স্বামীজির দেহ কি এখনও তাঁর ঘরেই শায়িত আছে! ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে নিশ্চয়ই! চোখের জল মুছে নিলেন ভাল করে। সন্ন্যাসীদের আবেগ প্রদর্শনের নয়, সংযমের। এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মঠ, মঠের পরে ঘাট অবধি ঘাস বিছানো মখমল জমি। ঘাটের কাছে কতগুলি ফুলের গাছ। ফুল কি আজ কিছু বেশি ফুটেছে! একটু ওপাশে আশপাশের মানুষের ভিড় জমেছে। আর একটু বাদেই পৌঁছে যাবেন তিনি পিতার স্তব্ধ শুয়ে থাকা দেহের পাশে। ভেতরে হু হু করে দমকা বাতাস যেন বুকে মোচড় দিচ্ছে। শান্ত হতে হবে তাঁকে। হিন্দুদের প্রথা অনুযায়ী সন্তানকে মুখাগ্নি করতে হয়! তিনিই কি…! তিনি, শুয়ে আছেন প্রাণহীন। তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন যে মঠের পথ ও তাঁর মেয়ের পথ বেঁকে যাচ্ছে দুই দিকে ধীরে ধীরে, যদিও গন্তব্য একই? ক্রপটকিন, রমেশচন্দ্র দত্ত, ওকাকুরা আর নিজের ভেতরে থাকা আইরিশ রক্ত, তার সঙ্গে পিতার হাত ধরে ভারতবর্ষকে দেখার চোখ তৈরি — সবকিছু নিয়ে তাঁর পথ গড়ে উঠছে। নৌকা পৌঁছে গেছে বেলুড়ের ঘাটের কাছে।

ঘরে এসে নিবেদিতা বসলেন নিজের বিছানায়, ‘আপনার পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার কাজ সম্পূর্ণ করা হয়ে গেছে মি. ওকাকুরা! নিয়ে যেতে পারেন।’
সুরেন এবং ওকাকুরা সকালেই এসেছেন নিবেদিতার কাছে। টেবিলের দু’দিকে দু’টি চেয়ারে বসেছেন দু’জনে।
সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতেই থাকছেন ওকাকুরা। মার্চ মাসে আমেরিকান কনস্যুলেটের অফিসে হয়েছিল কলকাতায় ওকাকুরার রিসেপশন। সেখানেই আলাপ ঠাকুর পরিবারের অন্যতম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সরলা দেবীর সঙ্গে। ছিলেন আরও বিখ্যাত মানুষজন। রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ সেইদিনই এই জাপানি শিল্প-সাধকের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথকেও জাপানে আসার নিমন্ত্রণ করেন ওকাকুরা। জাপানি শিল্পচর্চা নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সপ্রশংস কথাবার্তায় ওকাকুরা খুব উৎফুল্ল। সুরেন্দ্রনাথ এবং সরলাদেবীর আগ্রহ দেখা যায় ওকাকুরার স্বদেশ চেতনা সম্পর্কিত ভাবনায়। পরাধীনতা থেকে দেশের মুক্তির জন্য প্রয়োজন জাতীয়তাবাদ তৈরি ও আন্দোলন— তাঁর এই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমগ্র এশিয়াকে একীভূত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার ভাবনা। সমগ্র এশিয়ার মুক্তির কথা বলেন ওকাকুরা। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন পথ খুঁজে পান ওকাকুরার ভাবনার ভিতরে। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িই হয়ে ওঠে ওকাকুরার কলকাতায় আবাসস্থল। ওকাকুরার প্রশ্ন খুব ভেতরে আবেগে আঘাত করছে শিক্ষিত বাঙালির — তোমরা তোমাদের দেশের জন্য কী করছ?
ওকাকুরার আধবোজা চোখ হাসলে আরও বুজে যায়, ‘ওহ্ সারপ্রাইজিং! মিস নোবেল আপনি এই বইটির প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। ভূমিকাও কি লেখা হয়ে গেছে?’
‘আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন মি. ওকাকুরা, আমি অযথা সময় নষ্ট পছন্দ করি না!’
নিবেদিতা কুসুমের হাত থেকে নিয়ে টেবিলের উপর দুধ, কলা, সন্দেশ, চিঁড়ে এবং এক প্লেট ফল রাখলেন প্রাতরাশ হিসেবে।
‘অবশ্যই অবশ্যই। আমার তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। আমরা কি আজকে…’
‘সুরেন ফল-মিষ্টি নিলে আমি তৃপ্তি পাব। আপনারা ততক্ষণ প্রাতরাশ করে নিন, আমি পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসছি।’ নিবেদিতা চলে যান।
বেশ কিছুক্ষণ পরে নিবেদিতা ঘরে এসে বসেন, হাতে একতাড়া কাগজ।
‘মিস নোবেল! আপনার মনীষা, আপনার দেশ-ভাবনা, প্রজ্ঞা…আমি মুগ্ধ! আমি যদি এই বাড়িতেই থাকতে চাই কিছুদিনের জন্য এবং একসঙ্গে কাজ করি …’ ওকাকুরা তাকালেন নিবেদিতার দিকে।
‘আমরা কি একসঙ্গে একটি মহান কাজে ব্রতী হতে পারি না মিস নোবেল?’
‘মি. ওকাকুরা ভুলে যাবেন না, আমি একজন সন্ন্যাসিনী, অতীত নিয়ে বর্তমানে চলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একজন অসহায় অসুস্থ একা মানুষকে আমার ব্রত অনুযায়ী সেবা করেছি, সুস্থ করেছি, যখন আপনি প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এখানে। সেটা একজন সমাজকর্মী হিসেবে আমার সেবা-ব্রত। এর বেশি কিছু নয়। আপনার থাকার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সুরেন।’
‘মিস নোবেল, যদি আপনি ভূমিকার কিছু অংশ একটু শোনান বা বলেন, তাহলে খুব ভাল লাগবে আমার। অনুগ্রহ করে একটু শোনাবেন?’
সুরেন প্রসঙ্গান্তর করে হালকা করতে চাইলেন পরিবেশ। নিবেদিতার এই রূপ সুরেন চেনেন।
‘হ্যাঁ। আমি মি. ওকাকুরার এই মতকে বিশ্বাস করি এবং প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি আমার ভূমিকাতে। এই বইয়ে তিনি যা বলতে চেয়েছেন অর্থাৎ সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বহুপথের সমাহার এশিয়া দেশসমূহের বৈশিষ্ট্য বহুধা হলেও এশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে এশিয়া ইজ ওয়ান, তার অস্তিত্ব পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত হওয়াই উচিত! এটাই ওঁর বইটির মূল সুর। মূল সুরটি এক রেখে আমি কিছু কিছু জায়গায় সম্পাদনা করেছি মাত্র, বেশ কিছুটা জায়গায় ভাষা পাল্টেছি, পাল্টাতে গিয়ে নতুন করে লিখতেও হয়েছে কিছুটা!’
‘অবশ্যই অবশ্যই। আপনাকে যদিও এর জন্য প্রভূত পরিশ্রম করতে হল, সো গ্রেট ফুল টু ইউ!’ ওকাকুরার চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতা।
‘বইটির বিষয়ের সঙ্গে আর আপনার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারণা সম্পর্কে আমি সহমত বলেই এই পরিশ্রম আমি ভারতবর্ষের জন্য করেছি। আপনাকে, আপনার শিল্পবোধ এবং আপনার চিন্তক সত্তাকে আমি শ্রদ্ধা করি মি. ওকাকুরা। আমি ভূমিকার কয়েকটি লাইন বিক্ষিপ্তভাবে পড়ি, সুরেন ও আপনি শুনুন। এখন সবটা পড়ার সময় নেই হাতে।’
নিবেদিতা কোলের উপর পাণ্ডুলিপি নিয়ে পড়তে শুরু করেন, ‘প্রথমদিকে মি. ওকাকুরার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে শুরু করেছি। ১৮৮৬ সালে জাপান সরকার ওঁকে ইম্পেরিয়াল আর্ট কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে ইউরোপে পাঠিয়েছিলেন। সেখানকার আর্ট দেখে ফিরে এসে তিনি উপলব্ধি করেন যে, প্রাচ্যের শিল্পকে পুনর্জাগরণ ঘটানো দরকার অযথা ঔপনিবেশিক শিল্পের প্রসার বন্ধ করা দরকার। কিন্তু তখন পাশ্চাত্যের প্রভাব প্রাচ্যের দেশসমূহে প্রবল, ফলে ওকাকুরার মত জাপান সরকারের বিরুদ্ধে যায়। সরকারি পদ থেকে ১৮৯৭ সালে পদত্যাগ করেন তিনি এবং কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি প্রাচ্য শিল্প আন্দোলন। Mr. Okakura has found to aid his Government in classifying the art treasures of Japan, and to visit and study the antiquities of China and India. এইখান থেকে আমি ওকাকুরার অজন্তা গুহার স্থাপত্য দেখার কথা বলি এবং তিনি যে দেখিয়েছেন সেই সমসাময়িক সময়ে চিন দেশের ভাস্কর্যে একই সাম্য ভাব।’
‘বাহ্ সুন্দর শুরু করেছেন মিস নোবেল!’ সুরেন উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
‘তারপর?’ ওকাকুরা আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়েন।
‘তারপর আপনি আর আমি যেটা আলোচনা করেছিলাম – Art can only be developed by nations that are in a state of freedom. It is at once indeed great means and fruitage of that gladness of liberty which we call the sense of nationality.’
‘ইন্টারেস্টিং!’ সুরেন বলে ওঠে।
‘মি. ওকাকুরা যেটা বলেছেন যার সঙ্গে আমি একমত যে, চিন, জাপান এবং ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিল্পের যে নিদর্শন দেখা যায় তার মধ্যে আছে এক পরম ঐক্যের সুর। আর এই সুরটি খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন শিল্পচর্চার নিদর্শনে।’ নিবেদিতা থামলেন।
‘এটা মি. ওকাকুরার সঙ্গে আলোচনায় আমি কিছুটা বুঝেছি। আমি একটু পড়লে আপনি কি কিছু মনে করবেন?’ সুরেন নিবেদিতার দিকে তাকায়।
‘না না। পড়ো তুমি!’ নিবেদিতা পাণ্ডুলিপি তুলে দেয় সুরেনের হাতে।
সুরেন চোখ বোলাতে থাকে।
‘ওহ! চমৎকার। আপনি খুব সুন্দর করে স্বামীজির বিশ্বের কাছে ভারতবর্ষের ধর্ম কথার প্রাচীনত্ব প্রচারের বিষয়টি এনেছেন! বাহ্ সুন্দর কনক্লুডিং লাইন – Our author has talked in vain if he has not conclusively proved that contention with which this little handbook opens, that Asia, the Great Mother, is ever One. বিউটিফুল ব্রাভো হোয়াট আ ল্যাঙ্গুয়েজ!
‘ধন্যবাদ সুরেন। এই বইটির প্রথম বাক্যই হল – Asia is One. সমগ্র এশিয়া এক। ভারতীয়দের মধ্যে প্রাচ্য প্রীতি গঠন করাই এখন প্রধান কাজ। পাশ্চাত্য বিরোধিতায় একটা বাধা আসবেই।’ নিবেদিতার কথা শেষ হতে না হতেই সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল বেশ জোরে।
‘খুব সম্ভবত ভূপেন্দ্র দত্ত ও বারীন ঘোষ এসেছে। অনুগ্রহ করে একটু বসুন। আমি দরজাটা খুলে দিয়ে আসি।’
‘সুরেনবাবু, ভূপেন ও বারীনের সঙ্গে গুপ্ত সমিতির বিষয়ে প্রাথমিক কথা আমার হয়েছে\। যদি দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হয়, যদি ব্রিটিশ শাসনকে এই দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হয় তবে তার একমাত্র পথ বিপ্লবের পথ। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজন গুপ্ত সমিতি।’
ফর্সা বেঁটেখাটো কিন্তু অসম্ভব ক্ষুরধার বুদ্ধিদীপ্ত এই জাপানি রাজসিক পোশাক পরা মানুষটির প্রতিটি কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে সুরেনের। করেও। সরলা দেবী এবং সুরেন গুপ্ত সমিতি গঠনের পক্ষে। নিবেদিতা বিপ্লবের পথকে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথ হিসেবে বিশ্বাস করেন। ক্রপটকিন-এর পথ এবং বিবেকানন্দের আদর্শ এই দুইয়ের এক পরম মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছে নিবেদিতার ভেতরে। তিনি ওকাকুরার প্রাচ্য-প্রীতি তত্ত্বের পক্ষে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ভারতের প্রাচীন শিল্প সংস্কৃতির প্রতি ভারতবাসীর আগ্রহ তৈরি করার কথা ভাবছেন জাতি-বোধ গঠনের জন্য, আবার সঙ্গে সঙ্গে গুপ্ত সমিতি তৈরি করার মধ্য দিয়ে সংগঠিত করতে আগ্রহী বিপ্লব-আন্দোলন।
নিবেদিতা বারীন ও ভূপেনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢোকেন।
ক্রমাগত সিগারেট খাওয়ায় অভ্যস্ত ওকাকুরা উসখুস করছিলেন অনেকক্ষণ ধরেই, সুরেন লক্ষ করেছে। যে মানুষটা ক্রমাগত সিগার খেয়ে যায়, সে এতটা সময় ধূমপান ছাড়া আছে কী করে! যদিও খুব দ্রুতই উঠে পড়লেন ওকাকুরা। গুপ্ত সমিতি গঠনের জন্য বারীন ও ভূপেনের হাতে ১০০০ টাকা চাঁদা দিয়ে যথাযথ কাজ করতে বলে গেলেন। বাংলার জেলায় জেলায় শাখা সংগঠন গড়ে তোলা এবং কলকাতায় কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে ওকাকুরা বেরিয়ে এলেন নিবেদিতার বাড়ি থেকে। দরজার বাইরে এসেই ফস করে সিগার ধরালেন। লম্বা টান দিতে দিতে সুরেনের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

