
রাজযোটক
এক
শরদিন্দুবাবু হাতের কাগজটা সামনের টেবিলে নামিয়ে চেম্বারের দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালেন। ।
দশটা পনেরো বেজে গেছে। আজ তাঁকে বারোটার মধ্যে কোর্টে যেতে হবে।
চেয়ার থেকে উঠে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে রান্নাঘরের দিকে মুখ করে একটু জোরেই স্ত্রীকে ডাকলেন, সুরো, হাত খালি করে একবার ঘরে এসো, কথা আছে ।
‘ছেলে অরিন্দম খেয়েদেয়ে অফিসে বেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তিনমাস আগে মেয়ে মেঘার বিয়ে হয়ে সে এখন হাসিমারার চাবাগানে, স্বামীর কোয়ার্টারে। এখন তো সুরঙ্গমার ফ্রি থাকার কথা। কি যে সারাক্ষণ রান্নাঘরে খুটখাট করে !’
কিছুক্ষণ পরেই সুরঙ্গমার প্রবেশ, কি বলছো, বলো ।
একটু বোসো এখানে । বোসো তো। সিরিয়াস কথা আছে তোমার সঙ্গে ।
শরদিন্দু মুখে সিরিয়াস বললেন বটে কিন্তু তাঁর মুখের কোণে একচিলতে হাসি ঝুলে আছে ।
কি এমন সিরিয়াস কথা, তোমার কোর্টে যাবার আগে বলতে হবে ! আমার রান্নাঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে । সুরঙ্গমা খাটে বসলেন।
ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করো সুরো। আর দেরি কোরো না । স্বামীর স্বরে রহস্যময় পুলক ।
এই তোমার সকালবেলায় সিরিয়াস কথা ! সুরঙ্গমার ছদ্ম বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
কি বলছো কী ! একমাত্র ছেলের বিয়ের কথাটা সিরিয়াস কথা নয় ? ছেলেটা আমার চিরটাকাল কো-এডুকেশন স্কুলে, কলেজে, ইউনিভারসিটিতে পড়াশোনা করলো। প্রথমে তুমি খবর তো নাও যে সে কাউকে পছন্দ করে রেখেছে কী ? রেখে থাকলে মেয়েটিকে আমাদের বাড়িতে ডাকো, আলাপ করে দেখি যে সে এ বাড়ির উপযুক্ত কী না !
শোনো, আমার ছেলে ওরকম নয় ! কেউ থাকলে অরু নিশ্চয়ই বেবি বা আমাকে বলে দিতো !
শরদিন্দু স্ত্রীর কথায় হেসে উঠলেন, আরে ও-রকম নয় মানেটা কি ! আমি নিজে কি প্রেম করে বিয়ে করিনি ? আমি কি তাহলে সে-ই-ই রকম ! তোমার তো আমাকে ভালোই লাগে, তাই না ? তিরিশ বছরে কতো বার বলেছো ! বলে শরদিন্দু হাসতে লাগলেন ।
সুরঙ্গমা স্বামীর দিকে তাকিয়ে ওঠবার উপক্রম করলেন, তোমার সিরিয়াস কথা শেষ হয়েছে ?
-আরে বোসো না। আসল ঘটনাটা তো এখনো বলিনি মি লর্ড ! কেসটা কেবল বিল্ড-আপ করছিলাম !
তাড়াতাড়ি বলো, রান্নাঘরে ভাত চাপিয়ে এসেছি ।
আজকে সকালে তোমার ছেলে এসে আমাকে বললো, ওর চন্দননগরের বন্ধু দেবু, দেবব্রত, সেই যে ডব্লিউবিসিএস, নতুন বিয়ে হয়েছে, চুঁচড়ো সদরে পোস্টিং, সরকারি কোয়ার্টারে থাকে ?
হ্যাঁ, মনে আছে তো ! দেবু তো ওর কলেজ থেকেই বন্ধু ! দেবুর বিয়েতে অরু বরযাত্রী গিয়েছিলো। এ বাড়িতে দেবু অনেকবার এসেছে।
সেই দেবু বৌকে নিয়ে সুন্দরবন বেড়াতে যাবে। অরু ওদের বলেছে, সুন্দরবন যাওয়ার আগে আমাদের বাড়িতে সস্ত্রীক দুরাত কাটিয়ে যেতে ।
সুরঙ্গমা শুনে খুশি হলেন। দেবুর বৌকে ছবিতে দেখেছেন…’ছবিতে, কনেবউয়ের সাজে মেয়ে কি রকম দেখতে ঠিক বোঝা যায় না কি !’
মুখে বললেন, সে তো খুব ভাল কথা । বেবি চলে যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা খালি খালি লাগে। দুদিন তো বাড়িটায় লোকজন থাকবে । তা এই কথার সঙ্গে অরুর এক্ষুণি বিয়ে দেওয়ার কি হলো বুঝছি না তো ।
শোনই না ! সকালে চেম্বারের ঘরে এসে তিনি তো আমাকে প্রথমে বললেন, দেবুর সস্ত্রীক এসে থাকার কথা। আমি বললাম, বাঃ । ভালোই তো প্রস্তাব দিয়েছিস। তারপরে বললো, আমার ঘরের ডবলবেড খাটটা তো আমার বড়ো হয়, ওটা গেস্ট রুমে লাগিয়ে দিচ্ছি, আর গেস্টরুমের সিঙ্গলবেড খাটটা আমার ঘরে নিয়ে আসছি। তাহলে গেস্টরুমে কাপল শোওয়ার কোন অসুবিধা হবে না। এবার কি বুঝলে ! তোমার ছেলের শোওয়ার খাট বড়ো লাগছে সুরো ! এ সেই আইবুড়ো ছেলের করাত দিয়ে তক্তাপোশ কাটার মতো ব্যাপার হয়ে গেলো না !
বলে শরদিন্দু হেসে উঠলেন ।
সুরঙ্গমা কিছু বুঝতে না পেরে বললেন, সে আবার কি !
