
সিঁদুরের দায়

বসন্তের এক সকালে মেয়েটার সিঁথিতে সিঁদুরের দাগ দেখে আঁতকে উঠল সবাই। মুহূর্তে ফিসফাস কথাটি গসিপে গসিপে আমার কানে গরম সিসে ঢেলে দিল।
অকুস্থলে পৌঁছে দেখি ছাত্রছাত্রীদের জটলা। এ পাশে গসিপানলে ঘি পড়ছে, ওপাশে চলছে শিক্ষকশিক্ষিকাদের ডিসকোর্সঃ সিঁদুর তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ ?
ঘিরে থাকা ছাত্রীরা হেসে ঢলে পড়ল। ছাত্ররা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছে। কানাকানি হাহা হিহি। যাকে নিয়ে কাণ্ড, তার কোন কান্ডজ্ঞান নেই ! আমি সিঁদুরে মেঘ দেখলাম। কালবিলম্ব না করে তদন্তে নামা গেল। কণিকা ম্যাডাম, সহেলি ম্যাডাম, অনুরূপা ম্যাডামরা ওকে ডেকে নিলেন।
কে পরালো সিঁদুর? জোর করে ? স্কুলের ভিতরে? বাইরে? আর কী করেছে? বল, বল না!b
সে মেয়ে কিন্তু মুখে রা কাড়ে না।
তদন্তকারী শিক্ষিকারা ধরে নিয়ে এলেন আমার কাছে। লায়লা ধরা পড়েছে, মজনুকে ডিটেকশনের দায় প্রধান শিক্ষকের।
আমি চেয়ারে নড়েচড়ে বসলাম। বিসমিল্লা সানাই শুনিয়ে দিয়েছে! মহল্লায় যে ঢি ঢি পড়ে যাবে। পড়াশুনা, না হল্লা বোল? কোন ক্লাস রে তোর?
করিডরের শুনশান শূন্যতা কাঁপল। মেয়ে কাঁপল না।
ক্লাস সিক্স, স্যার।
আমি হতচকিত। এই লিকলিকে বুভুক্ষু ধেড়ে কন্যা ক্লাস সিক্স! আমি হাবুডুবু। পায়ের তলায় মাটি পাচ্ছি না; ওকে দেখছি স্থির জলে, ছেঁড়া ফুলের পাপড়ির মত, ভাসছে।
আমার উত্তেজিত অবস্থা দেখে রমেন আমাকে তড়িঘড়ি গ্লাসে জল এনে দিল। রমেন বুঝল কী করে জলটা আমার এখন দরকার? দরজার বাইরে ব্যাটা নিশ্চই আঁড়ি পেতে সিঁদুর রহস্যের মৌতাত নিচ্ছিল!
রহস্য মোচনের তাগিদটা অতঃপর এল মেয়েটার দিক থেকেই। ও বোধহয় এই অবস্থাটা থেকে মুক্তি চাইছিল। আমিও চাইছিলাম, কাঁহাতক গোয়েন্দা ফেলুদা মার্কা ইমেজ হাতড়ে হামা দেওয়া যায় ! ও বলতে চাইছে, বলুক তবে। আমি শ্রোতা। শুনলাম বলছে, কাগজে মোড়া সস্তার সিঁদুর মেলা থেকে কেনা, দু’ টাকায়। মজনু ছোকরাটি তো একেই স্কুল-ছুট, তার ওপরে বেকার। দু’টাকাই সই। দেবতাকে সাক্ষী রেখে পরিয়েছে।
ওই সিঁদুরে ওর ভবিষ্যৎ কল্পনা করে আমি থমকে গেছি। জলের গ্লাসে ভনভন উড়ছে একটা মাছি। ফিনাইল চাই, ফাইনাল। রমেন! ঘরে ফিনাইল দাও।
ছাত্রীর শিক্ষক আমি, সমাজের মন থেকে একটা আগাছাও উপড়ে ফেলতে পারি নি! বুকে হতাশার ভার। তবু, চেতনায় কর্তব্য বোধের চোরা ঢেকুর উঠল। রমেন, জেলুসিল দাও, তোলপাড় করে খুঁজে আনো ঐ মেয়ের মাকে । ভাত-ঘুমের গিন্নি হোক, বাসন মাজার মাসি হোক, এখুনি আসতে বলো।
আমি অস্থির হয়ে উঠলাম।
এবার শান্ত জলে তুফান উঠল। মেয়েটি ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার পায়ে।
মা কে ডাকবেন না স্যার, মেরে ফেলবে। রেগে গেলে মা অমানুষ হয়ে যায়। বলতে বলতে সে জামার হাতা তুলে গরম খুন্তির ছ্যাকা দেখাল।
আমারও ছ্যাকা লাগল। তড়িঘড়ি বললাম, তবে বাবাকে ডাকো।
বাবা তো নেই স্যার।
নেই? কোথায় গেছে?