গরম অত্যন্ত বেশি। বৃষ্টির দেখা নেই। হাওয়া নেই। নিবেদিতার চোখে ঘুম নেই। এই বাড়ির ছাদের উত্তর-পশ্চিম কোণে মঠ। মঠের একটি ঘরে তাঁর পিতা কি এই গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছেন? গুরু তাঁর শিষ্যকে উপযুক্ত তৈরি করে মুক্তি দেন। যেমন পক্ষী-শাবকের ক্ষেত্রে পক্ষীমাতা করে। তিনি আমার জন্য যে পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তার বাইরে চলে গেছে আমার পথ গত এক বৎসরে, সত্যিই কি তাই গেছে? নিজের ভেতরে প্রশ্নের জটাজাল। উঠে বসলেন নিবেদিতা। সম্প্রতি স্বামীজির শারীরিক অবস্থার জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যায়নি। নিবেদিতার কাছে এই মুহূর্তে দশ-বারোজন মহিলাদের স্কুল খুলে লেখাপড়া শেখানোর থেকেও জরুরি ভারতের মুক্তি সাধনার জন্য ভারতবাসীকে জাগিয়ে তোলা। স্বাধীনতা আগে দরকার। বিছানা থেকে নামলেন নিবেদিতা। অস্থির হয়ে উঠছেন। হারিকেনের আলো বাড়িয়ে দিলেন টেবিলের উপর। বসলেন টেবিলের সামনে চেয়ারে। হিন্দু ধর্মই আমার ধর্ম। আমার দেশ ভারতবর্ষ। সেই দেশের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা এত স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছি! ভাবছেন নিবেদিতা। এর আগে এত স্পষ্ট ও সহজ করে রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি তাঁর কাছে, যা তিনি গত এক বছরে প্রত্যক্ষ করেছেন অভিজ্ঞতায়। ভাবছেন তিনি খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে — আমার জীবনে এমন কতগুলো ঘটনা জড়িয়ে গিয়েছে যা স্বামীজির অনুমোদন লাভ করবে না। কিন্তু আমি তো তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ করে যাব। ভারতবর্ষ স্বাধীন না হলে তার সন্তানেরা কিভাবে মুক্তি পাবে অন্ধকার থেকে, কিভাবে ভারতবাসীর শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানের প্রতিভার বিকাশ ঘটবে! পাশ্চাত্যের আগ্রাসন থেকে ব্রিটিশদের শাসনের নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতেই হবে। তার পথ তৈরি করে রেখে গেছেন পিতা, পরম গুরু, ‘সন্ন্যাসী দেশপ্রেমিক’ স্বামীজি। ওকাকুরা তো সেই জাগ্রত হবার কথাই বলেন। ক্রপটকিন বলেন অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষের ঐক্যবদ্ধ জাগরণের কথা। জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে সেই লড়াইয়ে জয়লাভ করতে চান। রবীন্দ্রনাথ কবিতা ও গল্পের মধ্য দিয়ে সেই কথাই তো বলে চলেছেন — মানুষের মুক্তি, জীবনের জয়গান। সব তো একই মালার ভিন্ন ভিন্ন ফুল! নিবেদিতা লিখতে বসেন চিঠি তাঁর প্রিয় য়ুমকে। অনেক কথা বলা বাকি। চিঠিপত্রের উপর গোয়েন্দাদের নজরদারি আছে। ওকাকুরার প্রতি শ্যেনদৃষ্টি আছে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের। বলতে হবে ওকাকুরার কথা, সুরেনের কথা, স্বামীজির খবর, জগদীশের কথা। দুঃখ নিয়ে চলা তাঁর জীবন নয়। তাঁর জীবন কর্ম নিয়ে চলা। কর্মেই প্রশান্তি।
17 Bose Para Lane Bagh Bazzar
July 2nd 1902, Wednesday

