[ভারতীয় মহিলা হিসেবে প্রথম ইংরেজি উপন্যাস রচয়িত্রী]

৪র্থ পর্ব

অধ্যায় ৭

গণেশ লক্ষ করতেন যে তাঁর বোনেরা কমলাকে দিয়ে খাটিয়ে নিতেন। বলা হতো এতে সে সহ্যশক্তি অর্জন করবে। অপরিচিতদের কাছে এসব মনে হতো, “বেচারা মেয়ে! মা নেই!” আর দেখানো হতো বাড়ির মেয়েরা সব কাজ নিজেরাই সামলে নেয়। ঘটনাচক্রে একদিন তিনি আবিষ্কার করলেন কেন কমলা অনুভূতিহীন হয়ে থাকে। কমলা টের পায়নি যে তার বিষয়ে স্বামীর মনে প্রশ্ন জেগেছে এবং ঘটনাচক্রে সেও তা জানতে পারল। সেদিন গরম ধোঁয়াশাপূর্ণ ছিল এবং সে বুঝতে পারেনি সে অসুস্থ এবং তার জ্বর হয়েছে। প্রতিবেশী বাড়ির সব মেয়েরা এক মুক্ত জায়গায় খেলার জন্য জমায়েত হয়েছে। কিন্তু কমলার যোগ দিতে ইচ্ছে করছে না। তাদের বাড়ি এবং নদীর মাঝখানে অবস্থিত এক ক্ষুদ্র ধ্বংসপ্রায় মন্দিরের পিছনে এক ঠান্ডা জায়গায় সে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে বসে সে নিজেকে খুবই দুর্দশাগ্রস্ত মনে করছে। সে জানত না তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর। কাঁপা হাতদুটি বুকের উপর রেখে সে দীর্ঘক্ষণ বসে আছে। তখন কেউ তার দিকে এগিয়ে আসছেন। সে এত ক্লান্ত ছিল, যে মাথা তুলবার শক্তিটুকুও তার ছিল না। কিন্তু, গায়ের কারো স্পর্শ পেয়ে সে সচকিত হল। কারণ কপালে সেই স্পর্শ ছিল পেলব এবং স্নেহপূর্ণ এবং স্পর্শকারীর কথা ছিল সমবেদনাপূর্ণ। “কি, শরীর ভালো নেই? এখানে কী করছ? ভয়ে ও বিস্ময়ে কমলা চোখ মেলল। সে দেখল এতদিন এড়িয়ে যাওয়া সেই মুখের মানুষটি আর কেউ নন, তার স্বামী। তিনিই তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। “পাগলামি করো না। আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব না। কাছে এসো, আমাকে তোমার স্পর্শ অনুভব করতে দাও। তোমার শরীর গরম এবং তোমার জ্বর হয়েছে।”
শুনে সে বিস্ময়ে চোখ খুলল এবং যখন গণেশ তার কাছে এলো তখন সে উত্তেজিত হয়ে মাথা সরিয়ে নিয়ে বলল—“জানেন, আপনার আমাকে ছোঁয়া উচিত নয় এবং আমার সঙ্গে কথা বলাও উচিত নয়।” এই বলে সে মুখ লুকোবার এবং চলে যাবার চেষ্টা করল।
তাকে থামিয়ে তিনি হেসে বললেন, “কে তোমাকে এসব বলেছে? বোকার মতো কথা বলো। এখন বাড়িতে গিয়ে নিজের যত্ন নাও। মাকে বলো যে তোমার জ্বর হয়েছে এবং ওষুধ খাও। আমি জানতাম তুমি বোকা। তাই তোমার খোঁজে এসেছি।”
কমলা জিজ্ঞেস করল, “আমার খোঁজে?”
“হায়! সারাদিন তোমাকে দেখিনি। তাই তোমাকে দেখতে বেরিয়েছি,” তিনি কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন। কমলা কখনও এত বিস্মিত হয়নি। কিন্তু কিছুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে, তারপরে কম্পিত ঠোঁটে এবং উজ্জ্বল চোখে সে বলল: “আপনি অন্যদের মতো আমাকে ঘৃণা করবেন না এবং আমাকে এড়িয়ে যাবেন না?”
“না! কেন আমি করব? কীসব আজেবাজে চিন্তা করছ?”
“কারণ আমি দরিদ্র এবং কপর্দকহীন এবং আমার কারো কাছে যাবার নেই।” এই কথাগুলি বলে কমলা কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার প্রতি আগ্রহ এবং সমবেদনা তার হৃদয়ে এতদিনের বেদনার বাঁধ ভেঙেছে এবং সে অজ্ঞানত তার মনের বোঝা স্বামীর কাছে সমর্পণ করল। আরও অঝোরে অশ্রু বেরিয়ে এল। কিন্তু, এখন সে কাঁদতে লজ্জিত নয়। করুণামাখা কথা এবং দৃষ্টি যা করণীয় তা করেছে। পুরনো সবকিছু ভুলে সে স্বামীর সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলতে শুরু করল।
সে বলল, “বাবা আমাকে দেখতে আসে না।”
“আমি সন্ন্যাসীকে তোমার কাছে নিয়ে আসব। এইভাবে ভেঙে পড়া তোমার উচিত নয়। কেউ তোমাকে ঘৃণা করে না। অর্থ বলতে তুমি কী বোঝো? আমি তোমাকে তা এনে দেব।” তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে কমলার চোখ মুছে দিলেন। এতে কমলা আবার লজ্জিত হল। সে মাথা নিচু করে কিন্তু হৃদয়ে ভরপুর আবেগ নিয়ে বাড়ি ফিরল। তখন, গণেশ নদীতীরে হাঁটবার জন্য এগিয়ে গেলেন। ব্যথায় কমলা মাথা দপদপ করছে। ঘরে গিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। হৃদয়ে তার আনন্দের প্রবাহ বইছে। চূড়ান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে সে অবশেষে এক বন্ধুকে পেয়েছে। মাথার যন্ত্রণা আরও বাড়ল এবং জ্বরও বাড়ল। কিন্তু এখন সে পরোয়া করে না। সে এখন বেশি অসুস্থ বোধ করছে না, কারণ এখন একজন আছেন যে তার জন্য চিন্তা করছেন।