চলে গেছে।
চলে গেছে? কোথায়?
জানি না, স্যার। আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। মা ও জানে না।
সংসার চলে কী করে?
মেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নির্লজ্জ নিবেদনের ভঙ্গিতে বলল, ও আমাকে খুব ভালবাসে স্যার।
ভালবাসা কারে কয় রে ঢেঙ্গা মেয়ে?
স্যার, ও আর খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মেশে না। দিল্লি রোডে বিস্কুট কারখানায় কাজ পেয়ে যাবে বলেছে। আমাকে খাওয়াবে পরাবে, ঠাকুরের পা ছুঁয়ে বলেছে… মা জানলে এই মাথাটা শিলনোড়া… থেঁতো করে দেবে স্যার…মার খুব কষ্ট…মা খুব মারে…আমাকে বাঁচান।
আমার রণং দেহী হাবভাব তখন আমাকেই বিব্রত করছে। রণের আয়োজনটা যে কার বিরুদ্ধে আমি নিজেই তখন আর বুঝতে পারছিলাম না।
কিন্তু ঐ ঢ্যাঙ্গা মেয়ে যে অনেক বুঝেছে দেখছি। অংক বইয়ের সুদ আসল, সমীকরণ বোঝে না, সিঁদুরে যে খাওয়া-পরার সমীকরণ লুকিয়ে আছে, সেটা ঠিক বুঝে নিয়েছে।
আকাশপাতাল ভাবতে থাকি। ফাঁকা অঙ্কের খাতায় শূন্য দিই, কিন্তু শূন্য ভাতের থালা ! রমেনকে জিজ্ঞেস করি, রমেন তুমি খেয়েছ?
রমেন একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়। তার পরেই বলে, স্যার, আপনি কিন্তু আজ এখনো খান নি।
খাই নি? কিন্তু খিদে পাচ্ছে না তো!
মাঝে মাঝে উপোস করা ভাল স্যার। হজম ক্ষমতা বাড়ে।
আমি সায় দিলাম। তার পরেই ভাবতে বসলাম, রমেন কী আমায় খোঁচা দিল?
পরদিন সকালে ছাত্রীর মা উপস্থিত। নতুন দিন, আমিও নতুন এনার্জিতে টইটম্বুর। মহিলার মগজে আচ্ছা করে গুঁজে দিলাম মেয়ের পড়াশুনা লাটে ওঠার রিপোর্ট কার্ড। কথাবার্তায় আমার ডিপ্লোম্যাটিক ভঙ্গিতে নিজের পিঠ নিজেরই চাপড়াতে ইচ্ছে করছিল। চেয়ারে বেশ আরাম বোধ হচ্ছিল।
আমার কথা শেষ হলে মহিলা আস্তে আস্তে মুখ তুললেন। শুকনো গাল। তার তাড়া আছে। কাজ কামাই হলে রোজের পয়সা মিলবে না। মেয়ের ঐ সিঁদুরের দায় কার? যাওয়ার আগে শুকনো হাতের কালচে শাঁখা নেড়ে প্রশ্ন করে গেলেন।
এমন সময় ফোনটা ঘ্র্যাং ঘ্র্যাং করে বেজে উঠল। খালি চায়ের কাপ থেকে মাছিরা উড়ে গেল। রমেন দৌড়ে এসে রিসিভারটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
হ্যালো।
চাইল্ড লাইন থেকে বলছি।
বলুন।
অনিতা দাস আপনার ছাত্রী, …
কী হয়েছে?
স্যার, আবার একটা চাইল্ড ম্যারেজ হতে চলেছে। ডেট অফ বার্থটা আমাদের দিন, প্লিস।
রেজিস্টার তন্নতন্ন হল, কিন্তু অনিতা দাস বেরোল না।
আবার ফোনটা ঝলমল করে উঠল, রমেন আবার দৌড়ে এলো, মাছিরা আবার উড়ল।
স্যার, ভুল হয়েছে, অনিতা নয়, সুনীতা।
ও তাই বলুন, অনিতা নয়, সুনীতা!
পরক্ষণেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। এ তো কালকের সেই মেয়ে!
ডেট অফ বার্থটা, স্যার, প্লিস। কমপ্লেইন্ট হয়েছে। আমরা আজকেই স্টেপ নেব।
ফোনটা নামিয়ে রাখলাম।
সুনীতাকে পাওয়া গেল। রেজিস্টার বলছে, বারো বছর বয়স; ক্লাস সিক্স, বাবার সই। রেজিস্টারের পাতায় এক পরিত্যক্তা নারীর মুখ ভেসে উঠল, শুকনো গাল, কালচে শাখা। স্বামী আজকে কোথায় কার সঙ্গে থাকে কেউ জানে না। তার ফেলে আসা মেয়ের সিঁদুরের দায় আজ তবে কার?
