মাহেশ হাই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়তে পড়তে পরিচয় হয়েছিল অনাদিদাদুর সঙ্গে ৷ আমি সেই ছোট্টোবেলা মানে ক্লাস সিক্স থেকেই ভোর বেলা আখড়াবাটির গলিতে লালার খাটালে দুধ আনতে যেতাম ৷ লালার বউ ছিল লালাইন ৷ আর তার মেয়ের নাম বেচি ৷ লালার ছটা গরু ছিল আর দুটো মোষ ৷ আমি শ্রীরামপুরে থাকলে আমি যেতাম তা নাহলে বাবা ৷ ভোর মানে সাড়ে চারটের সময় ৷ বাবা উঠতেন রাত তিনটের সময় শীত গ্রীষ্ম বর্ষা একই সময়ে গায়ে তেল মেখে স্নান করে চন্ডীপাঠ করতে যাবার আগে সোয়া চারটের সময় আমার গায়ে মুখে জলের ছিটে দিয়ে জাগিয়ে , শীতকালে নিজে গরম জামা টুপি পা মোজা হাত মোজা পরিয়ে হাতে দুটো কৌটো ধরিয়ে দিতেন ৷ একটায় আমাদের জন্যে চার সের গরুর দুধ আর অন্যটায় বাবার জন্যে মোষের দুধ ৷ আজও মনে আছে গরুর দুধ ছিল আড়াই টাকা সের আর মোষের দুধ তিনটাকা সের ৷ শীত গ্রীষ্ম বর্ষা একই সময় , ভোর সাড়ে চারটে ৷ লাহাদাদু আসতেন ৷ অবসর প্রাপ্ত রেল কর্মী ৷ বয়েস ৭০ ৷ শীতকালে একটা লং কোর্ট , মাথায় হ্যাট ৷ হাতে লাঠি ৷ যেন লন্ডন থেকে প্রতিদিন শ্রীরামপুরে আসতেন দুধ নিতে ৷ গরমেও ৭২ বছর বয়সেও বেশ স্মার্ট পোষাক থাকতো ৷ বর্ষায় একটা বিদেশি রেনকোট ৷ ঠিক ভোর ৪.৩০ এ এসে ডাকতেন ৷ আমিও রেডি থাকতাম ৷ আমার হাত ধরে যাত্রা শুরু ৷ শীতকালে লালা অনেক ঘুঁটে একসঙ্গে রেখে আগুন জ্বালাতো ৷ খাটিয়ায় বসে সেই উত্তাপ নিতে নিতে আমার চোখে নেমে আসতো ঘুম ৷ দুধ দোয়ানোর আগে লাহা দাদু নিজে বালতির ভিতরটা দেখতেন ৷ তারপর সাড়ে পাঁচটায় দুধ নিয়ে বাড়ি ফেরা ৷
অনাদিদাদু এখানে এলেন দুধ নিতে ৷ ভারি মজার মানুষ ৷ একমুখ দাড়ি ৷ এক মাথা জটা ৷ একটা ধুতি লুঙ্গির মত জড়িয়ে গায়ে একটা ফতুয়া ৷ শীতকালে তার ওপর একটা মোটা চাদর ৷
সব কথা বলতেন মিলিয়ে মিলিয়ে –
এই যে খোকা ভীষণ বোকা
দুধ আনতে এসে
ঘুমিয়ে কেন কাটাস সময় দ্যাখনা ভালোবেসে …
এইরকম আরকি ৷
লাহাদাদু অনাদিদাদুকে খুব পছন্দ করতেন ৷ লাহাদাদু সাধারণ ভাবে কথা বললেও তাঁর চেয়ে সামান্য ছোট অনাদিদাদু পদ্য করেই কথা বলতেন ৷
অনাদিদাদু বল্লভপুর স্কুলে পড়েছিলেন ৷ আমি ক্লাস ফোর পর্যন্ত ওই স্কলের ছাত্র ছিলাম শুনে বলতেন – আমরা দুজন কেলাস মেট
ছন্দকথায় ভরাই পেট ৷
পরে একদিন অনাদিদাদু বলতেই উনি বললেন – দাদু নয় দাদু নয় আমায় বলবি দাদা / তোর কেলাসের বন্ধু আমি বুঝিস না তুই হাঁদা ৷