My dearest Yum-Yum,
Fortunately Mr. O ( ওকাকুরা-র কথা বিভিন্ন ভাবে লিখতেন গোপন করার জন্য) and Surene ( Surendranath Tagore) called on Monday, with S. Sara’s letter about Murray, and yours was read at once.
…I never saw your friend (ওকাকুরা) look so lively or so natural. Perhaps he thought my surroundings bare – but he set himself to talk of ‘the land of hope’ in which he lived – in a way that did me good. Surene and his mother are angels of kindness to him – and they are constantly together.
থামলেন। তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করলেন নিজেকে কিছুটা। তারপর আবার ঝুঁকে পড়েন টেবিলের উপর। দূরে দূরে কোথাও কোথাও শিয়ালেরা ডেকে উঠছে থেকে থেকে।
I spent Sunday last at the Math, and Swami was looking so much better. He blest me with great sweetness as I felt. I am going again this morning.
What am I to say to you for your sweet letter about my child ( Dr. J.C.Bose)? It was like a touch of himself to hear from you, in such a way. I am SO glad you came to close. It was too lovely to hear of his sweetness and gentleness from you. My poor bairn! I fear he is worn out. I only hope S. Sara will not force him beyond his powers.
নিঃসীম অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন নিবেদিতা। বহুদূর নক্ষত্রের মতো জগদীশচন্দ্র হয়তো এখনও প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ভারতের বিজ্ঞান জয়ধ্বজা তুলে ধরার জন্য। একা। চূড়ান্ত বিরোধিতার মধ্যে। অন্ধকার আকাশে সেই উজ্জ্বল স্বপ্নঝরা নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। একদিন আসবেন বিশ্বজয়ী হয়ে।

নৌকা ঘাটের কাছে আসতেই নিবেদিতা লাফিয়ে নেমেই প্রায় দৌড়ে যান ঘাসের পথ পেরিয়ে মঠের ভেতরে। তরতর করে উঠে যান দোতলায়। দরজা ভেজানো আছে। আস্তে ঠেলে ঢুকলেন। আবছা অন্ধকার ঘর। ধূপ ও আতরের গন্ধ। মেঝেতে মাদুর পেতে তার উপরে শুয়ে আছেন তিনি টানটান। হলুদ ফুলে ফুলে ঢাকা। চোখ বুজে যেন পরম শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। নিবেদিতা দ্রুত তাঁর মাথার কাছে বসলেন। ফুলের মধ্য থেকে সন্তর্পণে মাথাটি দুই হাতে তুলে নিজের কোলে রাখলেন। পাশেই পড়েছিল তালপাখা। তুলে নিয়ে হাওয়া দিতে থাকেন তাঁর পরম পিতাকে। স্থির তাকিয়ে থাকেন। একবার যদি…। কতক্ষণ সময় গেছে জানেন না নিবেদিতা। দুপুর দুটো বেজে গেছে। সম্বিত পান যখন কানে আসে সিঁড়ি দিয়ে কারা মৃদুস্বরে কথা বলতে বলতে দোতলায় উঠছেন। দ্রুত কোল থেকে পিতার মাথাটি ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলেন। সরে বসে হাওয়া দিতে থাকেন তালপাখা দিয়ে। ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দ সহ অনেক সন্ন্যাসী ঘরে এলেন। নতুন গেরুয়া একটি চাদরে ঢাকা দেওয়া হল। শুধু মুখমণ্ডল উন্মুক্ত। ফুলের মালা দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ মৃদুস্বরে স্বামীজির শেষ সময়ের কথা বলছিলেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দের কন্ঠস্বর শুনে মাথা তুলে তাকালেন। ব্রহ্মানন্দ স্বামী বলছেন, ‘আমি কিছুদিন ধরেই তাঁর মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। তাঁকে যেন ঠাকুর রামকৃষ্ণের মতো দেখতে লাগছিল!’ সদানন্দ নিবেদিতার কানের কাছে এসে ফিসফিস করল, ‘আপনার দেওয়া এই চাদরটি গায়ে দিয়েই তিনি রামকৃষ্ণলোকে!’ নিবেদিতার মনে হয়েছিল বলবেন, ‘চাদরটির একটি টুকরো সে স্মৃতি হিসেবে নিতে পারবে কি না!’ কিন্তু বিসদৃশ হবে ভেবে বললেন না কিছু। সবাই নানান কথা বলছে সেই মুহূর্তে ঠিক কে কেমন দেখেছিল।
সন্ধ্যা সাতটা। ব্রজেন্দ্রকে স্বামীজি বললেন, ‘দে আমায় দু’ছড়া মালা দে। বাইরে গিয়ে জপ-ধ্যান কর। না ডাকলে আসবি না।’ ব্রজেন্দ্র দু’ছড়া মালা দিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে বসল। স্বামীজি ধ্যানে বসেছেন। সামনে একটি প্রদীপ জ্বলছে। স্বামীজি ঋজু বসেছেন। বসলেন আজ প্রচলিত নিয়ম ভেঙে। আজ স্বামীজি ধ্যানে বসেছেন উত্তর-পশ্চিম দিকে মুখ করে। অর্থাৎ নিয়ম রীতি ভেঙে ধ্যানে বসেছেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের দিকে মুখ করে। ঘন্টা খানেক কেটে গেল। স্বামীজি ডাকলেন ব্রজেন্দ্রকে। ব্রজেন্দ্র তাড়াতাড়ি ঘরে আসে। ‘দরজা জানালা সব খুলে দে, গরম হচ্ছে,’ বললেন স্বামীজি । ব্রজেন্দ্র দরজা জানালা হাট করে খুলে তালপাখা দিয়ে হাওয়া করতে শুরু করে।
নিবেদিতা নিথর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হাওয়া দিতে থাকেন জোরে জোরে। গরম হয়েছিল খুব। ঘেমে গেছিলেন। ঘামে ভিজে গেছেন। সব কথাগুলো কানে আসছে নিবেদিতার। মেঝেতে বিছানা পাতা ছিল। স্বামীজি শুয়ে পড়েন। হাতে জপমালা। ‘হাওয়া দে মাথায়,’ বলেন তিনি। ব্রজেন্দ্র হাওয়া দিতে থাকে। তারপরেই বলেন, ‘থাক, পা টিপে দে তো!’ ব্রজেন্দ্র তাই করতে থাকে। স্বামীজির নিদ্রাবেশ এল। ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। নিবেদিতা শুনতে শুনতে স্বামীজির সটান পায়ের দিকে তাকায়। ওই পায়ে কতবার মাথা নত করেছেন তিনি! সারদানন্দের কথা ভেসে এল খুব মৃদুস্বরে, ‘চিত হয়ে শুয়েছিলেন। এবার বামপাশে ফিরলেন। হঠাৎ ডান হাতটি একটু কেঁপে উঠল কয়েক সেকেন্ড। তারপরেই শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন।’ কে যেন বলল, ‘শিশুরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যেমন করে ঠিক তেমনি হেসে ওঠেন কেঁদে ওঠেন!’ ব্রজেন্দ্র বলে, ’অমন তো ঘুমের ঘোরে উনি করতেন এমন!’ কে একজন বলে চলে, ‘তারপরেই গভীর দীর্ঘশ্বাস নিলেন। কয়েক মিনিট পর আবার গভীর দীর্ঘশ্বাস। মাথাটা একবার নড়ে উঠল। তারপর স্থির। চোখদু’টি উপরদিকে স্থির হয়ে গেল। মুখে স্বর্গীয় হাসি আর সারা মুখে আশ্চর্য জ্যোতি দেখা দিল।’ জয় গুরু মহারাজের জয়! গুঞ্জন উঠল, জয় গুরু মহারাজের জয়! তখন রাত ন’টা বেজে মিনিট দশেক হবে। প্রেমানন্দ আর নিশ্চয়ানন্দ স্বামীজির দুই কানে রামকৃষ্ণ-নাম করতে লাগলেন। অদ্বৈতানন্দ বোধানন্দকে বললেন নাড়ি দেখতে। বোধানন্দ নাড়ি ধরে বসে রইলেন। অদ্বৈতানন্দ নির্ভয়ানন্দকে বললেন, ‘যাও শিগ্গিরি ডা. মহেন্দ্রনাথ মজুমদারকে ডেকে আনো।’ নির্ভয়ানন্দ বেরিয়ে গেল বরানগরে ডা. মহেন্দ্রনাথ মজুমদারকে ডাকতে। একজন চলে গেল কলকাতায় ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দকে ডাকতে।

