বেনারসে আমাদের বাড়ি ছিল ৬/৭৩ পিতাম্বরপুরায় ৷ আমাদের বাড়ি থেকে হরিশ্চন্দ্রঘাট মাত্র দু’মিনিট আর কেদারঘাট ৩ মিনিট ৷ শুনেছিলাম আমার ঠাকুর্দা রামতারণ ভট্টাচার্যকে তাঁর শিষ্যা নাটোরের মহারাণী সেটি দান করেছিলেন ৷ এক সময় নাকি সে বাড়ির পাশের মাঠে দুটি হাতি বাঁধা থাকতো শ্যাম পিয়ারী আর রাম পিয়ারী ৷ সে সব কথা এর আগেও বলেছি ৷ ওখানে আমার যারা বন্ধুরা ছিল তারা নানা ভাষার ৷ তাদের সঙ্গে আমার বছরে দু’তিনবার দেখা হত মাত্র ৷ অথচ আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটি ছিল গভীর ৷
একবার শ্রীরামপুর থেকে পদ্মশ্রী প্রাপক বিশিষ্ট প্রবীণ আইনজীবী ফণীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীরা সদলে বেনারসে যাবেন ঠিক করেছিলেন ৷ সেকথা তিনি বাবাকে বলতেই বাবা বললেন – তোমার বন্ধুদের বলে দ্যাখো তো , তারা এঁদের কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারবে কিনা ৷
তখন মোবাইল ছিল না ৷ বাড়িতে টেলিফোনও ছিল না ৷ তাই চিঠিই ভরসা ৷ চিঠি লিখলাম সুভাষকে আর শঙ্করণকে ৷ উত্তর এলো আসতে বলো কোনও চিন্তা নেই ৷ আমরা তখন সবাই ১৯-২০ ৷ বাবাকে বললাম ৷ বাবা ফণী জেঠুকে বললেন ৷


এখানে ফণীজেঠুর কথা এখানে একটু বলি ৷ বিখ্যাত প্রবীণ আইনজীবী ৷ মুখ্যত চুঁচুড়া কোর্টেই বসতেন ৷ সাধারণত সেই মামলাটাই নিতেন , যেটা তিনি বুঝতেন খুব চ্যালেঞ্জিং এবং জিতবেন ৷ যদি জমি সংক্রান্ত মামলা হত পরিস্থিতি বুঝে মক্কেলের সঙ্গে চুক্তি করতেন যদি বেহাত হয়ে যাওয়া জমি তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বেহাত জমির ৫০-৫০ বা ৩০-৭০ তাঁর হবে ৷ এই ভাবে তাঁর প্রচুর জমি হয়েছিল ৷ আমি শুনেছি তাঁর এত স্মরণ শক্তি ছিল যে তিনি যখন জজের কাছে বলতেন তখন আইনের বইয়ে কোন সালের কোন খন্ডের কত পৃষ্ঠার কত নং লাইনে সেই অর্ডারের উল্লেখ আছে তা তিনি অনায়াসে বলে যেতেন ৷ জজ লিখে নিতেন ৷ ফণীজেঠুরা তিনভাই ফণী জেঠু আর বনমালী জেঠু বিয়ে করেন নি ৷ ছোট ভাই বিয়ে করেছিলেন ৷ দুই ভাইই প্রচুর সম্পত্তির মালিক ছিলেন ৷ অথচ প্রবল কৃপনতা ছিল দুজনেরই ৷ ফণীজেঠু যে সামলাটি পড়ে প্রথম মামলা করা শুরু করেছিলেন জীবনের শেষ মামলাটিও সেটিই পড়ে করে ছিলেন এবং জিতে ছিলেন ৷ সবাই বলতেন ফণীবাবু মামলা নিলে আর কোনও চিন্তা থাকবে না ৷
ফণী জেঠুর মাত্র দুটি ধুতি ছিল একটি পরে কোটে যেতেন আর অপরটি অর্দ্ধেক করে বাড়িতে পরতেন ৷ একটি বড় গামছা কিনে অর্দ্ধেক করে ব্যবহার করতেন ৷ সকালে তাঁর ব্রেকফাস্ট ছিল দুটি বিস্কুট আর এক কাপ র’ চা ৷ দুপুরে কোর্টে যাবার আগে লাঞ্চ ছিল চরু , আধসের দুধে দু’মুঠো চার ফেলে সেদ্ধ করে সেই ভাত বা চরু ৷ বিকেলে এক কাপ র চা আর রাত্তিরে দুটো রুটি ৷


