
সাঁকোটা দুলছে (১৬ পর্ব)
সকালে বরফে মোড়া নভেম্বরের উইম্বলডনের পথঘাট। জানালার কার্নিশে কার্নিশে বরফের আস্তরণ। ব্রেকফাস্ট টেবিলে নিবেদিতার আসতে একটু দেরিই হল। অবলা টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজাতে সাজাতে লক্ষ করলেন নিবেদিতাকে।
‘মার্গারেট, তুমি তোমার শরীরের যত্ন নাও। ঠিক করে খাওয়া ঘুম কিছুই করছ না তুমি!’ অবলার চোখে ভালবাসার বকুনি।
‘মাই সুইট বো! আই লাভ ইউ সো মাচ। ইউ আর সো সুইট! আমি একদম ঠিক আছি। সরি ফর মাই ডিলে! বেয়ার্ন আসেনি?’ নিবেদিতা জড়িয়ে ধরেন অবলাকে।
জগদীশচন্দ্র দ্রুত কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে এসে চেয়ার টেনে বসেন।
‘আশা করছি তুমি চ্যাপ্টারটা শেষ করে ফেলেছ কাল রাতে। এই লেখাগুলো পরের চ্যাপ্টারের। আর ডায়াগ্রামগুলো আমি দিচ্ছি তোমাকে আফটার ব্রেকফাস্ট।’ জগদীশচন্দ্র পাণ্ডুলিপির বান্ডিল নিবেদিতার হাতে তুলে দিলেন।
অবলা দৌড়ে এলেন, ‘এ কী? মেয়েটাকে খেতে দেবে না! দেখছ ওর শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে রাতের পর রাত জেগে জেগে লিখে লিখে!’
‘আরে বাবা, আমি তো আর রাত জেগে লিখতে বলিনি! সে তো মার্গারেট নিজের ইচ্ছায় রাত জাগছে! আমি তো বলেছি একাধিকবার, ধীরে ধীরে সময় নিয়ে লেখো।’
‘আমি দেখেছি ওকে তুমি একটুও বিশ্রাম নিতে দাও না! দাও মার্গারেট আমাকে ম্যানুস্ক্রিপ্টটা দাও, তোমার ঘরে রেখে আসছি। তুমি খাও এখন, পরে দেখবে।’ অবলা পাণ্ডুলিপির বান্ডিল নিয়ে চলে গেলেন নিবেদিতার ঘরে রাখতে। নিবেদিতা মুচকি হাসেন। হাসেন জগদীশও! নিবেদিতা অবলা বসুর মধ্যে এই মাতৃস্নেহের ভাবটা খুব পছন্দ করেন। উপভোগ করেন।
জগদীশচন্দ্র কফির কাপে চুমুক দিলেন।
‘তাহলে তুমি ভারতে ফিরে যাচ্ছ মার্গারেট?’
‘হ্যাঁ।’ মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়েন নিবেদিতা।
‘লিনিয়ান সোসাইটির বক্তৃতার দিন ঠিক হয়েছে ২০ মার্চ।’ জগদীশচন্দ্র স্থির তাকিয়ে থাকেন নিবেদিতার দিকে।
‘জানি তো। পেপার তো তোমার তৈরি আছে বেয়ার্ন! আমি জানুয়ারি মাসেই রওনা হব।’ নিবেদিতা প্লেটে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটেন।
‘তার মানে লিনিয়ান সোসাইটিতে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তুমি থাকবে না!’ জগদীশ নিবেদিতার চোখ খোঁজেন।
নিবেদিতা প্লেটের স্যান্ডউইচ নাড়াচাড়া করেন, ‘আমাকে আমার কাজ করে যেতে হবে বেয়ার্ন!’ আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
‘ভারতে তোমাকে ফিরেই যেতে হবে এক্ষুনি? আর কয়েকটা মাস…’ জগদীশচন্দ্র দৈনিক কাগজটি হাতে তুলে নিতে নিতে বলেন।
‘বেয়ার্ন! ওরকম ভাবে বোলো না! ‘মা’ আমাকে ডেকেছেন। ভারতের অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব আমাকে তুলে নিতে হবে। জো, বুল সবাই জানেন। যদিও সারা চাইছিলেন না এক্ষুনি ভারতে ফিরে যাই। কিন্তু আমাকে তো ফিরে যেতেই হবে!’