সেই রাতে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় সে দেখল ঘর লোকে ভর্তি, চারপাশে আলোর আনাগোনা। কিন্তু, সে ঠাহর করতে পারছিল না ঘরে কারা আছে। এইভাবে বেশ কিছুদিন কাটার পরে কমলা যখন চোখ খুলল এবং অনুভব করল পাহাড়ি হাওয়া গায়ে লাগছে। কেউ একজন তার নাড়ি পরীক্ষা করছেন। দুটো চোখ আন্তরিকভাবে তার দিকে নিবদ্ধ এবং সেই চোখের শক্তি তাকে এমন অসাড় করে ফেলেছে যে সে চোখ ফেরাতে পারছে না। পুরুষটির এক হাতে তার নাড়ি এবং অন্য হাত তার কপালে। নতুন এক শক্তির তরঙ্গ সেই পুরুষের থেকে তার দেহে সঞ্চারিত হচ্ছে। রোগাক্রান্ত উত্তেজনা তার শরীর থেকে চলে গেল। সে আরাম এবং উজ্জীবিত অনুভব করল এবং তার চোখ বন্ধ করল। হাতের মুঠো আলগা করে তরুণ বললেন, “ও এখন ভালো আছে। আমার অনেক ধকল গেছে। ওকে ঘুমোতে দাও।” সেই স্বর এতই কোমল এবং কপালে হাতের স্পর্শ এতই আরামদায়ক যে সে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুমোল। ঘুম থেকে জাগার পর সে প্রথমবারের মতো অনুভব করল সে এক অচেনা জায়গায় আছে—একটি শীতল মন্দির এলাকা, যেখানে ঘন্টা বাজছে, মাঝে মাঝে কাঁসরের আওয়াজ এবং শঙ্খের তীক্ষ্ণ ধ্বনি। তার শাশুড়ি, স্বামী এবং কাশী—সবাই কাছে আছে। পুরোহিত এলেন, মন্ত্র উচ্চারণ করলেন এবং ধূপ জ্বালালেন। তিনি কমলার গায়ে মারগোসা গাছের পাতা বুলিয়ে বললেন যে ডাইনির প্রভাব কেটে গেছে। তারপর রহস্যজনক স্বরে বললেন, “কমলার শরীরের সাতটি ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু গৃহদেবতা এবং আমাদের মহান দেবতা সেই ভাগগুলি নিতে অস্বীকার করেছেন, তাই সে রেহাই পেয়েছে।” তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের কমলাকে সামনের পবিত্র কুন্ডে স্নান করাতে বললেন। তারপর দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা দিতে পরামর্শ দিলেন। উপস্থিত লোকদের আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কমলা বুঝতে পারল যে “মন্ত্র” নয়, বরং কমলার উপর সেই অপরিচিত তরুণের প্রভাবই তাকে সুস্থ করেছে। সারাদিন ধরে সে শুধুই সেই তরুণের এবং তাঁর বিস্ময়কর ওষূধের প্রশংসা শুনে গেল।
কমলার গায়ে হাত রেখে কাশী বলল, “আমরা ভেবেছিলাম তুমি বাঁচবে না। বহুদিন জ্বর ছাড়ছিল না। অনেক চেষ্টা করা হয়েছে এবং সব বিফল হয়েছে। সমাধিস্থ এক মহিলা তখন তাঁর এক আত্মীয়ের আত্মাকে ডেকে জানতে পারেন যে এক ডাইনির কোপ তোমার উপর পড়েছে এবং কুমারী আত্মা কুন্নিয়া তোমার শরীরে প্রবেশ করেছে। ঝাড়ফুঁক করার জন্য তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। কিন্তু, এখানে আসার পর তোমার দেহ শীতল এবং জ্ঞানহীন হয়ে যায়। তখন আমার কাছে তোমার খবর পৌঁছয়। আমি বাবাকে নিয়ে এখানে আসি এবং বাবা সেই তরুণকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। কারণ, সেই একমাত্র দক্ষ ব্যক্তি ছিলেন। আর এখন তো দেখতেই পাচ্ছ তিনি তোমার জন্য কী করেছেন।
পরদিন তরুণ আবার এলেন। তাঁর উপস্থিতিতে কমলা ভয় অনুভব করল এবং এক অদ্ভূত শক্তিতে তার অস্তিত্ব যেন তরুণের আয়ত্তে চলে গেল। সে অনুভব করল এই পুরুষের আদেশে সে যে কোন কিছু করতে পারে। এই চিন্তায় সে কাঁপতে থাকল। একমাত্র যখন তিনি চলে যেতে উদ্যত হলেন তখন সে বিস্ময়ে তাঁকে চিনতে পারল— যে এই অপরিচিত তরুণের সঙ্গেই তার পাহাড়ি বাড়ির কাছে ওষধি সংগ্রহরত অবস্থায় তার দেখা হয়েছিল। এঁকেই সে বাবার কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে এই উপলব্ধি নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখল। কিছু সময় পরে তার শক্তি ফিরে এল এবং তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হল। তার স্বামী যত্ন এবং মনোযোগের বিষয়ে বিরামহীন ছিলেন। এতে সবার আপত্তি ছিল। কিন্তু, তিনি কিছু মনে করেননি। অশক্ত এবং দুর্বল কমলা তাঁর মনোযোগ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করল। সে জানত যে তার শাশুড়ি এবং ননদেরা আসন্তুষ্ট ছিলেন। সমস্ত রীতির বিরুদ্ধে তাঁর সেবার নিরত থাকার জন্য তাঁরা ক্রুদ্ধ ছিলেন। রোগির ঘরে তার খোঁজ নিতে আসার জন্য তার বিরক্তি বোধ করত। কমলার এমন শক্তি ছিল না যে তাঁদের শান্ত করে।