প্রচুর জ্ঞান ছিল তাঁর ৷ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন ৷ প্রচুর বইয়ের একটা লাইব্রেরী ছিল তাঁর ৷ শুনেছিলাম একটুও কেনা নয় ৷ পড়তে নিয়ে ফেরত না দেওয়া বই সেগুলি ৷ এরকম আমারও দুটি বই চিরকালের জন্য পথ হারিয়েছিল তাঁর সেই বিশাল লাইব্রেরীতে ৷
তবে ওই লাইব্রেরীর বইতে তিনি কাউকে হাত দিতে দিতেন না ৷ আমি একবার ভুল করে একটি বই খুলে পড়তে গিয়ে দেখেছিলাম তৎকালীন বেশ কয়েকটি ১০০০হাজার টাকার নোট দিয়ে পেজ মার্ক করে লাল পেন্সিল দিয়ে অনেক লাইনে দাগ দেওয়া ছিল ৷ উনি জানতে পেরে আর ঐ লাইব্রেরীতে আমায় ঢুকতে নিষেধ করেন ৷
ফণীজেঠুর কাছে একটা প্রাচীন তামার ঘটিতে ৪৮ টা আকবরী মোহর ছিল ৷ আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম ৷ কনিষ্কের পাঞ্জা , বহু ঐতিহাসিক মুদ্রা ছিল ৷ তিনি মারা যাবার আগে তাঁর আইনের বইগুলি সব চুঁচুড়া আদালত লাইব্রেরীতে দান করেন ৷ ন্যাশানাল লাইব্রেরীতে অন্য বই অনেক দান করেন ৷
সাতের দশকে তিনিই প্রথম ৪১ জন মুসলমানকে গঙ্গায় স্নান করিয়ে হিন্দু ব্রাহ্মণ করে তাঁদের চৌধুরী পদবী দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন ৷ তাঁর পাণ্ডিত্বের জন্যেই সেই সময় সরকার তাঁকে ” পদ্মশ্রী ” উপাধি দিয়েছিলেন ৷
এ নিয়ে বাবা তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি বিভিন্ন শাস্ত্রের সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়ে বাবাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ৷
তাঁকে অনেকে চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া বলতেন ৷ তাঁর মাথায় মগজ নামক কম্পিউটারে এত তথ্য ছিল যে বহু গবেষক তাঁর কাছে তথ্য এবং তথ্যের উৎস নিতে আসতেন ৷ দুঃখের বিষয় তিনি মারা যাবার পর তৎকালীন এস.ডি.ও শর্মিষ্ঠা ঘোষ তাঁর সংগ্রহের সব জিনিস সংরক্ষণ করতে যাবার আগেই তার সব কিছুই স্থানীয় অনেকেই লুটেপুটে নিয়েছিলেন ৷
আর বাকি যা দীর্ঘদিন অবহেলায় পরেছিল তা সবই বল্মীকস্তুপে পরিণত
হয়েছিল ৷
যাই হোক সেই ৭০ বছরের যুবা ফণীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে ২১ জন অতি যুবা এবং যুবতী রওনা হলেন বেনারসে ৷ তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়স ৬৬ বছরের একজন ছিলেন আর সবচেয়ে বেশি বয়সের ৯৩ বছরের একজন ছিলেন ৷

