
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (১৮)
আমাদের সেই সাতের দশক ছিল ভয়ঙ্কর ৷ আজও মনে আছে ১৯৬৬ র সেই খাদ্য আন্দোলনের ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা ৷ তখন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সরকার ৷ তাঁদের খাদ্যনীতি , আকাশচুম্বী জিনিসের দাম মানুষকে নিয়ে গিয়েছিল এক ভয়ঙ্কর অবস্থায় ৷ পঞ্চাশ দশক থেকে শুরু হলেও ছয়ের দশকের মাঝামাঝি এসে সে এক ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল ৷ খাদ্যের অনিশ্চয়তা ভয়ঙ্কর অস্থিরতা শুরু করেছিল মানুষের মধ্যে ৷ ফলে সে এক ভয়ঙ্কর জন বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল ৷ মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ তখন ২টাকা ৮০ পয়সা কেজি চাল কেনার ক্ষমতায় নেই ৷ আমি তখন সবে মাত্র নয় ৷ বাবার কাছে শুনছি সুযোগ বুঝে মজুতদার ব্যবসায়ীরা সব খাদ্যসামগ্রী বাজার থেকে উধাও করা শুরু করে দিলো ৷ তখন কিছুই বুঝছি না এসব কি ব্যাপার ৷ শুধু শুনছি চাল পাচার হচ্ছে ৷ একদিন শুনলাম শ্রীরামপুর স্টেশনে ইলেকট্রিক ট্রেনের ছাতে এক চালপাচারকারী ওভারহেড তারে মাথা ঠেকে পুড়ে গিয়েছে ৷ উদ্বৃত্ত জেলা থেকে ঘাটতি জেলায় চাল এমনিতে আসছে না ৷ প্রচুর বাধা নিষেধ বলে চোরাচালান হচ্ছে তুমুল ভাবে ৷ তখন খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন ৷ জেলায় জেলায় খাদ্যসংকট তীব্র ৷ হঠাৎ একদিন বাবা কাগজ পরে মাকে বললেন স্বরূপনগরে দুটো ক্লাস সিক্স এর ছেলে মণীন্দ্র আর নুরুলকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে ৷ যত দিন যাচ্ছে বিক্ষোভ তীব্র হতে শুরু করতেই হঠাৎ ছাত্রঘট শুরু হল ৷ বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এবং বিশিষ্ট বামপন্থী নেতারা দাঁড়ালেন ছাত্রদের পাশে ৷ ছাত্রদলের তুমুল বিক্ষোভ ছড়িয়ে গেল গোটা রাজ্য জুড়ে ৷ সে যেন এক ভয়ঙ্কর সময় ৷ যেন রুদ্রভৈরব নৃত্য শুরু করলেন ৷ অবস্থা প্রসাশনের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল ৷ নদীয়ার কৃষ্ণনগরে , শান্তিপুরে তুমুল বিক্ষোভে বহু ছাত্র পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল তেমনই অনেক পুলিশ ও অফিসার সহ বহু সাধারণ লোক ও মারা গিয়ে ছিলেন ৷ ঘোষিত হল কারফিউ ৷ রাজ্য সরকার ব্যারাকপুর থেকে কয়েক ব্যাটেলিয়ন আর্মড ফোর্স আনালেন ৷

একদিন কারফিউ আর ১৪৪ ধারার মধ্যেই বটতলার মোড়ে টেক্সটাইল কলেজ আর শ্রীরামপুর কলেজের ছাত্রদের মিছিলে আর্মড ফোর্সের গুলি চালালে বেশ কিছু ছাত্র মারা গেল ৷ বাড়ির দরোজা থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলাম রিক্সায় করে রক্তাক্ত ছাত্রদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ ৷ কৈশোরের সেই দৃশ্য আজও ভয়ঙ্কর ভাবে স্মৃতির মলিন পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে ৷ সে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ৷ তখন আমি ষষ্ঠ কিম্বা সপ্তম ৷
১৯৬৬-১৯৭৬ চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হল ৷ চীনের নেতা মাও সে তুং শুরু করলেন এক রাজনৈতিক আন্দোলন ৷ তাঁর বিখ্যাত লিটল রেডবুক লিখিত ধারণা অনুসরণ করে এক নতুন প্রজন্ম তৈরি হল ৷ যার প্রভাব ছড়িয়ে গেল এদেশেও ৷ নবীন প্রজন্মের পাশাপাশি বহু বিশিষ্ট লেখক ,বুদ্ধিজীবী , বিজ্ঞানীরাও যোগ দিলেন এই দলে ৷ সাংস্কৃতিক বিপ্লব এক ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছিল ৷
১৯৬৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়িতে চারু মজুমদার , কানু সান্যাল , জঙ্গল সাঁওতালদের মত কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে গঠিত হল সশস্ত্র বামপন্থী আন্দোলন ..নকশালবাড়ি আন্দোলন ৷ গঠিত হল CPI(ML ) মাওবাদী লেলিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ৷ ছড়িয়ে গেল বিহার ওড়িশ্যা , অন্ধ্র প্রদেশেও ৷ লক্ষ্য সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ৷ বহু আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ছড়িয়ে গেল এর প্রভাব ৷ ১৯৬৭ তে অজয় মুখার্জীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি ৷

উত্তরবঙ্গ থেকে নকসালবাড়ি আন্দোলন প্রবলরূপ নিল ৷ তখন আমার বয়ঃসন্ধিকাল ৷ কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলাম আমিও ৷ আমরা তো সেই শৈশবের ছয়ের দশক থেকেই দেখে এসেছি খাদ্যসংকট , চালপাচার , পুলিশের অমানুষিক লাঠি চার্জ ৷ বড়দের মুখে শুনেছি ভাতের থালার সামনে বসে পুলিশের গুলি খেয়ে মরেছে ৷ পাড়ায় দক্ষিণপন্থীদের টহল ৷ আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে গেলেন বামপন্থী নেতারা ৷ অত্যাচার এমন জায়গায় পৌঁছে গেল যে শ্রীরামপুর থানার ভিতরে ঢুকে দখল নিল জনতা ৷ সুবিশাল মৌন মিছিল সংগঠিত হল ৷ প্রায় দু’আড়াই মাইল লম্বা ৷ হাঁটলেন কবি , শিল্পী , বুদ্ধিজীবী এবং বৃদ্ধ ও পঙ্গু মানুষরাও ৷ ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় জানালেন পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরাই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে ৷
যতদূর মনে হচ্ছে ১৯৭০ এর নভেম্বরে একটা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল ৷ নাম ছিল ভোলা ৷ সেই আমার স্মৃতিতে থাকা প্রথম ঘূর্ণিঝড় ৷ প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিলেন ৷
১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ বঙ্গের ইতিহাসে এক ভয়ঙ্কর সময় ৷

