
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (১৩)
চারু মজুমদার কথা বলছিলেন আর আমার ভিতরে আমি অপুর্বকে খুঁজে পাচ্ছিলাম ৷ সেদিন কিন্তু একবারও তিনি বলেননি আমাদের সঙ্গে এসো৷ শুধু বলেছেন মানুষ কমিউনিস্ট হয়েই জন্মায় ৷ মানুষের চাওয়া Need তিনটে খাদ্য বসন আর ঘর ৷ ব্যাস ৷ মুষ্টিমেয় মানুষের প্রচুর টাকা। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ভাবে ওরাই সব ৷ বোঝে না আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েই ওরা ধনী ৷ মানুষকে জাগাতে হবে ৷ ভিতরে লোভ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তা করা যাবে না ৷ তুমি কবিতা লেখো তো ? তোমার কাছেই আছে সবচেয়ে বড় অস্ত্রটি ৷ তুমি লেখা শুরু করো ৷
সেদিন ভিতরে অনেক ছোটোছোটো ফুলকি নিয়ে ফিরেছিলাম ৷ বাড়ি এসে দু’দিন ভালো করে ঘুমোতেই পারিনি ৷ পেট্রিক পরদিন এসে অনেক কথা বলে চলে গেল ৷ বাবা হঠাৎ মা কে ডেকে বলেছিল – শ্রীমানকে এই ছেলেটির সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিও ৷ তা নইলে বিপদ হবে ৷
মা আমাকে সে কথা বলতেই আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম- ৷ তা কি করে হয় ! পেট্রিক আমার কতদিনের বন্ধু ৷ আমি ওর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই চলব ৷
চারদিন পরে হঠাৎ শুনলাম পেট্রিক এরেস্ট হয়েছে ৷ আর আশ্চর্য আমাদের বাড়ির গলির সামনে একটা বদ্ধ উন্মাদ এসে হাজির হল ৷ সে কি ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ তার শরীরে ৷ এত নোংরা মানুষ আমি দেখিনি ৷ সে আমার মায়ের কাছে এসে রোজ সকালে চাইতো ৷ প্লাস্টিকের একটা বোতল করে চা নিয়ে যেত বলে মা তাকে একটা পুরনো কাপ দিয়েছিল চা খাবার জন্যে আর একটা এলুমিনিয়মের থালা ৷ দু’বেলা ওতেই খাবার নিয়ে যেত আমাদের বাড়ি থেকেই ৷ এসে মাআআ বলে ডেকে সিঁড়িতে বসে থাকতো ৷ বাবা একদিন ওকে বলেছিল – তুমি সিঁড়িতে বসবে না ঘরে তোমার গিয়ের গন্ধ যায় ৷
সেদিন থেকে রাস্তায় বসেই খাবার চাইতো ৷ পাড়ার লোকেরাও তাকে নানা খাবার দিত ৷ এইভাবে পাগলটা প্রায় পনেরো দিন ছিল ৷ তারপর হঠাৎ একদিন রাতে উধাও ৷
এর মধ্যে হঠাৎ খবর পেলাম পেট্রিক সহ আরও চারজনকে পুলিশ দিল্লীরোডে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে দিয়েছে ৷ শুনলাম ভ্যানে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছিল ৷ প্রস্বাব করবে বলে নেমে তিনজন পালাতে গিয়েছিল তাই পুলিশ গুলি করেছে ৷ পায়ে না করে পিঠে গুলি করেছে ৷ তিনজনই স্পট ডেড ৷ আমি কয়েকদিন শুধু কেঁদেছি ৷ বাবা বলেছিলেন – তোমার পকেটেও বিপদ রাখা আছে , সাবধানে থেকো ৷
সাত দশকের দিল্লীরোড ছিল এরকমই বধ্যভূমি ৷ কত তরুণের প্রাণ যে সেখানে গিয়েছে ৷ তার হিসেব নেই ৷ ওখানে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে বলেছে – পালিয়ে যা ৷
পিছন থেকে গুলি করে মেরে দিয়েছে ৷
এরকম একজন নিষ্ঠুর পুলিশ অফিসার দীপক দত্ত ছিলেন , যিনি পরে আমায় পরে বলেছিলেন নিজে অন্ততঃ ষাটটা ছেলেকে সরকার আর ওপরতলার নির্দেশে মেরেছিলেন ৷
যাই হোক প্রায় ২০ দিন পর একদিন কলেজ থেকে ফিরে সদর দরোজা দিয়ে ঘরে ঢুকটে গিয়ে দেখি ঘরে দু’জন টাই পরা শুটেড বুটেড ভদ্রলোক বসে আছেন ৷ আমি ঢুকতেই বাবা বললেন – এঁরা লালবাজার থেকে এসেছেন ৷ তোমার সঙ্গে কথা বলতে ৷ আমার হঠাৎ মাথা থেকে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল নিচে মনে হল ৷ ভিতরের দরোজা দিয়ে মা ঢুকতেই স্বল্প দৈর্ঘ্যের অফিসার উঠে মাকে “মা ভালো আছেন ” বলে প্রণাম করতে যেতেই মা একটু পিছিয়ে গিয়ে বলে – একি আপনি আমায় প্রণাম করছেন কেন !