ওহ, তুমি এই গল্পটা শোনোনি ! তাহলে বলি ! একটা বড়ো একান্নবর্তী পরিবারে এক আইবুড়ো ছেলের বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কারও খেয়াল উদ্যোগ নেই। শেষে একদিন সেই ছেলে একটা বড়ো কাঠ কাটার করাত এনে বাড়ির উঠোনে নিজের শোওয়ার তক্তাপোশটা নিয়ে গিয়ে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে কাটতে লাগলো। বাড়ির বড়োরা সবাই হাঁ হাঁ করে উঠেছে, আরে কি করছিস, কি করছিস ! ছেলে বললো, তক্তাপোশটা আমার বড়ো লাগছে, তাই কেটে ছোট করছি !
শরদিন্দু হাসতে লাগলেন ।
সুরঙ্গমা রসিক স্বামীকে বিলক্ষণ চেনেন !
ঠোঁট উল্টে বললেন, তোমার যতো সব গেঁয়ো রসিকতা !
শরদিন্দু হাসতে হাসতে বললেন, আরে ছেলে আমার রসিকতার কি দেখেছে ! আমার তো মুখে প্রায় এসে গিয়েছিলো, নতুন বিয়ে হয়েছে, ওদের জন্য সিঙ্গল বেড খাটটাই এখন অ্যাপ্রোপ্রিয়েট। খুব জোর আমার মুখটা আটকেছি ! বলে আরও হাসতে লাগলেন ।
সুরঙ্গমা উঠে পড়ে দরজার দিকে যেতে যেতে বললেন, ছিঃ ! মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আর তুমি এখনও সেই একই রকম…
শরদিন্দু হাসি থামিয়ে বললেন, আহা, তোমাকে বলছি তো ! যাক, রসিকতা থাক, তুমি শোনো, বিয়ের কথাটা অরুর কাছে পাড়ো দেখি। ওর বোধহয় ছাব্বিশ হয়ে গেলো, একেবারে রাইট টাইম। যদি ওর নিজের পছন্দ কিছু না থাকে, তাহলে সুরো, আমার সন্ধানে ভালো মেয়ে আছে ।
তোমার সন্ধানে ভালো মেয়ে আছে ! সুরঙ্গমা দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, এবার সত্যিই অবাক হলেন।
হ্যাঁ । গত হপ্তায় রিসেসের সময় পিপি দীনবন্ধুদা, দীনবন্ধু বসু, ওঁর বড়ো মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধের কথা বলছিলেন। মেয়েটি বাবার মতোই লইয়ার, তাকে প্রায়ই দেখছি আমি, বাবার জুনিয়র হয়ে এই বছরখানেক কোর্টে বেরোচ্ছে। ভারি সুশ্রী, সুন্দর মিষ্টি চেহারা, পালটি ঘর, আর কি চাই আমাদের । আমার প্রথম থেকেই তো ঐশী, মানে মেয়েটিকে, ভালো লেগেছে। তোমারও পছন্দ হবে আমি শিওর। অরুর সঙ্গে বিয়ে হলে ভালো হবে। আমার চেম্বারটারও একটা হিল্লে, একটা ওয়ারিশ পাওয়া যাবে।
বাড়িতে আবার একজন উকিল ! অবশ্য নামটা খুব সুন্দর…ঈশ্বরপ্রেরিতা !
সুরঙ্গমার বাংলায় অনার্স ছিল, শরদিন্দুর সঙ্গে ফেঁসেছিলেন ওই সুরেন্দ্রনাথ কলেজেই।
ভালোই তো ! নিজের দলে যদি টানতে পারো, তাহলে বাড়িতে আমার এগেনস্টে ঐশ্বরিক আর্গুমেন্ট করার জন্য একজনকে তো পাবে, তোমার তো পুরোটাই লাভ !
শরদিন্দু হাসতে হাসতে স্নান করতে চলে গেলেন ।

দুই
মিত্র সদনে পরের ঘটনাবলী দ্রুত এগোল ।
মায়ের উপরযুপরি প্রশ্নের জবাবে অরিন্দম দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে প্রথমে জানিয়েছিল, সে বিয়ের জন্য এখন মানসিক ভাবে তেমন প্রস্তুত নয়।
সুরঙ্গমা স্বামীর নির্বন্ধাতিশয্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেবুর বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা বলে ছেলেকে চাপ দিলেন ।
এখনই বিয়ে করতে না চাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ মা খোলাখুলি জানতে চাইলে অরু জানিয়ে দিলো, মা যেরকম ভাবছে, সেসব কিছু নয়। বিয়ের জন্য তার নিজের পছন্দ-করা কোন ক্যান্ডিডেট নেই ! বাবা-মা ভালো বুঝে যার সঙ্গে তার বিয়ের ঠিক করবে সে মত দিয়ে দেবে।
ছেলের দিকের ক্লিয়ারেন্স পেয়ে শরদিন্দু পাবলিক প্রসিকিউটর দীনবন্ধু বসুর কাছে কথাটা পাড়লেন।
বসুজা শুনে বেশ খুশি হলেন, মেয়ের বিবাহপ্রস্তাব এসেছে সহকর্মী বন্ধুর কাছ থেকে ।
প্রথিতযশা উকিল শরদিন্দুকে তিনি বহু বছর ধরে জানেন।
রসবোধযুক্ত সওয়াল করার জন্য কোর্টে তাঁর বিশেষ খ্যাতি আছে।
তাঁর কেসের শুনানির সময় কোর্টরুমে উপস্থিত শ্রোতাদর্শক মানুষজনের বিনোদন প্রতিক্রিয়ায় বেচারি জজসাহেবকে ঘন ঘন গ্যাভেল ঠুকতে হয় !
একমাত্র ছেলেকে ওকালতিতে রাজি করাতে না পারার খেদ শরদিন্দু অবশ্য মাঝে মাঝে সহকর্মীদের কাছে প্রকাশ করে থাকেন।
তবে এমটেক এমবিএ ছেলের জন্য সুক্ষ গর্বও অপ্রকাশ থাকে না !
দীনবন্ধু বাড়িতে প্রয়োজনীয় কথা-টথা বলে পাত্রী দেখার দিনক্ষণ বন্ধুকে জানিয়ে দিলেন…শরদিন্দু তো তাঁর মেয়েকে হামেশাই দেখছেন তবু শ্রীমতী মিত্র, বিশেষ করে পাত্র অরিন্দম তো ইয়ং জেনারেশন, নিজের জীবনসাথী পছন্দ করার ব্যাপারটা তার জন্য জরুরী বইকি !