হিন্দুদের মধ্যে এক প্রথা আছে যে তারা প্রতি বছর অসংখ্য দেব-দেবীর প্রিয় আবাসস্থল দর্শনে যায়। মহিলা এবং শিশুরা একত্র হতো, দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য হিসেবে মিষ্টান্ন এবং পিঠা তৈরি করত এবং তারপর গাড়িতে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে দীর্ঘপথ অতিক্রম করত। তীর্থস্থানের মধ্যে উপযুক্তভাবে বিখ্যাত ছিল দুধস্থল। দূর দূর স্থান থেকে মানুষ এখানে দর্শনে আসতেন। এছাড়া এই স্থান মহান সৌন্দর্যের স্থল ছিল। আশেপাশে আরও অনেক দ্রষ্টব্য স্থান ছিল। গঙ্গা গোদাবরী নদী এখানে মিলিত হয়েছে এবং এক বিশাল পাথরের উপর থেকে নিচের গুহার দিকে লাফিয়ে পড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে এক অতি সুন্দর জলপ্রপাত। গুহার কাছে এক পাথরের ফলকে পতিত হয়ে জলরাশি ফোয়ারায় ছড়িয়ে পড়ছে। ধোঁয়ার মতো অনেক উঁচু পর্যন্ত লাফিয়ে ওঠা এই জলরাশি দেখে মেঘের মতো মনে হয়। এই কারণে এই স্থানের নাম হয়েছে দুধস্থল, যার অর্থ ‘দুধের স্থল’।
শিবগঙ্গা থেকে প্রতি বছর এক বড় দল দুধস্থলে যায়। সেই তীর্থযাত্রার সময় ঘনিয়ে আসছে, যখন কমলা সুস্থ হয়ে উঠছে। আর যখন এক দল তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তাতে কমলাও যোগ দিল। কাশী এবং তার অনেক মেয়ে বন্ধু তার সঙ্গে গেল এবং তাই সে খুব খুশি ছিল। সে একবার একদলের সঙ্গে এবং আর একবার অন্য দলের সঙ্গে মিলত। এর ফলে সে মনের সুখে আনন্দ উপভোগ করছিল। এই ধরনের যাত্রায় যে স্বাধীনতা এবং সরল আনন্দ পাওয়া যেত তা হিন্দু বাড়ির নীরস, কৃত্রিম পরিবেশে একেবারেই দুর্লভ ছিল। ননদেরা কী ভাবছে তা কমলার মনেই আসছে না। ননদেরা সঙ্গেই ছিল, কিন্তু এখানে তাদের প্রভাব খাটছিল না। তার স্বভাবগত প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এক পরিপূর্ণতা লাভ করল, কারণ সে গ্রাম্য পরিবেশের অনেক এবং বিচিত্র দৃশ্য দেখল।
শিশিরস্নাত বনাঞ্চল যার মধ্য দিয়ে তীর্থযাত্রীরা সকালে পথ অতিক্রম করত কাঠুরের কুঠারের শব্দে প্রতিধ্বনিত হত। ক্ষেতে বলদের পায়ে ছেটান জলের শব্দ দূর থেকে শোনা যেত। পল্লীগ্রামের নানা প্রান্ত থেকে বৈচিত্রময় শব্দও আসত। দেখা যেত বেগুনি রঙের লতাগুল্মের ঝোপ, যা সবুজ পাতার ভারে নুয়ে পড়েছে এবং লেবু ও কমলার ফুল বাতাসে মিষ্টতা ছড়াচ্ছে। কুয়োর পাশে চোখে পড়ছে সবুজ সবজির সমৃদ্ধ ক্ষেত। গ্রামবাসীদের কন্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কোথাও মহিলারা মাথায় ফল বা সবজির ঝুড়ি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের মনোরঞ্জন করতে লাঙ্গল ঠেলা তরুণ কৃষক মজার ছন্দে গান গাইছে। সে মহিলাকে ঘাড় ফিরিয়ে জলের স্বাদ গ্রহণ করতে আহ্বান করছে—“গান করো, তোমার তৃষ্ণা মিটে যাবে। তোমার মুখে নতুন সৌন্দর্য এবং লাবণ্যের ছটা ছড়াবে। দেখবে আমার তোলা জল কেমন!” তারপরেই সে বলদের প্রতি ডাক দিচ্ছে “হেঁট! হেঁট!”, যাতে বলদের গতি দ্রুততর হয়। এই শব্দ চারদিকের পাহাড়ে ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কুঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়া মহিলার মুখ ঝামটা হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে: “আমার গান বাক্সে বন্দী আছে। তুমি বড় বড় কথা বল। তোমার শব্দ কম পড়লে আমার বাক্স থেকে ধার করো না! কারণ যারাই করেছে তারাই বিপদে পড়েছে।” মেয়ের কথায় কান না দিয়ে কৃষক গান করতে থাকল। তীর্থযাত্রীরা ক্ষেতের পাশ দিয়ে গেলেই ফুল, নতুন কাটা বিচালি বা ওপড়ান মাটির গন্ধ তাদের মোহিত করে। বিচালির জড় করা বা বেধে গোছা করা নিয়ে পুরুষ এবং নারীর মধ্যে হাসি-ঠাট্টার আনন্দপূর্ণ শব্দ তাদের কানে আসছে। কাজ করতে করতে পুরুষদের ছন্দময় ঐকতান আর তার সঙ্গে ছন্দময় পায়ের আওয়াজ তারা শুনতে পারছে। ওরা ক্ষেত থেকে বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছে। তাদের গাওয়া গান, এক দল গাইছে, “ধীরে, ধীরে ছেলেরা পা চালাও।” অন্য দল উত্তর দিচ্ছে, “হোয়! হোয়!” “আমাদের বাড়ির ভাজা সস্তা পিঠে নিয়ে বোকা মেয়েরা আমাদের আসার অপেক্ষা করছে।” “হোয়! হোয়!” সুন্দরী মহিলা পাশ দিয়ে গেলে গানের সুর হঠাৎ বদলে যায়:–“কালো শাড়িই এই কাণ্ড করছে?” “না! না!” “নাকি হরিণ শিশুর মতো চোখ, না হরিণীর মতো পদক্ষেপ?” “হ্যাঁ! হ্যাঁ!” উত্তর এল এবং সঙ্গে সঙ্গে হাসির ফোরায়া। বেচারা মহিলা মাথা নিচু করে ফিরে তাকালে গান আরও দুষ্টুমিতে ভরে ওঠে। “বিনয়ী মুখ, বিনয়ী চোখ।” “হোয়! হোয়!” পাহাড় পেরিয়ে যাওয়া পুরুষদের মুখ থেকে শোনা গেল। মেঘের সঙ্গে মিশে যাওয়া মিছিল পথচারীদের কাছে অদ্ভূত বোধ হচ্ছিল। মজুরদের গ্রাম অনেক নিচে। তাদের স্ত্রী এবং সন্তানরা আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি এবং গাদের নিঃশ্বাস নেওয়া মুক্ত বাতাস তাদের হৃদয়ে এমন নির্দোষ আনন্দের জন্ম দিচ্ছে।