‘জয় গুরু মহারাজ কী জয়’, ‘জয় গুরু মহারাজ কী জয়’; সমস্বরে শান্ত কণ্ঠে সবাই। স্বামীজির দেহ নামিয়ে আনা হল নীচে ধীরে ধীরে। নিবেদিতা নেমে এলেন পিছন পিছন। নীচে একটি খাটের উপর তাঁকে শোয়ানো হল। ফুলে ফুলে ঢাকা পড়ে গেল তাঁর দেহ। কেউ একজন সাদা কাপড়ে তুলে রাখল তাঁর পায়ের ছাপ। মন্ত্রোচ্চারণ, ধূপ-ধুনোর ধোঁয়া, শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে আরতির কাজ শেষ হল। কাঁধে তুললেন খাট সন্ন্যাসীরা। ছোট্ট শোভাযাত্রা। জয় গুরু মহারাজ কী জয়, জয় গুরু মহারাজ কী জয় ঘন ঘন উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সেই নির্দিষ্ট বেল গাছটির কাছে নামানো হল মরদেহ। আরেকটু নীচে গঙ্গার দিকে সাজানো হয়েছে চিতাশয্যা। নিবেদিতা পিছন পিছন এসে বসলেন ঘাসের জমিতে একটু তফাতে, যেখান থেকে চিতাশয্যা বেশি দূরে নয় এবং স্পষ্ট দেখতে পাবেন।
চুপ করে বসে আছেন একা নিবেদিতা। হঠাৎ দেখলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় প্রায় দৌড়ে এলেন চিতাশয্যার কাছে। হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সদানন্দ এসে নিবেদিতাকে নিয়ে গেল চিতাশয্যার কাছে। চিতাশয্যায় শায়িত স্বামীজি। নিবেদিতার হাতে দেওয়া হল একগুচ্ছ জ্বলন্ত পাটকাঠি। নিবেদিতা পিতাকে প্রদক্ষিণ করে মুখাগ্নি করলেন তিন বার। চোখমুখ লাল হয়ে গেছে তাঁর। ভেতরে বিস্ফোরণ, জলস্রোত ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে। নিবেদিতা ঠোঁট চেপে আছেন। দ্রুত আবার গিয়ে বসলেন তফাতে একা। সন্ধ্যা নেমে এল। দাউ দাউ চিতার আগুন। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় এক টুকরো আধপোড়া গেরুয়া কাপড় উড়ে এসে পড়ল নিবেদিতার কোলের কাছে, তার গাউনের উপর। নিবেদিতা তুলে নিলেন হাতে। কপালে ঠেকালেন — প্রভু শুনতে পেয়েছিলেন তাঁর মনের কথা!
একসময় চিতা নিভে গেল। বাতাসে ছাই উড়ছে। সন্ন্যাসীরা জল ঢেলে যে যার চলে যাচ্ছেন। ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে এলাকা। নিবেদিতা একা বসে আছেন। একটু দূর থেকে তাঁকে নজরে রাখছেন সাথী সখা বন্ধু সদানন্দ। নিবেদিতা ধীরে ধীরে উঠলেন। সদানন্দ এগিয়ে এলেন। নিবেদিতা তাকালেন না সদানন্দের দিকে। সামলাতে পারবেন না নিজেকে! দ্রুত হাঁটা শুরু করলেন ঘাটের দিকে। সদানন্দ অনুসরণ করতে শুরু করেন। ঘাটের কাছে এসে নিবেদিতা তাকালেন মঠের দিকে। অন্ধকার আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সিলিউট তিনটি ছায়া। নিবেদিতা জানেন ওই তিনজন তাঁর অতিপ্রিয় স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী স্বরূপানন্দ এবং স্বামী সারদানন্দ। নিবেদিতা মাথাটা ঝটিতি নামিয়েই দ্রুত উঠলেন নৌকায়। সদানন্দ অনুসরণ করে উঠে বসলেন নৌকায়। নিবেদিতা একবার দেখলেন প্রিয় বন্ধু সদানন্দকে। সদানন্দ তাকাচ্ছেন না তাঁর দিকে। তাকিয়ে আছেন জলের দিকে। কালো নদী হয়ে গঙ্গা বয়ে চলেছে। নিবেদিতা আবার ভেসে চললেন।

১৭ নম্বর বোস পাড়া লেনের বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। নিবেদিতা বাড়িতে ঢুকলেন। পিছনে সদানন্দ। সদানন্দ দাঁড়ল।
‘আমি আসি। মঠ শোকস্তব্ধ। অনেক কাজ আছে।’
‘এসো।’
মাথা নিচু করে চলে গেল সদানন্দ অন্ধকার গলিপথ ধরে গঙ্গার ঘাটের দিকে। নিবেদিতা দরজা বন্ধ করলেন। কুসুম বসে ছিল বারান্দায় থামে হেলান দিয়ে। পিলসুজ নিয়ে ধীরে ধীরে উপরে নিবেদিতার ঘরে রেখে এলো। নিবেদিতা উঠে এলেন দোতলায় নিজের ঘরে। কেউ কারও চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। কুসুম নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে নিচে। পিলসুজের প্রদীপটি জ্বলছে কাঁপতে কাঁপতে। নিবেদিতা বসলেন চেয়ারে। তাঁর প্রিয় আশ্রয় লেখা। ডায়রি খুললেন। আজকের তারিখ – ৫ জুলাই ১৯০২। কোনো শব্দই আসছে না কলমের ডগায়। স্থির বসে আছেন। শূন্য। মহাশূন্য মাথার ভেতর, বুকের ভেতর। খুব সন্তর্পণে ধীরে ধীরে দুটি শব্দ লিখলেন – Swami dead. চুপ বসে রইলেন। আধপোড়া কাপড়ের অংশটি আস্তে আস্তে বার করে রাখলেন টেবিলের উপর। তাকিয়ে থাকেন। শোক নয় দ্রোহ। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, নিরন্ন দরিদ্র মূর্খ অন্ত্যজ ভারতবাসীর মুক্তির জন্য দ্রোহকালের সূচনা-কর্ম সমাগত। জলধারা নেমে এসে থুতনিতে মুক্ত বিন্দু ভেঙে পড়ে। একা কান্না আচ্ছন্ন করে শোক। শোকের প্রকাশ তো নিরাময়! শোক প্রকাশের নয়, সংরক্ষণের। তাকিয়ে থাকেন জানালা দিয়ে অন্ধকারের দিকে। আবছা কালো নদী নেমে আসে। দুপাশে অসংখ্য কালো কালো মানুষের হাত উঠে আসছে। সাঁকো দুলে ওঠে। সাঁকো গড়ে ওঠে।

