আজ দুপুরে পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে বাগানে সদ্য বৃষ্টি ভেজা ছাতিমগাছটার দিকে তাকিয়ে আছি আনমনে ৷ ভাঙা ভাঙা মেঘের থেকে কুচি কুচি আলো এসে পড়েছে পাতার ওপর ৷ সে এক অপূর্ব দৃশ্য ৷ হঠাৎ দেখি কয়েকটা মৌটুসী বাবুই আর টুনটুনি উড়ে এসে বসেছে সপ্তপর্ণীর ডালে ৷ তারপর পাশের কলকে গাছের ফুলগুলো থেকে মাঝে মাঝে মধু খেতে খেতে তাদের সেকি তুমুল আড্ডা ৷ মন দিয়ে দেখছিলাম ৷ কতক্ষণ দেখেছি মনে নেই হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে ৷ মনে পড়ে গেল গত শতকের নয়ের দশকে ঠিক এই সময়টিতেই আমাদের আড্ডা জমত পোদ্দার কোর্টের তিনতলায় একটা দশ বাই দশ ঘরে ৷ কবি মঞ্জুষ দাশগুপ্ত ছিলেন মধ্যমণি ৷ তৎকালের বাংলা সাহিত্য জগতের দিকপাল মানুষেরা সেখানে আসতেন ৷ সঙ্গে বাংলাদেশ ও বিদেশ থেকেও আসতেন কত বিশিষ্ট লেখকেরা ৷ ওখানেই ছিল আমাদের অর্ন্তবৃত্ত ৷ সেখানে মঞ্জুষদার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে নিয়ে এই বৃত্তটি করা হয়েছিল ৷
মঞ্জুষদার এই আড্ডা বহু মানুষকে সমৃদ্ধ করেছে ৷ আড্ডার অনেকে আজ বাংলা সাহিত্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন ৷ চা , মুখরোচক টা আর আলোচনা ছিল আড্ডার প্রাণ ৷ ওখানেই আমাদের পরিচয় কত মানুষের সঙ্গে ৷ প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনদের ভিড় ছিল উল্লেখ করার মতোই ৷ এত রকমের খাওয়া হত সেখানে যে বন্ধু তাপস রায় আড্ডার নাম দিয়েছিল “ভোজরাজের সভা ” ৷ নির্বাচিত আড্ডাবাজদের অনেকেই মাঝে মঞ্জুষদার সঙ্গে চলে যেতাম কলকাতার বাইরে অন্য কোথাও , অন্য কোনও খানে ৷
বাইরে সন্ধ্যা নামছে , আড্ডা শেষে পাখিগুলো যেযার নিজের বাসার দিকে চলে গেছে ৷ শুধু একটা বাবুই বসে আছে গাছটার নিচের ডালে নিজের ঘরটার দরোজায় ৷ একটাও জোনাকী পায়নি সে যে ঘরে সন্ধে বাতি দেবে ৷ একটু ঘরে ঢুকছে আবার উড়ে যাচ্ছে জোনাকীর খোঁজে ৷
ওর কাজ দেখতে দেখতে
আরেকটা আড্ডার কথা মনে পড়ছে ৷
রবিবার সকালে বসতো কবি শুদ্ধসত্ত্ব বসুর বাড়ি ৷ “একক ” পত্রিকার সম্পাদক শুদ্ধসত্ত্বদা প্রাচীন ধর্মী কবিতা পছন্দ করতেন ৷ কিন্তু তাঁর আড্ডায় তরুনরা যদি নতুন কাব্যভাষায় কবিতা লিখত তিনি খুব খুশি হতেন , এককে তার কবিতা সম্মান দিয়ে ছাপতেন ৷ তবে সেখানে নবীনদের উপস্থিতির সংখ্যা খুবই কম ছিল ৷ প্রবীণরাই বেশি ৷ শুদ্ধসত্ত্বদার সমসাময়িক প্রায় সবাই ৷ সেখানেই প্রথম পরিচয় কুমারেশ ঘোষের সঙ্গে ৷ “যষ্ঠিমধু”র স্বাদ প্রথম সেখানেই পেলাম ৷” যষ্ঠিমধু ” হাতে পেয়ে বাড়িতে এসে পড়েই যৌবন খুব সেই রসে মজে ছিল ৷ কুমারেশদা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন মজার কিছু ছড়াও ৷ ” সাহিত্য ও সংস্কৃতি”র সঞ্জীব কুমার বসুর সঙ্গে এখানেই আমার পরিচয় ৷ পরবর্তীকালে তাঁর পত্রিকায় আমি তিনটে সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছি ৷ একবার সঞ্জীবদাকে বলেছিলাম – দাদা এত বড় প্রবন্ধ লিখছি কিছু পারিশ্রমিক দেওয়া যায় না ৷ গম্ভীর মুখে বলেছিলেন – যায় না ৷ শুদ্ধসত্ত্ব তো কতবার লিখেছে তাদেরই আমি টাকা দিইনি ৷ একটা বই দিচ্ছি তো ৷ আবার কি ! শুদ্ধসত্ত্বদা পরে আমায় হাসতে হাসতে বলেছিলেন – বিজ্ঞাপন থেকে ও প্রচুর টাকা পায় ৷ যৌবনে জহরলালের স্নেহধন্য সঞ্জীব কাউকেই টাকা দেয় না ৷ তুমি যে সাহস করে বলেছো এটাই অনেক ৷ দীপ্তেন্দুদা শুনে বলেছিলেন – আজকালকার ছেলে , ঠিক করেছো চেয়ে ৷ সঞ্জীবদাকে তারপর আর ঐ আড্ডায় আসতে দেখিনি ৷ কিন্তু অবাক হয়েছিলাম ১৪০৯ এর শারদ সংখ্যায় আফসার আহমেদ এর ছোটগল্প নিয়ে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলাম সঞ্জীবদা তার জন্যে পত্রিকার সঙ্গে ১০০ টাকা দিয়েছিলেন ৷ দীপ্তেন্দুদা নিজের পয়সায় আড্ডায় আমাদের একটা করে মিষ্টি খাইয়েছিলেন ৷ অথচ আমার থেকে একটি টাকাও চাননি ৷ তবে সেখানে খুব বেশিদিন যাইনি আমি ৷