এখন এক স্বপ্নে দেখা পুকুরের পাশ দিয়ে তীর্থযাত্রীরা যাচ্ছে, যাতে পদ্মের ঝাড় মাথা নুইয়ে আছে। অলস গবাদি পশু তীরে ঘুমোচ্ছে। আর মৌমাছির গুঞ্জন সবদিক থেকে শোনা যাচ্ছে। পাশের ঝোপের মধ্যে এক বিশাল খোদাই করা পাথর দেখে বোঝা যাচ্ছে এটা এক প্রধান দেবতার শিলা। অদূরে এক বুদ্ধ মূর্তি শায়িত অবস্থায় আছে। পর্যটকরা আরও এগিয়ে গেলে দেখতে পাচ্ছে এক অতি সাধারণভাবে নির্মিত মন্দিরের চারপাশে একই রকম সাধারণ ধরনের কিছু কুটির। সেই মন্দিরের ভিতর থেকে বৈরাগীরা উঁকি দিচ্ছে। বিগ্রহের প্রতি প্রণাম জানিয়ে তীর্থযাত্রীরা এগিয়ে চলল। অদূরেই তাদের সামনে দেখা দিল এক পাথরের গুহা, মুখে ঝুলে পড়েছে লতাগুল্মের ঝোপ। গুহার ভিতরের দেয়াল থেকে চুইয়ে পড়া জলবিন্দুর টিপ টিপ শব্দ তারা শুনতে পাচ্ছে। যখন তারা গুহার মুখে উঁকি দিল তখন এক ঝলক শীতল বাতাস তাদের মুখে লাগল। নিচের গর্তে জমা স্বচ্ছ জলে পর্যটকদের তৃষ্ণা মিটল। এই গর্তের নাম সীতাকুন্ড। পাশে অবস্থিত শ্যাওলা মাখা পাথরের বেদী হল তাঁর (সীতাদেবীর) শিশুদের শয্যা। পাহাড়ি এই এলাকার বিশাল গাছের উপরে হনুমান চিৎকার করছে আর পথিকদের গায়ে জামরুল বা অন্যান্য ফল ছুঁড়ে দিচ্ছে। আর একটু এগিয়ে তীর্থযাত্রীদের কানে এল টমটমের শব্দ। এইখানে এক দেবতার আবির্ভাব হয়েছে এবং কাছেপিঠের গ্রামের মানুষ সেই দিকে দ্রুত যাচ্ছে। এক বেপরোয়া কাঠুরের কাটা এক গাছের থেকেই দেবতার উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে। কারণ, গাছের কাটা অংশ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। দেবতার ক্রোধ অবদমিত করতে ইতিমধ্যেই এক ছাগবলি দেওয়া হয়েছে। চারিদিকে পতাকা উড়ছে। শীঘ্রই এখানে এক পাথরের দেবস্থল এবং মন্দির নির্মিত হবে। কমলা সবকিছু প্রত্যক্ষ করল। তারপর সে বন্ধুদের সঙ্গে বুনো ফুল সংগ্রহ করল। তারপর প্রত্যেক দেবস্থল এবং মন্দিরে গিয়ে অর্ঘ নিবেদন করে প্রার্থনা করলো:–“হে দেবতা! আমার সঙ্গী হও। আমার বাবাকে সাহায্য এবং রক্ষা করো। আমাকে সুখদান করো।” যত গহনতম জায়গায় বিগ্রহ আছে তত সমীহ তার হৃদয়ে অনুভূত হলো।
দিনের বেলায় তীর্থযাত্রীরা এক পুকুর বা নদীর ধারে ছড়ান গাছের ছায়ায় তাদের গাড়ি থামাত। আগুন জ্বালিয়ে সবাই মিলে মিশে সাধারণ খাবার রান্না ক্রত। জ্বালানি বা জল সংগ্রহ করতে সবাই হাত লাগাত। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে চল হাসি ঠাট্টা। বড়রা ছোটদের নিয়ে অনেক মজা করত। মহিলাদের থেকে পুরুষদের সংখ্যা কম ছিল। তীর্থযাত্রীদের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতাই বেশি দেখা যেত। কিন্তু, পুরুষদের মধ্যে কমলার স্বামী ছিলেন। কাশী, ভাগীরথী এবং অন্যান্য কয়েকজন মেয়ে কমলার থেকে বয়সে বড় ছিল। তাই তাকে ঠাট্টার ভাগ বেশি সইতে হতো। কারণ মেয়েবন্ধুদের সামনে তাকে স্বামীর জন্য বেশ কিছু কাজ করতে হতো। সব বন্ধুদের মধ্যে অদ্ভূত মিল ছিল। কে কোন পরিবারের বা কোন দলের কোন বিবেচনা না করেই পুরুষেরা কুয়ো থেকে মেয়েদের জল তুলতে সাহায্য করত। রাত নামার আগে সন্ধ্যা থাকতে থাকতে তীর্থযাত্রীরা এক সরাইখানায় থামত। রাতের মতো সেখানে তার বিশ্রাম করত। গবাদি পশু চড়ান এবং গ্রাম্য বাড়ির দৃশ্য কমলার কাছে অদ্ভূত এক শান্তি এনে দিত। কাশীর পাশে বসে সে স্বপ্নময় চোখে আকাশের তারা দেখত। তার সঙ্গে কানে ভেসে আসত অনুপযুক্তভাবে রক্ষিত বিশ্রামালয়ের মধ্যে বাতাসের গর্জন। সন্ধ্যায় স্বামী কমলাকে খুঁজে নিয়ে তার পাশে বসতেন। তিনি কমলা, কাশী এবং তাঁর মাকে সেই দিনের যাত্রাপথে যে বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থান দেখেছেন তার বর্ণনা করতেন।

