিনেক তাঁর শয্যাশায়ী অবস্থায় কেটে যায়।
এই রকমই একদিন শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই তাঁর মনে হল সামনের দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য ছবি।

সেগুলো কোনটা বা কর্নিকের দাগ, কোনটা বা ড্যাম্প, কোনটা আবার জলের দাগ। তারা সব বিচিত্র ছবি হয়ে তাঁকে যেন কিছু বলতে চাইছে। এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখা ‘আমার কথা’ থেকে কয়েকটি লাইন তুলে ধরছিঃ-
“রোগশয্যায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল প্রায় মাস তিনেক। সে সময় যখন আর সময় কাটছে না, তখন হঠাৎ একদিন বিছানার সামনে দেওয়ালের গায়ে সিমেন্ট দিয়ে মাজা অংশের উপর কতগুলো কর্নিকের দাগ ছবি হয়ে উঠে আমায় ডাকলে, বললে, আমার দাগে দাগ বুলিয়ে ফুটিয়ে তোলো, আমি ছবি।
অরেঞ্জ টিউব রঙ নিয়ে তুলি চালাতে আরম্ভ করলাম। সেদিন ঘন্টা কয়েকের মধ্যেই ছবিটা শেষ হল। আমার গৃহিণী বললেন, বাঃ, এ তো চমৎকার হয়েছে। তখন সত্যিই আমি পুলকিত হলাম, খুশী হলাম –জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাহলে ছবি আঁকব?
ছবি যখন ভাল হল, তখন আঁকো না ইচ্ছা হলে। কিন্তু বাপু দেওয়ালে নয়। না, দেওয়াল জুড়ে জুড়ে তুমি ছবি এঁকে ভরাবে সে হবে না।
তাহলে?
তাহলে আর কি? যেমন করে মানুষ ছবি আঁকে তেমনি করেই আঁকো। যামিনীদার ছবি আঁকা দেখেছি। কাপড়ের উপর আঁকেন তিনি। তাই আঁকো। দেওয়ালে আঁকা হবে না।
এই আমার ছবি আঁকার কথা।”


সেই শুরু। তবে কাপড়ের ওপরে নয় – কাঠের ক্যানভাসে। জল রঙেও নয় – তেল রঙে। এর জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জামই কেনা হত ধর্মতলার বিখ্যাত জি সি লাহার দোকান থেকে।
আসলে দেওয়ালের দাগের মধ্যে যাঁরা ছবিকে কল্পনা করতে পারেন ছবি তাঁদের মনের অন্তঃস্থলেই বাস করে। শুধু সময়ের অপেক্ষা – এক সময় সামনে এসে দাঁড়ায়। নয়তো কর্নিকের দাগ চিরকাল দাগই রয়ে যায় – ছবি হয়ে ওঠে না।
ছবি এঁকেছিলেন প্রায় তিরিশ পঁয়তিরিশটা। এই সংখ্যাটা শুধু মাত্র যে ছবিগুলো ফ্রেমে বাঁধানো হয়ে তাঁর বাসভবনে টাঙানো হয়েছিল তাদের। এ ছাড়াও তিনি বহু ছবি এঁকেছিলেন – তার অধিকাংশই কাউকে না কাউকে উপহার দিয়েছিলেন – কিছু হারিয়েও গিয়েছে। তাঁর একটা ছবির খাতা ছিল। সেখানে ভুতপুরাণের জন্যে ছবি এঁকেছিলেন। ভুতপুরাণ এক কিশোর উপন্যাস – দেবসাহিত্য কুটিরের বার্ষিকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী কালে যখন শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে তা বই হয়ে বেরোয় তখন তাতে ছবিগুলোও ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রথম সংস্করণের ভুতপুরাণ আজ আর কোথাও পাওয়া যায় না।


তাঁর আঁকার মধ্যে ছিল বেশ কিছু ল্যান্ডস্কেপ, বনাঞ্চল, হরিতশস্যক্ষেত্র, বন্দর ইত্যাদি। ছিল রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, গোর্কির পোর্টেট। এঁকেছিলেন মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণা পিঙ্গলবরণা, অন্ধবধির, কৌষেয়ধারিণী কন্যার ছবি। ছিল দিনের শেষে প্রদীপ হাতে প্রতীক্ষারত বার্ধক্যর ছবি। এঁকেছিলেন তাঁর নিজের সৃষ্ট কিছু চরিত্র – পুণ্ডরীক, রীনা ব্রাউন, কৃষ্ণেন্দু, গন্নাবেগমের ছবি, এমনকি নিজের প্রতিকৃতিও।
১৯৬৭ সালে তাঁর কিছু ছবি নিয়ে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে এক প্রদর্শনী হয়েছিল। বিখ্যাত ভাষ্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী তার উদ্ধোধন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,”তারাশঙ্করের সঙ্গে একদিন মানুষ হিসাবে মিশবার সুবিধা পেয়েছিলাম। তখন জানতে পারিনি ছবির প্রতি তাঁর আর্কষণ চিত্রকরের পেশাতেও দাবি এনে ফেলবে। খুবই আনন্দের কথা দলভুক্ত করে শিল্পীরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করবেন।”
শিল্পীরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন কিনা জানি না, তবে অনেকে ব্যঙ্গের তীক্ষ্ণ হুল ফোটাতে ছাড়েননি। এক বর্ষীয়াণ বিখ্যাত কবি বিদ্রুপ করে বলেছিলেন, “শুনেছো হে, তারাশঙ্কর আজকাল ছবি আঁকছে। মাঝে মাঝে সনৎকে (লেখকের জেষ্ঠ পুত্র) ভুল করে রথী বলে ডেকে উঠছে।”
সে যে যাই বলুক – এতে তারাশঙ্করের জীবনে একটা পরিবর্তন রসেছিল – তিনি অসুস্থতা কাটিয়ে আবার সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। ওই যে – যে পলিটা জমেছিল, তাকে বর্ষার জলরাশি দিয়ে ধুয়ে মুছে দূরে সরিয়ে প্রবল উচ্ছাসে আবার সাহিত্যের আঙিনায় প্রবেশ করেছিলেন।


তাঁর আঁকা সব ছবিরই বর্তমান আবাস স্থল কলকাতা মিউজিয়াম। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেওয়ার কথা থাকলেও মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ আজও ছবিগুলোর ডিজিটাল কপি তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেননি।
তারাশঙ্করের শিল্পকর্মের আরো একটা অজানা দিক আছে – তা হল কাটুমকুটুম। ভবিষ্যতে কোন এক সময় সে নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের আগের রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
পল্লববরন পাল
পল্লববরন পাল
11 months ago

অচেনা তারাশঙ্কর – তাঁর এ শিল্পীসত্ত্বার কথা জানতামই না।
অত্যন্ত মূল্যবান নিবন্ধ। 🙏🏼🙏🏼

Nandita Sinha
Nandita Sinha
11 months ago

অজানা তথ্য জানলাম।ভালো লাগলো