আমরা আগে ঋষি বঙ্কিম সরণির যে বাড়িতে থাকতাম সেটার মালিক ছিলেন কলকাতার আশুতোষ কলেজের অধ্যক্ষ পঞ্চানন সিংহ ৷ খুবই পণ্ডিত মানুষ ৷ বাবার পাণ্ডিত্ব দেখে ১৯৫৫ সালে নিজে বাবাকে এনে ভাড়া বসিয়েছিলেন সে বিশাল প্রাচীন বাড়ির একতলায় ৷ ভাড়া ছিল ১০ টাকা আর লাইট বিল ১ টাকা ৷ তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া বেড়েছে ৷ বাবার সংসারও একজন থেকে আস্তে আস্তে মোট পাঁচজনে এসে থেমেছে ৷ অত বড় বাড়িতে সব্বাই ভালো বাসতেন আমাকে ৷ বাড়ির ছোটছেলে বকুকাকু , যাঁকে সবাই অধ্যাপক অলোক সিংহ বলে জানতেন , তিনি আমায় দেখলেই মজা করে বলতেন – কোথা পার্থ / ধরে মারতো ৷ আসলে তখন অর্থাৎ ৫৭-৬৭ সালে আমিই এক মাত্র ছোট ছেলে ৷ কালি জেঠু বা বকুকাকা সহ চার বোনের কারোরই বিয়ে হয়নি ৷ সবার ছোটবোন চিত্রা আমরা যাকে খুচকি পিসি বলতাম সে এত পড়াশুনো করতো যে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল ৷
পরে বাবার সঙ্গে বাড়ির বড় মেয়ে সরযূ একটা ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে প্রবল অশান্তি করেন ৷ বাবাকে তিনি বলেন জুতো মেরে পুলিশ দিয়ে ঘাড় ধরে এই বাড়ি থেকে দুর করে দেবো ৷ অপমানিত বাবা ১৯৬৪ সালে শ্রীরামপুর কোর্টে মামলা করেন ৷ মামলায় উকিল ছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত তিন আইনজ্ঞ ধীরেন লাহা , যিনি বাবার স্কুলেস সম্পাদক ছিলেন ৷ বিশ্বনাথ ঘোষাল যিনি বাবার ছাত্র ছিলেন ৷ আর সমীরবাবু ৷ সেই কেস শ্রীরামপুর চুঁচুড়া এবং বাবা ১৯৮২ সালে মারা যাবার পর আমি হাইকোর্ট পর্যন্ত লড়েছিলাম ৷ আমাদেরই জয় হয়েছিল যদিও যাঁরা মামলা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কালিজেঠু ছাড়া কেউই জীবিত ছিলেন না ৷

ওই বাড়িতে থাকতে থাকতেই একবার একটা পদ্য লিখেছিলাম ১৯৭৬-৭৭ এ “ধুত্তুরি ছাই “

” চুন খসা এই ছোট্ট ঘরে
খুঁজছি আমার শৈশব
এই তো পড়ে জামার বোতাম
জলের বোতল বই সব ৷
ওই দেয়ালে আমার আঁকা
বুদ্ধু-ভুতুম , মক্ষী
তার পাশে এক জালের খাঁচা
মায়ের তোতা পক্ষীর ৷
থাকত যাতে তিলের নাড়ু
মুড়কি , গুড়ের তক্তি
কৌটোগুলোয় জং ধরেছে
আর লাগে না ভক্তি ৷
শহর এখন বাড়ছে রোজই
এই বাড়ি তাই আদ্দি ,
ফ্ল্যাট হবে , রোজ বলছে সবাই-
সব পুরোনোই বাদ দি ৷
এইখানে এই কাচের ঘরে
ইলেকট্রনিকস্ কর্ণার –
বসবে , তাতে থাকবে টিভি
ইলেকট্রনিক্স ঝরনা ৷
রং মেলানো নতুন বাড়ি
দশতলার ওই কক্ষে
থাকবো সুখে , ধুত্তুরি ছাই
জল আসে তাও চক্ষে ! “

