ব্যালকনির লাগোয়া ড্রইংরুম থেকে লাগাতার টিভির আওয়াজ আসছে।
ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে নন্দিতা ।
তার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটছে…অনুলোম বিলোমের নিঃশ্বাস নেওয়া ছাড়ার গুণতির গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে !
সকালবেলার এই আধঘণ্টা চল্লিশ মিনিট নন্দিতার একেবারে নিজস্ব সময়।
নন্দিতা বলে যোগসাধনার সময় ।
তিরিশ বছর বিবাহিত জীবনের নানারকম মানসিক উৎপাত ভুলে থেকে মনকে শান্ত রাখার জন্য সাধনা করার সময় !
‘আচ্ছা টিভির ভল্যুমটা কম করেও তো শোনা যায় ! এই সক্কালবেলায় কি চালিয়েছে, সিনেমা না ইউটিউবের যত্তোসব ফালতু কমেডি এপিসোড !’
অজ্ঞাতে ব্যায়াম থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে নন্দিতার মনে যখন এইসব ভাবনা তখনই তারস্বরে ড্রইংরুমে গান শুরু হয়ে গেলো, শুন শুন শুন দিদি …!
আর শুনেই চড়াৎ করে নন্দিতার নাসারন্ধ্রের বায়ু আর ধমনীর রক্ত একসঙ্গে মাথায় উঠে গিয়ে ধাক্কা মারলো, বন্ধ চোখদুটো খুলে গেলো।
‘আবার ! আবার চালিয়েছে এটা ! গতকাল থেকে এই নিয়ে বোধহয় চারবার দেখছে সিনেমাটা ।’
পদ্মাসন থেকে তড়াক করে উঠে পড়ে নন্দিতা ড্রইংরুমে ঢুকে পড়লো।
সেখানেও অন্য সাধনা চলছে !
সোফায় আরাম করে বসা বগলাপ্রসাদের চোখ নিমীলিত…বাঁপায়ের ওপর ডান পা আড়াআড়ি ভাবে তুলে রাখা আছে !
প্রিন্টেড রাত-পাজামার ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা ডানপায়ের পাতা গানের তালে তালে হাল্কা হাল্কা নড়ছে !
সারা মুখে এক নিবিড় প্রশান্তির আভাস !
স্বামীর ওই গভীর মগ্নতা দেখে নন্দিতার বিরক্তি আরও যেন তিনগুণ চড়ে গেলো !
পাঁচ সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ও সেন্টার টেবিলের ওপর থেকে টিভির রিমোটটা তুলে নিয়ে খটাং করে দরকারের থেকে বেশি জোরে টিপে টিভিটা বন্ধ করে দিলো।
বগলাপ্রসাদের ধ্যান ভেঙ্গে গিয়ে চোখদুটো খুলে গেলো।
‘আহা ! সিনেমাটা বন্ধ করে দিলে ! কি গো তুমি, বেরসিক! ইসস, যেমন মারকাটারি নাচের সিন আর তেমনি আশাজির কালজয়ী গান !
‘চোখ বন্ধ করে তুমি নাচ দেখছো ! যত্তো ন্যাকামি ! আর কাল থেকে এই নিয়ে চারবার তুমি খুবসুরৎ দেখছো ! আচ্ছা, তুমি কি এখনও পাগলামি ছাড়বে না ! তোমার বয়স হয়নি ? কদিন বাদে তোমার মেয়ের বাচ্চা হয়ে গেলে তুমি দাদু…
‘এটা কি মাস ?
কড়ক কথার ফ্লো-এর মধ্যে স্বামীর হঠাৎ এমন ঠান্ডাগলায় সংযোগহীন প্রশ্নে নন্দিতার আগ্রাসন যেন থমকে গেলো।
প্রায় যন্ত্রচালিতের মতো ও বলে উঠলো, কেন, অকটোবর মাস, ন-তারিখ ।
-করেক্ট ! কাল দশ, বুধবার, রেখার জন্মদিন ! রেখার এই জন্ম সপ্তায় আমি পরপর তার হিট ছবি দেখে যাবো, বুঝেছো ! চারবার খুবসুরৎ, তিনবার উমরাও যান, তিনবার ইজাজত, তিনবার উৎসব, দুবার জুবেদা, দুবার লজ্জা, দুবার নমকহারাম আর অন্তত একবার খুন ভরি মাঙ্গ !
বগলাপ্রসাদ একটু রেগেই সোফা থেকে উঠে ঘরের বাইরে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে ঘুরে গিয়ে বললেন, অবশ্য আরও দেখতে পারি, রবিবার অবধি, যখন যেটা ইচ্ছে করবে। তবে তোমার চোখকানের নাগালের বাইরে, স্টাডিরুমের টিভিটাতে দেখবো ! আর বিবি হ্যয় তো এয়সি যে দেখবো না, সেটা নিশ্চিত !
নন্দিতা বললেন, হ্যাঁ: হ্যাঁ:, ও স-অ-বগুলো বাদ দিয়ে দশবার শাওন ভাদো দেখতে থাকো, নেশা কেটে যাবে…গালফোলা, কালো, মুটকী !