অধ্যায় ৮
পথে প্রায় আটদিন বিভিন্ন স্থান দর্শনের পর তীর্থযাত্রীদের দল দুধস্থলে পৌঁছল। পথের বৈচিত্রময় দৃশ্য দেখে এবং স্রোতস্বিনীর জলের গর্জন শুনে কমলা প্রীত হল। হাওয়া দমকার মতো মাঝে মাঝে ধেয়ে আসছিল এবং এক সুরেলা গীতের সৃষ্টি করছিল। চারিদিকে গোলাকার এবং চ্যাপ্টা পাথরের তৈরি ছোট বাড়িগুলি দেখা যাচ্ছিল। জলপ্রপাত থেকে কিছুটা দূরে নদীবক্ষ প্রসারিত হয়েছিল। সেই জলে পাথরের খোদাই করা বিশাল নন্দীর (ষাঁড়ের মূর্তি) পদতল ধৌত করছিল।
নদী থেকে কিছুটা দূরে এক অন্ধকার বনের মধ্যে মন্দির অবস্থিত ছিল। তাকে নিয়ে মহিলাদের আলোচনা কমলার কানে আসছিল। কেউ নদীর জলে খই ছুঁড়ে ফেলছিল এবং কেউ নারকেল ভাঙছিল। নিচের গুহার কাছে লাফিয়ে পড়া নদী দেখে বয়স্করা হৈচৈ করছিল। ধার্মিকরা বলছিল, “হরি! হরি! শিব! শিব! পৃথিবী আমাদের পবিত্র গঙ্গাকে গ্রাস করছে। চারিদিকে শত্রুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি ধরণীমাতা তাঁর শুভ কর্মে ঈর্ষান্বিত হচ্ছেন এবং তার প্রবাহে বাধা দিচ্ছেন।” জলের দুরন্ত প্রবাহের খুব কাছে সিঁড়ির উপর ভিড়ের মাঝে কমলা দাঁড়িয়ে আছে। এই স্থান তার মনে এমন এক সংবেদন সৃষ্টি করে যা আগেও সে অনুভব করেছিল। মনে হচ্ছিল সে ভাবছে যেন এক পুরনো পরিচিত দৃশ্য দেখছে। দ্রুত প্রবাহিত নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এই অনুভূতি প্রবল মনে হচ্ছিল। তার বিপরীত দিকে একটি পাথর আছে, যা কমলা স্পষ্টভাবে চিনতে পারল। জলের এমন শব্দ সে আগেও শুনেছে। নিশ্চিতভাবে সে এইসব দৃশ্য দেখেছে। কিন্তু ওখানে কী ঘটল? তার মাথায় কেন স্বপ্নালু বেদনা শুরু হল? এটা দুশ্চিন্তার দবদবানি। সে যেন এক চেতনহীনতায় পতিত হল, কারণ কাকে সে দেখছে যে তাকে হাত বাড়িয়ে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে? এ এক মহান সুন্দরী মহিলার অবয়ব; যার গলায় হীরার হার পরা। জল হিস হিস শব্দে তার চারদিক দিয়ে গর্জন করে যাচ্ছে। এক মুহূর্তে তার মনে হলো পা পিছলে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো সেই মহিলা তার পরে জলে নিমজ্জিত হলেন। হায়, এই ভয়ঙ্কর জলাশয়! কত অন্ধকার দেখাচ্ছে? এক বেদনার শিহরণ তার শরীরে বয়ে গেল। সেই মহিলা তাকে ধরে তুলে আনলেন, কিন্তু কখন এবং কোথায় এই ঘটনা ঘটেছিল? সত্যিই কি সে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল? কী তার মনে এইসব কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিয়ে আসছে? এইভাবে ভাবনায় নিমজ্জিত থাকার সময় এক স্বর তার কানে পৌঁছল এবং সে চমকে উঠল। এই স্বর তার বাবার যা তার মনের মধ্যে সৃষ্ট এই প্রাণবন্ত দৃশ্যের সঙ্গে অদ্ভূতভাবে মিশে ছিল। এ যেন এক বিস্মৃত সঙ্গীত—যা তার উপর এবং চারিদিকে এক ঘোরের সৃষ্টি করেছিল। এই স্বর এখন তার কানে স্পষ্ট প্রতীয়মান হলো এবং তার মনে হলো সে এক স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে। সে অনেক কষ্টে ঘুরে দাঁড়াল এবং ঠিক তখনই সে বাবাকে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল। সে চিৎকার করে উঠল:– “বাবা! বাবা!” এবং ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার বাবার কী হলো? কারণ উথাল নদীর দূরতম প্রান্তে সে নিজেকে একা অন্ধকার বনে এক মন্দিরের সিঁড়িতে আবিষ্কার করল। কাঁসর এবং শঙ্খের আওয়াজ কর্ণবিদারি ছিল। এই অদ্ভূত দৃশ্য দেখে তার মনে ভয় হলো এবং সে অনুভব করল ভিড়ের মধ্যেকার মুখগুলো তার দিকে কৌতূহলের চোখে তাকিয়ে আছে। সে ভাবল, “হায়! আমার স্বামী এবং শাশুড়ি কী ভাববেন?” বৈরাগীদের ভস্মমাখা শরীর এবং উৎকট চেহারার পুরোহিতদের বিশাল দৃষ্টিকারী চোখ কমলার মধ্যে অস্বস্তির সঞ্চার করল। ভীত ত্রস্ত কমলার শরীরে যেন কোন শক্তি নেই, তাই সে চাইলেও চিৎকার করতে পারছে না। সে মাটিতে বসে পড়ল। এক শান্ত, দৃঢ় এবং কর্তৃত্বকারী স্বর তাকে বলল, “ওঠো”। সে নির্দেশ মেনে কম্পিত ভাবে উঠে দাড়াল। “তোমার সহযাত্রীদের মধ্যে এস। এটা তোমার স্থান নয়। তোমার বাবা চলে গেছেন।” এই কথা শুনে সে বক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, তিনি সেই তরুণ চিকিৎসক! এক অপ্রত্যাশিত শান্তভাব তাকে গ্রাস করলো। সে কিছু বলতে চাইল।