বাড়িতে মেয়ে দেখতে যাওয়ার মানুষ তো কেবল তিনজন, শরদিন্দু, সুরঙ্গমা আর অরিন্দম।
মেঘা এতো শর্ট নোটিশে আসতে পারবে না জানিয়ে দিয়েছে ।
দাদার বিয়ে যদি ওখানেই ফাইনাল হয়ে যায় তাহলে স্বামী-স্ত্রী দুজনে একসঙ্গে উইক এন্ডে আসবে, ভাবী বৌদির সঙ্গে ভাব-টাব করে ফিরে যাবে !
তবে প্রথম সুযোগেই মেয়ের ছবি যেন অবশ্য পাঠানো হয়, আপাতত তাতেই চলবে !
মেয়ে দেখতে যাওয়ার নির্দিষ্ট দিন রবিবার । কোর্ট বন্ধ।
নিউ আলিপুরের মিত্রবাড়ি থেকে একটা গাড়ি বেরোল, ড্রাইভিং সিটে অরিন্দম, পেছনের সিটে বাবামা।
শরদিন্দু স্ত্রী-র বিবেচনায়…’তোমরা, পুরুষরা, এসব ব্যাপার ঠিক বোঝো না…তোমরা দুজনে গেলে কিছু হতো না…আমি যাচ্ছি তো, যদি ওরা কুটুম হয়েই যায়, খালি হাতে যাওয়া যায় না…’ গাড়ির ডিকিতে ছোট এক বাস্কেট ফল আর গাঙ্গুরামের রসকদম্বের একটা বড়ো বাক্স উঠিয়ে নিয়েছেন।
নিউ আলিপুর থেকে ঢাকুরিয়া আসতে রবিবারের বিকেলে কতোক্ষণই বা লাগে !
দীনবন্ধুর বাড়ি পৌঁছোবার মিনিট পাঁচেক আগে শরদিন্দু বন্ধুকে ফোন করে দিলেন, ওদেরও তৈরি হবার একটু সময় পাওয়া উচিৎ।
দীনবন্ধু পদমর্যাদায় কোর্টে শরদিন্দুর থেকে কিছুটা সিনিয়র, তবু ছেলেপক্ষ বলে কথা !
ফোনে আগাম খবর পেয়ে তিনি সদরে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন, ছোট্ট দলটাকে অভ্যর্থনা করে বাইরের হলে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
গৃহকর্ত্রী মৃদুলা সোফায় বসে অপেক্ষায় ছিলেন, পরস্পর নমস্কার বিনিময় হয়ে গেলো ।
শরদিন্দু এ বাড়িতে একেবারে অপরিচিত নন, কয়েকবার এসেছেন বিভিন্ন প্রোফেসনাল কাজে ।
দুই দম্পতির মধ্যে সাধারণ আলাপচারিতা চলছে, এমন সময় বাড়ির কাজের লোকটি একটা ট্রে-তে নানারকম নোনতা মিষ্টি খাবার নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলে রেখে চলে গেলো ।
শরদিন্দু চোখের ইঙ্গিত করতেই অরিন্দম উঠে বাইরের দিকে বেরিয়ে গেলো ।
একটু পরেই ফলের বাস্কেট আর মিষ্টির বাক্সটা নিয়ে এসে মৃদুলার হাতে দিতে.. ‘এসব আবার কেন…কিছুই না, এই সামান্য জিনিস তো’…দুই মহিলার মধ্যে এসব পর্ব মিটে গেলে শরদিন্দু বললেন, দীনুদা, এবার ঐশীকে ডাকলে হয় না ! আমরা ওর সঙ্গে একটু কথা বলি।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই !
দীনবন্ধু উঠে ভেতরের দরজার কাছে গিয়ে বেশ জোরগলায় ডাকলেন, ঐশী, ঐশী, নীচে আয় রে ।
সেই বাজখাই আওয়াজ শুনে অরিন্দমের হঠাৎ মনে হল যেন ডাক পড়ছে…’ঐশী বসু হাজির হো !’
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ঐশী ঘরের মধ্যে এলো, বরং বলা যেতে পারে, তার আবির্ভাব হলো !
হাল্কা মেকআপ, একটা মানানসই সিল্কের শাড়ি, গলায় লম্বা চেনের সঙ্গে চুনি রঙের পাথর-বসানো পেন্ডেন্ট আর বড়ো একটা খোঁপাতে ঐশীকে খুব সুন্দর লাগছে।
শরদিন্দু আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন…‘ঈশ্বরপ্রেরিতা’-র দিকে সুরঙ্গমার মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে তিনি যারপরনাই স্বস্তি বোধ করলেন…’যাক তাহলে আমার এতদিনের চেম্বারটা বেঁচে গেলো…আর অরু তো বলেই দিয়েছে মা-বাবার পছন্দই আমার পছন্দ…এখন যদি এমন মেয়েকে ছেলে বলে আমার পছন্দ হয়নি তাহলে তো ব্যাটাকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করবো…’
সস্ত্রীক শরদিন্দুকে প্রণাম আর অরিন্দমকে নমস্কার করে ঐশী সোফায় বাবা-মার পাশে বসে পড়লো।
সিনিয়রদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা চলছে।
ঐশী অরিন্দমের দু-একবার দৃষ্টি বিনিময় হল বটে কিন্তু ওই পর্যন্তই…’উকিলসাহেবা দেখতে তো বেশ সুন্দর…কিন্তু…আচ্ছা, দেখছি হাসিটাও বেশ…কিন্তু এর সঙ্গে তো আলাদা করে কথা বলাটা খুব জরুরি…বাইরে কোনো একটা জায়গায় মিট করার কথা বলতে হবে…ফোন নাম্বারটা পেলেই তো হয়ে যাবে…কিন্তু আমার বাবা মা-র আক্কেলটা দেখো…কোথায় দুজনকে একটু একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দেবে, তা না যতো সব ফালতু কথা বলে যাচ্ছে…আরে ঐশীর ছোটবেলার কথা জেনে তোমাদের কি হবে…আর আমার হলেও-হতে-পারে শ্বশুরশাশুড়ি বা-ই কিরকম…সোফা থেকে উঠে মা বাবাকে বাড়িটা একটু ঘুরিয়ে দেখাতে নিয়ে যেতে পারে তো…প্রথম বাড়িতে এলে এ তো একেবারে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল…তা না সব ফেভিকুইক লাগিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে…ইস মেঘাটা এইসময় এখানে থাকলে ঠিক একটা কায়দা বার করতো…’
অরিন্দম, কিছু নিচ্ছো না কেন, নাও মিষ্টি নাও, দাদা, দিদি, আপনারা শুরু করুন, চা আসছে ।
মৃদুলা নিজেদের কথার মধ্যে হঠাৎ অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠতে ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যেতে ও একটু চমকে উঠে বললো, না…নিচ্ছি…মানে বাইরের হাতটা একটু ধোবো…মানে কোথায়…’এইবার তো মেয়েকে বলো, যা তো ঐশী, অরিন্দমকে হাত ধোয়ার বেসিনটা দেখিয়ে দিয়ে আয় তো’
দেখা গেলো অরিন্দমের ট্যাকটিক্যাল ভাবনার সঙ্গে মৃদুলার কাজের কোন মিল হলো না !
