(লেনিন)

সক্কাল সক্কাল অল্প হাঁটলেই হাই ইস্কুল। স্কুলটাও জাদুকরের জামার মতো রঙ বদলায়। সকালে প্রাইমারীর জামা, বেলা বাড়লেই হাইয়ের জামা। কিছুদিন ধরে শহরে হৈ-হৈ রব। প্যাডেলওয়ালা রিক্সার সামনে-পিছনে মাইকের চোঙ— গলির মধ্যে খানিকটা এগিয়েই রিক্সা দাঁড়িয়ে পড়ছে।

——”দেখুন দেখুন পি সি সরকার এর জাদুখেলা, ‘অমর টকিজ’ সিনেমা হলে”, থেকে থেকে চোঙ থেকে তারস্বরে চিৎকার ভেসে আসছে।

রিক্সার সীটে বসা লোকটা কাঁচির মতো ক’রে একটা পা অন্য পায়ের উপর রেখে গলার শিরা ফুলিয়ে বলেই চলছে। পুরো পাড়া মাইকের শব্দে গমগম করছে। বন্ধুরা সবাই রিক্সার পিছনে দৌড়াচ্ছে। রিক্সাওয়ালা একটা একটা করে কাগজ তুলে দিচ্ছে হাতে-হাতে। কী সুন্দর গোলাপি কাগজ! ওটায় রাজা-মহারাজাদের মতো ঝলমলে উষ্ণীষ পরা একটা সুন্দর লোক, বুক পর্যন্ত ছবি। জরির কাজ করা গলাবন্ধ রাজপোশাক। গলায় মণি-মুক্তোর মালা। দুই হাতের পাঁচটা-পাঁচটা মোট দশটা আঙুল দেখা যাচ্ছে। সবগুলো আঙুলেই আংটি। লোকটাকে দেখতে ঠিক মহারাজার মতো। তাঁর হাসিমুখ আর চোখ— রাতের তারাদের মতো মিটমিট করছে। চোখে কাজল পরেছে। বড় মানুষরা কাজল দেয় চোখে? সরু গোঁফের দুই প্রান্ত শিবাজীর তলোয়ারের মতো অল্প বেঁকে দুই কানের দিকে গালের পাশটায় কিছুটা উঁচু হয়ে আছে।

তখন ছোট্ট ‘আনন্দমেলা’ পাওয়া যেত। সদাশিব-এর কমিকস ছিল আনন্দমেলায়। সদাশিবের মুখটা কি উজ্জ্বল না? কালো-কালো মুখটায় চোখদুটো কী জ্বলজ্বল করতো! তানাজি, শম্ভুজি, শাহজি ভোঁসলে এঁরা সবাই থাকতেন সদাশিবের কমিকস্ জুড়ে। এঁদের মাথাতেও কাগজের লোকটার মতো উষ্ণীষ। গলায় মুক্তোহার, কোমরবন্ধনীতে কারুকার্যময় তলোয়ার। পা’য় নাগরাই জুতো। হাতি শুঁড়ে জল ভরে জল ছেটানোর আগে যেভাবে শুঁড় মাথার উপর গুটিয়ে নেয়, নাগরাই জুতোর মাথাটাও তেমন, না? জেমিনি সার্কাসদলের হাতিগুলো ওভাবেই তো বড় জোকারটাকে জল ছিটাতো। প্যারেড গ্রাউন্ডের ইয়া বড় মাঠে প্রতিবছর সার্কাসের দল আসতো। তখন এমনটা দেখেছি অনেকবার। জোকারগুলো ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে একে অন্যের পেছনে চটাস-পটাশ করে পিটুনি দেয়। অনেকটা দূরে গ্যালারিতে বসেই সেই পিটুনির ফট-ফট শব্দ শোনা যায়। ওদের ব্যথা লাগে না? স্কুলের স্যারের সরু বেতের লাঠিতে তো খুব ব্যথা লাগে।

সকাল সাতটায় স্কুল বসে। কী মজা সকালে ঘুম থেকে উঠে তো আর পড়তে বসতে হয় না। অংক কষতেও হয় না। আমার না অংক কষতে ভালো লাগে না। তারচেয়ে ইতিহাস পড়তে বেশি ভালো লাগে। ইতিহাসের গল্প শুনতে আরও বেশি ভালো লাগে। বাবা বঙ্গাইগাঁও থেকে আলিপুরদুয়ারে মাসে একবার করে আসে। রাতে শুয়ে শুয়ে আমাকে মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা, নটিলাস নামের একটা ডুবোজাহাজ আর ক্যাপ্টেন নিমো-র গল্প, ‘হেলেন অফ ট্রয়’— ইয়া বড় কাঠের ঘোড়ার ভিতর লুকিয়ে থাকা সৈন্যদের গল্প, ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’-এর শাইলকের গল্প বলে। ঘরের সিলিংটা তখন যেন সিনেমা হলের সাদা পর্দা হয়ে যায়। চরিত্রগুলো ‘জ্যান্ত মানুষ’ হয়ে পর্দায় ছুটে বেড়ায়।