ভদ্রলোক বলেন – আমায় চিনতে পারলে না মা ! পনেরো দিন তুমিই তো আমায় খাইয়ে বাঁচিয়ে রেখে ছিলে ৷ আমরা সবাই অবাক হয়ে জানলাম সেদিন এ ভদ্রলোকটিই সেদিনের সেই পাগল ৷ ফিলোজফি তে ফাষ্টক্লাস সেকেন্ড অন্য জন কেমিস্ট্রিতে ফাস্টক্লাস ফাস্ট ? দু’জনেই লালবাজারে গোয়েন্দা প্রধান। আমরা স্তম্ভিত ৷
তারপর চলল না প্রশ্ন ৷ এখানে বলে রাখি আমি তখন আন্তর্জাতিক রেডিও শর্টওয়েভ লিসিনার ৷ এক কথায় DXer , ১২৫ টা দেশের রেডিওর শ্রোতা ও ২৫ টা দেশের ক্লাব সদস্য ৷ তার মধ্যে চিন দেশটি মানে তৎকালীন পিকিংও ছিল ৷ আর ছিল কোরিয়ার পিয়ং ইয়ং ৷ পিকিং রেডিও থেকে আমার জন্যে একটি ” রেডবুক ” পাঠানো হয়েছিল কিন্তু কাস্টমস সেটা সিজ করেছিল ৷ তবে মাও সে তুং এর ছবি সহ অন্য জিনিসগুলি কোনও ভাবে এসে গিয়ে ছিল ৷ এছাড়াও আমার ছটি দেশে মহিলা পেনফ্রেন্ডও ছিল ৷ আমেরিকা রাশিয়া জাপান (২) থাইল্যান্ড এবং নরওয়ে তে ৷ এদের মধ্যে আমার তারুণ্যকালে আমেরিকার ভিকি আর জাপানের আৎসুকো মাসিয়ামার সঙ্গে আমার গভীর প্রেমালাপ ছিল বলতে দ্বিধা নেই ৷ রাশিয়ার বান্ধবীটি ফ্লিম একট্রেস ছিল। আমার চেয়ে সামান্য বড়ো। আৎসুকো আর ভিকির কথা এরপরে বলা যাবে।
যাই হোক অফিসারেরা দুজনে আমাকে ঘন্টাখানেক অনেক প্রশ্ন করলেন ৷ দেখলেন আমার সব ৷ তারপর মাকে বললেন আপনার নুন খেয়েছি ৷ আপনার ছেলেকে মারবো না ৷ তবে তুমি মনে রেখো তোমার নাম আমাদের কাছে থাকলো ৷ তুমি আমাদের নজরে থাকবে ৷ বেচাল দেখলে হয়তো অন্য কোনও অফিসার আমার এই কথা রাখার দায়িত্ব নেবে না ৷
বলে মাকে আর বাবাকে আবার প্রণাম করে চলে গেলেন ৷
বাবা বললেন – আমি আগেই সাবধান করেছিলাম তুমি শোননি ৷ আমি যে ভয়ে তোমায় প্রেসিডেন্সিতে পড়তে দিলাম না , সেই ভয় আজ আমার ঘরেই বাসা বাঁধছে ৷ মনে হল বাবার গম্ভীর মুখটার দুটো চোখে একটু কিছু চিকচিক করছে ৷
ঘরে বসলাম ৷ জামা কাপড় বদলাতে বদলাতে হঠাৎ
আমার চোখের সামনে যেন পেট্রিকের গুলি খাওয়া মুখটা ভেসে উঠলো ৷ যেন মনে হল পেট্রিক আমার পাশে বসে বলছে – আর এগোস না ৷ থেমে যা ৷ বাইরে ঘন মেঘের গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম ৷ আমি তখন সেতারে এলাহাবাদ প্রয়াগ সমিতি থেকে প্রভাকর পরীক্ষা দেবো বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ৷ একটু জলখাবার খেয়ে বসে গেলাম সেতার বাজাতে ৷
এবার আমার পেন ফ্রেন্ডদের কথা বলি ৷
ভিকি ছিল আমার সবচেয়ে ভালো বান্ধবী ৷ ভিকি লিচ স্টাউট ৷ আমার চেয়ে আড়াই বছরের ছোট ছিল ৷ আইওয়াতে থাকতো ৷ ওর বাবা আইওয়ার চেয়ারম্যান বা ও রকম কিছু ছিলেন ৷