মৃদুলা ডানহাতটা তুলে বললেন, ওই তো, করিডর দিয়ে সোজা চলে যাও, খাওয়ার হলটার শেষে বাইরেই একটা বেসিন পাবে। পাশেই ওয়াশরুম, সুইচ বাইরে, ভেতরেও একটা বেসিন আছে ।
‘…আছে যে তা তো বুঝলাম হলেও-হতে-পারেন শাশুড়ি মা ! মেয়েটাকে তো বলতে পারতেন উঠে গিয়ে আমাকে বেসিনটা দেখিয়ে দিতে…বেআক্কেলে সনাতনী মা…!’
অরিন্দম ওঠবার আগে আড়চোখে ঐশীর দিকে তাকালো…তিনি হাসিমুখে তাঁর পিতাশ্রীর মুখের দিকে বড়ো বড়ো চোখদুটো মেলে রয়েছেন, গদগদ মুখের ভাব, কোর্টে নিজের কেরদানির প্রশস্তি শুনছেন !
তিন
করিডরে কয়েক পা এগিয়েছে অরিন্দম এমন সময় আবার এক চমক !
প্রায় শূন্য থেকে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় করে নেমে এলো আর এক ঝকমকে সুন্দরী তরুণী !
একমুখ হেসে বললো, এই যে অরিন্দমদা ! দিদি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো না তো !
অরিন্দম মুখেচোখে হতভম্ব, প্রায় যন্ত্রচালিতের মতো বলে ফেললো, তুমি কে ?
বলেই ওর মনে পড়লো, মেয়েটা তো দিদি বললো ! তার মানে এ হচ্ছে ঐশীর ছোট বোন।
বাবা বলেছিল দীনবন্ধুদার দুই মেয়ে, ঐশী বড়ো মেয়ে।
‘আরে, এই মেয়েটা কি মনের ভাবনা বুঝতে পারে ! কি করে বুঝলো যে আমি ঐশীর সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলার জন্য সুযোগ খুঁজছি ! দারুণ স্মার্ট মেয়ে তো !’
অরিন্দম এইসব ভাবছে, মেয়েটা চোখমুখ ঘুরিয়ে বললো, আমি তৃষা। যদি আপনার সঙ্গে আমার দিদির বিয়ে হয় তাহলে আমি হয়ে যাবো আপনার শালী…যাকে বলে আধি ঘরওয়ালি !
বলে মুখে হাত চাপা দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো !
‘বাব্বা, এতো দেখছি চকোলেট বোম ! এ-ও ল পড়ছে না কি ! তাহলে তো এর হেভি পশার হবে !’
অরিন্দম ভাবনায় বাধা দিয়ে তৃষা বলে উঠলো, কি ভাবছেন অরিন্দমদা ! আমি তো আপনাকে চিনি, মানে চেহারায় চিনতাম ! বাবার কাছে নামটা শুনেছিলাম, আজ বারান্দা থেকে আপনাকে দেখে পুরো চিনতে পেরে গেলাম। আপনার কলেজ, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজেই তো পড়ি আমি, এখন এমটেক ফার্স্ট ইয়ার। চার বছর আগে আমি যখন ঢুকেছি তখন আপনার এমটেক ফাইনাল ইয়ার। কতোবার দেখেছি আপনাকে, কলেজে, ক্লাসের বাইরে, সবসময় একজন চশমা–পরা ফরসা সুন্দর ক্লাসমেটের সঙ্গে ঘুরতেন। আমরা ভাবতাম…যাক, এখন তো দেখছি আপনার বিয়ে হয়নি !
বলে তৃষা মুখ টিপে হাসলো।
‘
…’এই রে ! চকোলেট বোম তো এবার সত্যি ফেটে গেলো ! তৃষা কলেজে প্রায়ই সুমিতার সঙ্গে আমাকে দেখেছে ! এ মেয়ে তো সাঙ্ঘাতিক ! কে জানে নিজের দিদিকে এখন কি কি বলবে ! ঐশীকে তো আমার বেশ পছন্দ হয়েছে ! মহা মুশকিল হলো তো ! এখন তো আমার ঐশীর সঙ্গে কথা বলাটা আরও জরুরী হয়ে গেলো ! শেষ পর্যন্ত ওর সঙ্গে বিয়ে হোক বা না হোক, একটা ভুল ধারণা ওর মনে থেকে যাবে এটা তো হয় না । সুমিতা যে আমাকে ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেছে, এ কথাটা ওকে জানানো খুব জরুরি হয়ে পড়লো। এখন কি যে করি আমি !’
অরিন্দম স্থাণু হয়ে গিয়ে এসব আকাশপাতাল ভাবছে, এমন সময় তৃষা ওর ডানহাতে একটা কার্ড গুঁজে দিয়ে বললো, আর বেশি ভাববেন না, আমি দিদিকে কিচ্ছু বলবো না…কু-উ-ল ! এখন তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ঘরে আসুন তো। আমি যাচ্ছি ওই ঘরে। হ্যাঁ, কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না, কারণ, আমার এই জামাইবাবু বেশ পছন্দ হয়েছে !