হঠাৎ দেখলাম বাবুইটা একটা মৌমাছি কোথাও থেকে নিয়ে ঢুকে গেল ঘরে ৷ বাবুই গিন্নি তার সঙ্গে বেশ রেগেমেগেই কথা বলছিল দেখে ভাবলাম এটাই হয় ৷ এটাই বোধহয় বিশ্বজ্ঞান ৷
বিশ্বজ্ঞান শব্দটা মনে হতেই দেবকুমার বসুর কথা মনেপড়ে গেল ৷ আমাদের বন্ধু কবি প্রবাল কুমার বসুর বাবা ৷ সেখানে একটা ভালো আড্ডা বসতো ৷ শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বেশ কয়েকবার দেখেছি সেখানে ৷ তবে বেশিক্ষণ বসতেন না ৷ এসে একটু বসেই চলে যেতেন ৷ মাঝে মাঝে দেবুদা বেশ শাসন করেই কথা বলতেন শক্তিদার সঙ্গে৷
শক্তিদাও চুপ করে শুনতেন কথা বলতেন না ৷ আসতেন সে সময়ের আরো অনেক বিখ্যাত লেখক ৷ দেবুদা ছিলেন সবার দাদা এবং কমন অভিভাবক ৷ ওই আড্ডাতেই আমার পরিচয় হয়েছিল ” সাহিত্য সেতু”র সম্পাদক জগবন্ধু কুন্ডু র সঙ্গে ৷ তিনি লেখক ছিলেন না ৷ তবে সম্পাদক হিসেবে খুব সুনাম যেমন ছিল , তেমনি দেমাকও ছিল ৷ আড্ডায় আমি গেলেই দেবুদা আমায় আগে কবিতা শোনাতে বলতেন ৷ সেখানে একজন অতি প্রবীণ মানুষ আসতেন , তিনি যেদিন থেকে শুনেছিলেন আমি মঞ্জুষদার কাছে নিয়মিত যাই উনি আমায় অপছন্দ করা শুরু করেন ৷ পরে তাঁর মুখ থেকেই শুনেছিলাম একটি পত্রিকায় মঞ্জুষদা তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থকে তিক্ত সমালোচনা করেছিলেন বলে ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক মনে করতেন মঞ্জীষদা কবিতাটাই বোঝেন না ৷ জগবন্ধুদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ধীরেধীরে বেশ গভীর হল , তারপর ? সে এক দীর্ঘ কাহিনী ৷
আড্ডা ব্যাপারটাই চিরকাল আমার প্রিয় ব্যাপার ৷ উপস্থিত থাকতে যেমন ভালো লাগে , তেমনই দেখতেও ৷ ওই যে পাখিদের আড্ডা আপনারা যাঁরা মন দিয়ে দেখননি তাঁরা বুঝতেই পারবেন না সেগুলি কত আকর্ষণীয় হয় ৷ আমার তো মনে হয় জীবকুলে সব্বাইই আড্ডা দেয়৷