মুগলসরাই স্টেশন থেকে আমার বেনারসের বন্ধুরা তাঁদের নিয়ে হরিশ্চন্দ্রঘাটের কাছে শিবালয়ে একটা অতিথিশালায় রাখে ৷
সুভাষ , শংকরন , মহাদেও , বিভাস , শফিকুর এই পঞ্চমুর্ত্তি মিলে সাতদিন তাঁদের যেভাবে আতিথিয়তা দিয়েছিল তাতে ২১ জন অতি যুবা-যুবতী পরে বলেছিলেন নিজেদের বাড়িতেও তাঁরা ঐরকম স্বাচ্ছন্দ্য পান না ৷ মনে রাখতে হবে বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র শফিকুর বাদে প্রত্যেকেই ছিল ১৮-২০র মধ্যে ৷ শুধু শফিকুর ২১+ ৷ তাঁরা চলে আসার সময় বন্ধুরা ২১ জনের প্রত্যেকের হাতে একটা করে ছোট্ট স্মারক তুলে দিয়েছিল ৷ খুব সামান্য ছিল তার দাম ৷ ফণীজেঠু বলেছিলেন – এই উপহারটা আমার জীবনের সবচেয়ে দামী উপহার ৷ ও ছেলে ক’টির ঋণ জীবনে শোধ করতে পারবো না ৷
কয়েক মাস আগে আমার ভাগনা আমায় বেনারসে নিয়ে গিয়েছিল ৷ দেখলাম সুভাষ দিল্লীতে তার ছেলের কাছে থাকে ৷ শংকরণ ক্যান্সারে বছর তিনেক আগে মারা গিয়েছে ৷ শফিকুরের বাড়িটাই নেই ৷ মদনপুরায় কেউ বলতেই পারেনি তার কথা ৷ পরে মনে হয়েছে কোনও কারনে হয়তো বলতে চায়নি আমায় বহিরাগত দেখে ৷ এককালে কুস্তি লড়া মহাদেও বয়সের তুলনায় অতিবৃদ্ধ হয়ে গিয়েছে ৷ বহুদিন পর আমার নাম শুনে উঠে এসে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না ৷ ” তু কলকাত্তা মৎ যা ইয়ার ৷ হমকো তেরা ইয়াদ হ্যায় ! ” বলে পরিবারের সবার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে হাতটা ধরে বসে রইলো ৷ তারপর রাবরী , মালাই , মালাইচপ ইত্যাদি আমার প্রিয় জিনিস খাইয়ে নিজে টোটোয় তুলে দিয়ে টোটোওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে বলে দিল এ মেরা বচপন কা জিগরি দোস্ত , সামালকে লে যানা ৷ টোটো ছাড়তেই দেখলাম তার দু’চোখে জল টলটল করছে আবার ৷ কি ভয়ঙ্কর কো- ইন্সিডেন্ট কিছুক্ষণ আগে এই লেখা যখন লিখছি হঠাৎ একটা ফোন এলো তার ছেলে আমায় ফোন করে জানালো আজ সকালে সেরিব্রাল হয়ে সেও চলে গিয়েছে ৷ আমি একচোখ জল নিয়ে ঝাপসা লিখছি এখন ৷ বিভাসের কোনও পাত্তাই পাইনি ৷
আমাদের বেনারসের বাড়িটা আজও আছে ৷ সেরকমই আছে শুধু তা দখলদারের মালিকানায় চলে গিয়েছে ৷ দখল করে সেটি নতুন দলিল করে বিক্রি করা হয়েছে অন্য এক বাঙালীর কাছে ৷ আমি ওখানে গেলে ওই পাড়াতেই একটা সাউথ ইন্ডিয়ান গেস্ট হাউসে উঠি ৷ অনেক রাতে পাড়া যখন ঘুমিয়ে পরে আমি ধীরে ধীরে বাড়ির কাছে গিয়ে তার গায়ে হাত বোলাই ৷ দেখি আজও বাড়ি আমায় চিনতে পারে ৷ ফিসফিস করে কথা বলে ৷ সেসব সেইইই কবেকার দস্যিকালের কথা ৷
আমার শৈশব কৈশোর আর প্রাক্ যৌবন উঁকি দেয় আসেপাশে ৷ মিটি মিটি হাসে ৷