বলে আবার মুখ টিপে হেসে তৃষা তাড়াতাড়ি বাইরের ঘরের দিকে চলে গেলো ।
অরিন্দম হাতের কার্ডটা তুলে নিয়ে দেখলো, লেখা আছে, ঐশী বসু, বি এ, এল এল বি, অ্যাডভোকেট, নীচে চেম্বারের ঠিকানা, শেষে ফোন নাম্বার !
ঠিক বলতে গেলে সেদিন বিয়ের কথাবার্তায় ফাইনাল কিছু হলো না।
তৃষা ঘরের মধ্যে ঢোকার পরেই ঘরের ফর্মাল আবহাওয়াটা একেবারে পালটে গেলো।
কথা বলার ভঙ্গিতে, পরিহাসে, দিদির বিভিন্ন রকম খামখেয়ালিপনার গল্প বলে উপস্থিত সকলকে সে একেবারে মশগুল করে রেখে দিলো।
অরিন্দম বুঝলো বিয়েটা যদি হয়ই তাহলে বাসরঘরে এই তৃষা একাই একশো হয়ে বিরাজ করবে।
বেরোবার সময় শরদিন্দু জনান্তিকে দীনবন্ধুকে বললেন, সুরঙ্গমার তো ঐশীকে বেশ পছন্দ হয়েছে, তিনি বুঝতেই পেরেছেন, ওপেন এন্ড শাট কেস ! এখন ছেলের মতটা জেনে নিয়ে খুব তাড়াতাড়িই তিনি কেসটা ক্লোজ করবেন। তবে ছেলের হাবভাবে তাঁর মনে হয়েছে রায় ফেভারেবলই হবে !
সুমিতা, আমি অরিন্দম বলছি । কেমন আছো ?
বুঝতে পেরেছি। নম্বরটা এখনও সেভ করা আছে, সরাইনি । খুব ভালো আছি । কিন্তু কি ব্যাপার, অরিন্দম ? কথা হয়েছিলো না যে আমরা পরস্পর আর যোগাযোগ রাখবো না, ফোনও করবো না !
ভুলিনি, মনে আছে !
-তবে ?
-সুমিতা, আমি বিয়ে করছি !
বাঃ ! দারুণ খবর ! কনগ্রাচুলেশন্স ! তা প্রেমে পড়ে বিয়ে করছো ?
না । বাবার বন্ধুর, মানে কলিগের মেয়ে।
হ্যাঁ, তোমার জন্যে সেটাই ঠিক…বিয়ের পরে প্রেম !
সুমিতা, তার আগে তোমার কাছে একটু সাহায্য চাই। সেজন্য তোমাকে ফোন করতে বাধ্য হলাম।
অ্যারেঞ্জড বিয়ে করতে প্রাক্তনের কাছে সাহায্য চাইছো ! হোয়াট অ্যান আয়রনি !
( সামান্য নীরবতা ) আমায় প্রাক্তন তো তুমিই করেছিলে সুমিতা ! আজ এসব পুরনো কথা কেন তুলছো তুমি ?
সরি, মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। যাকগে, ভুলে যাও। এখন বলো, তোমাকে কি সাহায্য করতে হবে !
আমার ভাবী স্ত্রী-র ছোট বোন তৃষা আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ে, এখন এমটেক ফার্স্ট ইয়ার।
তো ?
চার বছর আগে ও যখন ঢুকেছিলো তখন আমাদের ফাইনাল ইয়ার। আমাদের দুজনকে তখন সবসময় একসঙ্গে দেখেছে। আমার সঙ্গে প্রথম দেখাতেই আমাকে কথাটা আলাদা করে বললো ।
আচ্ছা !
জানি না ওর দিদিকে কি ভাবে কি জানিয়েছে । তবে আমি চাই না ঐশীর মনে এ ব্যাপারটা নিয়ে প্রথমেই কোন ভুল ধারণা বসে থাকুক ।
তোমার ভাবী স্ত্রী-র নাম ঐশী ! ভালো নাম !
সুমিতা, আমরা এক জায়গায় মিট করবো। সেখানে তুমি এসে যদি বলো, আমরা ক্লাসমেট হিসেবে পরস্পর বন্ধু ছিলাম, আমাদের মধ্যে তেমন কিছু প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক কোনদিন ছিল না…
ছিল না-ই তো ! সেটা আমিই আগে বুঝতে পেরেছিলাম তাই তো…
( সামান্য নীরব থেকে ) সে ঠিক আছে । কিন্তু এখন এটুকু সাহায্য তো তুমি আমাকে করতেই পারো সুমিতা। বলো, করতে পারো না ? আমি আর কোনদিন তোমাকে।বিরক্ত…
( নিঃশ্বাস ফেলে ) করবো । ঠিকই বলেছো, এটুকু সাহায্য তোমাকে আমি করতেই পারি। তুমি দেখা করার দিন ফাইনাল করে আমাকে জানিয়ো, কয়েক মিনিটের জন্য আমি চলে আসবো। সন্ধেবেলায় কিন্তু, অফিসের পরে, কয়েক মিনিট কিন্তু।
থ্যাঙ্ক ইউ সুমিতা। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। আমি জানতাম তোমার সাহায্য আমি ঠিক…
বাই দি ওয়ে, ঐশী কি প্রোফেসনাল অরিন্দম ? কি করে ও ?
অ্যাডভোকেট। আলিপুর কোর্ট । এখন বাবার চেম্বারেই বসে ।
মাই গড ! তোমার ভাগ্যে শেষে অ্যা-ড-ভো-কেট ! কি করে সামলাবে ! ঠিক আছে, আমাকে যদি খুব জেরা করে…তুমি কিন্তু আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ো !

চার
যোধপুর পার্কের ব্লু টোকাই কফি হাউসে ঐশী আর তৃষা বসে আছে প্রায় পনেরো মিনিট হলো।
কোর্ট থেকে ফিরে ঐশী নিজের পছন্দের একটা শাড়ি পরেছে, সঙ্গে মানানসই ব্লাউজ, কপালে একটা ছোট্ট টিপ, কান খালি, গলায় একটা সরু চেন, পেন্ডেন্ট।
তৃষার পরনে একটা সাধারণ কলমকারি প্রিন্ট কুর্তি আর ঢিলাঢালা অফ হোয়াইট পালাজো।
ঐশী ওকে একটা ভালো ড্রেস পরতে বলায়…’দিদি, বিয়েটা এখন তোর হচ্ছে, আমারও সময় আসবে, তখন দেখিস…’ বোনের এ কথার পর ঐশী আর কি বলবে !