যৌবনের একমাত্র ক্রাশের এইরকম বডি-শেমিং দুর্বাক্য শুনে বৌয়ের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বগলাপ্রসাদ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের রিটায়ার্ড রিজিওনাল ম্যানেজার, অতি সুদর্শন, শান্ত চরিত্রের ষাটোর্ধ বগলাপ্রসাদ, স্বামী হিসেবে প্রায় সর্বগুণসম্পন্ন বলা যায়।
চাকরিক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন।
সংসারেও সব দিকে তীক্ষ্ণ নজর, সেখানে কোন অভিযোগের জায়গা নেই।
একমাত্র মেয়ে উচ্চশিক্ষা পেয়ে ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার।
সেই বিবাহিতা কন্যা এখন সহপাঠী স্বামীর সঙ্গে বেঙ্গালুরুতে একই বহুজাতিক সংস্থায় দুজনে কাজ করছে।
অদূর ভবিষ্যতে তার সন্তান প্রসবের সময় নন্দিতা সেখানে কয়েক মাসের জন্য যাবেন এরকমটাই ঠিক আছে।
প্রৌঢ় বগলাপ্রসাদের একটাই চারিত্রিক দুর্বলতা, মানে প্রচণ্ড দুর্বলতা বলা যায়…ভানুরেখা গণেশন…সারা ভারতের বিনোদন জগত যাকে রেখা নামে একডাকে চেনে !
প্রাক-যৌবনের দিনে এক বন্ধুর সাজেশনে পাড়ার ভিডিও লাইব্রেরি থেকে খুবসুরৎ-এর ক্যাসেট এনে দেখেছিলেন !
ব্যাস ! ভিনি ভিদি ভিসি ! তিনি বগলাপ্রসাদের মনোজগতে এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন !
দুই-বিনুনী শোভিতা ফ্রক-পরা রেখাকে দেখে সেই যে তাঁর বিপুল ক্রাশ হলো, বছরের পর বছর কেটে গিয়ে সেই ক্রাশের মিহি পাউডার উড়ে উড়ে তাঁর মনের চারপাশে এখনও ধুম্রজাল সৃষ্টি করে চলেছে।
প্রথম চোটে সেই বন্ধু তো গোলবাড়ির প্রচুর স্পেশাল কষা মাটন আর রুটি সাঁটিয়েছিল।
আর তার পর থেকে সেই ভিডিও-পারলারের মালিকের সৌজন্যে রেখার প্রথম থেকে একটাও ছবি বগলাপ্রসাদের বাদ পড়েনি।
‘শাওন ভাদো’ দেখে চোখে আর মনে একটু ধাক্কা লেগেছিলো বটে, কিন্তু পড়াশোনায় তুখোড় বগলাপ্রসাদের ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়া ছিল !
সুতরাং পরের কয়েক বছরে রেখার মুখসৌন্দর্যের সেই ক্রমান্বয় বিবর্তন তাঁর খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিলো!
খবর নিয়ে জেনেছিলেন রেখা বয়সে তাঁর থেকে বছর কয়েকের বড়ো হতে পারে।
‘কিন্তু তাতে কি কিছু আসে যায় ! শচীন অঞ্জলির প্রেমের কিসসার কথাটা একবার ভাবো !’
অবশ্য নিজের নামটা নিয়ে বগলাপ্রসাদ প্রথমে কিছুটা সংশয়াচ্ছন্ন ছিলেন।
ধর্মপ্রাণা ঠাকুমার দেওয়া গ্রাম্ভারি নাম, দশমহাবিদ্যার এক বিদ্যা, দেবী বগলা হচ্ছেন শত্রুসংহারের প্রতীক !
ঠাকুমার পরম স্নেহাস্পদ বগলারও নামটা বিশেষ অপছন্দ নয় ।
গুজব শুনেছিলেন রেখা তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে বেশ আগ্রহী ও সে সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
রটনা এই যে, ‘কালাজাদু’ও নাকি তার জানা আছে ।
তাই তান্ত্রিকমতের অন্যতম এক মহাবিদ্যার নামাঙ্কিত পুরুষকে নিয়ে তার কোন মানসিক বৈকল্য থাকার কথা নয় !
আর লোকের মুখে অনবরত শুনে শুনে নিজের চেহারা সম্বন্ধে তো গভীর আত্মবিশ্বাস তো ছিলই ।
সুতরাং যৌবনের অদম্য জোশে বগলাপ্রসাদ সেকালে বন্ধুমহলে প্রচুর বাদবিবাদ আর আলোচনার মধ্যে প্রচার করে দিয়েছিলেন, প্রথম সুযোগেই তিনি বোমবে (তখনও মুম্বাই নাম পরিবর্তন হয়নি) গিয়ে রেখার বন্ধুত্ব প্রার্থনা করবেন !