“চুপ! কথা বলো না! এটা কথা বলার জায়গা নয়,” এই কথা বলে তিনি কমলার হাত দৃঢ়ভাবে ধরলেন এবং ভিড়ের মধ্য দিয়ে তাকে দূরবর্তী এক দলের কাছে নিয়ে গেলেন। সেটা ছিল কাশীদের দল এবং কাশীকে এগিয়ে আসতে দেখে কমলা হাঁফ ছেড়ে বাচল।
“সন্ন্যাসি নারায়ণ আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কমলাকে তার দলের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি এক মন্দিরে আছেন এবং তোমাকে দূর থেকে দেখেছেন। কিন্তু তাঁর অন্যান্য পালনীয় কর্তব্য আছে।” এই কথা বলে লোকটি চলে গেলেন। এই কথা শুনে কমলার গলার কাছে শ্বাস আটকে এল এবং সে কাশীকে কিছু বলতে পারল না। এদিকে কাশী কমলার দিকে প্রশ্নালু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কমলা যখন কাঁদতে শুরু করলো তখন কাশী ভাবল বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদের জন্যই সে কাঁদছে। সে তাকে সান্ত্বনা দিল। তারপর দুজনে দলের সঙ্গে মিলিত হল। দল এখনও উঁচু তীরে দাঁড়িয়ে আছে। এই সামান্য ঘটনা কমলাকে বিলক্ষণ মথিত করল। তার মধ্যে কী এমন আছে যে সে এমন দৃশ্য দেখল? সে কি আগে কখনও এই দৃশ্য দেখেছে? আর বাবাই বা কেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন? সে এই রকম অলৌকিক দৃশ্য দেখার এবং সমাধিস্থ হবার কথা শুনেছে। কিন্তু, ভয়ে সে কাউকে তা জানায়নি। এই কি দেবীর কোন বার্তা, নদী দেবতার? হায়! সে যদি কাশীকে এসব কথা জানায় তাহলে কাশী কী বলবে? আর এই ব্যক্তিই বা কেন বললেন যে বাবা তাঁকে নিয়োগ করেছেন? কমলা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভব করল। এবং আরও অস্থির বোধ করল। কিন্তু সবকিছু সে নিজের কাছে গোপন রাখল।
যাত্রাপথে গণেশ কমলাকে অনেকটা জানতে পেরেছেন। কারণ এখানে তো আর বাড়ির মতো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নেই। অনেক কথাবার্তা হয়েছে, গোপনে দলের অন্যদের অগোচরে। ধীরে ধীরে গণেশ কমলাকে আরো ভালোবাসতে শুরু করলেন। কমলার মধ্যে এমন কিছু চারুতা এবং পরিশীলন এবং তার সঙ্গে এক অনন্য সৌন্দর্য আছে যা তাকে তার বয়সি অন্য মেয়েদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে রেখেছে। এছাড়া তিনি দেখেছেন কোন জিনিস সম্বন্ধে জানার তাঁর আগ্রহ এবং দ্রুত তা আহরিত করার ক্ষমতা। তিনি যে নারীর ভালোবাসা সম্বন্ধে বিলিতি ধারণার জ্ঞানলাভ করেছেন, তা দিয়ে তিনি ভেবেছেন কমলাকে নতুন ভাবে তৈরি করবেন, যাতে সে তাঁর প্রকৃত সঙ্গী হতে পারে।
এই উদ্দেশ্য মাথায় রেখে তিনি যাত্রা থেকে ফেরত আসার ঠিক পরেই কমলার প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিজে হাতে নিলেন। পথের বাধা অনেক। তাঁর মা এবং বোনেরা তাঁর আচরণ মেনে নেননি। কারণ তাঁদের কথায় কোন আত্মসম্মানবোধ থাকা পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে শিক্ষা দিয়ে নিজের সমান করে নিতে পারেন? প্রবাদ আছে; স্ত্রী থালার নিচের বিড়াল, পরিবারের এবং তার প্রভুর দাস। তাদের অভিমত তিনি এইভাবে নিজের মুখ পোড়াচ্ছেন। কিছুদিন পর্যন্ত গণেশ সাহসী মনোভাব অবলম্বন করেছিলেন এবং নিজের পথে এগোবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, তাঁর মা দুঃখে ভেঙে পড়লেন এবং মুখে এমন এক বেদনার ভাব দেখাতেন যেন তাঁর প্রতি ভীষণ ব্যক্তিগত অন্যায় করা হয়েছে। তিনি মাঝে মাঝেই তাঁর কাছে কাঁদতেন এবং অভিযোগ করতেন—“তোমার কী হয়েছে বলো তো? তুমি কেন এক নারী-প্রতিমা গড়ার চেষ্টা করছ? তুমি তাকে কাজ করতে দিচ্ছ না, যেন সে রোজগার করতে যাবে। এমন পরিবর্তন দেখার জন্য পৃথিবীতে কেন আমার জন্ম হয়েছে? তোমার বোনেরাও কত ব্যথিত! আমাদের প্রতি কমলার কোন অনুভূতি নেই, ভালোবাসা নেই। সেই তোমাকে, এমন করতে বাধ্য করেছে। আমরা জানতাম সে পড়তে ভালোবাসে।”
“মা! কেন তুমি এত কঠোর ব্যবহার করছ? তুমি কি মনে কর সকালে এক ঘন্টা পড়াশোনা করলে সে তোমার বর্ণনা মতো নারীতে পরিণত হবে? আমি শুধু চাই সে আমার সার্থক সঙ্গী হয়ে উঠুক। সে তোমাদের উপর ছড়ি ঘোড়াবে না। বস্তুত, শিক্ষার মাধ্যমে তার মধ্যে নম্রতা আসবে এবং পড়াশোনা শেষ হলেই সে আবার পরিবারের কাজ করতে শুরু করবে। সবার জন্য যদি খাদ্য তৈরি হয় তুমি কি ওকে একটু দেবে না? কেন তুমি বলছ যে ওর জন্যই তোমাকে সব কাজ করতে হচ্ছে?”