‘তোমার কাছে ভারতবর্ষের কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এখানে আমার গবেষণার তুলনায়?’ জগদীশচন্দ্র কফি শেষ করেন।
‘বেয়ার্ন! তোমার বইয়ের কাজ আমি সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সম্পূর্ণ করে দিয়ে যাব। লিনিয়ান সোসাইটিতে তোমার বক্তৃতা জয়বার্তা আনবে, আমি তা ভারতবর্ষের মাটিতে বসে শুনব। ড.ওয়ালারের দল পর্যুদস্ত হবে। বেয়ার্ন, আমাকে ফিরে যেতে হবে কাজে। তুমি তোমার স্বাস্থ্য এবং আমার ‘বো’-এর যত্ন নেবে। সারা বুল, ম্যাকলয়েড, আমি তোমার চারপাশে আছি। সারা তোমার বই ছাপানোর যাবতীয় ব্যবস্থা নিয়ে নিয়েছেন।’
‘আমি জানি। সারা বুলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!’
‘সারা বুল তোমাকে পুত্রস্নেহে ভালবাসেন!’
‘সেটা আমি বুঝি। আর বুঝি বলেই আমার সর্বস্ব দিয়ে আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই সত্য — আমার গবেষণা সত্যের উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তুমি একদিন বলেছিলে, আমার সমস্ত ভাবনা তুমি অনুগত হয়ে লিখবে। মনে আছে তোমার?’
‘মনে আছে বেয়ার্ন! আমি অনুগত আমার কাজের কাছে। বোঝার চেষ্টা করো। আর আমি তোমার কাজ শেষ করেই যাব। আচ্ছা, পেটেন্টের জন্য যে দরখাস্ত করেছিলে, ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে তার কোনও উত্তর এসেছে?’
‘নাহ্ ! আমি তো চারটি দরখাস্ত করেছি আলাদা আলাদা। কোনও উত্তর নেই! ৯ মে, ৩০ জুলাই, ১২ সেপ্টেম্বর আর ১৪ সেপ্টেম্বর এই বছরেই করেছি, ১৯০১ তো শেষ হতে চলল।’
‘সমগ্র ভারতবাসী তোমার মাধ্যমেই ভারতের বিজ্ঞান-জয়যাত্রা দেখতে চাইছে বেয়ার্ন!’ নিবেদিতা সোজা হয়ে বসেন। হঠাৎ থেমে গেলেন।
অবলা হন্তদন্ত এলেন, ‘এ কী? তোমরা হাত গুটিয়ে বসে আছ আর খাবারগুলো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! তোমরা কথা বলেই চলেছ, বলেই চলেছ!’
নিবেদিতা রাত-দিন এক করে বইয়ের পাণ্ডুলিপির কাজ করে চলেছেন। বিজ্ঞানের যুক্তি ও বিশ্লেষণের কাঠিন্যে আনছেন সাহিত্যের ছোঁয়া। লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। একদিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, অপরদিকে সাহিত্য-রসের ছন্দ। তার সঙ্গে ডায়াগ্রামগুলিকে সন্নিবেশিত করার কাজ। পিটার ক্রপটকিন নিবেদিতার এই লেখার স্টাইলকে বলেন, মিউজিক অফ ল্যাঙ্গুয়েজ। হাসলেন নিবেদিতা। মিউজিক কি না জানা নেই, তিনি জগদীশচন্দ্রের লেখাকে একটু সুখপাঠ্য করে তুলছেন। কিন্তু তিনি ফিরে যাবেন ভারতের মাটিতে আগামী বছরের শুরুতেই। সব ঠিক থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকেই রওনা হবেন। সুতরাং দ্রুত কাজটি শেষ করা দরকার। প্রকাশনার যাবতীয় ব্যবস্থা করে রেখেছেন সারা বুল। এখন নভেম্বর মাস। আর মাস দুয়েকের কাছাকাছি সময় আছে। বেশ কয়েকটি চ্যাপ্টার লেখা হয়ে গেছে। বাকি আছে কিছু। আছে নক্সা ও ছবি। কিছু নক্সা ও ছবি নিবেদিতাকে ভাল করে এঁকে নিতে হচ্ছে। বইটির উৎসর্গ পত্র নিয়ে নানা আলোচনা চলেছে। এখনও স্থির হয়নি। একদম প্রথম পাতায় সুন্দর করে লিখেছেন বইটির নাম — Response in the Living and Nonliving. তারপর উৎসর্গ পত্র। গতকাল রাতে মাথায় এল ভারতবাসীকেই বইটি উৎসর্গ করলেই সবচেয়ে ভাল হয়। সাদা পাতার মাঝামাঝি জায়গায় লিখলেন —
To my Countrymen
This Work is Dedicated.