এবার ফিরে আসি শ্রীরামপুরে সেই দিনে ৷ আমাদের বাড়িতে মাটির বড় মূর্তি এনে সরস্বতী পুজো হত ১৯৫৪ সাল থেকে ৷ আমার বাবার একটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্কুল ছিল ৷ এলাহাবাদের প্রয়াগ সঙ্গীত সমিতির অনুমদিত
” শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় “৷ আমার বাবা-ই একমাত্র শিক্ষক ছিলেন ৷ গান , যন্ত্রসঙ্গীত সবই সেখাতেন ৷ বহু বিশিষ্ট মানুষ বাবার ছাত্রছাত্রী ছিলেন ৷ বছরে একবার লিখিত এবং প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা এখানেই হত ৷ পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থেকে পরীক্ষক আসতেন ৷ বহু অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীও এই সেন্টার থেকে পরীক্ষা দিতে আসতো ৷ আমিও তখন বাবার কাছে তালিম নিয়ে সেতার বাজানো শুরু করেছিলাম এবং প্রয়াগ সঙ্গীত সমিতি থেকে ৬ষ্ঠ বর্ষ বা বি -মিউজ পাশ করে ছিলাম ৷ তবে আমার শেখা ছিল বাবার শুনে শুনে ৷ বাবা খালি দেখতেন আমার মীর বা ঝালা সঠিক হচ্ছে কিনা ৷ ১৯৮২ সালে বাবা মারা যাবার পর আমার সেতার চিরকালের জন্যে ঘুমিয়ে গিয়েছে ৷ আর জাগবে না ৷
এখন আমার কবিতায় সেই সব রাগ-রাগিনীরা নানা ভাবে বাসা বাঁধে ৷
সেই স্কুলের জন্যেই সরস্বতী পুজো শুরু ৷ আমি জন্মের পর থেকেই দেখছি কত ছাত্রছাত্রী আসতো তখন ৷ তা প্রায় ৬০-৬৫ জন তো বটেই ৷ মা-ই সব রান্না করতেন ৷ দুটো তোলা উনুনে ৷ খিচুরি পাঁচ রকমের ভাজা , ফুলকপি আর বাঁধাকপির তরকারী , চাটনি পায়েস ৷ রাত তিনটের সময় উঠে উনুন ধরিয়ে স্নান করে রান্না শুরু করতেন মা ৷ অসীম ক্ষমতা ছিল আমার মায়ের ৷ ঠিক এগারোটার মধ্যে সব রান্না শেষ ৷ একবার পঞ্চমী দ্রুত ছেড়ে যাবে বলে মা সারারাত রান্না করে সূর্য উঠলে খিচুরি আর চালের পায়েস রেঁধে ছিলেন ৷


আমরা তিন ভাই বোন আমি মানু আর মিতা বসে থাকতাম কখন পুষ্পাঞ্জলি হবে তবে কুল খেতে পাবো ৷ সে সময়ের নারকেল কুল আর টোপাকুলের স্বাদ এখন আর নেই ৷ গ্রাম বাংলায় সেই টোপাকুলের গাছ আর নেই ৷ নারকেল কুলতো নেইই ৷ এখন যেসব কুল তার কোনও স্বাদই নেই ৷ মায়ের হাতে সেই বড় বড় টোপাকুলের চাটনির স্বাদই ছিল আলাদা ৷ বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে ফলগুলোর নিজস্ব প্রাকৃতিক স্বাদও যেন হারিয়ে গেছে ৷ হারিয়ে গেছে কুল চুরি করার দস্যিকালের দুপুরগুলোও ৷ সেসময় একধরনের ছোট্টছোট্ট বুনো কুল পাওয়া যেত ৷ হজমিনুন দিয়ে দারুণ লাগত ৷ সেসব গাছ শহীদ হয়ে গিয়েছে ৷

সেই গানের স্কুলও আর নেই ৷ বাবা মারা যাবার পর বাবার এক ছাত্রীকে দিয়ে কয়েকদিন চালিয়ে ছিলাম ৷ তারপর একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছি ৷ তবে সেই একাত্তর বছরের পুজো আজও চলছে ধারাবাহিক ভাবেই ৷ শুধু মাঝখানে বাবা আর মা চলে যাবার পর দু’বছর বন্ধ ছিল ৷ এখন আর মাটির মূর্তি আনি না ৷ অষ্টধাতুর মূর্তিতেই পুজো করি ৷ তবে এখনও ভোগ খায় ১০-১২ জন ৷ আমার মায়ের সেই মহামায়ার মত শক্তি আমার স্ত্রীর নেই ৷ বাস্তবিক না থাকারই কথা ৷
আজ এই রাতে লেখা যখন শেষ করছি হঠাৎ যেন কানের কাছে ফিসফিস করে মহাদেওয়ের কথা শুনলাম – আব্বে দোস্ত ইয়াদ রাখনা হমকো ….
আমার মোবাইলটা হাত থেকে হঠাৎ পড়ে গেল খাটের ওপর ৷ মনে মনে বললাম …ভুল ভুল ,
আমার শৈশব কাঁদছে , আমার কৈশোর কাঁদছে আমার প্রাক্ যৌবন কাঁদছে …আমি মোটেও কাঁদছি না মেরে ইয়ার মহাদেও… যানা তো পরেগা ভাই একদিন তেরে পাশ ৷

ক্রমশ


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Nandita Sinha
Nandita Sinha
8 months ago

খুব ভালো লাগছে