সেই থেকে অনাদিদাদু অনাদিদা হয়ে গেলেন ৷ পরবর্তীকালে তিনি শ্রীরামপুরের কিছু কবির কবিতা নিয়ে একটা সংকলন করে ছিলেন ৷ তাতে আমার একটা কবিতাও ছেপে পত্রিকা দিয়ে বলেছিলেন – ভাবিস না রে ভাবিস না রে বন্ধুকৃত্য করলাম / তুই কবিতা লিখিস ভালোই , মন দিয়ে তা পড়লাম ৷
এই সময় আর একজন আসতেন সেখানে দুধ নিতে , মজুমদার জেঠু ৷ খুব ইংরেজিতে কথা বলতেন ৷ মাঝে মাঝে নানা প্রশ্নও করতেন ইংরেজিতে ৷ আমি একটু এড়িয়ে চলতাম পরে শুনেছি উনি আমাদের কবি গৌতম মজুমদারের বাবা ছিলেন ৷ গৌতমদাকে যখন বলেছিলাম গৌতম হৈহৈ করে হেসে বলেছিলেন তুই আমার বাবার বন্ধু ছিলি !! তোকে তো কাকা বলা উচিত রে ৷


আজ বুঝতে পারি ওই তিন বৃদ্ধ মানুষ আমার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের ওম ভাগ করতেন ৷
পরবর্তীকালে একটা ছড়ায় লিখেছিলাম – আসলে অতীতকথা বড়রাই ভুলেছে /শৈশব বাক্সটা কে কে কবে খুলেছে ? / কেউ যদি খোলে সেটা দেখা যাবে পষ্ট / এককোণে রাখা আছে ছোট ছোট কষ্ট ৷”
এরপর নাইন ৷ তখন আমাদের এখানেই আরর্স সায়েন্স ভাগ হয়ে যেত ৷ নিত্যবাবুর উপদেশকে গ্রাহ্য না করেই বাবা আমায় সায়েন্সগ্রুপেই দিলেন ৷ ফিজিক্স কেমিস্ট্রী বায়ওলজি , বাংলা ইংরাজী তো ছিলই ৷ আমার অবস্থা জল ছাড়া মাছের মতোই ৷ নাইনে পরিমল , স্বপন , শ্যামলরা অঙ্কে ১০০ বিজ্ঞানের সব বিভাগেই ৯৭% ৷ আমি অঙ্কে ৬৯ অন্যান্য বিষয়ে ৭১ % ৷ বাংলায় ৮০% ইংরাজীতে ৬৫ % ৷
এই সময় একটি ঘটনা ঘটেছিল ৷ আমি তখন সখের নাটক করি ৷ আমাদের পাড়ার শুভেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের নাটকের নির্দেশক ছিল ৷ শৈশব থেকেই শুভেন্দুদা আমায় কবিতা বলাতো মুখে মুখে ৷ ” ভূতের মতোন চেহারা যেমন …” আমার মা আর দিদিভাই মানে দিদিমাও আমায় কবিতার ভূমি তৈরি করেছিলেন বাড়িতেই কবিতা শিখিয়ে ৷ শুভেন্দুদা পরবর্তী কালে আমায় অনেক কবিতা আবৃত্তি শিখিয়ে ছিল ৷ শুভেন্দুদা তখন আবৃত্তির মধ্য গগনে ৷ অভয় দাশের ছাত্র শুভেন্দুদা আবৃত্তি আর নাটকে তখন বাংলার প্রতিযোগিতাগুলোয় দাপিয়ে বেরাচ্ছে ৷ পাশাপাশি খেলাধুলোতেও চাম্পিয়ন ৷ সেই শুভেন্দুদা এখনও আবৃত্তি শেখায় তার নিজের তৈরি” শব্দনীড় ” নামে একটি সংস্থায় ৷ নাটকও করে ৷ আর একজনের কথা বলতেই হবে জুলু মুখার্জী ৷ আমরা ডাকতাম জলুদা ৷ জলুদাই প্রথম আমায় কলকাতায় আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নিয়ে গিয়েছিল ভবাণীপুর পাঠাগারে ৷ সেখানে আমি ফাইনালে সেবার ৩য় হয়েছিলাম ৷