পাতার উপরে বাঁদিক ঘেঁষে লিখলেন —
“The real is one: wise men call it variously.” — Rig Veda.
ব্রেকফাস্ট শেষ হবার পর নিবেদিতা পড়ার টেবিলে এসে বসেছেন। তাকিয়ে আছেন উৎসর্গ পত্রের দিকে। নিশ্চয়ই বেয়ার্ন আর বো-এর পছন্দ হবে উৎসর্গ পত্রটি। দুপুরে লাঞ্চের সময় দেখাবেন বলে মনে মনে ঠিক করেন।



জগদীশচন্দ্র এসে দাঁড়িয়েছেন আস্তে আস্তে চেয়ারের পিছনে কখন। নিবেদিতা চমকে উঠে তাকালেন।
‘কখন এসেছ বেয়ার্ন? দেখো দেখো উৎসর্গ পত্রটি ভাল হয়েছে না? ঋগ্বেদের এই উক্তিটা থাক, বুঝলে? আসলে তো সব একীভূত প্রাণময়, একক— বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন ভাবে তাকে ব্যাখ্যা করলেও তিনি এক। ঋগ্বেদের এই বার্তাটি থাক। বেয়ার্ন! কিছু বলছ না কেন?’
জগদীশচন্দ্র নিবেদিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘সরি মার্গারেট! সরি!’
‘কেন বেয়ার্ন? কী হয়েছে?’
‘তোমার সঙ্গে অমন ব্যবহার করা ঠিক হয়নি আমার।’
নিবেদিতা হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘দ্যাটস হোয়াই, দ্যাটস হোয়াই আই কল ইউ ‘বেয়ার্ন’! শিশু, খোকা!’
হেসে ওঠেন দু’জনেই। এক ঝলক রোদ ঢুকে পড়ে ঘরে।
গোপালের মা অধৈর্য হয়ে ওঠেন, নৌকা কতক্ষণে পৌঁছাবে বেলুড় মঠের ঘাটে। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন দূরে মঠের দিকে। নৌকা এগিয়ে চলে মঠের দিকে। লোক সমাগম দেখা যাচ্ছে। থমথমে চারপাশ। গাছেরাও স্তব্ধ। আজ ১৯০২ সালের ৫ জুলাই। স্বামীজির ছেড়ে যাওয়া শরীর-পোশাক আর কিছুক্ষণ পড়েই ছাই হয়ে যাবে। স্বামীজি পোশাকের মতন শরীরকে ছেড়ে চলে গেছেন গতকাল রামকৃষ্ণলোকে। স্বামীজির কথা, স্বামীজির বিশ্বাস, ভাবনা ছড়িয়ে দিতে হবে ভারতের কোণে কোণে। জাগিয়ে তুলতে হবে এক ঘুমিয়ে থাকা ঐশ্বর্যশালী ও সম্পদশালী একটা দেশকে। দর্প চূর্ণ করে বিদেশিদের চোখের সামনে একজন বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রমাণ করছেন ভারতীয় দর্শনের মূল সুর — বহুর মধ্যে একই প্রাণের স্পন্দন। সেই বিজ্ঞানীর কথা বলতে হবে। দেশকে চেনাতে হবে, দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, দেশের মেধাসম্পন্ন জাতীয় চিন্তকদের কথা — দেশময় বক্তৃতা দিয়ে যেতে হবে। নৌকা ভেসে চলে। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন তীরভূমির দিকে। কেউ তো আজ এগিয়ে এসে মাথায় হাত রেখে বলবেন না, ‘মার্গট, তুমি যা করছ ঠিক করছ, মহাশক্তি তোমার সঙ্গে আছেন।’ চোখের কোণ ভিজে যায়।
কলকাতায় এসে কিছুদিন থাকতে হয়েছে আমেরিকান কনস্যুলেট অফিসের গেস্টরুমে। বাড়ি দেখার কাজ চলছে। ১৬ নম্বর বোস পাড়া লেনের বাড়িটি এখন ভাল অবস্থায় নেই। কথা চলছে তার ঠিক পাশেই ১৭ নম্বর বাড়ি নিয়ে। কাজ ছাড়া চুপচাপ দিন কাটানো নিবেদিতার পক্ষে অসহনীয়। সবচেয়ে প্রিয় কাজ চিঠি লেখা বা ডায়রি লেখা। চিঠিতে চিঠিতে নিবেদিতা সব লিখে রাখতে চান। একটা কোথাও তো থেকে যাবে এই চিঠিগুলো ডক্যুমেন্ট হিসেবে, প্রমাণ হিসেবে! লিখতে শুরু করেন তাঁর প্রিয় য়ুমকে।
USA Consulate, Calcutta
May 5th, Monday morning [1902]
My dear Yum,
This is a mere note, for we leave this evening for Mayavati. He (Okakura) is going too. Mr. Oda is gone – to arrange a Conference at Yokohama in the autumn. He says, “leave Swami alone – it will be alright – say nothing.” I think he must be right.