এই পদ্যটি লেখার পঞ্চানন সিংহ মশায়ের বড় ছেলে কালি জেঠু , কালিপদ সিংহ বলেছিলেন – সত্যিরে তোর ভাবনার সঙ্গে আমার ভাবনাটা বেশ মিলে যাচ্ছে ৷ তবে বাড়িটা বিক্রী হবেই , আমি হাইকোর্ট থেকে ইনজাংসান দিয়ে বিক্রী বন্ধ রেখে ছিলাম ৷ পরে আমার ছাত্র প্রোমোটার সঞ্জয় বাড়িটা কিনে ফ্ল্যাট করতে চাইলে এবং বকুকাকার ছেলে ও কালিজেঠুর ছেলে আমায় অনুরোধ করায় , ২০১৫ সালে ইনজাংসান তুলে নিয়েছিলাম ৷ বাড়ি ভাঙা শুরু হলে আমি প্রতিদিন একবার গিয়ে ঘরের দেওয়াল গুলোয় হাত বুলিয়ে আসতাম ৷ দেওয়ালে আমার আর আমার দুই বোন মানু এবং মিতার ছোটবেলার ছাপগুলো যেন আমার সঙ্গে কথা বলতো ৷ আমার চোখ জুড়ে যে আষাঢ় নামতো কেন তা বুঝতাম না ৷ এখন আমি নিজে ওই পাড়াতেই বাড়ি করেছি ৷ ওই বাড়ি এখন বিশাল পাঁচতলা ফ্ল্যাট ৷ পাঁচতলায় আমায় একটা ফ্ল্যাট দিয়েছিল সেটা আমি আমার ভাগনা মানে আমার ছোট বোনের ছেলে দীপকে দিয়ে দিয়েছি ৷ দীপ ওর সঙ্গে আরও কিছুটা অংশ বাড়িয়ে নিয়ে ববড় ফ্ল্যাট করে নিয়েছে ৷
ওই বাড়িতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ পরিচারিকার কাজ করেছে ৷ আমার মনে আছে সরস্বতী দি বলে একজন কাজ করত ৷ তার একটা মেয়ে আর একটা ছেলে ৷ মেয়েটা বোবা কালা ৷ সবাই হাবি বলত ৷ এরা দুজনেই এত বিশ্বাসী ছিল যে বছরে তিনবার আমরা যখন বেনারসের পৈত্রিক বাড়িতে যেতাম সব ঘরের চাবি তাদের কাছেই থাকতো কোনও দিন একটি জিনিসের স্থান বদল হয় নি ৷ সরস্বতীদি অনেকের সহযোগিতায় হাবির বিয়ে দিয়েছিল ৷ কিন্তু এক বছরের মধ্যে তাকে তারা পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল ৷ আজও আমার মনে হাবির হাসিমুখটা উঁকি দিয়ে যায় ৷ সরস্বতীদির সেই হাহুতাস আজও ভুলতে পারিনি ৷ সরস্বতীদি সব বাড়ির কাজ ছাড়লেও আমাদের বাড়ির কাজ ছাড়েনি ৷ বলেছিল আমি একাই সব করতে পারবো ৷ একসময় শরীর আর সঙ্গ দেয়নি বলে কাজ ছেড়ে ঘরে বসে যায় ৷এই কিছুদিন আগে সরস্বতীদি মারা গিয়েছে প্রায় ৯৮ বছর বয়সে ৷ তার ছেলে গৌতম বড় ভালো ছেলে ৷ এখন সাইকেল করে মাছ বিক্রি করে ৷ প্রতিদিন আরত থেকে মাছ নিয়ে প্রথমেই আমার কাছে আসে আমাকে তার কেনা দামে মাছ বিক্রি করে তবে অন্য লোকের কাছে যায় ৷ এর একটাই কারন ও যখন ব্যবসা শুরু করে তখন শুরুর টাকাটা আমি দিয়েছিলাম ৷ ও আমায় মাছ দিয়ে সেই টাকা শোধ করেদিয়েছে অনেকদিন ৷ কিন্তু আজও তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই ৷

