(বাহাদুর)

ধাতব শব্দটা অনেকটা দূর থেকে ভেসে আসছে। অমনি কুকুরের মত জেগে উঠল কান। আমি একছুটে রাস্তায়। পরনে হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি। খালি পা, নাকি হাওয়াই চপ্পল— সেসবে ভ্রুক্ষেপ নেই। টং টং করে শব্দটা ক্রমশ কাছে আসছে। না না, ভুল বললাম। আমিই ধাতব শব্দটার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। বিশাল জামগাছটা মধ্যাহ্নের কড়কড়ে সূর্যকে এই রাস্তায় প্রবেশ করতে দেয় না। সারাবছর নো-এন্ট্রি বোর্ড ঝুলিয়ে রাখে সূর্যদেবের সামনে। সের্গেই বুবকা-র মত ই-ই-য়া পোলভোল্ট দিয়ে সূয্যিমামাকে গলির ভিতর ঢুকতে হয়। উঁচু ক্লাসে উঠে ভূগোল বইয়ে সেলভা অরণ্যের বৈশিষ্ঠ্য জানবার পর প্রথমেই মনে হয়েছিল, আরেহ্.. রাস্তার দু’ধারে বড় বড় জামগাছগুলো অমন ছিল না! গরমের ছুটিতে সত্যি সত্যিই আম-জাম-কাঁঠাল জুটত অনেক। তো, সেই সময় বড় জামগাছতলায় দাঁড়িয়ে ক্যাবলার মত হা করে ঊর্ধ্বে তাকাতাম। গাছের উপর থেকে জাম ছুড়ে দিত কেউ-কেউ। কুড়োতাম অনেক। স্যান্ডো গেঞ্জিটার পেটের কাছটা গুটিয়ে পোটলা করা, যেন আলিবাবার গুহা। ভিতরে জাম থইথই করছে। মুখ, জিভ, দাঁত, হাতের আঙুল সব বেগুনি— সাদা গেঞ্জিটাও। বন্ধুদের জামা বা গেঞ্জিতে পাঁচ আঙুলের হাত-ছাপ দিতে কী মজাই না হতো। ভোটের দেয়াল লিখন নেই, অথচ কত কত হাত ছুটে বেড়াচ্ছে এর-ওর পিঠে-পিঠে! অমন গেঞ্জি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলে একপ্রস্থ হাত পিঠেও পড়ত।
শব্দকে ধরেছি অবশেষে। সেইকালে বেতের ঝুড়ির মধ্যে হরেক কিসিমের সাপ নিয়ে সাপুড়ে আসত। সাপুড়ের বীণ আর মাথার পাগড়ি— এই দুটো জিনিস কী যে ভাললাগত! বাড়িতে মা-পিসিদের মুখে শুনতাম ‘নাগিন’ সিনেমার গল্প। দুটো মানুষ কীভাবে নাগিন হয়ে যেত, আর, একে-একে প্রতিশোধ নিত— এমন গল্প শুনে কত কত রাতে খাবারের গ্রাস মুখে পুরতাম! রাতে ভয় পেতাম, একটা করে গ্রাস কোত করে গিলতাম আর বলতাম; তারপর! তো সেই সাপুড়েদের বাঁশি শুনলে দিনের বেলাতেও গায় কাঁটা দিত। পাড়ার ছোটো মাঠের মাঝখানে ঝাঁপি খুলে সাপুড়ে যখন মাথা দুলিয়ে বীণ বাজাত, ওদের গাল প্যাডেলওয়ালা রিক্সার রবারের ভ্যাঁপু হর্ণের মত ফুলত আর তুবড়ে যেত। বৃত্তাকার ভীড়ের মধ্যে নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে, সমবেত মানুষের জঙ্গলের ভিতর থেকে মাথা বের করে সাপখেলা দেখতাম। সাপগুলো বাঁশির সামনে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মত মাথা দোলাতো। মাঝেমধ্যে সাপুড়ে হাতের বীণ দিয়ে সাপের মাথায় খোঁচা দিত, অমনি সাপ ফোঁস-ফোঁস করে উঠত। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যাবেলা হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসে গলা ফুলিয়ে “বাবুরাম সাপুড়ে” কবিতা আউড়ে যেতাম। ঘরে বিজলি আলো আছে, অনেকটা উঁচুতে ঝুলছে। প্রতি ঘরে মাত্র একটিই। হলুদ আলো। তাতে অবশ্য পড়াশোনা করা যায় না। এদিকে আবার বড়রা বলতেন; বেশিক্ষণ বাল্ব জ্বালানো যাবে না। ইলেকট্রিকের অনেক দাম।