রমেন বলল, দায়টা স্যার আপনারই।
আমি রমেনের দিকে চোখ ছোট করে তাকালাম। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না।
ও খুব বিনয়ের সাথে বলল, আপনি ওর বায়োলজিক্যাল ফাদার নন ঠিক…
রমেন!
দোষ নেবেন না স্যার, কলেজে ফিসিওলজি পড়েছি তো! এখানে ঘন্টা বাজাই, সাবজেক্টটা তো ভুলি নি।
বিড়বিড় করে বললাম, আমার দায়!
শুধু আপনার নয় স্যার, আপনার আমার…ওহো ক্লাস শেষ হতে চললো, আমি ঘণ্টা দিতে গেলাম স্যার।
রমেন দ্রুত চলে গেল। তারপরেই ঢং ঢং করে ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল সারা স্কুল জুড়ে।
গুটি গুটি এসে দাঁড়ালাম স্টাফ রুমের দরজায়। থমথমে পরিবেশ। হঠাৎ চোখ পড়ল ওই কোনায়। বেসিনের সামনে আয়নাতে কণিকা ম্যাডামের মুখ, সিঁথির সিঁদুর ধীরে ধীরে তুলছেন। অনিন্দিতা, সহেলি ম্যাডামরা হাঁ হাঁ করে উঠলেন, আপনি তো এয়ো !
কণিকা হেসে বললেন, তা বটে ! তবে, সিঁদুরের দায়টা আর তোমাদের দাদার ঘাড়ে চাপাব না। আমি নিজেই তো রোজগেরে ! চলি ।
দাঁড়ান, দাঁড়ান আমরাও তো যাব, বলতে বলতে অনিন্দিতারা কণিকা ম্যাডামকে ধরতে ছুটল।
ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল। আয়নায় নিজের মুখটা বেশ দেখতে পাচ্ছি। প্রতিবিম্বকে নিয়ে একা দাঁড়িয়ে রইলাম, কী জানি কিসের অপেক্ষায়!


অত্যন্ত বাস্তবধর্মী লেখা। রচনাভঙ্গীর মধ্যে কৌতুকের ছোঁয়া থাকলেও লেখাটি পাঠককে গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সমাজে পরিবর্তন আনার , মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির, বা মানুষের জীবনবোধ গঠনের দায়িত্ব কিছুটা হলেও যাদের হাতে আছে, তাদের সমস্ত সদিচ্ছা, সব প্রচেষ্টা যখন জীবনের দৈনন্দিন সংঘর্ষ আর অনিশ্চয়তার কাছে শেষ পর্যন্ত হেরে যায় , একটা জীবনের যখন সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত পথে এগিয়ে যাওয়ার silhouette এর নীরব দর্শক হতে হয় , তাদের সেই অসহায়তা আর ব্যর্থতার দায় ই বা কার ?দুমুঠো ভাত জোগাড়ের লড়াই যখন বড় বালাই হয়ে সামনে উপস্থিত হয়, সামাজিক নিরাপত্তা যখন প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড়ায়,তখন শিক্ষা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা,প্রতিষ্ঠা এসব নেহাতই অর্থহীন হয়ে যায়। বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটিও তাই ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার পরিবর্তে বহুলাংশে ভাত কাপড় আর নিরাপত্তা জোগানের মাধ্যম হয়ে থেকে যায় ।আর রমেনের গল্পটা একটু এগিয়ে। জীবনের একটা লড়াই জিতে সে শিক্ষার আলো দেখেছে বটে, কিন্তু তা সত্ত্বেও জীবনের লড়াই সে আজও লড়ে চলেছে।তবে এত কিছুর মধ্যেও কণিকা ম্যাডাম এর মতো মানুষেরা হয়তো silver lining হয়ে ঝলক দিয়ে যায়।
ভাষা হারা মম জীবন রোদন…
এমন সূক্ষ্ম বোধ – সম্পন্ন প্রধান শিক্ষক, রমেন উপেন দিদিমনির সংখ্যা বাড়ুক
কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে …
এমন প্রধান শিক্ষক , রমেন , শিক্ষিকা প্রতিটি বিদ্যালয়ে জেগে উঠুক ! একদিন সব প্রশ্নের জবাব আসবেই ! 🙏🏼
প্রথমেই মনে পড়ল…ভার তার না রহিবে না রহিবে দায়। অতি স্বচ্ছ ভাষায় দুটি বিপরীত চিত্র লেখক এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যা প্রশংসনীয়। গল্পের প্রথমে humour এর ব্যবহার এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে আর গল্পের শেষটা যেন হয়ে উঠেছে আরও বার্তাবহ। সব মিলিয়ে অসাধারণ। আরো গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।