দ্রুত চিঠি শেষ করেন স্বামীজির কথা দিয়েই।
And now I must stop. With infinite love. So glad He and Swarup are to meet. Don’t feel worried at anything Swami may write. His ups and downs are the tides of receding illness on the shores of nerves.
We all were there yesterday, and he received us well.
Most lovingly Margot
[Letters, page-465]
আমেরিকা থেকে ক্রিস্টিন গ্রীনস্টাইডেল আসবেন মঠে। নিবেদিতার সহকারী হিসেবে আত্মনিয়োগ করবেন ভারতবর্ষের কাজে স্বামীজির ডাকে। স্বামীজির সঙ্গে ক্রিস্টিনের দেখা সেই ১৮৯৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, স্বামীজি যখন ডেট্রয়েটে গিয়েছিলেন। বেদান্ত দর্শনের কথা শুনে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলেন ক্রিস্টিন। উদাত্ত ও উদার আহ্বানে বিচলিত ক্রিস্টিন। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯৫ সালের ২০ জুলাই। সেদিন ছিল এক ঝড়ের সন্ধ্যা। মেঘ অন্ধকার করে নেমেছিল বৃষ্টি। দ্রুত যেন নেমে এল রাত। রাস্তাঘাট ফাঁকা। সেই ঝড়ের রাতে বন্ধু ফাংকে-এর সঙ্গে বন্ধুরই ব্যবস্থাপনায় ক্রিস্টিন চলেছেন এক বাঙালি সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করতে থাউজেন্ড আইল্যান্ড পার্ক, যেখানে বিবেকানন্দ তাঁর আমেরিকান শিষ্যদের নিয়ে আছেন। ক্রিস্টিন বাগান পেরিয়ে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে। রেইনকোট খুলে রেখে ভেতরে প্রবেশ করলেন। গৃহকর্ত্রী নিয়ে গেলেন স্বামীজির ঘরের সামনে। সুন্দর মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে। ক্রিস্টিনদরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ওই সেই সৌম্যদর্শন গেরুয়া পোশাকে সন্ন্যাসী। দু’চোখে এক নতুন বিশ্বের ছবি। জীবনের এক নতুন অর্থ তাঁর প্রতিটি উচ্চারণে। স্বামীজির ভরাট গলায় বক্তৃতার প্রতিটি শব্দ শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার। তন্ময় ক্রিস্টিন! আত্ম-চেতনা, আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে আত্মোৎসর্গের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ মুক্তির পথ। অর্থ নয়, বস্তুর বিপুল আয়োজনে অন্ধত্বের মধ্যে ডুব দিয়ে আছ, মোহগ্রস্ত। নিরন্ন, দরিদ্র মানুষের পাশে মানুষ হিসেবে দাঁড়িয়ে জীবনকে উৎসর্গ করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। ওঠো, জাগো! সেই আহ্বান! ক্রিস্টিন ও ফাংকে স্থির। হঠাৎ তাকান স্বামীজি। দেখতে পান দুই মহিলা ক্রিস্টিন ও ফাংকে-কে। এগিয়ে আসেন স্বর্গীয় হাসি নিয়ে চোখে ও মুখে। দ্রুত তাঁদের আতিথেয়তায় আপ্লুত করে তুললেন তিনি। সংকোচে বিহ্বল দুই মহিলা। স্বামীজি তৎপর হয়ে তাঁদের শুকনো জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করে দেন। দুই তরুণী মুগ্ধ হয়ে বলেন, ‘আমরা এসেছি আপনার কথা ও বেদান্ত বক্তৃতা শুনব বলে।’
‘সে তো একদিনে কয়েক ঘণ্টার বিষয় নয়! তার জন্য কয়েকদিন লাগবে। তার সঙ্গে দরকার ধ্যান ও যোগের অভ্যাস। ক্লাস করতে হবে যে!’
