
যাত্রাপথের আনন্দ-গান (একাদশতম পর্ব)
(দুগগা ঠাকুর)
কালো কাঠের আলমারিটায় অ-নে-ক বই। ঠেসে-ঠুসে রাখা বইগুলো খুব টানে। পিসি বলেছে ওটা বড়দের আলমারি। বড়দের বই আছে ওখানে। ঠিকই তো, বড়দের বই বালক পড়ে বুঝবেই বা কী! মহাভারত, রামায়ণ, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায়, সুখলতা রাও আর অগুনতি কমিকস্ তো পড়া হয়ে গেছে। কতবার আর একই বই পড়তে ভালো লাগে! চুপিচুপি আলমারিটা খুলতে হবে। ‘বালক’ কি আর ছোটো আছে? কই টেপ রেকর্ডারে যখন গান বাজে, সেগুলোতে কি ছোটোদের গান বা বড়দের গান লেখা থাকে? সবাই শোনে, সেও তো শোনে। দুটো গান শুনলেই বালকের চোখ ভিজে যায়। “মা মাগো মা/ আমি এলাম তোমার কোলে”— গানটা বাজলেই মা’কে মনে পড়ে।
বঙ্গাইগাঁওতে ভাই মায়ের কাছে কী আদরই না পাচ্ছে! ভাইয়ের খুব মজা। শটিবনের পাশেই কোয়ার্টার। সকালে ঘি মাখানো গরম রুটিতে চিনি ছড়িয়ে খেয়েদেয়ে এক ছুটে খেলতে বের হয়, মোরগ লড়াই দেখে। দিনে কতবার যে সাইরেন বাজে ভোঁ ভোঁ করে। বাবা তো বাড়িতেই থাকে না। বাবার সাইকেলে বড় একটা বেলচা বাঁধা-ই থাকে। বাড়িতে রেলের লোক এসে কাগজে কী সব যেন সই করায়, অমনি মা ব্যস্ত হয়ে কয়লার উনুনে রান্না বসায়। বাবা খেয়েদেয়ে বেলচা লাগানো সাইকেলটায় চড়ে রেল জংশনে চলে যায়। কয়লার ইঞ্জিনের রেল গাড়ি চালাতে হবে। গৌহাটি, মালিগাঁও, কোকরাঝাড়, লামডিং— কোথায় কোথায় নাকি যেতে হবে রেলগাড়ি নিয়ে। ভাইয়ের খুব মজা, পড়তে হয় না তো, সারাদিন খেলে— সুরজ, মালা, তোতনের সাথে। আলিপুরদুয়ারে আমাকে যে খুব পড়তে হয়। দাদু, কাকাই, কালোদিদা, পিসি আর মানিক কাকু— সারাদিন বলে ;’এটা করবি না, ওখানে যাবি না, লবন খাবি না’ — এত “না না” ভালোলাগে?
আমার একটা ছোট্ট কুকুর আছে। সাদা খয়েরি রঙের। কাকাই একদিন কোত্থেকে নিয়ে এসেছে। ছেলে কুকুর। আমি ওর নাম দিয়েছি ‘ডেভিল’। আচ্ছা, ডেভিল যে ছেলে কুকুর বাড়ির সবাই বুঝল কীভাবে? মেয়ে কুকুরও তো হতে পারে! যাকগে, আমার কী তাতে। ডেভিল আমার সাথে তো খেলে। উঠোন জুড়ে পুত পুত করে দৌড়োয়, আমিও ছুটে গিয়ে ওকে ধরে ফেলি। উঠোনের রান্নাঘরের পিছনে ঐ দূরের পিটকিলা গাছ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির সীমানা। সকালে স্কুল করে বাড়ি ফিরে ডেভিল আর আমি খেলি। পিটকিলা গাছের পিছনেই ইয়া বড় নর্দমা। আমাদের বাড়ি, পাশের বাড়ি, তার পাশের বাড়ি— এক লাইন ধরে সব বাড়ির উঁচু উঁচু খাটা পায়খানা। আমার খুব ঘেন্না করে পিটকিলা গাছের ওদিকটায় যেতে। ডেভিল চলে যায়— আমি দূরে দাঁড়িয়ে— ‘ডেভিল, আয়, তু-তু’ করে ওকে ডাকি। ও কিছুতেই কথা শোনে না। যেদিন যেদিন শরীরে নোংরা মেখে আসে, মানিক কাকু ডেভিলকে হোগলা সাবান দিয়ে ঘসে ঘসে স্নান করায়। ও কুঁই কুঁই করে চিৎকার করে, আমি বলতে থাকি— ‘ যা, আরও যা ঐ নোংরায়, বেশ হয়েছে’… ডেভিল কি আমার কথা বুঝতে পারে? গলায় বেল্ট বেঁধে মানিক কাকু ওকে রোদ্দুরে শুকায়। বেল্ট বাঁধলে দুষ্টুটা আরও বেশি চিৎকার করে।

