
মানব সভ্যতাকে বাজি রেখে পাশার দান দেয় ‘সিজার’
‘সিজার’ আসলে পাওয়ারের সঙ্গে এথিক্সের হারিয়ে যাওয়া , হারিয়ে যেতে যেতে একবিংশ শতকের বুকে ফসিল হয়ে যাওয়া মুহূর্তের এক সাবধান বাণী। অ্যানার্কি বা নৈরাজ্য জন্ম নেয়, আর তলায় তলায় ষড়যন্ত্র। তৈরি হয় একটা লুপ। এই লুপকে বলে
ক্রোনি ক্যাপিটালিজম। বাসনা কামনার আগুনে যা মানবসম্পদকে পুড়িয়ে মারবে। অন্ধকার সমাজের বিবেকহীনতা, সরকারের ক্ষমতা বলে প্রজাদের সঙ্গে নির্লজ্জ ব্যবহার, কিন্তু তারপর পতন, মৃত্যু! এইভাবেই শেষ যদি ভেবে থাকি, বা স্বপ্ন দেখি তাহলেই তো যুগের পর যুগ বোকামি করে যাবো। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, এই মানবিক এক সারল্য কীভাবে যুগান্তরে তাদের বুকেই চাবুকের রক্তাঘাত নামিয়ে আনে— নাটকের এই কেন্দ্রীয় দর্শনকে খুঁজে ফেরার চেষ্টা করেছেন। খুঁজেছেন নির্মম ভাবে; দর্শকের অবুঝ মনের উপর পাঁচ উর্ধ্ব সিসমোগ্রাফিক রেঞ্জে তৈরি করেছেন ভূকম্পন।

‘দাঙ্গা, যুদ্ধ, গণহত্যা, সন্ত্রাস— আমার আজীবনের সঙ্গী !’
খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ থেকে ২০২৫— এই যাত্রা পথটা যতটা বড়ো, ঠিক ততটাই একই রকমের এক বিবর্তনের ছবি আঁকে। একটা ভালো নাটক দেখা মানে একটা ইতিহাসকে পাঠ করা। বিশেষ করে তার লেখনী যদি উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের হয়, তাহলে সেই ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে পৃথিবীর প্রত্যেকটা সময় কথা বলে, অ-বাকদের কণ্ঠে জোগায় ভাষা, সময়ের কান্না আগুনের প্রতিলিপি হয়ে দাউ দাউ করে আমাদের সামনে জ্বলে ওঠে। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে। রাষ্ট্রের পট পরিবর্তন হচ্ছে। অশনি সংকেত দেখাচ্ছে গোটা পৃথিবীর সামনে ঔপন্যাসিক লালসার লকলকে জিভ। উইলিয়াম তো একজন অভিনেতায় ছিলেন, তাঁকে মঞ্চেই মানায় – কিন্তু তাঁর ভিতরের যে কবি তিনি তো লেখবার জন্য ছটফট করছেন। সেখানে জনগণ দেখতে পারেন বালি-ঘড়ির মুখ। কমলেশ্বর আরও ভয়াবহ একটা কাজ করলেন, তিনি স্বয়ং শেক্সপীয়ারকে টেনে নিয়ে এলেন জনতার দরবারে। এমনই একটি বিপজ্জনক চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য চমকপ্রদ অভিনয় করে স্তম্ভিত করে দেন। রিপাবলিকান রোমের চরিত্রের যে অন্তর্গঠন, প্লেগ ও মহামারির কবল থেকে জনগণকে বিপথে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধের জন্য প্ররোচনা দেওয়া, সে সব কথা কেন লেখা হলো না নাটকে— প্রশ্ন করা হচ্ছে নাটককারকে। প্রথম রাইখের জন্ম মুহূর্তেই তো লেখা হয়ে থাকবে ভবিষ্যতের থার্ড রাইখের কথা। যে রাইখ অভিশাপ হয়ে নেমে আসবে আমাদের গত শতাব্দীর বুকে। আমাদের বুকে জন্ম নেবে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিশ্বাস, হিংস্র ঈর্ষায় মানুষ খাবে মানুষের মন। কেউ কাউকে বিশ্বাস করবে না। ক্যাসিয়াস যেভাবে আত্মার মতো ঢুকে যাবে প্রতিটি সমাজের কোষে কোষে। লোকনাথ দে ক্যাসিয়াস-এর ভূমিকায় যেভাবে শীতলতা নির্মাণ করেছেন, যেন প্রতি মুহূর্তে নড়বড়ে করে দিচ্ছিলো বিশ্বাস আর ন্যায়ের এক একটি মানদন্ড।