কিন্তু আদতে সেসব কিছুই হয়নি ।
ভাগ্যক্রমে বগলাপ্রসাদের জীবনে যা ঘটলো, তাকে বরং বলা যেতে পারে ‘হনৌজ বোমবে দূর অস্ত’ !
উল্টে অনার্স নিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করে বগলাপ্রসাদ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে পরীক্ষা দিয়ে প্রবেশনারি অফিসারের মহার্ঘ চাকরির লিস্টের বেশ ওপরের দিকে জায়গা পেতেই বাবা মা তড়িঘড়ি তার বিয়ে দিয়ে দিলেন।
পাত্রী লোরেটো আর বেথুনে পড়া সাদারন অ্যাভিনিউয়ের নন্দিতা, সুদর্শন বগলার সঙ্গে মানানসই সুন্দরী, চলনে বলনে সপ্রতিভ, কথাবার্তায় স্মার্ট।
নন্দিতার বুদ্ধিমান বাবা বগলার মধ্যে নর্থ ক্যালকাটার গলির ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেননি, প্রেসিডেন্সী কলেজের ইকনমিক্স অনার্স আর ব্যাঙ্কের প্রবেশনারি অফিসারের র‍্যাঙ্কিং দেখেছিলেন !
যা-ই হোক, ফুলশয্যার রাতে বগলা ও নন্দিতার কথোপকথন বেশ ইন্টারেস্টিং হলো !
বগলার সপ্রতিভ বৌ-ই মুচকি হেসে প্রথম কথা শুরু করলো, বাপির কাছে তোমার নামটা শুনে আমি তো প্রথমেই না করে দেবো ভেবেছিলাম, যদি না… .
‘প্রথম বাক্যালাপেই আনকোরা স্বামীর এরকম একটা খোলাখুলি মূল্যায়ন !’
বগলা মুখের ভাবে আর স্বরে ক্ষোভ লুকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, যদি না ?
‘যদি না বাপি তখনই তোমার ছবিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিতো। ভালো উঠেছিলো কিন্তু ছবিটা !
বলে নন্দিতা মুক্তোসারির মতো দাঁত দেখিয়ে ঝরঝর করে হেসে উঠলো !
‘যাক, ইভ্যালুয়েশনটা এবার একটু ব্যালান্সড হলো !’
তবে প্রথম রাতে নতুন বৌয়ের এরকম প্রগলভতা তার ভালো না খারাপ লাগছে সেটা ঠিক বুঝতে না পেরে বগলা চুপ করেই থাকলো ।
নন্দিতা থামার পাত্র নয় !
আবার হাসতে হাসতে বললো, সে তোমার নাম যাই হোক, তুমি তো প্রভারবিয়াল দর্শনধারী ! প্রেসিডেন্সী তো কো-এডুকেশন কলেজ ! কোন সুন্দরী মেয়ে তিন তিনটে বছরে তোমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়নি এটা হতেই পারে না ! কোন ক্লাসমেট ? জুনিয়ার, সিনিয়ার ? বলো না ! আমি কিচ্ছু মনে করবো না ! তোমার… কেউ ছিল না ?
এবার বগলা ফস করে বলে বসলো, ছিল না নয়, আছে !
বগলার এই সংক্ষিপ্ত সপাট উত্তর শুনে নন্দিতা এবার একটু থতিয়ে গেলো ।
‘আছে বললো !’ নন্দিতার হাসি বন্ধ হলো ।
‘আফটার অল, লোকটা তো একেবারে সিনেমার হিরোর মতো দেখতে, সন্দেহ নেই ! এই ব্যাপারটা ডিটেলে জানাটা খুব জরুরি, আজ রাতেই !’
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে নন্দিতা এবার গলায় কিছুটা গাম্ভীর্য এনে বললো, ওহ তাই ! বাহ বেশ ! তা মেয়েটি কে? ক্লাসমেট না পাড়াতুতো প্রেম ? কোথায় থাকে ? কতদূর এগিয়েছিলে তুমি?
‘ফুলশয্যার রাতেই বেড়াল মেরে দেওয়া উচিৎ !’
এই আপ্তবাক্য হঠাৎ মনে পড়ে গেলো বগলার।
তাই ভেবেচিন্তে নববিবাহিতা স্ত্রীর এতোগুলো প্রশ্নের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শেষ প্রশ্নটার উত্তর দেওয়াটা সমীচীন মনে করলো বগলা ।
গম্ভীর গলায় বললো, ফিফটি পারসেন্ট !
‘মানে ? নন্দিতার সন্দিগ্ধ প্রশ্ন ।
‘মানে আবার কি ! আমার দিক থেকে আমি একেবারে ঠিক করে রেখে ছিলাম ! অন্যদিকে…
-ওঃ ! এই ব্যাপার ! প্রেমিকাকে তোমার মনের ভাব বলতে পারোনি ! কেন ? লজ্জায় ? একটা নির্জন পার্কে দেখা করে বলে দিতে পারতে ! সে না বলে দিলে, অপমান করলে বা চড় কষালেও কেউ জানতে পারতো না !
দগদগে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো এই কথোপকথন বগলার ভালো লাগছিল না !
খাট থেকে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা জলের গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেয়ে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, দেখা হয়নি ! সে বোম্বেতে থাকে !
‘অ্যাঁ ! তাকে দেখনি ! বোম্বে ! বোম্বেতে থাকে ! তার ছবি দেখে প্রেম না কি ! আহা রে ! তো সেই পদ্মাবতীটি কে রতন সিংজী ?
সংশয় কেটে গিয়ে নন্দিতা এখন আশ্বস্ত বোধ করছে ।
স্তাই তার কথার ভাবে স্বাভাবিক কৌতুক আর প্রগলভতা ফিরে এসেছে !
‘রেখা !
অস্বস্তিকর ভাবে শব্দটা বলেই বগলা টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়লো।

