শ্যাম বেনেগালের ‘মন্থন’ – ভারতের প্রথম ক্রাউড ফান্ডেড হিন্দি ফিচার ফিল্ম যা তৈরি করার জন্য ৫ লাখ কৃষক প্রত্যেকে ২ টাকা করে সাহায্য করেছিলেন। ছবিটি দুধ উৎপাদনকারী চাষীদের শোষণের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগঠিত লড়াইয়ের কাহিনী। গুজরাটের একটি ছোট গ্রামে এক পশু চিকিৎসক (ভি. কুরিয়েন) চাকরি করতে এসে দেখেন, গ্রামের প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী জোর খাটিয়ে সস্তায় চাষিদের কাছ থেকে দুধ কিনছেন এবং সব দুধের একই দাম দিচ্ছেন। হাজার বাধা সত্ত্বেও ওই চিকিৎসক বাড়ি বাড়ি ঘুরে দুধের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং চাষিদের দেখান বিভিন্ন দুধের ফ্যাট কন্টেন্ট বিভিন্ন। যার দুধে ফ্যাট বেশি, তিনি বাড়তি দাম পাবেন, অর্থাৎ সব দুধের দাম এক হতে পারে না। তাছাড়া তাঁরা যে দামে রোজ দুধ বিক্রি করছেন, সেটাও দুধের ন্যায্য দাম নয়। এই বৈষম্য ও ঠকে যাওয়া থেকে মুক্তি দিতে তিনি চাষিদের এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা করেন। অনেক লড়াইয়ের পর তিনি চাষিদের বোঝাতে সক্ষম হন যে সমবায়ই তাঁদের দুধের সঠিক দাম দিতে পারে এবং তাঁদের প্রতিদিনের ঠকে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। ‘মন্থন’ মূলত আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড বা আমূল গড়ে ওঠার গল্প। গুজরাটের আনন্দে পলসন ডেয়ারির শোষণ থেকে দুধ চাষিদের বাঁচাতে ভি কুরিয়েনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সমবায়ের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ৩৬ লাখ এবং বাণিজ্যের পরিমাণ আশি হাজার কোটি টাকা। কৃষকরা একত্রিত হলে তারা শুধু টিকে থাকে না, নিজেদের উন্নতিও ঘটায় – আমূল তার জ্বলন্ত উদাহরণ। আজ এই সমবায়, গ্রামীণ উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি ও সমবায়ের গুরুত্ব

ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি আজও ‘কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট’ খাতের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। দেশের জিডিপি ও কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান যথাক্রমে ১৮.২% এবং ৪৭%। এই কৃষির খোলনলচে বদলে দিতে পারে কৃষি সমবায়, কারণ এর পরিবর্তনমূলক প্রভাব কৃষিতে অনেকখানি। কৃষি সমবায়গুলি দেশের মোট কৃষি ঋণের প্রায় ৩৬% নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া, কৃষি পণ্য সংগ্রহ ও বিতরণেও সমবায়কে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তার উদাহরণ হলো, মহারাষ্ট্রের চিনি সমবায় গুলি। দেশের উৎপাদিত আখের প্রায় ৪০% এরা সংগ্রহ করে যা থেকে ৪৫% চিনি উৎপন্ন হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

‘কো-অপারেটিভ বিল্ড এ বেটার ওয়ার্ল্ড’ অর্থাৎ ‘সমবায় উন্নত বিশ্ব গড়বে’ – এই থিমকে সামনে রেখে জাতিসংঘ, ২০২৫ সালকে আন্তর্জাতিক সমবায় বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এবং সামাজিক সংহতিতে সমবায়ের অবদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি। তাছাড়া অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে সামাজিক এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখারও এক অনন্য ক্ষমতা রয়েছে সমবায়ের। তাই ‘সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমবায়ের ভূমিকা অপরিমেয়। ভারত সেই ১৯৫১ সাল থেকে প্রতি বছর ১৪ থেকে ২০ নভেম্বর সমবায় সপ্তাহ পালন করে চলেছে। ২০২৪ সালেও “বিকশিত ভারত গঠনে সমবায়” – এই লক্ষ্যে সারা দেশে সমবায় সপ্তাহ পালিত হয়েছে। আবার ২০২৫ সালের বাজেটে, এই বিকশিত ভারত গড়ার কাজে কৃষিকেই বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে কৃষি ভারতীয় অর্থনীতির জীবনী শক্তি। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও কৃষকের ঘরে অভাব। চলছে কৃষি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ‘বিকশিত ভারত -২০৪৭’ এর জন্য সমবায় এবং কৃষি দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। এটা বিবেচনায় রেখে সরকার কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