সিজার এর ভূমিকায় শংকর দেবনাথ একটা ঝড়, তাঁর শরীরের মধ্যে বাসা বেঁধেছে নৈতিকভাবে একনায়কতন্ত্র, বহুগামিতা, দাসত্ব প্রথা বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। সমাজতন্ত্রের সিল্কের চকচকে কাপড় পরিয়ে, ক্ষমতাবলে শোষণ করে যাওয়ার ঈগল পাখি যেন মেলে ধরেছে তার ডানা। ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতির ভেতর দিয়ে সিজারের মৃত্যু। আর্টেমিডোরাস-রা যখন সমাজের এক প্রান্তিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে তখনই বুঝতে হয় পতনের পাশার ছক তৈরি হয়ে গেছে। শেক্সপীয়ার সাবধান বাণীর সূত্র রেখে যান পরবর্তী যুগের জন্য। লেখক সত্য হয়ে থাকেন, কিন্তু শাসক? বিচার করবে তো সময়! শান্ত ভাবে রূপম ভট্টাচার্য চরিত্রটি দাগ কেটে দিয়ে মঞ্চে চলে যান।
‘এই জনপ্রিয় রাজনীতি কালান্তক হবে প্রজাতন্ত্রের পক্ষে।’
‘সিজার’, রাসবিহারী শৈলুষিক-এর নতুন প্রযোজনা, আমাদের নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বাধ্য করায়। গণতন্ত্র বস্তুটা জনগণের কাছে ঠিক কী, সেটা জনগণ নিজে জানে তো? একে অপরের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসার যে সম্পর্কগুলো ছিল, তার মধ্যে দিয়েই বৃহত্তর ক্ষেত্রে একটা গণতান্ত্রিক দায়িত্ব বোধ অনুভব করতো মানুষজন— সেই ভালোবাসা এখন ফ্যাকাসে স্বার্থপরতায় পরিণত হয়েছে। সবটা না হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়েছে। নারীর অধিকার লুট করেছে রাষ্ট্র, তাকে আপন ইচ্ছেয় ব্যবহার করে ছিবড়ে করে ফেলে দিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ক্যলপুরিনার কান্না, পোর্শিয়ার হতাশা— মানব সভ্যতার অভিশাপ হয়ে থেকে গেছে আজও। নবনীতা দত্ত ও মৌলি রায় যথাক্রমে দুটি চরিত্রেই তীক্ষ্ণ আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন মঞ্চে।

কোনও গণ-প্রতিষ্ঠান যখন একটি পদক্ষেপ নেয় ও সমাজে স্থাপন করে; সেখানে বৃহত্তর জনসম্মতির জায়গা থাকে। গণতান্ত্রিক রহস্য অনুসারে ধরে নেওয়া হয় সেই পদক্ষেপ গণতন্ত্রেরই এক অংশ। যদি না হতো— তাহলে প্রতিষ্ঠান সেই পদক্ষেপ তুলে নিতে বাধ্য হতো। যদি সেখানে অ-সামাজিক বা অ-ন্যায় কিছু জনগণ দেখতে/শুনতে/বুঝতে/ভাবতে পারতো, সেখানে তারা রাজপথে নেমে একত্রিত হতো। এখন হয় না। প্রতিবাদ ও প্রতিবাদী(কে/দের) গিলে ফেলেছে (Un)Social Media।
এখন চায়ের দোকানে একটু রাতে আড্ডা দিতে গিয়ে দেখি পাড়ার হোমরা চোমরারা মদ খায় খোলা চায়ের দোকানে ঠেস দিয়ে— পিছনে ঝান্ডা ওড়ে। সবটা সবাই দেখে— কিন্তু বলতে গেলেই “আমার পয়সায় আমি যা খুশি করবো!”