সরস্বতীদির পর আমাদের বাড়ি কাজ শুরু করে পাস্পতি আর তার দু’মেয়ে তারা এবং লাখপতি ৷ আমি তখন ক্লাস এইট ৷ সদ্য যৌবনে পা দিচ্ছি ৷ পাস্পতি একা কাজ শুরু করলেও কয়েকদিন পর তারাও কাজে যোগ দেয় ৷ তারাকে ভয়ঙ্কর দেখতে ছিল ৷ যেমন কালো তেমনি মোটা ৷ আমারই বয়সী ৷ হিন্দীভাষাভাষী হলেও বাংলায় থেকে বাংলাতেই কথা বলতো ৷ তারাও খুব বিশ্বাসী ছিল ৷
আশ্চর্য পাস্পতি আমি যাকে বুড়িয়া বলতাম সে আর তার দু’ই মেয়ে আমায় দাদা বলতো আর রাখীপূর্ণিমায় আমার হাতে রাখী পরাতো ৷ এরকমই চলছিল বছর খানেক পর ৷ তখন আমি নাইনে পড়ি , হঠাৎ একদিন তারা ঘর মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বলল – জানুস দাদা আমি তুমার বাড়ি কাজ করি শুধু তুমাকে দেখবো বলে ৷ তুমাকে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে ৷ কাউকে বলবি না যেন ৷ তাহলে আমায় কাজ ছাড়িয়ে দেবে ৷ আমি সেদিন কোনও উত্তর দিই নি ৷ তবে সেই প্রথম কেউ আমায় সুন্দর বলেছিল গোপনে ৷ হোকনা সে পরিচারিকা , অসুন্দরী হিন্দী ভাষাভাষী ৷ দু’তিন মাস পরেই ছাপড়ায় তারার বিয়ে হয়ে গেল ৷ যাওয়ার সময় এসে আমাদের সবাইকে প্রণাম করে আমাকে চুপিচুপি বলে গেল – দেখবে আমি পালিয়ে আসবো ৷ কিন্তু মাস ছয়েক পরে একদিন বুড়িয়া এসে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলল – জানো আমার মেয়েটাকে নেপালে বেচে দিয়েছে বিশ হাজার টাকায় ৷ পুলিশ কোনও ভাবেই আর উদ্ধার করতে পারেনি ৷ সেই হারিয়ে গেল তারা ৷ পাসপতি আমাদের বলল – আমি দেশে বিয়ে করবো না বাবা ৷ এখানেই করবো ৷
পাস্পতির বরটা কারখানায় কাজ করত , প্রচুর মদ খেত , হটাৎ একদিন রহস্যজনক ভাবে মারা গেল ৷ পরে জানতে পারা গেল ৷ ও নাকি তারার হদিস পেয়ে ওকে উদ্ধারের সব ব্যবস্থা করেই ফেলেছিল ৷ তাই মেরে দিয়েছে ৷ কেউ বলল – না না মেয়েটা বিক্রীর ব্যাপারে ওরও হাত ছিল ৷ ওই জন্যেই ওখানে বিয়ে ঠিক করেছিল ৷ টাকা পায়নি বলে ও সব বলে দেবে বলায় ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিলা৷ যাই হোক তারা হারিয়েই গেল ৷ বুড়িয়ার অনেক বয়েস এখন ৷ পনেরো সালের পর থেকে ও আর কাজ করতে পারে না ৷ তবে প্রতিবার বুড়িয়া আর বড় মেয়ে সোনা এবং ছোটমেয়ে লাখপতি এসে রাখী বেঁধে যায় ৷ পুজোর সময় বুড়িয়াকে আমি শাড়ি সায়া ব্লাউজ ও কিছু টাকা হাতে দিলে , ও দু’ হাত আমার মাথায় রেখে আশীর্বাদ করে ৷ মাস ছয়েক আগে বুড়িয়া হঠাৎ এসে বলল – তারা এসেছিল কাল , নেপালে দু’ হাত ঘুরে এখন এক খুব ভালো নেপালী লোকের কাছেই থাকে ৷ বুড়ো হলেও লোকটা ভালো ৷ সবার কথা জিজ্ঞাসা করেছে ৷ বারবার বলেছে – দাদা কেমন আছে রে ?