যৌথ খামারের ব্যর্থতা ও এফপিও-র ধারণা

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আমূলের মতো উজ্জ্বল ব্যতিক্রম থাকা স্বত্ত্বেও ভারতীয় কৃষিতে সমবায় বা যৌথ খামারের সাফল্য নেই বললেই চলে। দেশের কৃষিতে যৌথ খামারের সফল রূপায়ণে সরকার কেন ব্যর্থ, আজ সেই প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের বেশিরভাগ অংশ যখন ধ্বংসস্তূপের চেহারা নিয়েছিল, সেই সময়ে বিশ্বের দুই পরাশক্তিধর দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সারা পৃথিবীতে নিজেদের রাজনৈতিক দখলদারির চেষ্টা চালিয়েছে। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের যোগানকে সুনিশ্চিত করতে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য কমিউনিস্ট দেশগুলি ওই সময় যৌথ চাষ বেছে নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বেশ কিছু দেশ কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে জোর দেয়। ভারত সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। যার হাত ধরে, ভারতীয় কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের উদ্ভব হয়। এই পর্যন্ত সবটাই জানা। আবার এটাও জানা, সময় যত গড়িয়েছে, সবুজ বিপ্লবের প্রভাব ক্রমশ ফিকে থেকে ফিকেতর হয়েছে। এতদিন পর ভারত কৃষিতে কৃষক উৎপাদন সংগঠন বা এফপিও গঠনে জোর দিয়েছে, অর্থাৎ নতুন করে যৌথ চাষের মডেল গ্রহণ করছে। অথচ ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন ‘জোতের আয়তন ও উৎপাদনশীলতা’ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, সে সময় যৌথ চাষের কথা আলোচিত হলেও তা গৃহীত হয়নি। বলা হয়েছিল ছোট জোতের উৎপাদনশীলতা বেশি, কিন্তু আয়তনের বিচারে অর্থনৈতিক নয়। তাই ছোট জোতগুলিকে একত্রিত করে যৌথ খামারের চেহারা দিতে পারলে বাড়তি উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি বড়ো জোতের সুবিধাও পাওয়া যাবে। তবে তা ওই খাতায়-কলমে।

বিশ্বের বুকে সমবায় কৃষির সাফল্য

ইউরোপের কৃষি অর্থনীতিতে সমবায়ের সাফল্য চমকে দেওয়ার মতো। ইউরোপের মোট কৃষি উৎপাদনের প্রায় ৫০% সমবায়গুলির মাধ্যমে উৎপাদিত এবং বাজারজাত করা হয়। বিশেষত, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, এবং ফ্রান্সে কৃষি সমবায়গুলি অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, ডেনমার্কের ডেইরি সমবায়গুলি দেশটির ডেইরি পণ্যের ৯৪% নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে একচেটিয়া সুবিধা এনে দেয়। এছাড়াও, ইজরায়েলে গড়ে ওঠা কিব্বুৎজ (Kibbutz) এবং মোশভ (Moshav) নামের যৌথ খামারগুলি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছে। কিব্বুৎজ ছিল সম্পূর্ণ যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি সম্প্রদায়, যেখানে জমির মালিকানা ছিল সবার এবং উৎপাদন ও লাভের অংশ সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া হতো। অন্যদিকে, মোশভ ছিল একটি সমবায় গ্রাম যেখানে কৃষকরা নিজেদের জমির মালিক হলেও, কেনা-বেচা এবং বিপণনের জন্য যৌথভাবে কাজ করত। এই মডেলগুলি দেখিয়েছে যে, সঠিক নেতৃত্ব, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে যৌথ চাষ যে শুধুমাত্র টিকে থাকতে পারে তাই নয়, বরং ব্যাপক সাফল্যও অর্জন করতে পারে।

