১.
রাতে ঘুমাতে যাবে, ঠিক তখনই বেজে উঠলো মোবাইলটা। এতো রাতে কে আবার ফোন করছে? ভুরুতে ভাঁজ পড়লো আদিত্যর। আননোন নাম্বার। প্রথমবার ধরলো না আদিত্য। আবার ফোন। ধরবে না, ধরবে না, করেও শেষমেশ ধরলো ফোনটা–
–হ্যালো!
–ঘুমিয়ে পড়েছিলে? বিরক্ত করলাম। মহিলা কন্ঠ। আবার তুমি-তুমি করছে? চেনে নাকি? আদিত্য গম্ভীর স্বরে বলে–
–কে আপনি?
হাসির রোল ওঠে ওপাশ থেকে।
–চিনতে পারনে না? আমি সেঁজুতি, মানে তোমাদের নন্দিন । চমক লাগে আদিত্যর ; প্রায় ৮/৯ বছর আগেকার ঘটনা। কি জানি, হঠাৎ কী মনে করে ?
–বলুন।
–আমাকে আপনি-আপনি করছো কেন? আচ্ছা, আচ্ছা, অনেক বছরের ব্যবধান, তাই এই দূরত্ব? ভালো। যেজন্য ফোন করেছিলাম। আগামী পরশু সন্ধ্যা ৬টায় রবীন্দ্র-সদনে আমার একটা শো আছে।এসো কিন্তু।
ও হ্যাঁ, এটা তোমার what’s App নাম্বার তো? আমি আমন্ত্রন পত্রটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। অবশ্যই এসো। কথা আছে।

কানেকশন বন্ধ হয়। আদিত্য লাইট অফ করে বিছানায় শরীরটা ফেলে। ঘুম আসে না। ইউনিভার্সিটি জীবনের ফেড-হওয়া নেগেটিভগুলো আবার যেন জীবন্ত হতে চায়।
মনে পড়ে, ছোট টিপ, দুটো বিনুনির সেই ছিপছিপে মেয়েটাকে।
মনে পড়ে, প্রথম দিন। একা। একটি মেয়ে। একটু শ্যামলা। তন্বী। ফিগারটা সুন্দর ।
আচ্ছা, ফাস্ট লিস্টে আমার নাম উঠেছে, ভর্তি হয়েছি। হস্টেলে একটু একমোডেশন চাই ; আমাকে কেউ হেল্প করতে পারেন?

কী চাই বলুন? এগিয়ে আসে আদিত্য।
–দেখুন, আমি উত্তর-বঙ্গের মেয়ে ; এই কলকাতা শহরে তেমন চেনা-জানা কেউ নেই। তাই একটা নিরাপদ থাকার জায়গা খুঁজছিলাম। এখানে পাওয়া যাবে?

–না, আপাতত কোনো সীট খালি নেই। আপনি একটা অ্যাপ্লিকেশন রেখে যান। আপনার নীড ও রিকোয়ারমেন্টস জানিয়ে। দেখবো যদি হয়।

–আপনার ফোন নাম্বারটা পাওয়া যাবে? মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত করে পজিশন জানতে চাইবো।
–অবশ্যই।

না। সেই অ্যাপ্লিকেশনে সেঁজুতির হস্টেলে সীট হয়নি। গড়িয়ার কাছে, কোনো এক জায়গায় ভাড়া থাকে সে। পেয়িং-গেস্ট হিসাবে।

সেই তখনই আদিত্যর ফোন নাম্বার নেয় সেঁজুতি। তারপর এতোদিন!সেই নম্বরটা ঠিক মনে রেখেছে। না রেখেই বা উপায় কী? আদিত্য মনে না রাখলেও সেঁজুতি তো ভুলতে পারে না ; এর মধ্যে আদিত্যর সঙ্গে যে তার একটু সম্পর্কও তৈরি হয়েছে!

আদিত্যর মনে পড়ে, ‘রক্ত-করবী’ রিহারশালের সেই দিনটা। এমনিতে সেঁজুতি বেশ রেগুলার। রোজ সময়মতোই আসে। সেদিন বেশ খানিকটা দেরি করে। আদিত্য ফোন করেছিলো। সুইচ অফ।

অনেক্ষণ পরে, হাঁপাতে-হাঁপাতে ঢোকে সেঁজুতি। আদিত্য বলে, কী হয়েছে?
–কিছু না।
কিন্তু মুখে ‘কিছু না’ বললেও বোঝা যায়, কিছু একটা হয়েছে তো বটে !
তখনও সেঁজুতির শ্বাস ঘন—বুক যেন হাওয়া-লাগা পালের মতো, জোরে জোরে ফুলে-ফুলে উঠছে, মুখ আরক্ত। ওয়াশ রুম থেকে, চোখে মুখে জল দিয়ে, একটু জিরিয়ে নিয়ে, সেঁজুতি নাটকের রিহারশাল দিতে শুরু করে—
দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলে, “দরজা খোলো,”
“আবার এসেছ অসময়ে। এখনই যাও, যাও তুমি।”
“অপেক্ষা করবার সময় নেই, শুনতেই হবে আমার কথা।”
“কী বলবার আছে বাইরে থেকে বলে চলে যাও।”
“বাইরে থেকে কথার সুর তোমার কানে পৌঁছায় না।”

২.

পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ । আদিত্য বসেছে প্রথমের দিকেই। সেঁজুতির পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’। ১২৯৯ বঙ্গাব্দের ২৮ শে ভাদ্র যে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাটক প্রকাশিত হয়, মূলত তার সঙ্গে ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের সংমিশ্রণে এই উপস্থাপনা।

কু-রুপার ভূমিকায় সেঁজুতি। কী করিওগ্রাফি, কী লাইটিং।আধো-আলো,আধো-অন্ধকারেও যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠছে হৃদয়ের আর্তি ! সেঁজুতি যে এখনও হার্ট-থ্রব।

শো শেষ ।
সম্বর্ধনার জন্য ডাকা হয়েছে সেঁজুতিকে স্টেজে। সেঁজুতি হাতে মাইক্রোফোন তুলে নেয়। মুখের একদিকে তার চুলের রাশি। কথা বলতে শুরু করে সেঁজুতি।

আমি কুরুপা। এককালে হয়তো সু-রুপাই ছিলাম। কিন্তু সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময় থেকেই একদল পশু আমার পিছু নেয়। একদিন ওদের সর্দারকে মুখের ওপর বলেই দিলাম— ” তোমাদের বাড়িতে কি মা-বোন নেই ? তাদেরও এভাবে ভাবো নাকি?”

হাসির রোল উঠলো। সর্দার এগিয়ে এসে বললেন, “ধুস।
তুমি হলে আলাদা। চলো, আজ বিছানায়।আমাকে বুঝতে পারবে।”

ঠাঁঠিয়ে গালে এক থাপ্পর মারি। তারপর কিছুদিন চুপ-চাপ। ভাবলাম, থেমে গেল বোধহয়। কিন্তু না। ইউনিভার্সিটিতে তখন ‘রক্ত-করবী’ নাটকের অনুশীলন চলছে। আমি নন্দিনী। সেইসময় একদিন, দলবল নিয়ে সেই সর্দার আবার হাজির, আমাকে নিয়ে যাবেই ওর বিছানায়। কোনো-ক্রমে পালিয়ে আসি।

একটু থামে সেঁজুতি। তারপর এলো সেই কালো দিন। ইউনিভার্সিটির ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে । টিউশন পড়িয়ে ফিরছি। একটু রাত হয়েছে। আমার ভাড়া বাড়িতে অলি-গলির পথ। সেই পথের বাঁকেই দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। মুখে কী যেনো ছুঁড়ে দিলো। তরল। জ্বলে গেলো মুখ। আর্ত-চিৎকারে রাস্তায় জ্ঞান হারাই। যখন জ্ঞান এলো, আমি এক হসপিটালে ।বেঁচে আছি। সিস্টার-দিদি মুখের সামনে এক আয়না ধরে। চমকে উঠি। এটা কে?

এতোক্ষণে মুখের চুলগুলো সরায় সেঁজুতি। সবাই চমকে ওঠে।
সেঁজুতি বলতে থাকে, প্লাস্টিক সার্জারি করে , এখন তবু একটু পদের হয়েছে।প্রথমে ভেবেছিলাম, এ জীবন রাখবো না।

ডাক্তার-দিদি বোঝালেন। নিজের জীবন নষ্ট করে কী লাভ ! তার চেয়ে যারা তোমার জীবনে এমন বিভীষিকা এনেছে, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াও । সেই থেকে জেদ চেপে গেলো মনে। সত্যিই তো, আমি কেন মরবো?

তাই আজ আমার এ নাচ, নাচ নয় ; এ প্রতিবাদ, সমাজের পশুদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। এ নাচের ব্যঞ্জনা নয় ; এ এক নারীর হৃদয়ের যন্ত্রণা।

হাততালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ । আদিত্য স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ? মনে নেই। সম্বিত যখন ফিরলো, সেঁজুতি ওর পাশে। প্রেক্ষাগৃহে ।

–কী ভাবছো রাজা? আমার আদিত্য !
–আমি এতসব জানতাম না।
–এখন তো জানলে। কী করবে ? পাশে থাকবে তোমার নন্দিনীর?আপন করে নেবে তাকে?

আদিত্যর চোখে জল। সেঁজুতির দুটো হাত চেপে ধরে বলে,”আমাকে কি সে-সুযোগ দেবে তুমি ?”

কী বলবে সেঁজুতি? নদী আজ সাগরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন কী আর ফেরা যায়?
আদিত্যর কানে যেন বাজতে থাকে, “এনে দাও চিত্তে রক্তের নৃত্যে / বকুলনিকুঞ্জের মধুকরগুঞ্জন…”

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]