নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (পর্ব- ৮)

অবশেষে সুদিন এলো। পরের দিনই যুস্মদ শব্দের রূপ বলতে গিয়ে আটকে গেল সলিল। আমি তো মনে সংস্কৃতদেবীর কাছে এটাই প্রার্থনা করছিলাম। দেবী যে খুব জাগ্রত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুযোগ এসে গেল আগের দিনের প্রতিশোধ নেবার। স্থুলকায় সলিলের দুটো কান ধরে বেঞ্চির ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে গিয়ে আমার কাজটা যে খুবই নিষ্ঠুর হয়েছিল ফলে তার কতটা কষ্ট হয়েছিল তা আজ অনুভব করি। কিছুদিন আগেও কথায় কথায় বন্ধুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলাম। এখানে বলে রাখি ঘটনার দিন বাবাও বাড়িতে এসে আমাকে খুব বকুনি দিয়েছিলেন।
তবে এই অষ্টম শ্রেণী ছিল আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারন এসময়েই আমার প্রথম কবিতা ছাপাক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্যালয় পত্রিকা
“ঋতুপর্ণা “য়।
কবিতার নাম ছিল
” আমাদের বিদ্যালয় “
কবিতাটি যতদূর মনে আছে এরকম ছিল –
“হে বিদ্যালয়,
মাহেশের বুকে তুমি আমাদের
গর্বের পরিচয়।
মোরা কোনওদিন ভাবি নাই সবে-
তুমি যে আবার বহুমুখী হবে ,
যত অন্ধেরে কোলে তুলে লবে
তুমি হে জ্যোতির্ময় ,
জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালাবে হৃদয়ে
আঁধার করিবে জয়।”
পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ইংরেজীর শিক্ষক নিত্য গোপাল ঘোষ।
জমা দেবার পর স্যার আমাকে ডেকে পাঠালেন।
গেলাম সামনে। প্রথম প্রশ্ন
– টিফিনে ক্ষেত্রসার মেলা নিয়ে একটা ছড়া লিখে আনবে।
ঘাড় কাত করে চলে এলাম। টিফিনে মেলা নিয়ে চারলাইনের একটা ছড়া নিয়ে গেলাম। ভয়ে ভয়ে স্যারের হাতে দিয়ে চলে এলাম।
বাড়ি এসে মায়ের কাছে শুনলাম বাবাকে নিত্যবাবু জিজ্ঞাসা করেছেন কে লিখে দিয়েছে? বাবা বলেছে – ওর তো লেখাপড়া হবে না। গণ্ডমুর্খ হবে। তাই কবিতা লেখার মতো অকাজই হবে।
যাই হোক লেখাটি নিত্যবাবুর ভালো লেগেছে শুনে আশা জাগলো হয়তো ছাপা হবে।
নিত্যবাবু আমাদের ইংরাজী পড়াতেন। এতভালো পড়াতেন বাড়িতে এসে আর পড়তে হত না।
সে সময় আমাদের একটা টাং টুইস্টিং কবিতা ছিল।

” বেটি বটার বট সাম বাটার….” স্যার যেদিন প্রথম পড়ালেন আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম স্যারের মুখটা। মনে হচ্ছিল নিশ্চিত একটা মেশিন লাগানো আছে বলে ভাবছিলাম। আমাদের বন্ধু মৃত্যুঞ্জয় ও কবিতাটি অনেক কষ্টে চারটে লাইন মুখস্থ করে বলার পর স্যার গম্ভীর ভাবে বলে ছিলেন ৭৫ স্পিডের রেকর্ড ৩৩ স্পিডে চালালে যা হয়। আমি অনেক কষ্টে স্নান খাওয়া ভুলে , ভীষণ পেটের ব্যথা বলে , দুদিন শিঙ্গি মাছের ঝোল ভাত আর সাবু খেয়ে কবিতাটা মুখস্থ করে বলতে পেরেছিলাম।
স্যার খুশি হয়ে আমার কবিতার খাতা নিয়ে দেখা করতে বলেছিলেন।