কৃষকদের সমস্যা ও এফপিও-র ভূমিকা

আমাদের দেশে কৃষকদের উৎপাদন ক্ষমতা প্রশ্নাতীত, কিন্তু উৎপাদিত ফসল ন্যায্য দামে বিক্রি করার উপায় তাঁদের জানা নেই। ফসলের দাম নির্ধারণে কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁরা বেশিরভাগ সময়েই বাজার অবধি পৌঁছাতে পারেন না, আর পৌঁছালেও দর কষাকষির ক্ষমতা তাঁদের নেই। কৃষি পণ্যের বাজার মূলত ব্যবসায়ীদের দ্বারা ‘নিয়ন্ত্রিত’। কৃষি বিপণনে, ক্রেতারা যে চূড়ান্ত দাম দেয়, তার সিংহভাগই যায় ফড়েদের পকেটে, যৎসামান্য পায় কৃষক। এই পরিস্থিতি থেকে কৃষকদের বাঁচাতে, তাঁদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনা জরুরি। যৌথ কৃষিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। ২০১৮ সালে, তামিলনাড়ু সরকার ছোট কৃষকদের একত্রিত করার জন্য এফপিও গঠনে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। স্থির হয় একবারে নিম্নস্তরে সর্বোচ্চ ২০ জন কৃষক নিয়ে ‘কৃষক স্বার্থ গোষ্ঠী’ বা এফআইজি তৈরি হবে। পাঁচটি এফআইজি নিয়ে হবে একটি ‘কৃষক উৎপাদক গোষ্ঠী’ বা এফপিজি। ১০টি এফপিজি নিয়ে হবে একটি এফপিও। তিরুচিরাপল্লী জেলায়, ৭৮টি এফপিজি গঠিত হয়েছিল। মাদুরাইতে রাজ্য সরকারের যৌথ কৃষিকাজের উদ্যোগে ১৩টি ব্লকে ২.৮ লক্ষ কৃষক উপকৃত হন। তবে তামিলনাড়ুর কৃষকদের কাছে যৌথ কৃষি ব্যবস্থা নতুন নয়, কারণ ১৯৯৪ সালেই, তামিলনাড়ুর ৯৪টি গ্রামের ৯০০ জন দলিত এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলা কৃষকদের নিয়ে তামিলনাড়ু মহিলা সমষ্টি গঠিত হয়। পরবর্তীতে, তিরুনেলভেলি এবং তুতিকোরিন জেলার মহিলাদের নিয়ে এই সমষ্টি গঠিত হয়। সারা দেশের নিরিখে এটা একেবারেই বিক্ষিপ্ত ঘটনা। এফপিও-র মূল লক্ষ্য কৃষকদের সংগঠিত করে তার মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানো। এফপিও তার সদস্যদের চাষের যন্ত্রাংশ কেনার জন্য ঋণ দেয়, তেমনই শস্য ঋণও দিয়ে থাকে। এছাড়াও এফপিও সস্তায় উন্নত মানের বীজ, সার, কীটনাশক কৃষককে সরবরাহ করে। কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত ফসল সংগ্রহ করে গুদামে রাখে, তারপর প্যাকেজিং করে ন্যায্য মূল্যে বাজারে বিক্রি করে। এতে কৃষকের সময়, পরিবহন খরচ দুই-ই বাঁচে। ফসলের দামের ওঠানামা, ওজনে ঘাটতি, অভাবী বিক্রির মতো পরিস্থিতির হাত থেকে তাঁরা রেহাই পান। এফপিও চাষীদের জন্য সব রকম বিমার ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে। এরসঙ্গে, কৃষকের দক্ষতা বাড়াতে এবং বাজার সম্পর্কে ধারণা পেতেও সাহায্য করে। একজন এফপিও সদস্য হিসাবে, কৃষক, এর ফলে ‘উপাদান এবং পণ্যের’ বাজার উভয় ক্ষেত্রেই ‘স্কেল অর্থনীতির’ সুবিধা পেয়ে থাকেন, ব্যক্তিগত ভাবে যা তিনি পেতেন না। কৃষকদের এই জোটবদ্ধকরণ কৃষককে শুধু স্কেল অর্থনীতির সুবিধাই দেয় না, বরং উৎপাদন ও উপাদানের বাজারে তাঁদের দর কষাকষির ক্ষমতাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।