‘বিপর্যস্ত সময়ে নিরপেক্ষতা একটা ঠুনকো কাঁচের ইমারত মাত্র’
আসলে গণতন্ত্রকে শিখন্ডী দাঁড় করিয়ে ‘যা খুশি’ করার একটা যুগের উপকূলে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছে জনগণ। এর নাম দেওয়া হয়েছে উদারনীতি। বিরুদ্ধে গেলেই তুমি নীতি পুলিশ!
গণতন্ত্র নিয়ে ভাবনাহীন মানুষ বর্তমানে বসে যাওয়া রথের চাকা তোলার জন্য সংগ্রামরত কর্ণের ভূমিকায়। এখন তীর অর্জুনের গাণ্ডীব থেকে ছুটে না এলেও অন্য কোনও রথী, মহারথী কিংবা পদাতিক সৈন্যের থেকে তো আসতেই পারে!
ব্রুটাস এইভাবেই ফেঁসে যাবে জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতার স্বাদের লোভে। তাঁর হাতে রক্তের গন্ধ, তাঁকে তো ক্ষমতার চাকা ঘোরাতেই হবে। কমলেশ্বর চরিত্রের বয়ানকে শেক্সপীয়ারের বেড়াজাল থেকে টেনে বার করে যাচাই করে দেখছেন— ক্ষমতা শুধু দুর্বলের উপর নয়, স্বয়ং ক্ষমতাকারীকেও কতখানি ক্রীড়নক করে দেয়। অর্ণ মুখোপাধ্যায়-এর দৃপ্ত চলন এই চরিত্রের আলো ও অহংকার। ঠিক সমানভাবে বিপরীতে সন্দেহকারী মার্ক অ্যান্টনি চরিত্রে পদ্মনাভ দাশগুপ্ত এই নাটকের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তোলেন।

এই নাটকের স্তম্ভ হলো সমসময়ে, গণতন্ত্রের আড়ালে, বিশ্বে ঘটে যাওয়া একনায়কতন্ত্রের উত্থান। তিনঘণ্টার নাটক, একটা ফ্যাসিস্ট স্টেজ ক্রাফট— একদম স্থির , বিশাল উচ্চতায় এক একটি লৌহ নির্মিত পাদদেশ। কোনও মঞ্চের অদল বদল নেই, ঠিক যেভাবে রোমকে নিরেট ভাবা হয়েছিল, কিন্তু স্থবিরের মধ্যেই তো ধরে ফাটল। রঙের মনস্তত্ত্বের উপর সেট ডিজাইন পাল্টে যায় দৃশ্যের পর দৃশ্যে।
আলোর রঙ এই নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। স্টেজ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সিজার বাহিনীর শোষণ, ক্ষমতার বলে অত্যাচার, দাসত্ব, উপেক্ষা, প্রেম, অপ্রেম আর দম্ভ; সমস্ত কিছুই এক অলীক আলোতে ভরিয়ে দিয়েছেন প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী ও প্রক্ষেপণে শুভঙ্কর দে। দেবাশিস সোম ও বিশ্বজিৎ বিশ্বাস-এর আবহ জুটি এক বীভৎস উল্লাসের বাতাবরণ তৈরি করে। জনগণের বোঝা দরকার চারপাশে সুলোলিত ও সুশোভিতের আড়ালে এমন কুৎসিত অশ্লীল একটা পরিবেশ বেঁচে আছে। কান, চোখ, মন সবটাই যদি খোলা থাকে এমন আওয়াজ শোনা যায়। বিলাপ করার চেয়ে সংশোধন করা অনেক বেশি আনন্দের! থিয়েটার অন্তত সেই চেষ্টাটুকু করে। একটা স্থবির জাতির উদ্দেশ্যে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়-এর ‘সিজার’ আসলে এক সাংঘাতিক (নাট্য)শক থেরাপি।

