আকাশবাণীতে যখন যোগ দিয়ে ছিলাম তখন ক্লাস টেন ৷ ১৯৭১-৭২ উত্তাল কলকাতা ৷ সে সময় আমাদের শহরেও সেই আঁচ লেগেছিল ৷ একদিন স্কুলে গিয়ে দেখলাম আমাদের টেন এ সেকসনের সাদা দেওয়ালে কালো আলকাতরা দিয়ে লেখা হয়েছে ” নকশাল বাড়ি লাল সেলাম ” , ” মাও সে তুং লাল সেলাম ” আমরা কেউ বুঝতেই পারছি না কে লিখেছে ৷ আমাদের শ্রেণী শিক্ষক মৃগাঙ্কবাবু এসে দেখলেন ৷ তারপর সোজা চলে গেলেন হেডস্যার সুধীরবাবুর কাছে ৷ আগেই বলেছি সুধীরবাবুর ব্যক্তিত্বই ছিল আলাদা প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা ধুতি পাঞ্জাবী পরা মানুষটি এসে দেখলেন ৷ তারপর কাউকে কিছুই না বলে মৃগাঙ্কবাবুকে বললেন – এদের লাস্ট পিরিয়ড যাঁর আছে তাঁকে বলবেন ওটা আমি নেবো ৷ তারপর পেট্রিককে বললেন – তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে ৷
হেড স্যার চলে গেলে মৃগাঙ্কবাবু নাম ডাকলেন ৷ ইংরেজী গ্রামার পড়ালেন , ঘন্টা পড়ার তিন-চার মিনিট আগে বললেন – এসব যে করেছিস সে স্বীকার করে নিস বাবা ৷ নইলে কপালে খুব দুঃখ আছে ৷ চলে গেলেন ৷
পেট্রিক আমার বিশেষ বন্ধু ছিল ৷ পেট্রিক চার্লস ব্যানার্জী ৷ W.C.Banarjee অর্থাৎ উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জীর পোতা ৷ আমাদের স্কুলে নাইনে ভর্তি হয়েছিল ৷ তার আগে দার্জিলিং এ পড়ত ৷ পড়া শোনায় খুব ভালো ৷ সব স্যারই তাকে খুব ভালো বাসতেন ৷ ও একবার সেই আমেরিকা থেকে ” I SAW THE MOONROCK ” স্টিকার আর ব্যাজ এনে আমায় উপহার দিয়েছিল ৷ ১৯৬৯ এর ২০ শে জুলাই নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রেখে ছিলেন ৷ তিনি পেট্রিকের জ্যাঠামশাই যিনি আমেরিকাতেই অধ্যাপক ছিলেন এবং ওহাইও তে থাকতেন তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন ৷ পেট্রিকের পরিবার আদ্যপান্ত বাঙালি ছিলেন ৷ পেট্রিক আমেরিকা থেকে বহু ডাকটিকিট কয়েন আর ও স্টিকার ব্যাজ নিয়ে এসে আমায় উপহার দিয়েছে ৷ ওর থেকেই শুনতাম “নকশাল বাড়ি “র কথা , চারু মজুমদারের কথা ৷ সেই বয়সে শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিত ৷ ভিতরে একটা ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া ৷
মনে পড়ে যেত ছয়ের দশকে সেই ছোটবেলায় দেখা কার্ফিউ , বটতলার মোড়ে মিলিটারির গুলিতে ছাত্র মৃত্যু , গুলিতে আহত দু’তিনজনকে রিক্সায় তুলে নিয়ে যেতে যেতে তাদের সঙ্গীরা চিৎকার করছে – আপনার একটু সহযোগিতা করুন ৷ কিন্তু কেউই বাইরে আসছে না ভয়ে ৷ মৃত্যু ভয় মানুষকে চুপ করিয়ে রেখেছিল সেদিন ৷ পরে শুনেছিলাম সেই সব ছেলেরা শিক্ষায় রত্ন ছিল ৷ দেশের অহঙ্কার হতে পারত তারা ৷ আমার শিশু মনে সেদিন ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে দৃশ্য দেখে ৷ ভয় রাগ ঘৃণা সব মিলিয়ে একটা ভয়ঙ্কর ক্ষত ৷
পরে টেন ইলেভেনেও সেই ক্ষতের ব্যথা ছিল ৷
যাই হোক সেদিন শেষ পিরিয়ডে হেডস্যার সুধীরবাবু এলেন ৷ সঙ্গে দারোয়ান রাম গোয়ালা ৷ সঙ্গে অনেক নারকেল দড়ি ৷ আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না ৷
স্যার এসেই বললেন আমি জানি এই কাজ কে কে করেছে ৷ কারন সব দিকেই আমার নজর থাকে ৷ আমি তোমাদের কিছু প্রশ্ন করব , যদি আমায় সন্তুষ্ট করার মতো উত্তর দিতে পারো তাহলে দেওয়ালটা রাম গোয়ালা পরিস্কার করবে , আর তা যদি না পারো তাহলে তোমরা সবাই মিলে পরিস্কার করবে ৷
বলে আগে দু’তিনজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন – নকশাল বাড়ি কোথায় ?