এফপিও-র অগ্রগতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি

সমবায় সমিতি থাকা সত্ত্বেও কেন এফপিও (Farmer Producer Organisation) বা এফপিসি (Farmer Producer Company) তৈরি করা হলো? এর কারণ হলো ঐতিহ্যবাহী সমবায়ের কিছু দুর্বলতা, যেমন রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাব। এই সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে একটি নতুন মডেলের প্রয়োজন ছিল। সেই লক্ষ্যে, এফপিও/এফপিসি তৈরি করা হয়েছে কোম্পানি আইনের অধীনে, যা তাদের বাণিজ্যিক সত্তার মর্যাদা দেয়। এই কাঠামো তাদের সহজে ঋণ নিতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং সরাসরি বাজারে কাজ করতে সাহায্য করে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের একত্রিত করে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো, যাতে তারা উৎপাদন খরচ কমাতে এবং লাভ বাড়াতে পারে। সরকার এই মডেলটিকে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে যা কৃষিখাতে বেসরকারি ও কর্পোরেট বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে।

তবে, এই নতুন মডেলটি কর্পোরেট আধিপত্য বিস্তারের একটি নতুন পথও খুলে দিচ্ছে। এবং কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে সাহায্য করছে। এফপিও-এর বাণিজ্যিক কাঠামো এবং সরকারের আর্থিক সহায়তা থাকায়, কর্পোরেটরা সরাসরি হাজার হাজার কৃষকের সঙ্গে চুক্তি না করে এফপিও-র মাধ্যমে সহজে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছে। এই সংস্থাগুলির পরিচালনা ক্ষমতা কিছু নির্বাচিত ব্যক্তির হাতে থাকায়, কর্পোরেটরা তাদের সঙ্গে চুক্তি করে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর ফলে কৃষকরা একদিকে যেমন উন্নত প্রযুক্তি এবং বাজারের নিশ্চয়তা পাচ্ছে, অন্যদিকে তারা ধীরে ধীরে কর্পোরেটদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে কৃষকের স্বাধীনতা কমে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা বড় সংস্থার একটি অংশে পরিণত হচ্ছে, যা কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে কৃষিব্যবস্থার প্রসারে সাহায্য করছে। এই মডেলটিতেও দুর্নীতি বা অনিয়মের সুযোগ রয়েছে।

এটি একদিকে কৃষকদের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হতে পারে, আবার অন্যদিকে তা কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের একটি মাধ্যমও হতে পারে। এই মডেলের সাফল্য বা ব্যর্থতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে এর সঠিক পরিচালনা, স্বচ্ছতা এবং কঠোর নজরদারির ওপর।

কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৯ – ২০২০ সালের বাজেটে এফপিও গড়ে তোলায় বিশেষ জোর দেয়। ২৯শে ফেব্রুয়ারী, ২০২০ তারিখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন পরবর্তী পাঁচ বছরে কৃষকদের জন্য কেন্দ্রীয় সেক্টর স্কিম হিসাবে নতুন ১০০০০ টি এফপিও ‘গঠন ও উন্নয়ন’ করা হবে। এই উদ্যোগে বাজেট ব্যয় ধরা হয় ৬,৮৬৫ কোটি টাকা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৩০ জুন, ২০২৪ পর্যন্ত, এই প্রকল্পের অধীনে মোট ৮,৮৭৫টি এফপিও নিবন্ধিত হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদী গত ফেব্রুয়ারী মাসে, বিহারের ভাগলপুরে পিএম-কিষাণ প্রকল্পের ১৯তম কিস্তির টাকা দেওয়ার সময় ১০,০০০ তম এফপিও – র উদ্বোধন করেন। বিহারের খাগারিয়া জেলার এই এফপিও-টি ভুট্টা, কলা এবং ধান চাষ নিয়ে কাজ করবে। প্রচার চলছে এফপিও গঠনে সরকার লক্ষ্য পূরণ করেছে! কিন্তু এই পর্যন্ত দেশে কমবেশি ৩০ লাখ কৃষক এফপিও-র সাথে যুক্ত, অথচ চাষির সংখ্যা ৯৫০ লাখ।

এফপিও-র মাধ্যমে কৃষকদের এক ছাতার তলায় আনতে পারলে কৃষিপণ্যের বাজারে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ যেমন দূর করা যায়, তেমনই ফড়েদের দৌরাত্ম্যও ঠেকানো সম্ভব হয়। কৃষি পণ্যের বাজার দরের উপর চাষির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন, ফসলের দামের বেশিরভাগটাই চাষি ভোগ করতে পারেন এবং তাঁর আয় বাড়ে। চাষির জোটবদ্ধকরণ, তাঁকে শোষণ থেকে মুক্ত করে। ‘মন্থন-ও তাই দেখিয়েছে। হুগলীর পুরশুড়াতে “পুরশুড়া কৃষি ফার্মাস প্রোডিউসার্স কোম্পানি লিমিটেড” গঠিত হয়েছিল এফপিও প্রকল্পের পাইলট পর্যায় চলাকালীনই। মূলত পাট, সবজি, ধান উৎপাদন এবং বিপণনের কাজ করা এই সংস্থাটি বর্তমানে ই-নাম প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও কৃষিপণ্য কেনা-বেচা করছে। এফপিও-টির দক্ষ পরিচালনার ফলে তার সদস্য চাষিদের আয় আগের তুলনায় বেড়েছে, ফসলের অভাবী বিক্রি বন্ধ হয়েছে।

আবার সঠিক পরিচালনার অভাবে শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে ওই জেলারই খানাকুল ব্লকের “আটঘড়া, শ্রীরামপুর ফার্মাস প্রোডিউসার্স কোম্পানি লিমিটেড” । অর্থাৎ, এফপিও-র মাধ্যমে কৃষকের শোষণমুক্তি নির্ভর করে এর স্বচ্ছ ও সঠিক পরিচালনার উপর। তাই শুধু এফপিও গঠন করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য ও চাষির ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত তাদের উপর সরকারি নজরদারি ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে।

যে দেশে আমূলের মতো সমবায়ের সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে, সেই দেশে কৃষিতে যৌথ খামারের নীতি ব্যর্থ – তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে এ বিষয়ে মূল ত্রুটি সরকারের ভ্রান্তনীতি। দেশের কৃষি প্রধান দুই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও মধ্যপ্রদেশে এফপিও-র উন্নতি কল্পে আমেরিকার ওয়ালমার্টকে ১.৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার বিনিয়োগের অনুমতি তারই প্রমাণ। নতুন এফপিও আন্দোলনের শুরুতে, এটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। অদূর ভবিষ্যতে এফপিও-উৎপাদিত পণ্য বাজারে নয়, সরাসরি ওয়ালমার্টের কাছেই হয়তো বিক্রি করতে হবে। সরকার কি ধীরে ধীরে কৃষিকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চাইছেন? এফপিও-র মাধ্যমে যৌথ চাষের ভাবনা শুধুই কি তবে লোক দেখানো? তাই যদি হয়, তাহলে ‘সমবায় উন্নত বিশ্ব গড়বে’ – জাতিসংঘের এই স্লোগান ভারতে এসে হোঁচট খাবে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

4.3 3 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Sibaji Ganguly
Sibaji Ganguly
9 months ago

খুব সুন্দর পোষ্ট ।