(চিলাপাতা)

রাস্তা ঘুরে গেল। হাইওয়ে ধরে ছুটছে গাড়ি। ডুয়ার্সে এখন বিকেল পাঁচটায় সন্ধ্যা নামে। আলো পুরোপুরি মিলিয়ে যায় না ঠিকই, তবে আর মিনিট কুড়ি যাবে কী যাবে না, অমনি ঝুপ করে অন্ধকার নামবে। মেইন রোডের দু’পাশে শ্যামাপুজোর রাজকীয় প্যান্ডেলগুলোয় গিজগিজ করছে মানুষ। ধূপগুড়ি ঢুকতেই ট্রাফিক ইন্সপেক্টর জানালেন ; শহরে গাড়ি নিয়ে ঢোকা যাবে না, হাইওয়ে ধরে চলে যান গন্তব্যে।

একে অমাবস্যা, তায় নিকষ কালো হাইওয়ে। ভারি ট্রাক, বড় গাড়ি সামনে পিছনে। রাস্তার দুপাশে গাছ আর গাছ। মনে হচ্ছে গাছগুলোকে ভেজা জামাকাপড় টাঙানোর মত করে কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর শেষ যেন নেই। দূরে-দূরে টিলার মত পাহাড়, পদতলে কুয়াশাঘেরা সমতল। দূরে তাকালাম। কত কত জোনাকি! জোনাকি নয়,দূরের বসতি। দীপাবলির আলো টিমটিম করে জ্বলছে। কুয়াশার কুন্ডলী ভেদ করে তারই কিছু আলো এসে লাগছে চোখে।

চলে এসেছি, কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার বর্ণিত গয়েরকাটা-য়। কাঠের দ্বিতল বাড়ি এখনও আছে! টিনের চাল। বাড়িগুলো টিকালো নাকের মত রাস্তার উপর ঝুলে পড়েছে। বয়সের ভারে নুব্জ। কাঠের পিলারগুলোর বয়স আন্দাজ করবার চেষ্টা করছি। রাস্তার দু’পাশে চা-বাগান। ভগ্নপ্রায় বাগান কোয়ার্টার। ঝিঁঝি পোকার ডাক কানে আসছে। কাচ নামিয়ে নিলাম। কাছেপিঠেই আছে ‘আংরাভাসা’ নদী, ‘স্বর্গছেঁড়া’ চা-বাগান। ‘উত্তরাধিকার’ আর ‘কালবেলা’ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মত ক্রমশ মনে জেগে উঠছে।

” এ পথে আমি যে, গেছি বারবার, ভুলিনি তো একদিনও “…গুনগুন করে গাইতে-গাইতে টের পেলাম, বহুকাল এ পথে আসিনি! ক’জন আর সহজ পথ ছেড়ে অহেতুক জটিল পথে যায়! সহজসিদ্ধ জীবনে কে-ই বা চায় অধিক পথশ্রমে কাহিল হ’তে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসবে হাসিমারা। গুরদোয়ারাকে ডানে রেখে পাশের গলিপথে ঢুকতে হবে।

এই গলিপথটায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। অনেকটা রাত হয়েছে। রাত সাড়ে ন’টা। সামনেই রাস্তার উপর আড়াআড়িভাবে ঝুলছে একটি বড় গাছের গুড়ি। পাশে ছোটো পাকা ঘর। পুরনোদিনের সিনেমা হলের টিকিট ঘরের মত, তবে, এখানে জানালাটা বড়। গাড়ির নম্বর, কতজন যাত্রী এসব লিখে একটি চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিল খাঁকি পোশাকের এক ব্যক্তি। টলোমলো পা’য় অন্য একজন গাছের লম্বা গুড়িটাকে লেভেল ক্রসিংয়ের গেটের মত তুলে দিল। প্রবেশ করলাম চিলাপাতা ফরেস্টে।