এক চরম আত্মদ্বন্দ্বে দীর্ণ হতে থাকেন নিবেদিতা। রামকৃষ্ণ সংঘের সদস্যা তিনি। বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে রামকৃষ্ণ সংঘের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে। স্বামীজি শেষ যেদিন এসেছিলেন বোসপাড়া লেনের নিবেদিতার বাড়িতে অসুস্থ শরীর নিয়েও সেইদিন জানিয়েছিলেন তিনি। সংঘের মধ্যে নিবেদিতার রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ আছে প্রবল। সংঘের উদ্দেশ্য ও আদর্শ স্বামীজি নিজে তৈরি করে গেছেন — রাজনৈতিক সম্পর্করহিত আধ্যাত্মিক উন্নতি ও মানুষের সেবা। কিন্তু নিবেদিতা নিমগ্ন আছেন দেশের ভাবনায়। ভারতমাতার শৃঙ্খলা মুক্তির পথে তিনি হাঁটতে শুরু করেছেন। স্বামীজি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বারণ করেছিলেন।
হয় রাজনীতি, নয় মঠ। হয় তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে রামকৃষ্ণ সংঘ তথা মঠের কাজের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক, অথবা তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে তাঁর ভারত-মুক্তির রাজনৈতিক কর্ম-পরিকল্পনা। রাত কাটে নির্ঘুম। কে এই সংকটকালে তাঁকে পথ দেখাবেন! গুমোট গরমে সারা রাত জেগে থাকলেন নিবেদিতা। তিনি তো ডেকেছিলেন ভারতের সেবায় জীবন নিবেদন করার জন্য। আজ সেই দিন খুব নিকটে। ভারত-মাতার মুক্তির কাজ না রামকৃষ্ণ-মিশনের আর্তজনের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন তিনি? রামকৃষ্ণ মিশন কোনও রকম সমস্যায় পড়বে তাঁর কর্মপদ্ধতির জন্য — এটা তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না। কথা দিয়েছেন তিনি বিবেকানন্দকে। পাখি ডেকে ওঠে। রাত শেষ হয়ে গেছে কখন খেয়াল করেননি। জানালার কাছে ভোরের পাখি ডেকে ওঠে। নিবেদিতা ছাদে গেলেন। আকাশে লালের ছটা। ভোরের মিষ্টি মনোরম বাতাসে চোখ বুজে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন তিনি। ধ্যানে বসলেন। তার আগে একবার আকাশের দিকে তাকালেন — শক্তি দাও হে পিতা, আমি আমার সংকল্পে যেন অবিচল থাকতে পারি। হে পিতা, তোমার অসমাপ্ত কাজ যেন শেষ করতে পারি।
৮ জুলাই গেলেন মঠে। সঙ্গে ছিলেন ওকাকুরা। ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দ সবাই ছিলেন। কিন্তু ওকাকুরা থাকার কারণে কোনও কথা খুব বেশিদূর এগোল না। তবে নিবেদিতা বুঝতে পেরেছেন গ্রন্থি ছিঁড়ছে। যদিও ব্রহ্মানন্দ স্বরূপানন্দ সারদানন্দ সবাইকে ভালবাসেন নিবেদিতা। সবাই নিবেদিতাকেও ভালবাসেন। নিবেদিতা অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন ব্রহ্মানন্দ মহারাজকে। কিন্তু ব্যক্তি বিলীন হয় সংঘে।
১০ জুলাই বুধবার। সকালে উঠে চিঠি লিখলেন প্রথমেই তাঁর প্রিয় জোসেফাইন ম্যাকলয়েডকে। ছোট্ট চিঠি শুরু করেন – ‘I am getting Grindlays to send you a telegram through Dr. Bose. I fear you are utterly unnerved. Do not be grieved Dear…’
চিঠি শেষ হয় এক চূড়ান্ত একাকীত্বের হাহাকার নিয়ে – ‘I am so lonely! I long to hear from you. And his.’
তাঁর মানসিক অস্থিরতার হদিস পাওয়া যায়।
কিন্তু ধীরে ধীরে নিবেদিতা গুছিয়ে নেন নিজেকে। সিদ্ধান্ত পরিষ্কার ভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে অন্তঃস্থল থেকে। রাজনৈতিকভাবে ভারতের মুক্তি-ভাবনা ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে তাঁর কাছে মৃত্যু শ্রেয় — এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন তিনি। ১৬ জুলাই লিখলেন পরিষ্কার করে ম্যাকলয়েডকে — “ I feel that in this, I am carrying out the mission Swami really gave me, though Swami himself thought differently, under the tortures of the physical existence.” সেই চিঠির শেষে লিখছেন – “Oh Swami, dear Swami, grant to me always to carry out your innermost will – not merely the personal whim or weakness.” নিবেদিতাকে বারবার রাজনীতি সম্পর্কে সতর্ক করতেন স্বামীজি , এড়িয়ে থাকতে বলতেন তিনি। স্বামীজির সতর্কতা বার্তাকে নিবেদিতা ভাবতেন তাঁর ব্যাক্তিগত খেয়াল বা দূর্বলতা।
দীর্ঘ এই চিঠিতে দেখা যায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন মঠের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার। তিনি এমনকী টাকা পয়সার হিসাব করেছেন যা মিটিয়ে দেবেন এবং নিজের ভরণপোষণের জন্য সামান্য অর্থ রাখার কথাও ভাবছেন। “I think I must reserve something over the 750 a year, because I still have so much to do to the house, and it would be unwise to leave this undone, but I mean to go to the Bank to know just how much I can get it.” এই চিঠিতেই জানাচ্ছেন তাঁর কাছে সংগ্রহ করা অর্থের একটি অংশ নিজের ভরণপোষণের জন্য রেখে বাকি অর্থ সারদানন্দের কাছে তুলে দেবেন সারদামায়ের বাড়ি তৈরির জন্য। তিনি স্থির-সংকল্প। দেশমাতার শৃঙ্খল মোচনের কাজ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মঠের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে যন্ত্রণাদীর্ণ হলেও তিনি তাঁর ভাবনায় অটল। “It is all so different from what it was meant to be – and Swami was so angry two months ago, and the men are so sure I ought to do what He told me – and yet I cannot do differently from this. I have become the idea – could die more easily than submit.” মঠের সবাই ভেবেছিলেন স্বামীজির কথা শুনবে নিবেদিতা। কিন্তু নিবেদিতা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ভারতমাতার স্বাধীনতার ভাবনা ত্যাগ করার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করছেন তিনি। যে ভারতবর্ষকে তাঁর গুরু হাত ধরে চিনিয়েছিলেন, সেই দুঃখিনী ভারতমাতা আজ তাঁর দেবতা — তাঁর শৃঙ্খলা মোচনে, তাঁর মুক্তির জন্য আজ তিনি নিবেদিতা।
১০ তারিখেই গেলেন তিনি আবার মঠে আলোচনা করতে। মহাসংকটে আজ প্রিয় ব্রহ্মানন্দ স্বরূপানন্দ সারদানন্দ সদানন্দ আর সব সন্ন্যাসীরা। আত্মিক সংকটে নিবেদিতা। ব্রহ্মানন্দ সবটুকু বুঝিয়ে বললেন নিবেদিতাকে। স্বামীজির প্রদর্শিত ও নির্দেশিত পথেই তাঁরা চলবেন, যেখানে স্বামীজির নির্দেশ — ‘The aims and ideals of the Mission being purely spiritual and humanitarian, it shall have no connection with politics.’ এর ব্যতিক্রম করার অন্যপথ নেই। নিবেদিতাকে হয় বর্তমান রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম ত্যাগ করতে হবে, অন্যথায় ত্যাগ করতে হবে রামকৃষ্ণ সংঘ, মিশন ও মঠের সঙ্গে সম্পর্ক। সেক্ষেত্রে নিবেদিতার কাজ হবে স্বাধীন। মঠের সঙ্গে সেই কাজের কোনও সংযোগ থাকবে না, থাকবে না মঠের কোনও রকম দায় বা দায়িত্ব।
কিছুক্ষণের নীরবতা। নিবেদিতা স্থির বসে আছেন। সাদা গাউন। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। সোনালি চুল মাথার উপরে গুছি করে বাঁধা। চোখের কোণে নির্ঘুম ক্লান্তির ছায়া গভীর। স্থির তাকিয়ে আছেন দেওয়ালের দিকে।
‘আমি ভারতবাসীর দেশমাতার কাজে যুক্ত হয়েছি। সে কাজে আমার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রয়োজন। সে কাজকে অপূর্ণ রেখে ফিরে আসার চেয়ে আমার মৃত্যু শ্রেয় বলে মনে করি। আমাকে নির্দেশ দিন, আমার কী করণীয় আছে।’
ধীরে স্থির-সংকল্পে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করলেন কথাগুলো। নীরবতা নেমে এল ঘরে। কোনও একটি পাখি ডেকে চলেছে একা মঠের মাঠে।
ব্রহ্মানন্দ নীরবতা ভাঙলেন, ‘তোমার এই সিদ্ধান্ত কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিয়ো। মঠের পক্ষ থেকে আমি তোমাকে চিঠি করেই জানাব শীঘ্রই। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উত্তর দিয়ো।’ ব্রহ্মানন্দ উঠলেন। উঠলেন সারদানন্দ, স্বরূপানন্দ। সদানন্দ ধীরে এলেন নিবেদিতার কাছে।
নিবেদিতা উঠলেন। ছোট্ট শব্দ উচ্চারণ করলেন, ‘আসি। আপনাদের নির্দেশ মতোই আমি চলব। আমি চাই না, আমার কর্মপদ্ধতির কারণে মঠ কোনও রকম অসুবিধার মধ্যে পড়ে।’