কিন্তু তিনি মেনে নেওয়ার মানুষ নন। তিনি মুখ ভার করে এক কোণে আশাহত হয়ে বসে থাকবেন। গণেশের হৃদয়ে মায়ের দুঃখ আঘাত দিল এবং তিনি মাকে মানানোর এবং সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন। যখন রাতের খাবার পরিবেশিত হলো, তখন যে মা গণেশের সামনে বসে তাঁর খাবার তদারকি করতেন তিনি অন্য ঘরে গিয়ে বসে রইলেন। গণেশের বাবাও যখন তাঁর প্রতি ব্যবহার পরিবর্তন করলেন তখন গণেশের কাছে পরিবারের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে দাঁড়াল। মানুষটির অভ্যেস ছিল দীর্ঘক্ষণ ধরে গণেশের সঙ্গে কলেজের খবরাখবর নেওয়া এবং মাঝে মধ্যে দুজনে একসঙ্গে বসে বেদান্ত সাহিত্যের কোন বিষয়ে আলোচনা করতে করতে আনন্দ প্রকাশ করতেন। কিন্তু এখন তিনি ম্লান মুখে নীরব হয়ে বসে থাকছেন এবং গণেশ কোন কথা বললে তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে দায়সারা উত্তর দিচ্ছেন। গণেশের বোনরাও তাঁকে এড়িয়ে চলছে। গণেশকে দেখলেই তারা মায়ের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলে। স্বাভাবিকভাবে তাঁর সঙ্গে ব্যবহার করেন রমাবাঈয়ের স্বামী। কারণ তিনি তাঁর মনোভাবের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন। অবশ্যই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কমলা। সে সবার এড়িয়ে যাওয়া মুখ দেখছে এবং গোপন মন্তব্য এবং গালমন্দ শুনছে। নিজের হৃদয়ের অনুভূতিকে সে নিজের মধ্যেই গোপন রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে সে কী অন্যায় করেছে। স্বাভাবিক নিয়মে সে যখন ঘরোয়া কাজে সাহায্যের হাত বাড়াতে গেছে। কেউ তার প্রতি নজর দেয়নি এবং সবচেয়ে নগণ্য কাজের জন্যও সে কথা শুনেছে। একাকী সে যখন রান্নাঘরে খেতে গেছে (কারণ রান্নাঘরেই পরিবারের মহিলারা আহার গ্রহণ করে) সে নিজের জন্য অবশিষ্ট কিছুই দেখল না। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করল। কিন্তু এমনকি মহিলা ভৃত্যও তাকে উপেক্ষা করে গেল। এদিকে সে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত, কিন্তু সে মুখ খুলতে পারছে না। সন্ধ্যায় সে যখন কুয়োতে গেল রুখমা জিজ্ঞেস করল তাকে কেন এমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। সুখী রুখমা তার স্বাভাবিক আনন্দোচ্ছল ভাবে জিজ্ঞেস করেছিল। কমলার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ল। সে তাকে সব কথা খুলে বলল। তৎক্ষণাৎ রুখমা তার পাত্র নিচে নামিয়ে রাখল এবং বাড়ি থেকে কয়েকটি পিঠে নিয়ে এল, যেগুলো তার নিজের হাতে তৈরি। সে কমলাকে সেগুলো খেতে অনুরোধ করল। কমলার মনে হল গলা বুজে আসছে। তাই সে কোন প্রকারে কিছুটা পিঠে খেতে পারল। রুখমা জিজ্ঞেস করল, “কেন তুমি খাবার পেলে না?” কমলা বলল, সে কিছুই জানে না। সে বলল, খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু, সে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছে। সে আরও বলল কিছুদিন ধরে তাকে কোন কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং বাড়ির সবাই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। দুজনের কাছেই এসব রহস্যময় মনে হলো। কয়েক মূহুর্ত নীরব থাকার পর, রুকমা বলল, “এই ভাবে চলতে থাকলে তুমিই বা কী করতে পারবে?” কমলা আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল এবং তার সঙ্গিনী তার চোখের জল মুছিয়ে দিল। রুকমা তাকে অন্য কাউকে কিছু বলতে মানা করল। কিন্তু বলল রাতের খাবারের পর আবার কুয়োর কাছে আসতে এবং প্রতিদিন তারা এখানে কিছু পিঠে ভাগাভাগি করে খাবে।
এই অবস্থায় দেখলে কমলা বাবা কী বলতেন? তিনি শুধু তাকে সব কাজ থেকে বিরত থাকতে বলতেন? তাঁর সঙ্গে যতদিন বাস করেছে, সে কোন কিছুর অভাব অনুভব করেনি। তাঁর সঙ্গে কাটান জীবন তার কাছে সুখস্বপ্নের মতো। কিন্তু কমলার সঙ্গে যা হচ্ছে, তা সাধারণভাবে সব হিন্দু পরিবারেই হয়ে থাকে। বিয়ের পর আদরে- যত্নে প্রতিপালিত কন্যা আর পিতামাতার সমস্যা নয়। তার নতুন জীবনে হস্তক্ষেপ করাটাও তাদের পক্ষে অনুপযুক্ত বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই ঘটবে।
দৈবক্রমে কমলা জানতে পারে যে তার খাবার পুরুষদের মহলে দেওয়া হয়েছে। যে ভৃত্যা তাকে এই সংবাদ জানিয়েছিল সে কমলার অনাহারের মুখচ্ছবি সইতে পারেনি। সেও কমলার প্রতি বিরক্ত ছিল এবং তাকে বলেছিল যে তার ব্যবহারই তার এই দুর্দশার কারণ। কী করবে কমলা বুঝতে পারেনি এবং পরে স্বামীকে প্রশ্ন করেছিল। তিনি জানিয়েছিলেন তিনি তাকে শিক্ষাদান শুরু করার পরই এসব ঘটছে। কমলা তখন ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে বলে, “আপনি জানেন না আমকে কী সইতে হচ্ছে, আমাকে করুণা করুন।” কিন্তু তিনি তাকে কিছু গায়ে না মাখতে পরামর্শ দিলেন এবং বললেন তিনি শিক্ষাদান চালিয়ে যাবেন। কমলা দেখেছে তিনি দয়ালু এবং তাকে ভালোবেসে প্রতিদিন সকালে শিক্ষা দেন। সমস্ত বাধা সত্ত্বেও সেই