অবশেষে ঋতুপর্ণা প্রকাশিত হবার পর যখন পত্রিকা হাতে পেলাম আমার আনন্দ দেখলাম দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্লাসঘর থেকে সমস্ত স্কুল ছাপিয়ে সারা আকাশময়। বাড়ি এসে মাকে দেখালাম। ভাগ্যক্রমে দিদিভাই তখন শ্রীরামপুরেই ছিলেন। তাকেও পড়ে শোনালাম। মায়ের চেয়ে দিদিভাইয়ের আনন্দ সবচেয়ে বেশি। তক্ষুনি আঁচল থেকে দু’আনা বের করে আমায় বললেন – যা তোর পছন্দের দুটো মিষ্টি কিনে নিয়ে আয়। মা বললেন – দেবেন না মা। এটা এমন কি কাজ। পড়াশোনায় ভালো হলে তবেই না আনন্দ হবে। দিদিভাই ফোকলা মুখে একটু ফিচিৎ করে হেসে বললেন – ও তুই বুঝবি না।
মিষ্টি কিনে বাড়িতে এসেছি। দিদিভাই আর আমি দুজনে খাচ্ছি , হঠাৎ দিদিভাই বললেন – তোর বাবাও খুশি হয়েছে রে। চিনুকে বলছিল – নিত্যদা শ্রীমানের লেখার খুব প্রশংসা করছিলেন। বলছিলেন নাইনে ওকে আর্টস গ্রুপে ভর্ত্তি করতে। কিন্তু আমার স্বপ্ন ও সায়েন্স নিয়ে পড়বে। ডাক্তার হবে।
আমি সেদিন দিদিভাইকে বলেছিলাম – আমি ডাক্তার হব না। আমি বাংলা নিয়ে এম.এ পড়তে চাই। কিন্তু তখন এখনকার মতো ছিলনা বাবা মায়ের ইচ্ছেতেই ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় পড়তে হত। ফলে বাবার ইচ্ছায় আমাকে নাইনে সায়েন্স নিয়েই ভর্তি হতে হয়েছিল। নিত্যবাবু একটু কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবছর স্কুল পত্রিকায় লেখা ছাপতেন।
ছাপা অক্ষরে আমার কবিতা সেই অষ্টম শ্রেণীতেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সেবার ছাত্রদের মধ্যে ওই একটা কবিতাই মনোনীত হয়েছিল , শুধু তাই নয় আমার ক্লাসে একমাত্র আমার লেখাই সেবার প্রকাশিত হওয়ায় বন্ধুদের কাছে আমার সম্মান বেড়ে গিয়েছিল।
সরল শিশির মৃত্যুঞ্জয়রা আমায় কেক আর বাসনা বিস্কুট কিনে খাইয়েছিল।
হেডস্যার সুধীরবাবু আমায় ডেকে একটা কলম উপহার দিয়েছিলেন।
সেদিন আজও মনের কোণে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বাড়িতে এসে রাতে ঘুমোনোর সময় পত্রিকাটা বুকে জড়িয়ে শুয়েছিলাম। বড় বোন মানু আর ছোটবোন মিতাকে দিদিভাই বলেছিলেন ওর বাবা লেখক ও দাদু লেখক দেখিস ও লেখক হবেই। তারপর থেকে সেটা আমার বালিসের নিচেই থাকতো। অনেকদিন পর হঠাৎ একদিন সকালবেলা পত্রিকাটা খুঁজেই পেলাম না ! মা বলল – কোথায় আর যাবে , আছে কোথায়…সবাই মিলে খুঁজলাম পাওয়া গেল না খুঁজে । রহস্যজনক ভাবে হারির গেল আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হবার পত্রিকা। তার পর বহুদিন কেটে গেছে। বাবা মারা যাবার পর ১৯৮১ সালে পত্রিকাটি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম বাবার নিজস্ব তোরঙ্গ থেকে। একটি নতুন লাল কাপরে মোড়া শুকনো ফুল বেলপাতা দুব্বো আর চন্দন লাগানো তাতে। আজও আমি রহস্য ভেদ করতে পারি নি।
এসময়েই আমার পৈতে হয়েছিল। উফ কত নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম সে সময় সে গল্প? …পরের অধ্যায়ে।
-কে লিখে দিয়েছে?
– আমি নিজেই লিখেছি স্যার।
– মিথ্যে কথা হলে শাস্তি পাবে।
– ঠিক আছে স্যার