‘দৈনিক বসুমতী’ আর ‘যুগান্তর’ পত্রিকা বিকেলে এসেছে। পাতা জুড়ে খেলার মাঠে মারা গেছে এমন মানুষদের ছবি। বাড়িতে সবাই বলাবলি করছে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের খেলার সময় অনেক লোক মারপিট করতে করতে মারা গেছে। কই বিজু, অঞ্জন, পাপু, শানটু, টুকাই— ওরাও তো বাড়িতে আসে, আমরা বড় উঠোনে প্লাস্টিকের বড় লাল বল দিয়ে ফুটবল খেলি, আমরা তো মারামারি করি না। বড়রা খেলার মাঠে অমন কেন করলো? দুর্গাপূজার সময় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে গান বাজছে— “খেলা ফুটবল খেলা/খোকা দেখতে গেল/ সেই সকাল বেলা”— গানটা শুনলেই কী কষ্ট হয়! কাকাই এই ক্যাসেটটা বাড়িতেও বাজায়— বুক মুচড়ে ওঠে শুধু! আমি কালো বইয়ের আলমারিটা খুলে ‘ শাভিন ও সুসকভ্ ‘ – এর লেখা “ফুটবলের কলাকৌশল” বইটা আবার পড়তে আরম্ভ করি। ওটায় পেলে, গ্যারিঞ্চা, পুসকাস, হিদেকুটি, লেভ ইয়াসিন, গর্ডন ব্যাঙ্কস্-এর সম্পর্কে কত সুন্দর সুন্দর কথা লেখা! লেভ ইয়াসিনের গোল বাঁচানোর ছবি দেখে আমারও খুব ইচ্ছে করে গোলকিপার হব, তাহলে তো আর খেলার মাঠে মারামারি করতে হবে না!

গাঙ্গুলী বাড়ি আর ভটচাজ্ বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়। বাড়িতেই ঠাকুর বানায়। বন্ধুরা মিলে ঠাকুর বানানো দেখতে দারুণ লাগে। ঠাকুরদালানে উবু হয়ে প্রতিদিন দেখি একটু একটু করে ঠাকুর স্বাস্থ্যবতী হয়ে উঠছে। গনেশ ঠাকুরের ভুঁড়িটা কী-ই সুন্দর। দুগগা ঠাকুরের কোমরটা কী সরু! পাল মশাই দুগগা ঠাকুরের বুক যখন বানায় অতক্ষণ ধরে বুকে হাত বোলায় কেন! সিংহটার না আবার ‘টুঙ্কু’ও আছে। বন্ধুরা দেখায়, আমরা সবাই মুখ টিপে হাসি। এদিকে, জবা, রত্না ওরা যখন আসে তখন না আমরা, ছেলে বন্ধুরা, খুব গম্ভীর হয়ে যাই। লক্ষ করি জবা, রত্না— ওদের মুখ লাল। ওরাও সিংহের তলপেটের নিচে তাকাচ্ছে আর আমাদের দিকে আড়চোখে দেখছে। আমরাও যে ওদের আড়চোখে দেখছি— ওরা কি তা টের পাচ্ছে? কী জানি!


অনেকদিন পরে পড়ে যথারীতি ভাল লাগলো খুব। পরের পর্বের অপেক্ষায়।