‘রেখা ! কে রেখা ? পদবী কি ? বাঙালি ?
নন্দিতার স্বরে রহস্য উন্মোচনের বাড়তি আগ্রহ !
অসহিষ্ণু গলায় বগলা বলে উঠলো, রেখা…রেখা ! খুবসুরৎ, সিলসিলা, উমরাও জানের রেখা ! বুঝতে পারছো না !
শুনে এক মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে নন্দিতা হাসবে না কাঁদবে ঠিক করতে না পেরে প্রথম এক্সপ্রেশনটাই সিলেক্ট করলো !
তবু যতই হোক, শ্বশুরবাড়ি, ফুলশয্যার রাত !
তাই মুখে হাত চাপা দিয়ে খিলখিল করে প্রবল হাসতে হাসতে নন্দিতা খাটের ওপর গড়িয়ে পড়লো !
‘রেখা ! উমরাও মেরি জান ! ফিফটি পারসেন্ট ! ও হো হো !
হাসতে হাসতে বেদম হয়ে নন্দিতার পার্লারে-বাঁধা খোঁপা খুলে জড়ানো বেলফুলের মালাটা বিছানায় ছড়িয়ে গেলো, শরীরের বিভঙ্গে তার বুকের আঁচল সরে গেলো!
বগলা সেদিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, অতো হাসির কিছু নেই ! চিঠির উত্তর পজিটিভ এলে এখনও চলে যেতে পারি। হা হা করে হেসো তখন !
গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলে টেবিলের কাছে গিয়ে গ্লাস থেকে আবার এক চুমুক জল খেলো ।
হাসি থামিয়ে এবার নন্দিতা উঠে বসলো।
নিজেকে ঠিকঠাক করলো।
হাসির দমকে তখনও সে হাঁফাচ্ছে ।
একটু দম নিয়ে, তখনো দমকে দমকে হাসি, বললো, চিঠি ! তুমি অ্যাকট্রেস রেখাকে চিঠি লিখেছিলে ? সত্যি ? মাই গড ! কটা লিখেছিলে ? কবে ? উত্তর দিয়েছিলো ?
‘এই মেয়েটা তো দেখছি বড্ড বেশি প্রশ্ন করে ! শেষ পর্যন্ত বাচাল বৌ হলো আমার !’
বগলা এমনিতে শান্তিপ্রিয় মানুষ, তার ওপর বৌয়ের সঙ্গে প্রথম রাত !
একটু ইতস্তত করে বললো, দুটো লিখেছিলাম, প্রথমটা কলেজে পড়ার সময়, বন্ধুরা বললো, লিখে তো দে !
-ওঃ ! বন্ধুরাও এ গল্প জানে ! উত্তর আসেনি নিশ্চয়ই…আর পরের চিঠিটা ?
কৌতুকপ্রিয় নন্দিতা এখন নিশ্চিন্ত আর কৌতূহলী !
‘মাস দেড়েক আগে। তোমার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর।
‘সে চিঠিরও উত্তর আসেনি তো ! আসবে না ! তা কি লিখেছিলে চিঠিতে ? ‘ওগো প্রিয়তমা, এ জীবনে তো আর তোমাকে পাওয়া হলো না ! পরের জন্মে তোমাকে নিজের করে পাবো এই আশা নিয়ে আমি এই নিষ্ফল জীবনটা কোনরকমে দুঃখে দুঃখে কাটিয়ে দেবো ! ইতি তোমারই…’এইসব ?