যাই হোক শুভেন্দুদার প্রশিক্ষণেই আমার সখের অভিনয় শুরু ৷ অনেক কিছু শিখেছি ৷ আমাদের ক্লাব ছিল কিশোর সংঘ ৷ সদস্য সংখ্যা খুব বেশি নয় ৷ বুল্টু ,স্যান্টা , বাবু , বুবু , ফুচে , বাবলু , কাবলু , থংগ , অমর আর আমি ৷ এরাই আমাদের অজিতেশ শম্ভু মিত্র সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ প্রতিবছর পাড়ার লেবুতলার মাঠে আমাদের অনুষ্ঠানে নাটক হত ৷ একবার রবীন্দ্রভবনে আমি কবি সুকান্তের ভূমিকায় অভিনয় করছি ৷ শেষ দৃশ্যে আমার মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসছে দেখে দর্শক আসন থেকে মা চিৎকার করে মঞ্চে ছুটে আসছিল ৷ সবাই বুঝিয়ে ঠান্ডা করার পর মা বলেছিল এরকম নাটক আর করবি না ৷ তবে ওই নাটক দেখে একজন বিখ্যাত চিত্রনির্দেশক আমায় তাঁর সিনেমায় অর্ডিশনের জন্যে ডাকলে আমি বাড়ির আপত্তি সত্বেও অর্ডিশন দিতে যাই ৷ নির্বাচিতও হই ৷ যেহেতু তখনও ১৮ হয় নি তাই বাবা অনুমতি পত্র না দেওয়ায় তাঁরা আমায় সুযোগ দেয়নি ৷ জীবনে যেই প্রথম বাবা আমায় রূপবাণী সিনেমায়
” বিদ্যাসাগর ” সিনেমা দেখিয়ে , পুঁটিরাম এ মিষ্টি খাইয়ে বাড়ি এনে বলেছিল – আমাদের বংশের ছেলে সিনেমা করবে না ৷
আমরা পাড়ায় যে নাটক করতাম মঞ্চ আর মেকাপ এ থাকতো
” বিশ্বাস ডেকরেটর্স ” এর খোকাদা ৷ তার অবস্থা ছিল লিটলম্যাগাজিন পত্রিকার প্রেসের মতোই ৷ অর্দ্ধেকের কিছুটা টাকা দিয়ে পরে দেবো বলে হাওয়া ৷ পরের বছর আবার খোকাদার কাছে গিয়ে অনুরোধ ৷ খোকাদাও মুক্ত হস্ত ৷ মেকাপম্যান , মিউজিক ম্যান , লাইটম্যান মান্নাদা সবাই আমাদের পাশে থাকতো ৷ সে এক অসাধারণ দিন ৷ তাদের সেই আন্তরিকতা সহমর্মিতা এসময় বড় দুর্লভ ৷ শুভেন্দু সে সময় শ্রীরামপুরের বিখ্যাত নাট্যদল সাহানায় অভিনয় করে সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে ৷ সেদিনে শুভেন্দুদা আর খোকাদা আজও সক্রিয় ৷
১৯৭২ সালে আমি আকাশবাণীর যুববাণীর ক্যাজুয়াল শিল্পী হিসেবে যোগ দিলাম ৷ আমাদের পেক্স অর্থাৎ প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ প্রদীপ মিত্র আমাকে শেখালেন কিভাবে মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে হয় ৷ পরের বছর অর্ডিশন দিলাম কিন্তু র আর ড় এর উচ্চারণের জন্যে পাশ করতে পারলাম না ৷ঠিক তিনমাস পরে আবার অর্ডিশন হল ৷ অমিয়দা নিয়ে ছিলেন ৷ মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা আর বিষ্ণু দে র কবিতা আর বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের নির্বাচিত অংশ পড়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ হলাম ৷ সে এক নতুন অভিজ্ঞতা ৷



সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]