মঠ থেকে হাঁটতে হাঁটতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি নৌকার দিকে। কত কত স্মৃতির পথ যেন পেরিয়ে চলেছেন। লতাগুল্মরাজি কি জড়িয়ে ধরছে তাঁর পা? পা টানতে টানতে চলেছেন। তাঁর একলা চলার পথ সামনে। হঠাৎ সম্বিত ফেরে। ভেঙে পড়ার সময় এটা নয়। দ্রুত পায়ে ফিরে আসেন নিবেদিতা নৌকায়। নৌকা ছেড়ে দেয়। একবার তাকিয়ে দেখেন পিতার ভবন। এইখানে তিনি ‘নিবেদিতা’ হয়েছিলেন। হয়েছিলেন হিন্দু। হয়েছিলেন ভারতীয় এক নারী। মহাশক্তির উপাসক। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। নৌকায় ওঠেন।
ভেসে চলে নৌকা। সামনে নতুন পথের ঠিকানা। নতুন ব্রত। নতুন পথ। নিবেদিতা জানেন মঠের সামনে গেরুয়া পোশাক পরে তাঁর প্রিয় মানুষেরা দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু নিবেদিতা পিছন ফিরে তাকালেন না।

ক’দিন ব্যস্ততার মধ্যে দিনগুলো চলে গেল। ওকাকুরার সমস্ত কাজকর্মের দিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দার নজরদারি শুরু হয়েছে। সরলা ও সুরেন গুপ্ত সমিতি গঠনের দিকে এগিয়ে চলেছে। সারদানন্দের সঙ্গে হিসেব নিয়ে বসেছিলেন নিবেদিতা। ‘মায়ের বাড়ি’ নামে সারদা মায়ের বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। করা হবে দ্রুত। নিবেদিতার বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত, ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দ অর্থের সংকুলান নিয়ে কথা হয়েছে। সমস্ত সংগৃহীত অর্থ নিবেদিতা তুলে দিতে চান মঠের হাতে। আশ্চর্য শ্রদ্ধা ও ভালবাসার উদাহরণ রেখেছেন ব্রহ্মানন্দ, স্বরূপানন্দ, সারদানন্দ। সারদানন্দ মঠের প্যাডে চিঠি পাঠিয়েছেন নির্দেশাকারে — স্বেচ্ছায় মঠ ত্যাগের পত্র দিতে হবে নিবেদিতাকে এবং খবরের কাগজে ঘোষণাপত্র দিতে হবে যে নিবেদিতার বর্তমান কর্মপদ্ধতির সঙ্গে মঠ কোন‌ওভাবেই যুক্ত নয়, সমস্ত কর্মের দায়িত্ব নিবেদিতার। এই সময় ফুলের মতো একটি চিঠি কোন সে আকাশ থেকে যেন এসে পৌঁছেছে ১৭ নং বোসপাড়া লেনের এঁদো গলির দোতলা এক নিভৃত ঘরে। ৯ জুলাই লন্ডন থেকে লেখা প্রিয় বেয়ার্ন-এর চিঠি। বারবার পড়ছেন। ঝাপসা হয়ে আসছে চোখ। পড়ছেন। কয়েকটি লাইন বারবার পড়ছেন — What a void this makes! What great things were accomplished in these few years. How one man could have done it all ! And how all is stilled now. And yet, when one is tired and weary, it is best that he should rest. I seem to see him ( Swami Vivekanand) just as I saw him in Paris two years ago… the strong man with the large hope, everything large about him.
I cannot tell you what a great sadness has come. I wish we could see beyond it. Our thoughts are in India with those who are suffering.
আমাদের চিন্তা ভাবনা জুড়ে থাকুক ভারতের দরিদ্রতম মানুষের কষ্ট। নিবেদিতার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর প্রিয় ‘খোকা’র মুখ। তাকিয়ে থাকেন একদৃষ্টে চিঠির দিকে। দুলে উঠল কিছু! চশমা থেকে ঝুলে থাকা সিল্কের দড়িটা নড়ে ওঠে চিঠির উপর। অস্পষ্ট অবয়ব।

১৮ জুলাই। নিবেদিতা ভোরবেলায় ধ্যান সমাপ্ত করে বসলেন লেখার টেবিলে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিষয়টির পরিসমাপ্তি প্রয়োজন।

17, Bose Para Lane
Bagh Bazar, Calcutta
July 18th, 1902
Dear Swami Brahmananda,
Will you accept on behalf of the Order and myself my acknowledgement of your letter this evening. Painful as is the occasion, I can but acquiesce in my measures that are necessary to my complete freedom.
I trust however that you and other members of the Order will not fail to lay my love and reverence daily at the feet of the ashes of Sri Ramakrishna and my beloved Guru.
I shall write to the Indian papers and acquaint as quietly as possible with my changed position.
Yours in all gratitude and good faith,
Nivedita of Ramkrishna