অরিন্দম ফোন করে ঐশীকে বলেছে ওদের দুজনের একান্তে কিছু আলাপ করা উচিৎ।
গত রবিবার বাড়িতে তো সেরকমভাবে কথা বলার কোন সুযোগ হয়নি।
বাড়ি ফেরার পর বাবা-মা অরিন্দমের মত জানতে চাইলেও সে অফিসের কাজে কদিন ভীষণ ব্যস্ত আছে বলে এড়িয়ে গেছে। বলেছে তিন-চারদিন পরে জানাবে।
বুধবার বিকালে তার একটা ইম্পরট্যান্ট প্রেজেন্টেশন আছে সিইও-র সামনে।
সেদিন অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে। এখন মাথা জ্যাম হয়ে আছে, অন্য কিছু ভাবতে পারছে না।
আসলে ঐশীর সঙ্গে সুমিতার ব্যাপারটা ক্লিয়ার না করে নিলে ও কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
ওর ছোট বোন তৃষা কথা দিলেও অরিন্দম নিশ্চিন্ত হতে পারছে না ।
কে জানে, হয়তো অন্য কোন ভাবে দিদিকে কিছু বলেছে তৃষা ।
মুশকিলটা হচ্ছে ঐশীকে প্রথম দর্শনেই খুব ভাল লেগে গেছে অরিন্দমের ।
সেই রবিবার চুপচাপ থেকে ও ঐশীকে লক্ষ্য করে গেছে, ওর কথার ধরণ, আলাপচারিতা, ভাবভঙ্গি…আমার মনে হয়েছে এই ঐশীর সঙ্গে আমি আমার পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি ! একেই কি বলে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট, আমি জানি না ! সত্যিই তো মনে এরকম অনুভূতি আগে কখনো হয়নি আমার, যা রবিবারের পর থেকে সবসময় আমার মন জুড়ে আছে। নাহ, সুমিতার সঙ্গে যখন ঘুরে বেড়াতাম, সিনেমা নাটক যেতাম একসাথে, ভালো লাগা ছিলো, কিন্তু এইরকম প্রবল ভাবনা কখনো আমার মনে আসেনি তো । সেদিন ফোনে সুমিতা একটা মন্তব্য করেছিলো, বলেছিলো, আমার জন্যে নাকি বিয়ের পরে প্রেমটাই ঠিক ! তাই যদি হয়, তবে তাই হোক !
আজ হচ্ছে সেই বুধবার।
সত্যিই তো আজ সন্ধ্যায় অরিন্দমের প্রেজেন্টেশন আছে !
আর সে প্রেজেন্টেশন যে তার জীবনে খুব ইম্পরট্যান্ট, তাতে ওর কোন সন্দেহ নেই !
সাড়ে সাতটার মধ্যে অরিন্দমের পৌঁছে যাওয়ার কথা ।
দুই বোন একটু আগেই এসেছে।
তৃষা এসেই একটা কোল্ড কফি আর নাচো নিয়ে বসে আছে ।
অরিন্দমদা-কে বিলটা দিতে বলবে তৃষার মুখে এটা শোনার পর ঐশী কিছুতেই নিজের জন্য কোন স্ন্যাক্স অর্ডার করেনি, তৃষা বারবার বললেও করেনি।
তৃষার অকাট্য যুক্তি, পরে সারাজীবন ধরে যখন বিল দিতেই হবে তখন কদিন আগে কি এসে যায় !
ক্যাফের কাঁচের বিশাল দরজাটা দিয়ে বাইরের অনেকটা দেখা যায়, ফুটপাথ, রাস্তার অংশ।
তৃষা বসেছিল দরজার দিকে মুখ করে ।
হঠাৎ চাপা উল্লাসের স্বরে বললো, ওই তো অরিন্দমদা এসে গিয়েছে !
তারপরই একটু চকিত হয়ে স্বগতোক্তির মতো বলে উঠলো, আরে, সঙ্গে তো ওই মেয়েটাও আছে !
ঐশী ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে দেখতে পারছে না, দৃষ্টিকটু লাগবে। .
বললো, কোন মেয়েটা রে ? কে ? তুই চিনিস ?
তৃষা নিচু গলায় বললো, আস্তে ! চুপ কর। দুজনে ভেতরে ঢুকে গেছে। বাড়ি ফিরে সব বলবো।
অরিন্দম আর সুমিতা দুজনে ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক দেখছে ।
তৃষা উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বললো, অরিন্দমদা এই যে, এদিকে ।
চারজনের টেবিল, অরিন্দম আর ঐশী মুখোমুখি বসলো। ঐশীর বাঁদিকে সুমিতা, ডানপাশে তৃষা।
অরিন্দম বলল, তোমাদের আলাপ করিয়ে দিই। সুমিতা, এ হচ্ছে ঐশী, আলিপুর কোর্টে অ্যাডভোকেট, আর ও হচ্ছে তৃষা, ঐশীর ছোট বোন, আমাদের সায়েন্স কলেজেই রেডিও ফিজিক্স পড়ে, এমটেক ফার্স্ট ইয়ার । আর এ হচ্ছে সুমিতা, আগে গুপ্ত ছিল, বিয়ের পরে এখন চ্যাটারজি। ইনফোসিস-এ অ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজার । আমার সায়েন্স কলেজের ক্লাসমেট ও বন্ধু । তৃষা, আমরা দুজনেই তোমার কলেজে তিন তিন বছরের সিনিয়র, সুতরাং এবার বুঝে শুনে কথা বোলো ! বুঝলে ?
ক্যাবে ঘণ্টাখানেক সুমিতার সঙ্গে কথা বলে অরিন্দম এখন অনেক স্বচ্ছন্দ বোধ করছে এই মিটিংয়ের পজিটিভ ফলশ্রুতির ব্যাপারে।
তৃষা কোন ড্যামেজ করে থাকলেও সুমিতা যে ব্যাপারটা সামলে নেবে সে বিশ্বাস এখন ওর হয়েছে।
তৃষা তো চুপ করে সাজেশন হজম করার পাত্রী নয় ।
সে হাসতে হাসতে বললো, অরিন্দমদা, আপনি তো ‘ইতি গজ–র মতো করে আমাদের পরিচয়টা দিলেন। আসল ব্যাপারটাই চেপে গেলেন !