ভুদেব মজুমদার


সেই যে বিখ্যাত গান “কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই ” সত্যিই আমাদের আড্ডাটা আজ আর নেই ৷ অথচ সেই গত শতাব্দীর আট দশকের শেষে কবি সমর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম কফিহাউসে যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাদের কেঈ ফুরুৎ হয়ে পাখি বা অন্য প্রাণীদের আড্ডায় চলে গেছে ৷ আর যারা আছি এখনও কচিৎ কখনও সেখানে আড্ডা দিতে গেলেও বাড়ি ফেরার তাড়াটি পকেটে নিয়ে যাই ৷ ওই নয়ের দশকে আমার বাড়িতে বসতো সাহিত্যের আড্ডা , পঞ্চাশ মাস হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ৷ তখন সেখানে আসতেন বিখ্যাত কবিরা ৷ একবার নয়ের দশকের কবিরা এসে আমার স্ত্রীকে তাদের জন্য রান্না করতে দেখে আমার স্ত্রীকে হটিয়ে দখল করে নিয়েছিল রান্না ঘর ৷ সেসব দিন আজও স্মৃতির পাতা থেকে ফুর ফুর করে উড়ে এসে মনে বসে ৷ তারপর মিলিয়ে যায় ফের ৷
২০১৪ সাল থেকে আবার আমার বাড়িতে সাহিত্যের আড্ডা শুরু হয়েছে ৷ ১০৮ মাস ধরে নিয়মিত প্রতিমাসের শেষ বৃহস্পতিবার ঘড়ি ধরে ঘোষিত সময়ে শুরু হয় প্রতি মাসে ৷ আড্ডাটির নাম ” বেস্পতির আড্ডা ” শ্রীরামপুরে এরকম নিয়মিত ধারাবাহিক আড্ডা আজ আর নেই ৷ সেদিক দিয়ে এই আড্ডা আজ ইতিহাস ৷ পশ্চিমবঙ্গের দু’একজন ছাড়া সমস্ত বিশিষ্ট কবি গল্প লেখক রা এসেছেন এই আড্ডায় ৷ বিভিন্ন কবিরা এসেছেন রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে , অন্যান্য রাজ্য থেকে এমন কি বিদেশ থেকেও ৷ এই আড্ডার বড় প্রাপ্তি কবিতার পুরাতন ধারায় বিশ্বাসী অনেক প্রবীণ কবিও কবিতাকে ডাকছেন ” তুমি নব নব রূপে এসো” বলে ৷ বিখ্যাত পত্রিকায় তাঁদের লেখাও ছাপা হচ্ছে ৷
আড্ডা যে শুধু সাহিত্যের বা সংস্কৃতিরই হতেই হবে তা নয় যেকোনও বিষয়েই আড্ডা হতেই পারে ৷ মাঝে মাঝে আড্ডা-মাতাল সন্ধের দিকে ডেকে আনি দু’চারজনকে ৷ এই ” হঠাৎ আড্ডা “ও খুব জনপ্রিয় ৷ এরকম সঙ্গীতের আড্ডাও হয় ৷
আড্ডায় এসেনসিয়াল হল চা বা কফি , সঙ্গে চপ , মুড়ি – চানাচুর , সিঙ্গারা ইত্যাদি ৷ যদি এগুলির একটিও না থাকে তাহলে ও আড্ডাবাজদের নরকবাস অনিবার্য ৷