‘আমরা আপনার ক্লাসে যোগ দিতে পারি না? কী যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে?’ ক্রিস্টিন খুব আস্তে কথাটি উচ্চারণ করলেন মাথা নিচু করে।
‘কোনও যোগ্যতার প্রমাণ করতে হবে না। আমি তো তোমাদের যোগ্য করে তুলব গো!’
ক্রিস্টিন ও ফাংকে সেই দিন থেকেই থাউজেন্ড আইল্যান্ড পার্কে থেকে গেলেন এবং স্বামীজির ক্লাস করতে শুরু করেন। কম-বেশি আঠারোটি ক্লাস করেন ক্রিস্টিন। এক আশ্চর্য প্রশান্তি তাঁর চোখের দৃষ্টিতে। ক্রিস্টিন শান্ত, নম্র, বিনয়ী কিন্তু অন্তরে দৃঢ়, যে দৃঢ়তা তাঁর কোমলতাকে কাঠিন্যে পরিণত করেনি। স্বামীজির কাছে দীক্ষা নিলেন ক্রিস্টিন। নিলেন বীজমন্ত্র। যাবজ্জীবন ব্রহ্মচারিণী থাকার সংকল্প।
‘ভারতবর্ষের নারী শিশু তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ক্রিস্টিন। তুমি কি সেই ডাকে সাড়া দেবে?’
ক্রিস্টিন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ান, ‘আমি প্রস্তুত গুরুদেব, আপনি আদেশ করুন।’
ডেট্রয়েট শাখা সমিতির অবৈতনিক শাখা সম্পাদক ক্রিস্টিনের সঙ্গে নিবেদিতা ও তুড়িয়ানন্দের আলাপ হয় ভাল। দু’জনের অত্যন্ত প্রিয় ক্রিস্টিন আমেরিকায় স্বামীজির শিষ্য-শিষ্যাদের প্রিয় হয়ে ওঠেন দ্রুত। অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে আমেরিকার শাখার নানা কাজে দেখা যায় ক্রিস্টিনকে। তারপর কমবেশি ছয়-সাত বছর পর ক্রিস্টিন নিজের সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব গুছিয়ে রেখে চলে আসেন কলকাতায় স্বামীজির কাজ তথা ভারতের জন্য কাজ করতে, ১৭ নম্বর বোস পাড়া লেনে। নিবেদিতার সঙ্গী ক্রিস্টিন গ্রীনস্টাইডেল এলেন ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসের গরমের একটি দিনে। নিবেদিতার তখন ১৭ নম্বর বোস পাড়া লেনের বাড়ি কেনা হয়ে গেছে।
ক্রিস্টিন অকস্মাৎ এসে পড়েছেন শীতের আমেরিকা থেকে দাবদাহের কলকাতায়। সারা গা লাল হয়ে যাচ্ছে। লাল লাল ফুসকুড়ি। কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি। ছোট ছোট কোঁকড়ানো চুল ঘামে জবজবে হয়ে থাকছে। কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর নিবেদিতার কথা মতো গায়ে জল ঢেলে আসছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে তাঁর ফুলহাতা ব্লাউজ, শাড়ি। ক্রিস্টিন নিবেদিতার মতো গাউন পরেননি। ক্রিস্টিন পরেছেন ঢিলে ফুলহাতা সেমিজ আর সাদা শাড়ি, সরু পাড়। নিবেদিতার সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের ক্রিস্টিনের সঙ্গে নিবেদিতার সম্পর্ক খুব দ্রুত দুই বোনের মতোই হয়ে ওঠে। ক্রিস্টিন স্বল্পবাক, নিবেদিতার নিজের মত প্রতিষ্ঠায় বাক্যব্যয়ে কার্পণ্য নেই। কথা ও লেখায় অনর্গল। ক্রিস্টিন কোনও বিষয়ে জোর খাটানো পছন্দ করেন না, নিবেদিতা ঠিক বিপরীতে অবস্থান করেন। ক্রিস্টিন ধীর-স্থির, নিবেদিতার কর্মোদ্যম ঝড়ের মতন। নিবেদিতার সবচেয়ে ভাল লাগে ধীর, স্থির ক্রিস্টিনের স্বামীজির প্রতি নিঃসংশয় নির্ভরতা। ‘শান্ত, নির্ভরশীল — তার স্বভাবে ঔদ্ধত্য নেই; অনুগত ও সুহৃদয়।… যথার্থ লোক নির্বাচনে স্বামীজির কতদূর ক্ষমতা, ক্রিস্টিনকে দেখিলে অনুমান করা যায়।’ নিবেদিতা জানাচ্ছেন চিঠিতে।

