পায়ে পায়ে বজবজ (পর্ব ২ )

মাস্তুলে কালো মেঘ মেখে সেদিন কোলকাতায় এসে পৌঁছালো যে ঐতিহাসিক জাহাজটি; সমুদ্রের ঢেউ এর মতোই রক্তের ঢেউও গুনেছিল সে। আজ কোথায় গেল সেই জাপানী জাহাজ -“কোমাগাটা মারু”?

থৈ থৈ আলোয় ভেসে যাওয়া চরাচর, প্রতিবারই দুর্গা দশমীর পরে দুচোখে অন্ধকার নিয়ে স্তব্ধ হয়। যেমন সেদিন নিকষ অন্ধকার মেখে নিথর হয়েছিল বজবজ। আমরা ক’জনই বা জানি তা?
দিনটি ১৯১৪ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর , প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরবর্তী সময়। সেদিনও ছিল দুর্গা-দশমীর পরের দিন। উৎসবের আলোর সঙ্গে নিভে গিয়েছিল ১৯ জনের প্রাণের আলো।
চাইনিজ টেম্পল এবং টং আছিও’র সমাধি দেখা সেরে, দুপুরের খাবার খেয়ে আমাদের বাড়ী ফিরে আসারই কথা ছিল। সেইমতো দেখেশুনে তুলনামূলক চলনসই একটা পাইস হোটেলে ঢুকলাম। কিন্তু আমাদের জন্য আরও অপ্রত্যাশিত চমক অপেক্ষা করছিল।
খাওয়ার টেবিলে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হওয়ার সুবাদে জানতে পারলাম, এই চত্বরেই আরও এক রোমহষর্ক জায়গা আছে, নাম – “কোমাগাটা মারু”। এটি বজবজ স্টেশন চত্ত্বরের অনতিদূরেই অবস্থিত, এবং বজবজ স্টেশনের পুরাতন নামও “কোমাগাটা মারু”। ওই ব্যক্তির কাছ থেকেই প্রাথমিকভাবে নামটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মর্মান্তিক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হওয়া গেল। তারপর ড্রাইভার দাদার সঙ্গে রাস্তা চিনে অবশেষে পৌঁছোলাম।
অদূরেই দেখতে পেলাম ঋজু শিরদাঁড়ার শুভ্র মাস্তুলখানি, শহীদদের ক্ষত আগলে দন্ডায়মান। এই সেই জাপানী জাহাজ, -‘কোমাগাটা মারু’র স্মৃতি বিজরিত প্রতীকী এক জাহাজ-বাড়ি। কিছুটা এগোতেই চোখে পড়লো জাপানী জাহাজখানির ইতিহাস বিস্তারিত ভাবে বিবৃত করা রয়েছে ওই প্রতীকী জাহাজ-বাড়িটির বাইরের দেওয়ালে।

জানতে পারলাম, ১৯১৪ সালে ৩৭৬ জন শিখ, হিন্দু, ইসলাম প্রভৃতি সাহসী যাত্রীদের নিয়ে এক জাপানী জাহাজ ‘কোমাগাটা-মারু’ পারি দেয় কানাডার উদ্দেশ্যে। তৎকালীন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে এবং খাদ্য ও বাসস্থানের সন্ধান করতে কিছু ভারতীয়, শিখ সম্প্রদায়ের গুরদিত সিং এর নেতৃত্বে এই জাহাজে করে প্রথমে হংকং এবং তারপর কানাডার ভ্যাঙ্কুভার বন্দরে পৌঁছায়। স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের তাগিদে পৌঁছানো সেই মানুষগুলোর পরবর্তী দিনগুলো যদিও স্বাদ-হীন ভাবে কাটতে থাকে। কানাডায় ভারতীয় অভিবাসী নীতি অনুযায়ী গুরদিত সিং সহ ৩৭৬ জন যাত্রী বোঝাই কোমাগাটামারুকে মূল ভুখন্ডে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় কানাডা সরকারের তরফ থেকে (পরে জানা যায়, শুধুমাত্র ২৪ জন প্রবেশাধিকার পেয়েছিল)। এরপর তারা টানা ২ মাস ভ্যাঙ্কুভার বন্দরে প্রায় অভুক্ত এবং আটক দিন কাটায়। মাস দুই পর, নৈরাশ্যের লহর ঠেলে ঠেলে ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ১৯১৪; নিজ ভূমি কোলকাতায় ফিরে আসে ওই যাত্রী বোঝাই জাহাজটি। সেখানে ঘটে গেল আরও এক বিপদ! রুখে দাঁড়ালো ব্রিটিশ গভর্নর। গান-বোট, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নিয়ে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য স্যর উইলিয়াম ডিউক জাহাজটিকে থামতে বাধ্য করে। তাদের জন্য এক বিশেষ ট্রেনে পাঞ্জাবে ফিরে যাওয়ার আদেশ ধার্য হয়। কিন্তু নির্ভিক গুরদিত সিং অটল থাকেন ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে। তিনি এবং বাকী যাত্রীরা চায় সঙ্গে করে আনা গুরু গ্রন্থ সাহিবকে গুরুদ্বারায় প্রতিষ্ঠা করতে এবং কোলকাতায় রুটিরুজির চেষ্টা করতে। উপহার স্বরূপ জোটে ব্রিটিশ সরকারের গুলিবর্ষণ! ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ১৯ জন নিরস্ত্র নিরীহ যাত্রী।