বছর দশেক আগে একটা আড্ডায় গিয়েছিলাম নৈহাটিতে ৷ একবন্ধু আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকটা কারনে ৷ আড্ডার নামটি ভারি মজার “মুখরোচক” ৷ ১৫-১৬ জন সদস্য ৷সবাই খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ ৷ সদস্য বাদ দিয়ে আমন্ত্রিত অতিথি ছাড়া অন্যদের সে আড্ডায় প্রবেশ অধিকার ছিলনা ৷ এঁরা কেউ বাড়িতে বা সমাজে খিস্তি বা খারাপ কথা বলতে পারেন না তাই এই আড্ডায় যে যত পারেন দুই-চার-ছয় অক্ষরের খিস্তি দিয়ে নিজেদের মধ্যে কথোপকথন করতেন , এমন কি কুকথায় ছড়া বা গল্প লিখেও পড়তেন ৷ মনে আছে সেখানে ইছাপুরের একজন বিখ্যাত ডাক্তারবাবুও ছিলেন ৷ একবার কি দু’বার গিয়েছিলাম সেই আড্ডায় ৷ নিয়ম ছিল আড্ডা শেষে উঠে আসার সময় সবাই আদা দিয়ে গরম লিকার চা খেয়ে মুখশুদ্ধ করে বাড়ি যাবেন ৷ ওই আদা চা টাই ছিল মুখশুদ্ধি ৷
আমাদের গঙ্গার ধারে একসময় আমরা বৈকালিক আড্ডা ছিল ঝালমুড়ি সহ ৷ আমরা পাঁচজন শৈল প্রত্যুষ এষা শিখা এবং আমি ৷ কত প্রেমময় ছিল সে আড্ডা ৷ চূড়ান্ত প্রেম মেখে আমরা বাড়ি ফিরতাম সেই সাত আটের দশকে ৷ অথচ আমাদের মধ্যে কারও সঙ্গে কারও প্রেম ছিল না ৷ সে আড্ডা থেকে আমি অনেক ভালো ভালো কবিতার অনুষঙ্গ পেয়েছি ৷ আমাদের বন্ধুত্বের কথোপকথন একটু দূরে বসে অন্যরা মন দিয়ে শুনত ৷ একদিন না গেলে তাঁরা প্রশ্ন করতেন আপনারা কাল আসেন নি তাই সবাই মিস করছিলাম আপনাদের ৷
আমাদের শ্রীরামপুরের বটতলার মোড়ের আড্ডাটা আজ আর নেই ৷
বলতে গেলে নেই তো অনেক কিছুই ৷ তবে কোনও কিছু না থাকলে আড্ডা থাকবেই ৷ এইতো এই লেখাটা লিখতে লিখতেও আমার বাগানের গাছদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম হঠাৎ বাংলাদেশের এক বন্ধু ফোন করে জানালো কনফারেন্স লাইনে আমেরিকার এক বন্ধু আছে তার সঙ্গে একটু আড্ডা হবে ৷ আরে আমাদের ঘড়ি বলছে এখন রাত সাড়ে বারোটা ৷ অনলাইন আড্ডা চালু ৷ লেখা এখানেই শেষ ৷ হুম বলে রাখি এ রকম হতে পারে ভেবেই নিজে কিন্তু আগেই ফ্লাক্সে ব্ল্যাককফি করে রেখেছি ৷ আড্ডা হি কেবলম ৷


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Dipak Banerjee
Dipak Banerjee
9 months ago

খুব ভালো লাগলো আড্ডার গল্প! তবে আদা চা খেয়ে মুখশুদ্ধি করাটা ক্লাসিক!
বেস্পতির আড্ডায় যাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে!
ঐতিহাসিক ব্যাপার!

NANDITA Sinha
NANDITA Sinha
9 months ago

খুব ভালো লাগলো।