বলে নন্দিতা আবার খিলখিল করে হেসে উঠতে গিয়ে বগলাপ্রসাদের মুখের ভাব দেখে থমকে গেলো ।
বেশ ক্লিষ্টস্বরে বগলা বললো, পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়েছো তো, তাই রামী-চণ্ডীদাসের কাহিনী পড়ার সৌভাগ্য তোমার হয়নি । নিষ্কাম প্রেম আমার । বিয়ের বন্ধনে বাঁধা পড়তে যাচ্ছি, তাই তার আগে ওর সঙ্গে একবার দেখা করার, মুখোমুখি বসে দুটো কথা বলার এই ছোট্ট ইচ্ছের কথাটা ছিল চিঠিটায়। ঠিকানায় পালি হিল, বান্দ্রা তো লিখেছিলাম। কে জানে সে চিঠি ওর হাতে পৌঁছেছে কি না !
বগলার গলার স্বর ক্রমশ মৃদু হতে হতে থেমে গেলো ।
তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, যাক এসব তুমি বুঝবে না । এ আলোচনা আমার আর ভালো লাগছে না, প্লিজ।
বলে বগলাপ্রসাদ খোলা জানলার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
‘হায় রে ! এ তো দেখছি একেবারে সোজাসাপটা ছেলেমানুষ বর হলো আমার !’
হঠাৎ নন্দিতা বগলার জন্য মনে তীব্র আবেগ অনুভব করলো।
খাট থেকে নেমে জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে একটু ইতস্তত করে পেছন থেকে স্বামীকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বললো, সেসব এখন অতীত, এদিকে ঘুরে দ্যাখো, এই আমি নন্দিতা, আমি-ই এখন তোমার বাস্তব রতনসিংজি, বাকি সব ছবি, চলচ্চিত্র কেবল ! সব স্মৃতি !
জীবনে প্রথম নারীদেহের স্পর্শ ! তাও আবার ফুলশয্যার রাতে, বিয়ে-করা স্ত্রীর !
একটু অস্বস্তি হলেও বগলার কেমন যেন ভালো লাগছে।
নন্দিতার হালকা বাহুবন্ধনের মধ্যেই ধীরে ধীরে ঘুরে গেলো বগলাপ্রসাদ।
তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বললো, স্মৃতি ! তাই-ই তো !
বলে চোখের ইশারায় নন্দিতাকে ঘরের কোণে রাখা কাঁচের পাল্লা দেওয়া বুককেসের দিকে দেখালো।
নন্দিতা সেদিকে দেখলো একবার।
কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, কি ? ওখানে কি ?
এবার বগলা নিজের হাত দিয়ে নন্দিতার কোমরটা জড়িয়ে ধরলো ! তারপর নন্দিতার চোখে চোখ রেখে প্রায় ফিসফিস করে বললো, সিডি ! পঞ্চান্নটা ! এখন পর্যন্ত ও-র যতগুলো ছবি রিলিজ হয়েছে !
তারপর ফুলশয্যার রাতের বুদ্ধিমান বরের মতো নিজের মুখটা ধীরে ধীরে সামনের সুন্দর মুখের ওপর নামিয়ে আনলো !