সময়টা তার কাছে সুখের হয়। কিন্তু, একসময় দেখা যায় তাঁর মধ্যে পরিবর্তন আসছে এবং তিনি ধীরে ধীরে শিক্ষাদানের জন্য তার কাছে আসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। সকালে কমলার কোন কাজ করার থাকত না। কিন্তু সে ঘর ছেড়ে বেরোতে ভয় পেত। সে স্বাভাবিকভাবে কাজে যোগ দিতে পারত না কারণ তার দিকে তিক্ত মন্তব্য মহিলামহল থেকে ছুঁড়ে দেওয়া হতো। দিনের পর দিন স্বামীর আসার এবং তাঁকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কমলা অপেক্ষা করেছে। সে বুঝতে পারে না স্বামীর না আসার পিছনে কী রহস্য আছে এবং সে স্বামীর এই ব্যবহারে ক্ষুণ্ণ হয়। সে অন্যদের ব্যবহারের কোন পরোয়া করে না, কারণ সে ইতিমধ্যে অন্যদের ব্যবহার কীভাবে সামলাতে হয় তা শিখে গেছে। কিন্তু, একমাত্র যে মানুষটিকে সে বন্ধু হিসেবে খুঁজে পেয়েছে তাঁর মধ্যে উদাসীন মনোভাব লক্ষ করে সে হতাশ বোধ করছে। তার গর্বে আঘাত লেগেছে কারণ সে তার বিপর্যয়ের ইঙ্গিত পাচ্ছে। সে তার স্বামীর মধ্যে স্থায়ী বিশ্বাসের জায়গা খুঁজে পেয়েছিল, যা এখন এক দুর্বল অবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এখন যখনই সে ঘর থেকে বের হয়, অনেক ঠাট্টা এবং উপহাস তাকে শুনতে হয়। বলা হয়, “আহা! কী পতন! এইসব অনর্থক ঝামেলার কী দরকার ছিল এবং তোমার সকল সকল ষড়যন্ত্রের কী পরিণতি হলো!” সে খুবই মর্মাহত হতো। ব্যর্থভাবে সে স্বামীর ব্যবহারের কারণ খোঁজার চেষ্টা করত। সে ভাবত, “তাঁর কিছু করার নেই। এইসব খুব সম্ভবত মা এবং বোনেদের কীর্তি।” কিন্তু এইসব ভাবনাতে সে সান্ত্বনা পেত না। ইতিমধ্যে পরিবারের অন্য সব সদস্যের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। তারা আর এখন খোলাখুলি ভাবে তার প্রতি ঘৃণাপূর্ণ ব্যবহার করে না। কারণ তারা তার স্বামীকে নিয়ে ব্যস্ত এবং সন্তুষ্ট হয়ে আছে। কিন্তু সে জানে তার প্রতি কেউ ক্ষমার মনোভাব প্রকাশ করবে না। রমাবাঈয়ের স্বামী এই পরিবর্তন এনেছেন। তিনি হলেন পরিবারের পরামর্শদাতা। মহিলা সদস্যরা যখন বুঝতে পারল যে রমাবাঈয়ের স্বামী কমলার এবং এবং পরিবারের প্রতি গণেশের মনোভাব সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তাই ঘটছে, তখন তারা কমলার শ্বশুরমশাইয়ের শরণাপন্ন হয় এবং এমন এক বধূ আনার জন্য অভিযোগ করে। মা বলেন, “সে পাগলের মতো তাকে ভালোবাসে। সে আমাদের বা অন্য কাউকে পছন্দ করে না। সে আমাদের অবহেলা করে তাকেই ভালোবাসে। সে তাকে কাজ করতে দেবে না এবং আমাদের তার দাস হিসেবে দেখতে চায়।” এইসব অভিযোগ বৃদ্ধ মানুষটির কানে গেল।
তিনি সব শুনলেন, ভাবলেন, এবং অস্থিরতা দেখালেন। তখন রমাবাঈয়ের স্বামী তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। “আমি জানি কেন এসব হচ্ছে। এসব হলো আধুনিকতার প্রভাব। আমি লক্ষ করেছি এবং একাধিকবার আপনাকে সতর্ক করেছি। কিন্তু কেন আপনি এমন হতে দিচ্ছেন। গণেশকে যত বাধা দেবেন ততই সে স্ত্রীকে শিক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর হবে। সে ভাবছে সে তার অধিকারের জন্য লড়াই করছে এবং আপনার ব্যবহার শুধু তাকে আমাদের থেকে দূরত্বে ঠেলে দেবে। সে কিছুর পরোয়া করে না। যদি সে দেখে আপনারা সবাই এর বিরুদ্ধে তাহলে সে তাকে নিয়ে চলে যাবে। তাই তাকে তার ইচ্ছেমতো আচরণ করতে দিন। কোনভাবেই তার বিরোধিতা করবেন না। অন্যদিকে তার প্রতি অনুকূল মনোভাব দেখান এবং মেয়েটির প্রতি আপনার অসন্তুষ্টি গোপন রাখুন। এক তরুণকে স্ত্রীর থেকে দূরত্বে নিয়ে যাবার হাজার একটি উপায় আছে। আমি দেখেছি যে সে সামাজিকতা এবং আমোদপ্রমোদ ভালোবাসে। তাই তাকে মন্দির এবং ভোজ অনুষ্ঠানে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করুন। যাতে নবদৃষ্ট এই মনোভাবে কিছুটা ভাঁটা পড়ে। যখন সে বাস্তবিক কোন বাধা পাবে না, সে স্ত্রীর প্রতি তথাকথিত শিক্ষাদান থেকে বিরত হবে।”
সবাই এই পরামর্শ মেনে নিল। কিন্তু বেদনার কণ্ঠে বৃদ্ধ মানুষটি বললেন যে তিনি বিশ্বাস করেন না তাঁর পুত্র এমন মূর্খের মতো ব্যবহার করবে এবং যে মেয়েকে নিয়ে এত জল্পনা কল্পনা চলছে সে সর্বসমক্ষে তার মাকে অমান্য করতে এবং অন্যদের থেকে তাকে দূরে সরিয়ে নিতে উৎসাহিত হবে। এই আলোচনার পর গণেশের মা তাঁর দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকালেন এবং তার মনোভাবকে আর অবাধ্য বলে ভাবলেন না। এত ভাল এক মাকে অসন্তুষ্ট করার জন্য তাঁর বিবেকে আঘাত লাগল। তিনি ভাবলেন, “কমলার ভালোবাসা এত মহান যে সে তার প্রতি ক্ষমার অযোগ্য ব্যবহার সহ্য করেছে। তিনি ভাবলেন অচিরেই তিনি রামপুরে যাবেন এবং সেখানে তিনি তাকে শিক্ষা দেবেন।” তাই, তিনি কমলাকে শিক্ষা দিতে আসা বন্ধ করে দিলেন। এমনকি আগের মতো তার সঙ্গ পাবার ইচ্ছা করলেন না এবং সুচতুরভাবে প্রস্তুত আমোদপ্রমোদে আনন্দ খুঁজে পেলেন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, এপ্রিল ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]