নকশাল বাড়ির পথ বলতে কি বলতে চাওয়া হয়েছে ?
মাও সে তুং কে ? তার নীতি কি ?
কেউই উত্তর দিতে পারেনি ৷ এরপর পেট্রিক আর দু’জনের পালা , তাদেরকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে দিলেন ৷ শুধুমাত্র পেট্রিক ছাড়া আর কেউ স্যারের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নি ৷ স্যার পেট্রিককে বললেন ওহে সংগ্রামী যুবক তোমার ফলোয়ারদে তুমি যেমন শিক্ষা দিতে পারো নি তেমনি তুমিও নিজে না জেনে ভ্রান্ত পথে চলেছো ৷ ফলে তোমরা চারজন মিলে এই দেয়াল এই নারকেল দড়ি দিয়ে ঘষে পরিস্কার করবে ৷ বাকিরা সবাই উপস্থিত থাকবে ৷ আমিও থাকবো ৷
প্রত্যেকের নাকে রুমাল বাঁধা হল ৷ প্রবল উৎসাহে তিনজন দেয়াল ঘষছে ৷ সে এক অসাধারণ দৃশ্য ৷ আমি বাবার সঙ্গে ফিরতাম প্রতিদিন , সেদিন আমায় একাই ফিরতে হল ৷
কিন্তু আমার কাছে একটা ধাঁধা রয়েই গিয়েছিল , সেটা হল হেডস্যার কিভাবে জানলেন কারা প্রকৃত দোষী !! পরে জেনেছিলাম সব ক্লাসেই স্যারের কিছু স্পাই ছিল ৷ তারাই সব খবরাখবর স্যারকে দিয়ে আসতো ৷ পরবর্তীকালে আমার শিক্ষকজীবনে আমিও ওই পদ্ধতিতে অনেক উপকার পেয়েছিলাম ৷
সেদিন সব শেষ হল ৬ টায় ৷ স্যার সাবান কিনে আনিয়ে রেখেছিলেন ৷ হাতমুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে সবাই একটা করে কেক আর জল খেয়ে ছটার সময় বাড়ি ফিরলাম ৷
১৯৭৪ এ উচ্চমাধ্যমিক পাস করে যখন কলেজে ভর্তি হতে যাবো প্রেসিডেন্সি কলেজে আমি আর পেট্রিক বাংলায় অনার্স পেলাম কিন্তু বাবা কিছুতেই ভর্তি হতে দিলেন না ৷ আমায় ভর্তি হতে হল শ্রীরামপুর কলেজে আমার অতি অপছন্দের বিষয় বটানি নিয়ে ৷
তবে পেট্রিকের সঙ্গে আমার যোগাযোগটি মোটেও নষ্ট হয় নি ৷ সে আমার বাড়ি প্রায়ই আসতো ৷ একদিন বাবা মাকে বললেন – শ্রীমানকে বলবে এই ছেলেটির সঙ্গে যেন একদম না মেশে ৷ বিপদ অনিবার্য ৷
মা আমাকে সে কথা বলতেই আমি উড়িয়ে দিয়ে বললাম – ধুর পেট্রিক আমার এত ভালো বন্ধু আমি তাকে ছাড়তেই পারবো না ‘
মা আর কিছু বললেন না ৷ ইতিমধ্যে আমার হায়ার সেকেন্ডারি টেস্ট পরীক্ষার দিন এসে গেল ৷ হঠাৎ বেনারসের বাড়িতে একটা গন্ডোগোলের জন্য মা বাবা দুই বোনকে নিয়ে সেখানে চলে গেলে ৷ শ্রীরামপুরের বাড়িতে আমি একা সব কাজ করে , পড়াশোনা আর রান্না করে খেয়ে পরীক্ষা দিতাম ৷ যদিও পাড়ার দুই বৌদি বিশ্বনাথ দাসের বৌ জোছনা বৌদি আর জিতেন দাসের বৌ রেখা বৌদি আমায় মাতৃস্নেহে প্রতিদিন মাছ বা তরকারি রান্না করে দিয়ে যেতেন ৷ আমি ডাল ভাতটা রান্না করে নিতাম আর রাতে ওঁরা রুটি দিতে চাইলেও আমার ইচ্ছে হত না ৷ আমি নিজেই রুটি করতাম পড়াশোনার ফাঁকেই ৷ সে সময় মাঝে মাঝে অফ ডে তে পেট্রিক আসতো সকালের দিকে ৷ রাতে আমাদের পাশের পাড়ার নরেন , আমরা তাকে কুলি বলে ডাকতাম ও আসতো আমার সঙ্গে থেকে পড়তো ৷ রাত দশটা থেকে ও ঘুমিয়ে নিত আর আমি পড়তাম ৷ আমি রাত সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত পড়ে শুতে যাবার আগে ওকে ডেকে দিয়ে শুয়ে পড়তাম ও ভোর সাড়ে চারটে পর্যন্ত পড়ে আমায় ডেকে দিয়ে বাড়ি চলে যেত ৷