শুনেই আমার মনে সেই কুচকুচে কালো অল্প মোটা একমাথা কুচকুচে কালো চুলের জিদ্দি মেয়েটার ছবি যেন সামনে ভেসে উঠলো ৷
বুড়িয়া তারাকে জিজ্ঞাসা করেছিল – দাদার নতুন বাড়ি যাবি ? খুব সুন্দর বাড়ি ৷ ও উত্তর দিয়েছে – না আমার এই শরীর নিয়ে ও বাড়ি গেলে ওদের অমঙ্গল হবে ৷
গলির মুখ থেকে আমার বাড়ি দেখে হাত জোড় করে প্রণাম করে চলে গিয়েছে ৷
দুই পরিচারিকা সরস্বতীদি আর বুড়িয়া দুজনকেই বাবার নির্দেশে আমাদের পরিবারের লোক বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল ৷ আমার বাবা মানসিক ভাবে নানা সংস্কারে বিশ্বাসী থাকলেও ৷ কাজের লোকদের কখনও অসম্মান করতেন না ৷ সন্দেহ করতেন না এবং সবাইকে বলাছিল কেউ যেন তাদের চোর না ভাবে ৷
আমার নতুন বাড়িতে বুড়িয়া যখন কাজ করেছে ঘর পরিস্কার করতে গিয়ে খাটের নীচে থেকে চারটে ৫০০ টাকার নোট পেয়ে তুলে আমার মাথার বালিশের নিচে রেখে আমায় শাসন করে বলেছিল – লক্ষ্মীকে এভাবে অবহেলা করা উচিত নয় দাদা ৷ আমি ওকে ১০০ টাক দিতে গেলে বলেছিল , তুমি আমায় বাড়ির লোক মনে করো না ! এ টাকা দিয়ে আমায় ছোট করে দিওনা দাদা ৷ আমি সেদিন
হাতজোর করে ওকে প্রণাম করেছিলাম ৷ সেই বুড়িয়াকেই যেদিন আমার স্ত্রী প্রশ্ন করেছিল ৷ আমার দামী কাপসেটের দুটো পাচ্ছি না বুড়িয়া তুমি কি জানো ? বুড়িয়ি বলেছিল – আমি তো দেখিনি ৷
আমার স্ত্রী বলেছিল – তুমি ছাড়া তো আর বাড়িতে কাল বাইরের কেউ আসেনি ! কে নেবে বলো তো ৷
সেদিনই আমি বুড়িয়াকে ডেকে বলেছিলাম – বুড়িয়া আমার মা নেই ৷ তুমি আমার মায়ের মতোই ৷ এই বুড়ো বয়সে আমি চাইনা তুমি অপমানিত হও ৷ কাল থেকে তুমি আর কাজে এসো না ৷ কিন্তু এমনি আসবে রোজ ৷ চা খেয়ে যাবে ৷
পরে সেই কাপ পাওয়া গেল আমার স্ত্রীর ঘরের খাটের অনেকটা নীচে অনেকটা ভিতর থেকে ৷ সে ভুলে গিয়েছিল যে তার বোন ভগ্নীপতিকে কয়েকদিন আগে চা দিয়েছিল আর ধোয়া হয় নি ৷ সেই থেকে আমার বাড়িতে একটিও পরিচারিকা নেই ৷ সব কাজ নিজেরাই করি ৷ অনেক অনুরোধ অশান্তি মিনতির পরেও কাজের লোক আমার বাড়িতে নেই ৷ আমার বাবা বলতেন – যে চুরি করে সে দোষী , যে সন্দেহ করে সে শতেক দোষী ৷
আমি সে কথা চিরকাল মেনে চলি ৷



সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, আগস্ট ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
1 year ago

খুব খুব ভালো লাগছে আপনার জীবন চরিত! ওই ছোট্ট বেলার কবিতা অসাধারণ!