রবিবারের সকাল থেকে রবি ঠাকুরের ইচ্ছাপূরণ গল্পটা কেমন টানছে বগলাকে।
কতো দিন আগে পড়েছে, আজ আবার পড়তে ইচ্ছে করছে।
বাড়িতে নন্দিতা নেই প্রায় সাতদিন হয়ে গেলো।
অ্যাডভান্সড প্রেগন্যান্সি তার।
নন্দিতার ইচ্ছেয় গত রবিবার তাকে সাদারন অ্যাভিনিউয়ের বাপের বাড়িতে রেখে এসেছে !
সাবেকি পড়ার ঘরে গিয়ে বইয়ের আলমারিটার সামনে দাঁড়ালো সে। ওখানেই আছে গল্পগুচ্ছ।
পাল্লা খুলে ভেতরের অবস্থা দেখে বগলা অপরাধবোধে আক্রান্ত হলো…ইসস কি ধুলো সব তাকগুলোয়, বইগুলোর স্পাইনে, ওপরে, সব জায়গায় মিহি ধুলোর আস্তরণ…ছি ছি, বিয়ের পর থেকে বোধহয় আমি এখানে হাত-ই দিইনি, পরিষ্কারও করা হয়নি…
বই বার করার আগে বগলা একটা ঝাড়ন টাইপের কাপড় এনে আলমারির ধুলো ঝেড়ে পরিষ্কার করলো।
তারপর দেখে দেখে গল্পগুচ্ছ বইটা টেনে বার করতে গিয়ে বইটার পেছনের দিকে গুঁজে রাখা একটা গোলাপি রঙের খাম নীচে পড়ে গেলো ।
নীচু হয়ে বগলা খামটা তুললো ।
খামের ওপরে তার নাম ঠিকানা টাইপ করা আছে।
খামের ওপরের এককোণে ইংরেজিতে ‘আর’ অক্ষরটা ইটালিক ফন্টে এমবস করা।
…কে লিখেছে আমাকে এ চিঠি ! ‘আর’ এমবস করা গোলাপি খামে ! খামটা তো খোলা হয়েছে দেখছি ! ভেতরে একটা কাগজ আছে মনে হচ্ছে…
অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে বগলা খামটা উল্টে দেখলো পোস্টঅফিসের অস্পষ্ট সিলমোহর।
চোখের কাছে তুলে এনে ভালো করে পড়তে গিয়ে খাম থেকে পুরনো হালকা সুগন্ধ নাকে ঢুকলো তার।
‘তিন বছর আগের সিলমোহর ! হিসেব মতো এসেছিলো আমার বিয়ের মাসখানেক পর ! কার চিঠি ? আমার নামের চিঠি কে খুললো ? নন্দিতা ?’
বগলাপ্রসাদ তাড়াতাড়ি খাম থেকে কাগজটা বার করে চোখের সামনে মেলে ধরলো ।
হালকা নীল কাগজের ওপরের কোণায় নামটা দেখে বগলার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এলো…ঘন নীল অক্ষরে এমবস করা আছে…রেখা, তার নীচে, বসেরা, সী স্প্রিংস, পালি হিল,…
ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বগলা, তার হাত এখন একটু কাঁপছে, ইংরেজিতে গোটা গোটা অক্ষরে হাতে লেখা চিঠিটা পড়তে থাকলো…ডিয়ার বগলাপ্রসাদ, মাই বেস্ট উইশেস ফর এ লং অ্যান্ড হ্যাপি ম্যারেড লাইফ ফর ইউ ! অ্যাট দি এন্ড অফ ইয়োর লং বাট লাভলি লেটার, ইউ এক্সপ্রেসড এ ভেরি স্মল সুইট উইশ…ইউ ওয়ান্টেড টু মিট মি, টক টু মি ফর এ হোয়াইল ! অফ কোর্স আই উইল ফুলফিল ইয়োর উইশ ! প্লিজ কাম টু দি অ্যাড্রেস প্রিন্টেড অ্যাবভ ! শো দিস লেটার টু দি গার্ডস অ্যাট দি বাংলো গেট। ওয়ান অফ দেম উইল এসকর্ট ইউ টু ফরজানা, মাই সেক্রেটারি। শি উইল ডু দি রেস্ট । টেক কেয়ার । ইয়োর সিন্সিয়ারলি, রেখা !