তারপরই বললো, আমি বলছি সুমিতাদি ! আপনাকে অরিন্দমদা বলেছে কি না জানি না। দিদির সঙ্গে অরিন্দমদার বিয়ের কথাবার্তা প্রায় আইবুড়ো ভাত অবধি এগিয়ে গেছে। তার মানে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে দিদি হবে অরিন্দমদার বৌ আর আমি হবো অরিন্দমদার একমাত্র শালী !
তৃষা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঐশী ওকে থামাবার চেষ্টা করতে করতেই সুমিতা হেসে বললো, সব জানি আমি ! তুমি অরিন্দমকে কি বলেছো সেটাও শুনেছি আমি । আর সেজন্যই ওর অনুরোধে আমি আজ এখানে কয়েক মিনিটের জন্যে এসেছি।
তৃষা একবার অরিন্দমের দিকে আর একবার দিদির দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে, সুমিতা হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো, আমাদের দুজনকে তুমি কলেজে অনেকদিন অনেকবার একসঙ্গে দেখেছো তো, ঠিক ? কিন্তু তার জন্য যদি তোমার কোন ভুল ধারণা হয়ে থাকে তাহলে সেটা সরিয়ে দাও । আমরা দুজনে খুব ভালো বন্ধু। তার বেশি কিচ্ছু নয়। কলেজের পরে অরিন্দম এমবিএ করতে ব্যাঙ্গালোরে চলে গেলো আর আমি প্রথমে চাকরি নিয়ে আর তার পরে বিয়ে করে আমার নিজের রাস্তায় চলে গেলাম। ব্যস ! আমাদের দুজনের গল্প ওখানেই শেষ ! এটুকু বলতেই এসেছিলাম ।
সকলে চুপ। ঐশী একবার এর দিকে আর একবার ওর দিকে তাকাচ্ছে।
তৃষা আগে কিছুই জানায়নি, তাই ও ভীষণ বিব্রতবোধ করছে, বোনের ওপর খুব রাগও হচ্ছে।
সুমিতা উঠে পড়ে বললো, ব্যস ! আজ চলি রে অরিন্দম, অলরেডি দেরি হয়ে গেছে ।
অরিন্দম একটু চমকে গেলো…আট বছরের পরিচয়ে সুমিতা কখনো তাকে তুই করে কথা বলেনি !
ও সামলে নেবার আগেই এবার ঐশী প্রথম কথা বললো, সে কি, এক কাপ কফিও না খেয়ে আপনি…
সুমিতা হাতের ঘড়িটা দেখে বললো, না ভাই, অলকেশ নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরে এসেছে। এই দ্যাখো, তোমাকে তো কংগ্রাচুলেশনস-ই বলা হয়নি ! কংগ্রাচুলেশনস ঐশী ! খুব সুন্দর মিষ্টি নাম তোমার ! আর তোমার ভাবী স্বামী-ও খুব মিষ্টি ! তবে…ওই একটু ইনট্রোভারট আরকি, মনের কথা বাইরে ঠিক করে খুলে প্রকাশ করতে পারে না। ওটুকু তুমি ঠিক করে নিতে পারবে। অল দি বেস্ট ! চলি রে !
অরিন্দম বোধহয় ওকে এগিয়ে দেবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই সুমিতা হাত নেড়ে বারণ করলো।
তারপরে ধীর পায়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেলো।
পাঁচ
রাত প্রায় বারোটা বাজছে ।
রিসেপশনে নিমন্ত্রিত অতিথিরা সকলেই এখন চলে গেছেন।
আলোয় সাজানো মিত্রবাড়ির সদর দেউড়ি, বাইরের হল, সব এখন ফাঁকা, কোন শোরগোল নেই।
শরদিন্দু সুরঙ্গমার নিকট আত্মীয়রাও সারাদিনের জমজমাট অনুষ্ঠানে সামিল হয়ে এখন যে যার নির্ধারিত ঘরে শোয়ার তোড়জোড়ে ব্যস্ত।
কিছুক্ষণ আগেও মেঘা তার কাজিন ভাই বোনেদের দল নিয়ে অরিন্দমের ফুলশয্যার ঘরে দারুণ হৈ হুল্লোড় করছিলো। সিনিয়র মা-মাসিদের তাড়নায় তারাও এখন রণে ভঙ্গ দিয়েছে।
ঘরের মধ্যে এখন কেবল ঐশী আর অরিন্দম ।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে খোঁপায় জড়ানো মালাটা খুলতে খুলতে ঐশী বললো, দরজার ছিটকিনিটা এবার দেবে তো, না কি !
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই তো দিচ্ছি। অরিন্দম তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলো ।
ঐশী এবার কানপাশা খুলতে খুলতে নিজের মনেই মুচকি হেসে আড়চোখে অরিন্দমকে দেখলো।
সে তখন খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে তার দুদিনের পুরনো বৌয়ের কার্যকলাপ লক্ষ্য করে যাচ্ছে।
কানের, গলার হাতের সব গয়না খোলা হয়ে ড্রয়ারে ঢুকে গেলো।
পার্লারে বেঁধে-আসা খোঁপাটা খুলে চুলটা হাল্কা আঁচড়ে নিয়ে এবার ঐশী ওপাশ দিয়ে ঘুরে গিয়ে খাটের ওপরে গ্যাঁট হয়ে বসলো।
তারপর আবার মুচকি হেসে বললো, হ্যাঁ, এইবার বলো তো, আমাকে বিয়ে করার জন্যে তুমি এতো ডেস্পারেট হয়ে গিয়েছিলে কেন ?
অরিন্দম তাড়াতাড়ি উঠে ঐশীর দিকে ঘুরে বসলো, না, মানে…আমি…ডেস্পারেট ? না না…মানে বাড়িতে বাবা মা-র এতো চাপ ছিল…না, মানে.. তুমি কি করে বুঝলে বলো তো !