ভালো লাগে ‘অঞ্জনা নদীতীরে খঞ্জনী গাঁয়ে’ কবিতাটা সুর করে পড়তে। ‘ ভয় কী, আমি যে শম্ভু ‘, ‘বাদল করেছে। মেঘের রঙ ঘন নীল ‘— ‘সহজপাঠ’ পড়তে পড়তে উদাস হয়ে যাই। কংসবধের যাত্রাপালা দেখতে ইচ্ছে করে।

কংসবধের কথা মনে পড়লেই মন ছুট লাগায় কুচবিহারের রাসমেলায়। ওখানে কত্ত বড় পুতনা রাক্ষসী। ইয়া বড় দুটো দাঁত। কৃষ্ণ পুতনা রাক্ষসীর বুকে কামড় দিয়ে মেরেই ফেলেছে পুতনাকে। রাসমেলায় গেলেই টমটম গাড়ি পাব। শোলার পাখির গায় সুতো বাঁধা। সুতোটা আবার একটা কাঠির সাথে বাঁধা। কাঠিটাকে হাতে ঘোরালেই শোলার পাখি বনবন করে ঘোরে আর ট্রিং-ট্রিং করে শব্দ করে! কাকাই দূরবীন কিনে দেয়। একটা দূরবীনে আবার সিনেমা দেখা যায়। কাকাই বলেছে ওগুলো সিনেমার রিল। একটা দূরবীন কিনলেই দোকানদার অনেকগুলো রিল দেয়। দূরবীনের সামনের সরু চ্যাপ্টা জায়গাটায় একটা রিল ঢুকিয়ে দিলেই চোখের সামনে ভাসে হিন্দি সিনেমার দৃশ্য। গব্বর সিং-কে একটা লোক গলার মধ্যে লাঠি পেঁচিয়ে ধরেছে। গব্বর সিং ব্যথা পাচ্ছে। ওর মুখটাও তখন পুতনার মুখের মতো লাগছে। ছোটোপিসি বলেছে ঐ সুন্দর লোকটার নাম ধর্মেন্দ্র। কি শক্তি, না? দুষ্টু গব্বরকে ও খুব পিটিয়েছে। খুব আনন্দ হয়েছে পিসির মুখে এই কথাটা শুনে।

আমাকেও হেড স্যার প্রেয়ার লাইনে সবার সামনে পিটিয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে দাদুকেও (ঠাকুরদা) নালিশ করে গেছে। করবেই তো। সকালে স্কুলে যাবার সময় বিজু আর অঞ্জন ছিল আমার সঙ্গে। বিজু হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা বিড়ি কুড়িয়ে মুখে নিয়ে টানল। আমার হাতে দিয়ে বলল— টান টান। আমি টান দিতেই সে কী কাশি। কই দাদু তো সারাদিন সিগারেট খায়, এত কাশে না তো! প্রেয়ার লাইনে সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আবার ধুম কাশি এল।

—”স্যার স্যার, ও বিড়ি খেয়েছে, তাই এত কাশছে “, বিজু হেডস্যারকে বলল।

অমনি সবার সামনে হেডস্যার আমাকে খুব পিটুনি দিল। পা’য় দাগ পড়ে গেল। বাড়িতে ফেরার পরে দাদুও দিল। আচ্ছা বিজু এমন করল কেন? ও-ই তো রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিজে টান দিল, অঞ্জন টান দিল, তারপর আমাকে বলল— ‘টান টান’..আমার কী দোষ! বন্ধুরা এমন করে অন্য বন্ধুকে মার খাওয়ায়?

রেজাল্ট বেরিয়েছে। প্রাইজ পাব। কী মজা। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পুরস্কার তুলে দেবেন শহরের একজন নামজাদা মানুষ। উনি কলেজ বিল্ডিং নির্মানের জন্য জমি দান করেছিলেন। শহরের একটি নামি হাইস্কুলের হেডস্যার ছিলেন। তো তিনি সার্টিফিকেট এবং দুটো বই তুলে দিলেন। কাকাই আগেই বলে দিয়েছিল— প্রণাম করবি কিন্তু। কাকাই খুব খুশি হয়েছে। বাড়ি ফিরতেই কাকাই হঠাৎ রেগে লাল। এতটুকু বাচ্চাকে কেউ ‘লেনিন’ পড়তে দেয়? পরদিনই কাকাই পাড়ার এক জেঠুর কাছে গেল পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ‘লেনিন’ বইটা হাতে নিয়ে।

জেঠু হাইস্কুলের খুব নামকরা একজন টিচার। কাকাই বাড়ি ফিরে দাদু আর বাবাকে বলল ওই জেঠুকে নাকি খুব করে কথা শুনিয়েছে। তুমুল ঝগড়া-তর্কও নাকি করেছে এই বলে যে— ‘ক্লাস টু’ এর বাচ্চাকে কেন..কেন… কেন….লেনিন পড়তে দেওয়া হবে? এদিকে দাদু আর বাবা বলছে এটা নাকি খুব ভালো বই। সবার পড়া উচিত। ঐ জেঠু আর কাকাই তো একই পার্টি করে। একসাথে মিটিং করতে যায়। ভোটের সময় একসাথে প্রচার করে। শুনেছি আলাদা আলাদা পার্টির লোকেরা ভোটের আগে একে অন্যের সাথে ঝগড়াঝাটি করে…তা’হলে একই পার্টি, নিজের পার্টির লোকেদের মধ্যেও এত ঝগড়া হয় কেন?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য