ম্যাকলয়েড এপ্রিল মাসেই ফিরে গেলেন আমেরিকায়। নিবেদিতাকে আশীর্বাদ করে সারা বুলও চলে গেলেন। মি. ওডা ফিরে গেলেন জাপানে ধর্ম মহাসভার আয়োজনে, যেখানে স্বামীজিকে নিমন্ত্রণ করে গেছেন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। স্বামীজির মন উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে! পরিকল্পনা করছেন জাপান যাবেন। ম্যাকলয়েড ও সারা বুল ফিরে যেতেই একটু ভেঙে পড়েছেন যদিও। ওঁরা সঙ্গে থাকলে ভরসা খানিক বেশি পান তিনি। কিন্তু তাঁর শরীর এতটাই খারাপ যে গত ১১ মার্চ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্মতিথিতে স্বামীজিকে ঘরের মধ্যে রাখা হয়। সাধারণ মানুষদের তাঁর দরজার কাছেও যেতে দেওয়া হয়নি। পাহারায় রাখা হয়েছিল স্বামী নিরঞ্জনানন্দকে। এমনকী মঠের মাঠে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি নীচে নামতেই পারেননি অসুস্থতার জন্য। তবুও তিনি প্রবল আগ্রহী — জাপান যাবেন, ধর্ম মহাসভায় বলবেন ভারতবর্ষের ধর্মীয় ঐতিহ্যের কথা। তিনি এখন বেশিরভাগ সময়ই ধ্যান করেন। সবাইকে নিয়ে বসে ধ্যান করেন।
বিকেলে গঙ্গার ধারে হাঁটতে বেরোন স্বামীজি। সঙ্গে কোনও না কোনও সন্ন্যাসী থাকেন। এই সময়টায় তিনি দিনের শেষ সাক্ষাৎ সেরে নেন যশোমতীদের সঙ্গে। যশোমতীর ঘরে ঢোকার আগে তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করা চাইই। প্যাঁক প্যাঁক করে পেট দুলিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে যশোমতী। হাঁসটি এখন একটু সুশ্রী হয়েছে।
নিবেদিতা যশোমতীকে দেখেই বললেন, ‘এর সেই পালক উঠে যাচ্ছিল না? আপনি টবে কার্বলিক অ্যাসিড মিশিয়ে হাঁসটাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন সেই কবে!’
স্বামীজি হেসে ওঠেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! পরীক্ষায় সফল! ওর আবার পালক হয়েছে!’
স্বামীজি উবু হয়ে ঘাসের উপর বসে যশোমতীকে আদর করলেন। যশোমতীর পেছনেই ‘বোম্বেটে’ এসে হাজির। ধবধবে সাদা বিশাল রাজহাঁস এসে দাঁড়িয়েছে। স্বামীজির প্রিয় রাজহাঁস — বোম্বেটে। তাকেও আদর করতে হল। গুটি গুটি চলে গেল রাজকীয় দুলকি চালে লম্বা গলা উঁচিয়ে। বাঘা এবার অধৈর্য হয়ে উঠেছে। বাঘা সেই তখন থেকে পাশে পাশে আছে স্বামীজির। দেখছে, সবাই আদর পাচ্ছে! এবার সে স্বামীজির পায়ের কাছে মাথা নামিয়ে লেজ নাড়াতে থাকে। স্বামীজিকে ছেড়ে কিছুতেই নড়ে না প্রভুভক্ত এই দেশি কুকুর, যাকে ছোট্টবেলায় রাস্তা থেকে তুলে এনেছিলেন স্বামীজি।
ক্রিস্টিন খুব মজা পাচ্ছিলেন স্বামীজির এই পোষ্যদের সঙ্গে সম্পর্ক দেখে। স্বামীজি কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটলেন। এবার বসবেন বাঁধানো গাছের নীচে।
বসলেন। একপাশে ক্রিস্টিন ও আরেকপাশে নিবেদিতা। ক্রিস্টিনের দিকে তাকালেন। স্নিগ্ধ মুখমণ্ডলে অস্তমিত সূর্যের রেখা। ধীরে ধীরে বললেন, ‘আমি জানি যে তুমি মহৎ এবং তোমার মহত্ত্বে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। নিবেদিতার কাজ ভারতব্যাপী। তুমি একজন নিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে নিবেদিতার পাশে থেকো। ও তোমাকে স্কুলের সমস্ত কাজ বুঝিয়ে দেবে।’
‘ক্রিস্টিন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমতী। একটু একটু করে সে সমস্ত কাজ বুঝে নেবে, স্বামী!’
