
সহযাত্রী
কে হয়?
সুমন মুখ তুলে দেখল একজন বৃদ্ধ খাটে শোয়ানো দিদার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। পরনে নতুন ধুতি, গায়ে নতুন চাদর, কপালে চন্দনের টিপ। কখন যে এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করেনি।
দিদা, দিদিমা
তার মানে তুমি রানির ছেলে?
হ্যাঁ আপনি আমার মাকে চেনেন?
বৃদ্ধ হেসে বললেন -তোমার মায়ের মামার বাড়িতে একসময় নিয়ম করে যেতাম। তখন অবশ্য তোমার মা, মামা কেউই জন্মায়নি।
সুমনের দিদিমা মারা গিয়েছেন। শ্মশানে দিদার খাটের পাশে ওকে রেখে বাকি সকলে অফিস ঘরে গেছেন। একটু পরে দিদার নিথর শরীরটা জ্বলন্ত চুল্লির ভেতরে ঢোকানো হবে।
আপনি কি দিদার বাড়ির কাছাকাছি থাকেন? সুমন বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল।
থাকতাম। তোমার দিদার বাপের বাড়ি যেখানে, একই পাড়াতে। বিয়ের আগে তোমার দিদাকে গান শেখাতাম, সেই সূত্রেই ঐ বাড়িতে যাওয়া আসা ছিল। সেও আসত আমাদের বাড়িতে।
ও আচ্ছা। মামা এক্ষুনি আসবে, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।
না না। বৃদ্ধ আপত্তি করলেন। সে এখন মাতৃশোকে কাতর, তাকে আমার কথা বলার প্রয়োজন নেই। কাজ কর্ম মিটলে তখন না হয় জানিও।
আচ্ছা এখন নয় জানাবো না, কিন্তু আপনার পরিচয় কী বলব?
আমার নাম অমর গোপাল মল্লিক। তোমার মা, মামা আমাকে অমু মামা বলে ডাকতো।
“সুমন” ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকালো, মামাতো দাদা রমিত পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তুই অনেক্ষণ ঠাকুমার খাট ছুঁয়ে বসে আছিস, যা একটু ঘুরে আয় আমি এখানে আছি।
ঠিক আছে তুমি বোস। আচ্ছা দাদু আমি একটু….
সুমন মুখ ফিরিয়ে অমর বাবুকে বলতে গিয়ে আর তাঁকে দেখতে পেল না। রমিত জিজ্ঞেস করল -দাদু আবার কে রে?
একজন বুড়ো ভদ্রলোক আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন
বুড়ো লোক? কই দেখতে পাইনি তো!
এক্ষুনি তো ছিলেন, এর মধ্যে চলে গেলেন!
একটা সিগারেট ধরাবে বলে সুমন শ্মশান চত্বর ছেড়ে একটু দূরে চলে এল। কাছাকাছি থাকলে বড়দের সামনে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।
পান সিগারেটের দোকানের সামনে হঠাৎ স্কুলের বন্ধু আবিরের সঙ্গে দেখা। আবির ডাকল সুমনকে
কি রে কী খবর? এখানে কেন?
দিদা। তোর?
ছোটদাদু, বাবার সম্পর্কে কাকা হতেন।
কাকু এসেছেন?
হ্যাঁ, বাবাকেই তো সব কাজ করতে হবে, বাবা না আসলে সমস্যা ছিল
কেন ওনার পরিবারের কেউ নেই ?
অকৃতদার। শুনেছি অল্প বয়সে পাড়ার একটি মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তারা উঁচু জাত হওয়ায় সে সম্পর্ক ভেঙে যায়। তাই ছোটদাদু বাকি জীবন একাই কাটালেন। শেষ কয়েকটা বছর বাবা আমাদের এখানে এনে রেখেছিলেন। তারপর তোর খবর বল।
দুজনে গল্প করতে করতে শ্মশান চত্বরের দিকে যেতে লাগলো। উল্টো দিক থেকে রমিত এগিয়ে এসে সুমনের হাতে একটা কাগজ দিয়ে বলল -একটু পরে অফিস ঘর থেকে ক্রিমেশন সার্টিফিকেটটা তুলে নিস, দিদার ভাল নাম বলবি কিন্তু, সুপ্রভা সান্যাল। আমরা আছি, তোকে ওধারে যেতে হবে না।
আবির সুমনকে বলল আমিও চুল্লির সামনে যেতে পারিনা, যে মানুষটাকে দু দিন আগেও দেখলাম তাকে ঠেলে আগুনের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া দেখতে ভীষণ অস্বস্তি হয়। চল একবার অফিসে খোঁজ করি, এতক্ষণে বোধহয় ছোটদাদুর কাগজটা হয়ে গেছে।
ওরা দুজনে শ্মশানের অফিস ঘরে ঢুকলো। কাউন্টারে বসা ভদ্রলোককে রশিদটা বাড়িয়ে দিয়ে আবির জিজ্ঞাসা করল
আচ্ছা এই সার্টিফিকেটটা কি রেডি হয়েছে?
ভদ্রলোক বললেন -ওটা হাতে রাখুন যিনি মারা গেছেন তাঁর নামটা বলুন আমি দেখে বলছি
আবির বলল -অমর গোপাল মল্লিক


বাহ । দারুণ লাগল।