পড়া শেষ করে বগলাপ্রসাদ ধপ করে মাটিতে বসে পড়লো।
তার মনের মধ্যে তোলপাড় করছে…তিন বছর আগে এ চিঠি এসেছিলো ! বিয়ের কিছুদিন পরেই ! চিঠি খুলে নন্দিতা পড়েছে! আর তারপর যাতে তার হাতে না পৌঁছোয় সেজন্য নন্দিতা চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছিলো এখানে ! ছি ছি ! নন্দিতার মন এইরকম ! প্রায়ই তো আমাকে নর্থ কোলকাতার গলির মানুষ বলে খোঁটা দেয় ! এই তোমার সাউথ ক্যালকাটার অ্যাভিনিউ নন্দিতা ! কিভাবে এমন নীচ কাজ করতে পারলে তুমি ! এ জন্য তোমাকে অবশ্যই আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে ! আর আমি যাবো বোম্বে, দেরি হয়ে গেছে অনেক, তবুও আমি যাবো । যা-আ-বোই, নন্দিতা তুমি আমাকে আটকাতে পারবে না, কিছুতেই পারবে না…
চিঠিটা হাতে নিয়ে উত্তেজিত মনে বগলা যখন এইসব ভাবছে তখন ক্রিং ক্রিং করে দরজার বেলটা বেজে উঠলো, বাজতেই থাকলো।
‘নন্দিতা আবার বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এলো না কি !’
বগলা তাড়াতাড়ি উঠতে যাবে, এমন সময়ে একটা ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার।
সামনে নন্দিতা দাঁড়িয়ে, চান করে এসেছে, মাথার সামনের কাঁচাপাকা চুলের পেছনে একটা গোলাপি তোয়ালে জড়ানো।
নন্দিতা ঝঙ্কার দিয়ে বললো, কখন থেকে ফোনটা বাজছে, ধরবে তো ! কি ঘুম রে বাবা !
ফোন বেজেই যাচ্ছে !
সাইড টেবিল থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে নন্দিতা বললো, হ্যালো, হ্যাঁ, টুকাই বল। কি ? ওই যে ! তোমার বাবার বিখ্যাত ঘুম ! ও, পাঠিয়ে দিয়েছিস ! ঠিক আছে, দেখে নিচ্ছি। পরে কথা বলবো, এখন রাখি ?
ফোনটা রেখে নন্দিতা বললো, টুকাই আমার টিকিটটা হোয়াটস আপ-এ পাঠিয়ে দিয়েছে । এ মাসের আঠাশে, সকালে ফ্লাইট, এয়ার ইন্ডিয়া ।
বগলা একদৃষ্টে দেখছিলো নন্দিতার মাথার গোলাপি তোয়ালেটা আর ভাবছিলো…গোলাপি খাম নয়, আমার জন্যে এখন ওই গোলাপি তোয়ালেটাই বাস্তব !
‘ঠিক আছে। চলে যেও তোমার মেয়ের কাছে। তার আগে, বলছিলাম কি, বিশে নভেম্বর তো তোমার জন্মদিন ?
‘বাব্বা, তোমার মনে আছে ?
‘বাস্তব, অবাস্তব সব জন্মদিনই মনে থাকে ম্যাডাম !
‘জন্মদিনের বাস্তব অবাস্তব ! সে আবার কি !
‘ও কিছু না ! তোমার অনেকদিনের ইচ্ছে তো ম্যরিয়টে লাঞ্চ করার ! চলো এবারে তোমার ইচ্ছেই পূরণ করি ! মনে রেখো তাহলে, কুড়ি তারিখে বাড়িতে নো মিল, আমাদের লাঞ্চ সেদিন ম্যরিয়টে ! পাক্কা !