চিঠিটি লেখা শেষ করার পর পড়লেন কয়েকবার। নিবেদিতা স্থির বসে আছেন। চিঠির অক্ষরগুলি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেল। সাদা ছলছল পাতা যেন টেবিলের উপর পড়ে আছে। নিবেদিতা নিজেকে সংযত করলেন। চোখের জল মুছলেন। ধীরে ধীরে সাদা পাতায় নীল কালিতে ফুটে উঠল নিবেদিতার মঠ ত্যাগের চিঠি চোখের তারায় স্পষ্ট।
নিবেদিতা চিঠির শেষে লিখলেন ‘Nibedita of Ramkrishna’, ‘রামকৃষ্ণের নিবেদিতা’। রামকৃষ্ণ সংঘ থেকে নিজেকে ছিন্ন করে নেওয়া খুব যন্ত্রণাদায়ক। তিনি আগে লিখতেন চিঠির নীচে ‘রামকৃষ্ণ-সংঘের নিবেদিতা’। কিছুদিনের মধ্যেই পরিবর্তন করে লিখতে থাকেন ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিবেদিতা’। আর এখন বিবেকানন্দের নামটি লেখা থেকে তুলে নিয়ে বুকের গভীরে অপ্রকাশ্যে নিজের কাছে রেখে দিলেন। লিখলেন ‘রামকৃষ্ণের নিবেদিতা’।
নিদারুণ আত্ম-সংগ্রামে ছিন্নভিন্ন হয়েছেন নিবেদিতা। স্বামীজি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেছেন। তরুণ বিপ্লবীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন শুধু নয় তাঁর কথায় উদ্বুদ্ধ হতেন। সতীশ বসু, হেমচন্দ্র ঘোষ প্রভৃতি বিপ্লবীরা দেশপ্রেমের প্রেরণা পেতেন স্বামীজির কাছ থেকেই। বিপ্লবী নেতা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন) স্বামীজির প্রত্যক্ষ সংস্রবে এসেছিলেন। রাজনৈতিক আত্মশক্তির উপর নির্ভর করেই, সংগ্রামশীল ও প্রতিরোধাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করেই বিদেশি শাসনাধীন থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে — এমন ভাবনার কথা স্বামীজি বলতেন সেই সময় তাঁর কাছে দেখা করতে আসা কংগ্রেসের নেতাদেরও।

১৯ জুলাই সকাল। নিবেদিতা বসে আছেন পড়ার টেবিলে। সামনে ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকা। কিছুক্ষণ আগে দিয়ে গেছে সদানন্দ। সদানন্দ আসে কথা বলে নানা বিষয়ে। আজকেই নিবেদিতা রওনা হবে যশোর জেলার উদ্দেশ্যে। তিন দিন যশোরে থাকবেন। যশোরের বিভিন্ন জায়গায় স্বামীজির স্মৃতিসভায় বক্তৃতা দেবেন। ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের দিকে তাকিয়ে থাকেন – We have been requested to inform the public that at the conclusion of the days of mourning for the Swami Vivekanand it has been decided between the members of the Order at Belur Math and Sister Nibedita that her work shall henceforth be regarded as free and entirely independent of their sanction of authority. খবরের শিরোনাম – সিস্টার নিবেদিতা। খবরে প্রকাশ, নিবেদিতার কার্যকলাপের সঙ্গে বেলুড় মঠের সদস্যদের কোনও সম্পর্ক থাকল না।
‘দ্য ইন্ডিয়ান মিরর’ কাগজে ছাপা হল – Sister Nivedita begs us to inform the public that, at the conclusion of the days of mourning for the Swami Vivekananda, it has been decided between the members of the Order at Belur Math and herself, that her work shall henceforth be regarded as free, and entirely independent of their sanction and authority. বারবার পড়ছেন আর বুকের ভেতর কী যেন ভেঙে পড়ার শব্দ শুনছেন। নিঃস্বতার কি কোনও শব্দ হয়?
স্বাধীন নিবেদিতা। দেশ জুড়ে তৈরি করবেন এক তরুণ দল। তৈরি করবেন জাতীয়তাবোধ। কয়েকজন মহিলাকে শিক্ষিত করে কিছু হবে হবে না, যদি না জাতীয় চেতনা না তৈরি করা যায়। সুতরাং নিবেদিতার বিধবাশ্রম এবং অনাথদের আবাসস্থলের কাজ পড়ে থাকল। স্কুল খোলার বিষয়টি থাকলেও সামনে বক্তৃতা দেবার ডাক আসছে। যেতে হবে। ‘হতে পারে, আমার সকল যুক্তি ভ্রান্ত। কেবল আমি জানি, আমার কাজ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করা, কয়েকটি মেয়েকে প্রভাবিত করা নয়।’ সেই কাজে দেশময় যেতে হবে আমাকে। মনের প্রস্তুতি গড়ে তুলেছেন তিনি। স্বামীজির কথা বলতে হবে, সেই সঙ্গে বলতে হবে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। দ্রুত তৈরি হতে হবে। যাবেন যশোর। কয়েক সেট জামাকাপড়, ওটস্, মিল্ক পাউডার, চিঁড়ে, গুড়, সন্দেশ ইত্যাদি গুছিয়ে দিয়েছে কুসুম ক্যাম্বিসের ব্যাগে। ‘স্বামীজির জীবন ও দর্শন’ নিয়ে বক্তব্য রাখতে হবে তিন চারটি শহরে। তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা এবং জাতীয় ভাবনায় উদ্ভূদ্ধ করা —এই উদ্দেশ্য নিয়ে দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছুটে বেড়াবার পরিকল্পনা করেছেন নিবেদিতা। তিনদিন যশোরের বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে ফিরে এলেন নিবেদিতা ক্লান্ত শরীরে। সদানন্দ এসেছে খবর নিতে। সদানন্দের সঙ্গে পরিকল্পনা করলেন মাদ্রাজে যাবেন, যাবেন বরোদায়। বরোদায় আছেন অরবিন্দ ঘোষ। বারীন ঘোষের দাদা। রমেশচন্দ্র দত্তের মারফত খবর পেয়েছেন নিবেদিতা। বারীন ঘোষের সঙ্গেও কথা হয়েছে।

জুলাই মাসের শেষ। রমেশচন্দ্র দত্ত চায়ে চুমুক দিয়ে নিবেদিতার দিকে তাকালেন, ‘ক্লাসিক থিয়েটারের সভায় আমিই থাকব সভাপতি। উদ্যোক্তারা চিঠি দিয়ে জানিয়েছে আমায়।’
নিবেদিতা উৎফুল্ল হন, ‘সে তো অতি উত্তম সংবাদ। আমি ভাবছিলাম কে না কে থাকবেন। সরলা, সুরেন অবশ্য যাবে।’
‘ভিড় কিন্তু ভালই হবে। এখন তো সবাই মঠ-বিচ্ছিন্না মার্গারেট নোবেল-এর কথা শুনতে চায়।’
নিবেদিতা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখেন, ‘আপনার কাছ থেকে এমন বিশেষণ আশা করিনি মি. দত্ত। আপনি আমার জাতীয়তাবাদী ধর্মপিতা।’
‘না, আমি শুধু চারপাশের লোকজন যা বলছে তার নির্যাস তোমার কাছে পৌঁছে দিলাম মাত্র। আমার মনে হয় তুমি কাগজে পরিষ্কার করে বলো যে, মঠের দায়িত্বের প্রতি তোমার আগ্রহ ছিল না এবং ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দেকে দায়িত্ব দেওয়া তুমি যথার্থ বলে মনে করো।’
রমেশচন্দ্র তাকালেন নিবেদিতার দিকে।
‘হুঁ, এইরকম আমি ভেবেছি। মি. রাটক্লিফের সঙ্গেও এই বিষয়ে কথা বলেছি। ‘স্টেটসম্যান’ কাগজে এমন কিছু লিখে জানাব। ২১ জুলাই ক্লাসিক থিয়েটারে তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বার্ষিক স্মৃতি সভা।’
‘হ্যাঁ। তুমি কী বলবে সে বিষয়ে কোনও খসড়া করেছ?’
‘না। তবে ঈশ্বরচন্দ্রের শিক্ষা বিস্তার এবং জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতিসত্তা গড়ে তোলার কথাই বলব। অবশ্যই স্বামীজির কথা বলব।’
‘ঠিক আছে। সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। তবে তোমাকে একটু সাবধান করতে পারি… জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারার সাথে ডন সোসাইটি, সিক্রেট সোসাইটি ইত্যাদি জড়িয়ে ফেলো না। উঠলাম।’
‘মি. দত্ত। আপনি আমাকে বিলক্ষণ চেনেন। আমি স্বাধীনতার স্বার্থে ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করি না, তা ব্যক্তিক হোক বা সার্বজনীন। আপনিই আমাকে জাতীয়তাবাদী ভাবনায় ভাবিত করেছেন, দেশের স্বাধীনতা অর্জনের কথা বলেছেন। আমার লক্ষ্য আমি স্থির করে ফেলেছি। অন্যথা হবে না।’
‘এই তেজদীপ্ত ভাবটা ভাল লাগে। ভারতবাসীর ভেতরে তৈরি করে দাও। চলি আজ। ২৯ জুলাই দেখা হচ্ছে।’
‘সে নয় আপনি আসবেন। কিন্তু আমার সামনে এখন একের পর এক বক্তৃতার আমন্ত্রণ পত্র।’
‘ভাল তো! আর আপনার ‘প্রাতরাশ’-এর চ্যালারা তো তৈরি!’
‘সব খবরই রাখেন দেখছি! আমি নিশ্চিন্ত হলাম!’
দু’জনেই হেসে ওঠেন। রমেশচন্দ্র সদর দরজার দিকে এগিয়ে যান। নিবেদিতা এগিয়ে দেন।