ঠিক এই জায়গাতেই নির্মান করা হয় “কোমাগাটা মারু’র প্রতীকী এই জাহাজ বাড়িটি। এই নিষ্ঠুরতম গণহত্যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও উদ্বুদ্ধ করে।
বিবৃতিটির থেকে সরে জাহাজ-বাড়ির লোহার গেটের দিকে রওনা দিল আমাদের চোখ। কিন্তু বাধা পোহালাম আমরাও। এবারেও তাল কেটে দিল গেটে ঝোলানো মস্ত বড়ো এক তালা। কী মুশকিল! যথারীতি বিমর্ষ মন নিয়ে চারপাশ দেখতে থাকলাম। কিন্তু “মুশকিলের” পরেই যে “আসান” আসন পেতে বসে থাকবে তার একটা আশা পূর্বক আভাস পাচ্ছিলাম। সুনসান জায়গাটিতে কয়েক হাত দূরে দুজনের দেখা পেলাম। পায়ের লাগাম ভেঙে চলে গেলাম তাদের সঙ্গে আলাপ করতে। ভারত পেট্রোলিয়ামের দ্বাররক্ষী রঞ্জন নন্দী এবং স্থানীয় এক ভদ্রলোক অভিজিৎ ঘোষ কয়েক মিনিটেই আমাদের সঙ্গে আন্তরিক হয়ে গেলেন। তাদেরকে অনুরোধ করায়, রঞ্জন নন্দী কিভাবে যেন ম্যাজিশিয়ানের মতো চাবি জোগাড় করে আনলেন। এক পশল বৃষ্টির পর মনের দিগন্তে রামধনু উঠলো।
শ্রদ্ধাবনত হয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। একপাশে একটি ফলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখিত শহীদদের নাম। শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হলো। প্রণাম জানালাম।

জাহাজের পাটাতনের আকার বিশিষ্ট চাতালের মাঝ বরাবর উঠে গিয়েছে মাস্তুলখানি। মাস্তুলের দেওয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে সেদিনের মর্মান্তিক গুলিবর্ষণ এবং নিহত যাত্রী সহ গুরদিত সিং এর কথাচিত্র। সেই মাস্তুলের একেবারে সামনে দাঁড়ালে এর আকারগত উচ্চতার পাশাপাশি বীর শহীদদের স্মৃতির উচ্চতায় সত্যিই মাথা উঁচু হয়!

মাস্তুলের সামনের দেওয়াল থেকে জানলাম এই প্রতীকী জাহাজ-বাড়ির উদ্বোধন করেছিলেন আমাদের দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু।
দেবী দুর্গা বিসর্জনের পরের সেই দিনটিতে, অন্যায়ের প্রতিবাদে ওঁদের সাহসের সঙ্গে জীবন বিসর্জনও ভারতবাসীর কাছে এক বিশেষ অর্জনের নথি।
আমাদের হৃদয়ের সমুদ্রে “কোমাগাটা মারু” উদ্বিগ্নতা, গর্ববোধ এবং শ্রদ্ধার তুফান তুলে যুদ্ধ জয়ের শুভ্র হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
তবে, পরিতাপের বিষয়, বজবজের এই অন্য রূপ খুব কম মানুষই স্পর্শ করেছেন। পর্যটন মানচিত্রে এই ঐতিহাসিক স্থানটি আজও ব্রাত্য। আশা রাখি, আগামীতে সাধারণ মানুষের কাছপ এই স্থানটির গুরুত্ব বোঝাতে পর্যটন শিল্প অগ্রনী ভূমিকা পালন করবে।
ক্রমশ

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

খুব সুন্দর বিষয়ে লিখেছ, কোমাগাটা মারু জাহাজের নাম শুনেছি ইতিহাস বইয়ে কিন্তু এত ইনফরমেশন অজানা ছিল।