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, আগস্ট ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

4.8 6 ভোট
Article Rating
19 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Susobhan Adhikary
Susobhan Adhikary
10 months ago

বেশ মজার। পড়তে বেশ ভালো লাগলো। সাবলীল ভঙ্গিতে এগিয়েছে। চিত্রধর্মী।

Ratna saha
Ratna saha
10 months ago

খুব মার্জিত সুন্দর হাস‍্যরস পরিপূর্ণ গল্প । আমি নবনীতা দেবসেনের অন্ধ ভক্ত । এই গল্পটা আমার মনছুঁয়ে গেল ।

Suman Mukerji
Suman Mukerji
10 months ago

ভারী সুন্দর নতুন ধরনের মিষ্টি গল্প

Ajoy Adhikari
Ajoy Adhikari
10 months ago

Ashis Sanyal er lekhar flavour je!
Ajoy Adhikari

Tapas Chakravarty
Tapas Chakravarty
10 months ago

বেশ ভালো লাগলো। পড়ে মনটা কেমন যেন ঝরঝরে হয়ে গেল।আমিও বাস্তব অবাস্তব এর দোলাচলে ভুগতে শুরু করলাম।

Partha Chanda
Partha Chanda
10 months ago

গল্পের বর্ণনা সুন্দর। মূল চরিত্র গুলির পারিপার্শ্বিক বর্ণনা চোখে পড়ার মতো। অনেকটা যেন একটা চিত্রকল্প।
কিন্তু একটি মানুষের সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন হঠাৎ বদলে যাওয়াটা খুব বিশ্বাসযোগ্য লাগলো না।

Last edited 10 months ago by Partha Chanda
Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
10 months ago

দারুন মিষ্টি গল্প পড়লাম!. খুব ভালো লাগলো!
আরো এইরকম গল্প পড়তে চাই!

Ashis Banerjee
Ashis Banerjee
10 months ago

A delightful reading of wishful thinking vs. reality of married life

, subhasish bose
, subhasish bose
10 months ago

সুন্দর

Tanushri
Tanushri
10 months ago

গল্পটা ভাল এবং হলকা । এমনো হয়, সাফল‍্যমন্ডিত চাকরী করা একজন মানুষের মন নিজি জীবনে একটা অবাস্তবতাকে ভাল লাগার সঙ্গী করে কাটিয়ে দিচ্ছে।

Shipra Maitra
Shipra Maitra
10 months ago

বেশ ভাল লাগল।

A. L. Das
A. L. Das
10 months ago

Good story, deserves high appreciation.

Debashis Banerjee
Debashis Banerjee
10 months ago

নিটোল গল্প। ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ সমাপ্তি বেশ উপভোগ্য।

Aparna Dutta
Aparna Dutta
10 months ago

গল্প টা খুব মজার ছিল

Aparna Bhattacharya
Aparna Bhattacharya
10 months ago

ছোট গল্পের শুরু থেকে শেষ অব্দি মিষ্টি, একটা সুন্দর রেশ ধরে রাখা র জন্য লেখক কে অনেক অভিনন্দন জানাই।
আরো অনেক গল্পঃ পড়তে চাই।

Uday S Chattopadhyay
Uday S Chattopadhyay
10 months ago

সরল সহজ অনাবিল মজার গল্প। stress reliever! বেশ ভালো লাগলো লেখা টা। লেখক আশীষদাকে অনেক ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানাই এইরকম সুন্দর একটা গল্প উপহার দেওয়ার জন্য।

হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়
হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়
10 months ago

বেশ ঝরঝরে গল্প,পড়লাম। ভাল লাগল।

Dr n.Guha
Dr n.Guha
9 months ago

Valo hoeche golpota,misti premer golpo

Dr n.Guha
Dr n.Guha
9 months ago

Khub valo hoeche golpota Ashishda