ধাতব লাঠিটা হাতের মুঠোয়। হাতের তালুতে ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব। লাঠিটা শক্ত করে ধরে বড় রাস্তা ছেড়ে গলির মধ্যে ঢুকতে থাকি। নামেই গলি। আসলে এটিও পাকা রাস্তা। এই তো আর পঞ্চাশ পা গেলেই…। লাঠির মালিক আমার মত অত জোরে কি হাঁটতে পারে! ওর মাথার টুপিটা আমার দারুণ লাগে। জংলি ছাপ ছাপ। খবরের কাগজে নেতাদের মাথায় যে টুপিগুলো দেখি সেগুলো সাদা। এর টুপিটা রঙিন। তবে অনেকটা একইরকম। সামনেটা অতখানি চোখা নয়। টানতে টানতে টিনের গেটের দরজায় চলে এসেছি। হাট করে দরজাটা খুলতেই উঠোনের একাংশ। বাড়িতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। লাঠির মালিকের মুখে স্মিত হাসি। হাসলে ওর মুখটা আরও সুন্দর দেখায়। দুই চোখ সমানে পিটপিট করে আর হাসে। মুখে শব্দ নেই। বাড়িতে যারা আছে, তারা ততক্ষণে ঘরগুলো থেকে উঠোনের দিকে নেমে আসা লালরঙের পাকা সিঁড়িগুলোয় বসে পড়েছে। লাঠির মালিকের সাথে একে একে কথা বলছে। লাঠির মালিক অনুচ্চস্বরে জবাব দিচ্ছে। ওর টকটকে ফরসা মুখটায় কাটা গাছের গুড়ির মধ্যেকার দাগের মত অনেক দাগ। গাছের দাগগুলো গোল-গোল, আর লাঠির মালিকের কপালে দাগগুলো লম্বা, তবে, কোঁচকানো। ওর জামার গন্ধটা অন্যরকম। ফুলপ্যান্টটা গোড়ালি থেকে কিছুটা উঁচুতে ঝুলছে। আমি ওকে বাহাদুর বলি। বাড়ির সবাই বাহাদুর বলে। ও নেপালি। আজ রবিবার। প্রতি রোববার বাহাদুর আসে আমাদের বাড়িতে। ওর কোনো ঘড়ি নেই। থাকলেও, দেখবেই বা কীভাবে! অন্ধ বাহাদুর প্রতি সপ্তাহে দুপুর ১২ টায় কী করে যে রাস্তা চিনে চলে আসে; আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না!
হঠাৎ, বাজখাঁই গলায় একটা আওয়াজ; — বৌমা, বেলা অনেক হ’ল। অনেকটা হেঁটে ওকে ফিরতে হবে। বাহাদুরকে খেতে দাও…

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের আগের রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, আগস্ট ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Prativa Sarker
Prativa Sarker
10 months ago

স্মৃতির দরজা যেন হাট হয়ে খুলে গেল। ব্যক্তিগত গদ্য্র লেখকের দক্ষতা প্রশ্নাতীত।

PRASENJIT CHATTERJEE
PRASENJIT CHATTERJEE
10 months ago

Darun sundor 💖 Lekha