গাড়ির হেডলাইটের আলোয় রাস্তার দুধারে সোলার প্যানেলগুলো আলোর মালার মত জ্বলছে। এবারে বেশ ভয়-ভয় করছে। অরণ্যের নিজস্ব গন্ধের সাথেসাথে বোটকা গন্ধও নাকে লাগছে। অনেকটা দূরে গভীর জঙ্গলে হয়ত হাতির পাল, কে জানে তারই গন্ধ কি না! বিচিত্র ধরনের পোকামাকড়ের ডাক, খসে পড়া পাতার গন্ধ…সাথে গা ছমছমে অনুভূতি। ঘন অরণ্য চিরে চলছি। দুধারে গাছগুলোর গুড়ি বা ডালপালার ধূসর রঙ। রহস্যের রঙও তো ধূসর, না? এই রাস্তাতেই একবার রাত্তিরে দূর থেকে বাম্প মনে করে কাছে এসে একটি ময়াল-কে রাস্তা পার করতে দেখেছিলাম। মনে পড়তেই চালককে বললাম ; আস্তে চলো।

ময়াল সাপের মতই রাস্তা, এঁকেবেঁকে চলছে। ‘সমপ্রবণ ভাঁজ’ (Fold)- এর শীর্ষদেশের মত উঁচু হয়ে আবার বাহু নেমে যাচ্ছে। রাস্তার এই উঁচু জায়গাগুলো বিপজ্জনক। চোখের সামনে রাস্তার প্রকৃতি বোঝা যায় না। বন্যপ্রাণী দাঁড়িয়ে থাকলেও দূর থেকে কিচ্ছু বোঝা যাবে না। চলছি তো চলছিই! দিনের আলোয় মনে হতো এই পথ যেন শেষ না হয়, অথচ, রাত দশটায় মনে হচ্ছে পথের শেষ কোথায়!

কমপক্ষে পনের কিলোমিটার জঙ্গল চিরে অবশেষে কালজানি ব্রিজে উঠতেই দমবন্ধ করা অহেতুক ভয় এবার আনন্দে ফেটে পড়ল। আহ্, জন্মভূমিতে পা রেখেছি। অল্প এগোলেই জন্মভিটে। নিজের বাড়ি। এই তো সেই রাস্তা, আজ থেকে ৪০ বছর আগেও শ্যামাপুজোর পরদিন রাস্তা আটকে, রাস্তার উপর যাত্রামঞ্চ বাঁধা হতো। রাতে যাত্রাপালা হতো। ফি বছর এমনটা দেখতে-দেখতে বড় হয়েছি। একেবারেই অল্পবয়সে বড় রাস্তার উপর বিখ্যাত পালাকার শান্তিগোপাল- এর অভিনয় দেখেছি। মনে পড়ছে কত কত মুখ। প্রবীণ মুখগুলো বিশেষত। এঁরা-ই ছিলেন মুখ্য। বড়দের মুখে শুনেছি, আলিপুরদুয়ার বড়বাজার এলাকায় শ্যামাপুজোর পরের রাত্তিরে যাত্রানুষ্ঠানের পুরনো প্রথাকে এঁরাই সচল রেখেছিলেন। কেউ-ই আর ইহজগতে নেই, বহু বছর আগেই আকাশের জোনাকি হয়ে গেছেন।

শ্যামাপুজোর পরদিন রাত সাড়ে দশটায় সেই স্থানটির উপর দাঁড়ানো গাড়িটি যখন ডানদিকের গলিতে ঢুকল, হেডলাইটের আলোয় ঝকমক করে উঠল আমাদের বাড়ি। মনশ্চক্ষে ভীড় করলো বাল্যস্মৃতি। বাড়ির গেটে দাঁড়াতেই মনে হ’ল, স্বর্গত ঠাকুর্দা এবং স্বর্গত পিতা-কে চর্মচক্ষু দ্বারা এ-জীবনে আর কোনোদিন দেখতে পাব না…

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Samsun Nahar
Samsun Nahar
1 year ago

ভীষণ ভালো লাগলো।

নির্মল দেবনাথ।
নির্মল দেবনাথ।
1 year ago

বাহ অপূর্ব লেখা। এ লেখা অনেক স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।