অরিন্দমের হাল ছেড়ে দেওয়া কণ্ঠস্বর !
মেয়েরা সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারে, ছটা ইন্দ্রিয় তাদের, উকিল হলে তো আরও বেশি বোঝে ! তুমিই কেবল কিছুই বুঝতে পারো না ! তুমি ডেস্পারেট না হলে ছুটকি তোমাকে কি না কি বলেছে তুমি কফি হাউসে একেবারে সুমিতাকে এনে হাজির করো ! ছুটকি আমাকে সব বলেছে !
অরিন্দম হঠাৎ দারুণ স্মার্ট হয়ে গেলো।
ঐশীর চোখে চোখ রেখে বললো, তুমি যখন এতোই বুঝতে পারো, তখন কেন ডেস্পারেট হয়ে গিয়েছিলাম সেটাও তো নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো ! পারো নি ?
অরিন্দমের চোখের দিকে ঐশীও তাকিয়ে রইলো।
কয়েক মুহূর্ত কেবল ! তারপর মুখ টিপে হেসে ঐশী বললো, সে তো বুঝেইছিলাম ! তবে তুমি যে কিছু বোঝো না, সেটাও সত্যি !
কেন ! আমি কী বুঝি না !
পাঁচ বছর ধরে মেয়েটার সঙ্গে ক্লাসে ওঠাবসা করলে, ক্লাসের বাইরে ঘুরলে ফিরলে, আর ও যে তোমাকে ভালবেসে ফেলেছে সেটাই বুঝতে পারলে না ! আর আমি পাঁচ মিনিট দেখেই বুঝে গেলাম !
কিন্তু আমি তো কখনো ওকে সেভাবে দেখিনি…মানে সেরকম কিছু কখনো বলিওনি…
সেই-ই-তো ! সে তো ক্যাফেতে সুমিতার কথায়ই বুঝতে পেরেছিলাম…তোমার দিক থেকে সেরকম কিছু ছিল না। ভালোলাগাটা থাকতেই পারে। অবশ্য সুমিতাকে হাজির করে তুমি আমার একটা বড়ো উপকার করেছো । জানো তো মানুষের মন সন্দেহপ্রবণ, লইয়ার-রা বোধহয় একটু বেশি। ছুটকির কাছে তোমার ইউনিভারসিটি লাইফের একটা ঝলক শুনে আমার মনে একটা সন্দেহ হতে পারতো ! সেটা আর গজিয়ে ওঠার সুযোগ পেলো না ! তবে তোমার যে সুবিধেটা ছিল আমার তো সেটা নেই ।
তার মানে !
আকাশ দুবছর হলো অস্ট্রেলিয়াতে চলে গেছে। আমার সঙ্গে ব্রেক-আপ হওয়ার পর আমারই এক ক্লাসমেটকে বিয়ে করে দুজনেই ওখানে চলে গেছে। ওখানেই সেটেলড হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। কোনো যোগাযোগ নেই। আর দেশেও নেই ! তাই আমি আর ওকে সাফাই দেওয়ার জন্য হাজির করতে…
ঐশী কথাটা শেষ না করে চুপ করে গিয়ে অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে রইলো ।
অরিন্দমও কয়েক মুহূর্ত চুপ…ছুটকি তো সেদিন আমাকে এটাও বলতে পারতো ! কি হতো তাহলে…
কিন্তু বিয়ে হয়ে গেলে মানুষের কতো যে পরিবর্তন হয়ে যায় !
অরিন্দমও আবার স্মার্ট হয়ে গেলো !
নতুন বৌয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে মাখা মাখা স্বরে বললো, ঐশী, আমরা কি আজকের রাতটা সুমিতা আর আকাশকে নিয়েই কথা বলবো ?
না, কখনোই নয় । আলোটা নিভিয়ে দাও।


ভাল লাগল
মিষ্টি মাখা ছোট্ট গল্প, ভালো লাগলো
মিষ্টি মাখা ছোট্ট গল্প ভালো লাগলো
‘রাজযোটক’ পড়ে বেশ একটা নির্মল আনন্দ পেলাম! একটা মিষ্টিমধুর প্রেমের গল্প। আশিসবাবু খুব সরসভাবে গল্পটা জমিয়ে দিয়েছেন। খুব স্বচ্ছন্দভাবে ঘটনাবলী এগিয়ে গেছে এক বাঞ্ছিত পরিণতির দিকে। কাহিনীবিন্যাস চরিত্রগুলিকে খুব বাস্তবোচিতভাবে উন্মোচিত করেছে। গল্পকারের মুন্সীয়ানা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়!
খুব মিষ্টি গল্প একটা ! মনস্কত্ব নিয়ে লেখক গভীর বিশ্লেষন করেছেন বোঝা যায় ।
A very sweet and refreshing short story
বেশ ভালো l
মন্দ নয়
একটি রসস্নিগ্ধ নিটোল গল্প। মিষ্টিমধুর পরিণতি মনে একটা ভাল লাগার রেশ রেখে দেয়।
Enjoyed reading. Congratulations to the writer for the good story. Thanks.
অনাবিল সহজ সরল সুন্দর গল্প। খুব ভালো লাগলো লেখা টা।
Khub bhalo laglo
খুব সুন্দর গল্প
Valo legeche 🙂
সুন্দর।।রবিবারের দুপুরে এই লেখাটা পড়ে মনটা ঝরঝরে লাগছে।।তবে একটি প্রশ্ন আছে।।রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে B.Tech, M.Tech সমাপ্ত করে দুই বছরের MBA করতে পাত্রের বয়স 25/ 26 হয়ে যাবে।।সেক্ষেত্রে 26 এই বিয়েটা সমসাময়িক চিন্তাভাবনার সাথে অমিল।
স্যার আপনার গল্প গুলো বেশ ভাল লাগে পড়তে। সুন্দর একটা বাঁধন থাকে প্রত্যেকটি গল্পে, যেটা উপভোগ্য।
ওটা বাধন হবে, autocorrect এ বাধা হয়ে গেছে
A brilliant story to read. Quite absorbing too. The traits of the characters are well sketched. The closing part of the story depicts the writer’s maturity in thinking.
নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের মিষ্টি গল্প ।