এই ভাবে আমি টেস্ট পরীক্ষায় উৎরে গেলাম ৷ উচ্চ মাধ্যমিকটাও প্রথম শ্রেণীতেই উত্তীর্ণ হলাম ৷
প্রেসিডেন্সি কলেজে বাংলায় অনার্স পেলেও বাবার ভয় হল আমি গোল্লায় যাবো ৷ আসলে বাবাকে কেউ কেউ সে কথাই বোঝালেন ৷ ফলে আমার শহরের শ্রীরামপুর কলেজে ভর্তি হলাম বায়োলজি সায়েন্স নিয়ে ৷ বোটানি জুলজি আর ফিজিও লজি ৷ প্রথম দিন এসেই বোটানির অচিন্তবাবু এ.আর.সি এসে বলেছিলেন বোটানি নিয়ে ফুটানি করবে না ৷
সাবজেক্ট পছন্দের ছিল না বটে তবে কলেজ জীবনটা ছিল ভারি সুন্দর ৷ ডিপার্টমেন্টে ছেলেদের থেকে মেয়েদের সংখ্যা বেশিই ছিল ৷
শুরু হল কলেজ জীবন ৷ বোটানির এ.আর.সি , এস. এস মানে সন্ধ্যা সুর তৎকালের মন্ত্রী প্রশান্ত সুরের স্ত্রী , সুবীরবাবু , জুলজির নিতীশবাবু , শৈলেশবাবু , ফিজিওলজির রেবাদি আর সন্তোস বাবু আরও কয়েকজন ছিলেন , তাঁদের নিয়ে শুরু হল নতুন জীবন ৷
এই সময়েই একদিন পেট্রিক বললে – চল তোকে একটা জায়গায় একজনের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যাবো ৷ একটা রবিবার দুপুরে মায়ের অনুমতি নিয়ে ওর সঙ্গে চললাম কলকাতায় ৷ সে রাস্তা ঘাট স্থান আজ আর মনে নেই ৷ বাসে করে বড়বাজারে নেবে ছিলাম এটা মনে আছে ৷ তারপর গলির গলি তস্য গলি অতিক্রম করে ৷ দুদিকে অতি পুতিগন্ধময় পচা নর্দমা যুক্ত পথে এসে এক জায়গায় থামতে হল , কৃষ্ণকায়া এক বিশাল চেহারার মহিলা পথ আটকালেন ৷ পেট্রিক তাঁকে খুব আস্তে কিছু বলতেই তিনি চলে গেলেন এবং ফিরে এসে আমাদের যেতে বললেন ৷ আমরা এগিয়ে গিয়ে আরও দু’মিনিট হেঁটে একটা টিনের চালের জীর্ণ বাড়িতে এসে পৌঁছালাম ৷ ঘরে ঢুকে আধো অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিয়ে
দেখলাম ঘরে একটা চৌকি তার ওপর মাদুর পাতা সামনে একটা অতি বৃদ্ধ টেবিলে একটা হ্যাজাক ,একটা কুপি দুটো মোমবাতি ৷ কাগজ কলম ৷ চৌকির ওপর খালি গায়ে লুঙ্গি পরে বসে আছেন একজন চামড়া ঢাকা কঙ্কাল মাথায় সজারুর মতো সাদা চুল ৷ আমি তাঁর চোখের দিকে তাকাতেই হঠাৎ মনে হল ৷ ” পথের দাবী “র অপূর্ব এরকমই একজোরা চোখ দেখে সব্যসাচী মল্লিককে চিন্তে পেরেছিল ৷ সে চোখ বুকের ভিতরটা পড়ে ফেলতে পারে ৷ ইনিই চারু মজুমদার ৷ মোস্ট ওয়ান্টেড ম্যান ৷ তিনি চশমা পড়লেন ৷ গেঞ্জি গায়ে দিলেন ৷ শুরু হল কথা …

ক্রমশঃ


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অক্টোবর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
9 months ago

দারুন ইন্টারেস্টিং, চারু বাবুর সঙ্গে কি কথা হলো
জানতে উদগ্রীব হয়ে রইলাম।