ভিকি আইওয়াতেই পড়তো ৷ আমায় ভীষণ ভালোবাসতো ৷ আমার ছবি নিজের বিছানার পাশে রাখা থাকতো ৷ আমি ওকে বাংলা শিখিয়ে ছিলাম , এখন যেমন মোবাইলে ইংরাজী লেটারে বাংলা লেখা হয় সেই ভাবেই ৷ ঠিক একই ভাবে ও আমায় স্প্যানিস শেখাচ্ছিল ৷ ও আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল আমি যদি রাজী থাকি ও বিমানের টিকিট কেটে পাঠিয়ে দেবে ৷ আমরা দুজনে আইওয়া কলেজে পড়বো ৷ ওর বাবা ওখানেই আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন ৷ একবার দিল্লী এসে আমার বাড়িতে আসতে চাইলে বাবা রাজী হয়নি কারণ ও খ্রীষ্টান ছিল ৷ আর বাবার অনুমতি পাওয়া যায়নি বলেই আমারও আইওয়াতে যাওয়া হল না ৷
আতসুকো মাসিয়ামা খুব ইমোশনাল মেয়ে ছিল ৷ যাস্ট যেন একটা পরী ৷ টোকিওতে রেডিওতেই চাকরি পেয়েছিল ৷ আমি তখন আকাশবাণীর যুববাণীতে অডিশন পাশ করা আবৃত্তি ও নাটক শিল্পী ৷ ঘোষক ছিলাম মাঝে মাঝে ৷ ও এটা জেনে আমায় রেডিও জাপানের বাংলা বিভাগে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানালেও বাবার নির্দেশে জাপান যাওয়া সম্ভব হয়নি ৷ কারণ আমি এক ছেলে ৷ বাবার একটাই কথা শেষ সময়ে তোমার হাতের আগুনটা চাই ৷
ভিকি যেদিন শুনেছিল আমি বিবাহ করেছি সেদিন ভীষণ ভেঙে পরে ছিল ৷ একটা গোটা এরোগ্রামে ওপরে শুরুতে আমার নাম আর শেষে নিজের নাম লিখে মাঝখানে ফাঁকা জায়গিয় খুব ছোট্ট করে লিখেছিল …
” O dear you not for me !!!!!”
তারপর একটা উড়ন্ত পাখির ছবি দিয়ে পাঠিয়েছিল ৷ পরে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেছিলাম ৷ ওর ভাই ডেভিড লিখেছিল ও বাঙালিকেই বিয়ে করবে বলে একজন বাংলাদেশীকে বিয়ে করলেও ছ’মাসের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায় ৷ তারপর ভিকি আইওয়া থেকে কোথায় গিয়েছে সে খবর রাখে না ৷ তবে ইন্ডিয়া সম্পর্কে , মেডিটেশন সম্পর্কে ওর খুব আগ্রহ ছিল তাই এখানেও আসতে পারে ৷
আজও মাঝে মাঝে ভাবি হঠাৎ একদিন হয়তো কোথাও কোনও সমুদ্র বা পাহাড়ের কাছে ভিকির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ৷ হুম ওরও তো ৬৬ বছর বয়েস হোলো ৷ ও আমার ছবিটা তো সঙ্গেই রাখেনা নিশ্চিত ৷ কিম্বা যত্নেই রাখে ৷ আমি চিনতে না পারলেও ও হঠাৎ সামনে এসে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞাসা করবে – Hiii Are You Ram?
আমি ঠিক চিনতে পারবো তখন ৷ যাকে শুধুই ছবিতে দেখিছি ৷ সেদিন মুচকি হেসে আমি বলব – “ঘাসের নীচে একটুখানি ছায়ার মতো লুকিয়ে আছে বুকের নীচে ভালোবাসা “
ক্রমশঃ