গভীর রাত। নানান সমালোচনা, বিরুদ্ধ কথা, অপব্যাখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদিতে ছারখার হয়ে যাচ্ছেন তিনি। কার কাছে কতবার কেন তাঁকে প্রমাণ দিতে হবে! শ্রদ্ধেয় ব্রহ্মানন্দ, প্রিয় শ্রদ্ধাস্পদ সারদানন্দ, ভ্রাতৃপ্রতিম সদানন্দ, মঠের ভ্রাতা-সন্ন্যাসীরা কষ্ট পাচ্ছেন নিশ্চয়ই এই অযাচিত মন্তব্যে। নিবেদিতা লিখলেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার সম্পাদককে —
“It is with the deepest pain that I hear of allusions to myself having become – by the death of my great master, the Swami Vivekananda – leader of the Order of Ramkrishna. I must ask you, therefore, to be good enough to give the widest currency at your disposal to the following statement:
The Order of Ramkrishna has its Head Quarter at Bellur Math, Howrah and is under the absolute leadership and authority of the Swami Brahmananda and the Swami Saradananda, two of the most saintly men whom one could ever meet.”
লিখলেন মঠের প্রতিষ্ঠা থেকে এই দুই মহান সন্ন্যাসী ধর্মীয় ভাবনা ও চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
খোলাখুলি লিখলেন — “My own position towards this religious treasure is that of the humblest leaner, merely a Brahmacharini, or novice, not a Sayassini or fully professed religious; without any pretentions to Sanskrit learning, and set free by the great kindness of my superiors to pursue my social, literary and educational work and studies, entirely outside their direction and supervision. Indeed, since the death of my Guru, I am not likely to be much in contact with any of my fellow-disciples who are not women.”
লিখলেন পরিষ্কার ভাবেই যে, হিন্দু ধর্মের জীবনচর্চার জন্য ইউরোপীয়ান নেতৃত্ব হবে চরম শোচনীয় ভুল। বরং উল্টোটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
চিঠিটি শেষ করেন — I trust that this letter may reach the eyes of many correspondents who will take it as a personal acknowledgement and reply.
গভীর রাত। মাথা ভার হয়ে নেমে আসছে টেবিলের উপর। আর পারছেন না। ক্ষতবিক্ষত যোদ্ধা। মাথা নামিয়ে রাখলেন চিঠির শেষে লিখতে লিখতে — Nibedita of Ramakrishna and Vivekanand.

শরীর ও মন জুড়ে একের পর এক ঝড়ে বিধ্বস্ত নিবেদিতা। অনিশ্চিত যাত্রা। নির্ঘুম কাটে রাত। ঝিরিঝিরি শব্দ ভেসে আসে। বৃষ্টি নামে। ঝিরঝির শব্দ হয় মাথার গভীরে। ভারী মাথা। যন্ত্রণা। শরীর জুড়ে গরম ধারাপাত যেন বয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার নেমে আসে মাথায়। শরীর নড়ে না। চৈতন্য হারিয়ে যেতে থাকে। তলিয়ে যায় নিবেদিতা গলিত লাভার স্রোতে। গলা শুকিয়ে কাঠ। মাথার কোষে কোষে হাজার হাজার পোকার দংশন।
বৃষ্টির স্পর্শ পান নিবেদিতা চোখে-মুখে। তাকান। আবছা একটা মুখ। চোখ মেললেন অনেক কষ্টে। মুখটা স্পষ্ট হয়। সদানন্দ।
‘আমি সদানন্দ। স্বামী ব্রহ্মানন্দজি, স্বামী সারদানন্দজি এসেছেন আমার সঙ্গে। কোনও চিন্তা নেই। আমরা এসে পড়েছি। জলপট্টি দিয়ে উপকার হয়েছে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি এই বাড়িতেই থাকব ক’দিন! আপনাকে সুস্থ করে মঠে ফিরব। ব্রহ্মানন্দজি এবং সারদান্দজি মাঝে মাঝেই আসবেন আপনাকে সুস্থ করে তুলতে।’ সদানন্দ ধীরে কথাগুলো বলল নিবেদিতাকে। বলল বটে! কিন্তু নিবেদিতার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না যে তিনি কিছু বোঝার জায়গায় আছেন। শুধু চোখের দু’পাশ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে চলেছে। তাকিয়ে থাকেন নিবেদিতা সজল চোখে। আবছা দেখতে পান সদানন্দের মুখ। প্রিয় সদানন্দ। তরুণ সদানন্দ। সন্ন্যাসী সদানন্দ। পিছনে পিছনে কারা ওরা? ওই ওই দলে দলে আত্মত্যাগী তরুণের দল এগিয়ে আসছে। তাদের এগিয়ে আসার শৌর্যে কেঁপে উঠছে ধরণী। তাদের সামনে ওই ওই অরবিন্দ ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ, যতীন্দ্রনাথ, বারীন ঘোষ। নিবেদিতা হাত তুলে কিছু বলতে চান। ওঁদের কণ্ঠে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি। হাতে হাতে পতাকা। ভারতের পতাকা। লাল রঙের পতাকা। লাল আত্মাহুতির প্রতীক। আত্মত্যাগের প্রতীক। তার মাঝে একটি চিহ্ন। বজ্র। পতাকার মাঝে লেখা দেবনাগরী অক্ষরে ‘বন্দেমাতরম’। জেগে উঠছে ভারতবর্ষ। এগিয়ে আসছে তাঁর ভারতবর্ষ। তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষ। ছোট ছোট সাঁকোগুলি দুলে দুলে সরে সরে যাচ্ছে। ভারতবর্ষের মানচিত্রের উপর দিয়ে এক অখণ্ড সাঁকো দুলে উঠছে মানুষের সমতালে পদচারণায়। সাঁকোটা দুলছে।

ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দের প্রযত্নে সদানন্দ এবং কুসুমের সেবায় নিবেদিতা সুস্থ হয়ে উঠলেন জ্বর থেকে দ্রুত। শরীর দুর্বল।
উঠে দাঁড়ালেন। আরেক অন্য নিবেদিতা। গুছিয়ে নিচ্ছেন নিজের কলম, লেখার প্যাড, জামাকাপড়, শুকনো খাবার। ভারতোপাসিকা বেরিয়ে পড়ছেন ভারতবর্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণে পরিক্রমায়। বক্তৃতায় বক্তৃতায় দেশকে জাগিয়ে তোলার ব্রতে পা বাড়ালেন বাড়ির বাইরে। এগিয়ে চললেন নতুনের ডাকে।

(সমাপ্ত)


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
শিপ্রা ভৌমিক
শিপ্রা ভৌমিক
9 months ago

‘সমাপ্ত’ শব্দটা একটা ধাক্কা মারল!’সাঁকোটা দুলছে’ শেষ হয়েও দুলবে পাঠকের মনে।ইতিহাসের ভেতরের পথ দিয়ে অনেকদিন হাঁটছিলাম!কত চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো! নিবেদিতাকে নতুন করে চেনানোর জন্য লেখককে অজস্র অভিনন্দন!