‘জানি আমি। দ্রুত মেয়েদের স্কুল খোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করো মার্গট! সূর্য ঢলে পড়ছে!’
টুং টুং টুং টুং। মৃদু ঘণ্টার ধ্বনি শোনা গেল। রোদ্দুর ম্লান হয়ে, কমলা রং ছড়িয়ে, ক্রমশ গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। টুং টাং টুং টাং শব্দটা দ্রুত কাছে চলে এল।
‘এই তো আমার হংসী চলে এসেছে। তাই তো ভাবছি কোথায় গেল ব্যাটা!’ স্বামীজি ছাগলটিকে কাছে টেনে নেন। হংসীর গলায় ঘণ্টা বাঁধা। হংসী আর মটরু—দু’টি ছাগলই দৌড়ে দৌড়ে চলে এসেছে স্বামীজির কাছে। স্বামীজি ওদের মাথায়, গলায়, পেটে, পিঠে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছেন।
‘আমি ভাবছিলাম, যদি অনুমতি করেন! কলকাতায় এসেই ক্রিস্টিন বেচারা পড়েছে একেবারে ফার্নেসে! প্রথম গরমে সে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে!’
ক্রিস্টিন স্বামীজির পাশে পাশে হেঁটে চলেছেন। গঙ্গার হাওয়ায় ক্রিস্টিনের ছোট ছোট চুল হাওয়ায় নড়ছে। উড়ছে না। ভারতের গরম যেন তাঁর প্রাণশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এই সময়টা তাও খুব ভাল লাগে ক্রিস্টিনের। স্বামীজির পাশে পাশে হেঁটে যেসব কথা শোনেন তা যেন পরম অর্থবহ হয়ে ওঠে। শোনেন শুধু। নিজের কষ্টের কথাও উচ্চারণ করেন না। কৃচ্ছ্রতা তিনি সাগ্রহে গ্রহণ করেছেন। তবে এই গঙ্গার সন্ধ্যাকালীন হাওয়া এবং স্বামীজির সঙ্গ তাঁর প্রাপ্তি বলে মনে করেন।
‘ভাবছিলাম, গরমের সময়টা যদি কিছুদিন মায়াবতী আশ্রমে কাটিয়ে আসা যায়! কেমন হয়?’ নিবেদিতা স্বামীজির মুখের দিকে তাকালেন।
‘তুমি যখন ভেবেছ তখন খুবই ভাল হয়। যাও। তবে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। আমার যাবার সময় হয়ে গেছে।’
নিবেদিতা ভেবেছেন স্বামীজি জাপান যাওয়ার বিষয়ে বলছেন।
‘অবশ্যই! ওখানে তো স্বরূপানন্দ আছেন! তাড়াতাড়িই ফিরে আসব।’
‘মার্গট, আমার চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। শরীরের বল কমছে। কলকব্জা বিকল হচ্ছে। কিন্তু অন্তরের দৃষ্টি প্রবল হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি — জাহাজ ধীরে ধীরে ডুবছে!’
মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি শুরু হল। সন্ধ্যা নেমে আসছে। এক তরুণ সন্ন্যাসী এগিয়ে আসে স্বামীজির কাছে। তার কাঁধে হাত রেখে স্বামীজি হাঁটতে থাকেন মন্দিরের দিকে। সন্ধ্যারতি শুরু হবে।
‘চলো।’
‘চলুন স্বামী’।
মে মাসের ৫ তারিখ ১৯০২। আজকেই সন্ধ্যায় নিবেদিতা, ক্রিস্টিন রওনা হবেন মায়াবতী আশ্রমের উদ্দেশ্যে। হিমালয়ের কোলে অখণ্ড নীরবতায় একা থাকার যে মানসিক জোর দরকার, সেটা ক্রিস্টিনের জন্য ক্রিস্টিনেরই পরখ করে নেওয়া প্রয়োজন। সঙ্গে যাচ্ছে ওকাকুরা। আর দু’-তিনজন মঠের ব্রহ্মচারী সঙ্গে আছেন সাহায্যকারী হিসেবে। ছ’দিনের জার্নি। ট্রেন, ঘোড়া, ডুলি এবং ডান্ডী। সঙ্গে খাবারের রসদ। আছে টেন্ট। সমস্ত ব্যবস্থা তদারকি করেছেন স্বামীজি নিজেই। নিবেদিতার মায়াবতী যাবার অভিজ্ঞতা স্বামীজির সঙ্গেই। তাই স্বামীজি নিবেদিতাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব মনে করিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যাতে ক্রিস্টিনের কোনও সমস্যা না হয়। কাঠগোদাম অবধি ট্রেন। তারপরেই জঙ্গল আর হিমালয়ের পার্বত্য ভয়ংকর সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে চলা। বেশিরভাগ পথ নিবেদিতা, ক্রিস্টিন ও ওকাকুরা গেছেন ডান্ডীতে। বড় টিম। ডান্ডী, মোটবাহক সব ব্যবস্থা করেই রেখেছেন স্বরূপানন্দ। মাঝে মাঝেই বাঘের আক্রমণে বিপর্যস্ত হয় ভ্রমণকারীরা, বিশেষত সন্ন্যাসী ও সাহেবদের দল। মায়াবতী আশ্রম সাধারণ ট্যুরিস্ট স্পটের আরও উপরে নির্জন বনভূমে। সামনে আকাশে হেলান দিয়ে আছে হিমালয়ের পর্বতমালা। আর চারপাশে ঘন, গহন, আকাশচুম্বী বৃক্ষরাজিময় অরণ্য। নির্জনতার একমাত্র আভরণে মণিমুক্তার মতো কখনও সখনও পাখির ডাক। ১১ জুন নিবেদিতা তাঁর দলবল নিয়ে পৌঁছলেন মায়াবতী আশ্রম। ক্লান্ত সবাই। স্বরূপানন্দ এখন মঠের অধ্যক্ষ। তিনি আর মিসেস সেভিয়ার ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মি. সেভিয়ার আর নেই। নিবেদিতার মনে পড়ে সেই নিষ্ঠ মানুষটির কথা। ১১ মে নিবেদিতারা পৌঁছলেন মায়াবতী। সুন্দরী মায়াবতী। চারিপাশে লাল রোডোডেনড্রন ফুটে আছে। বন্য গোলাপ ফুটে আছে জঙ্গলে দঙ্গল বেঁধে। নানারকম ফার্নের ভাস্কর্য। দেওদারের সুউচ্চ সারি। শান্ত গম্ভীর প্রকৃতি এখানে উজাড় করেছে তার সৌন্দর্য। বৃষ্টিতে ভেজা-ভেজা চারপাশ। ধ্যান করার পক্ষে উপযুক্ত জায়গা। নিবেদিতার মনে বারবার ভেসে আসছে — সামনে লিনিয়ান সোসাইটির বক্তৃতা! সেখানেও কি ডা. ওয়ালার ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা চরম বিরুদ্ধতা করবেন? বেচারা বেয়ার্ন! শুধু একজন পরাধীন দেশের বিজ্ঞানী বলেই তাঁকে এত অপমান সহ্য করতে হচ্ছে! দেশ কবে বুঝবে? দেশের কবে এই জাতীয়তা বোধ তৈরি হবে? নিবেদিতা পাহাড়ের পাকদণ্ডী দিয়ে দেবদারু গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলো-ছায়া মেখে চলেছেন। শান্ত। ঝিরঝির হাওয়া আর মাঝে মাঝে অচেনা পাখির ডাক। আমার যতটুকু কাজ আমি তার সবটুকু দিয়েই করেছি ‘বেয়ার্ন’! তোমার জীবনকে, তোমার প্রতিভাকে বাঁচাবার জন্য যা-কিছু প্রয়োজন, সবটুকুই করেছি। আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। জানি তুমি অসহায় বোধ করেছ। ক্ষুব্ধ হয়েছ। আমি জড়িয়ে যেতে পারি না, বেয়ার্ন! আমি যে সন্ন্যাসিনী ছাড়া কিছুই নই!
নিবেদিতা দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর চোখ কি ভিজে উঠছে! নাহ্। তিনি সন্ন্যাসিনী! কঠোরতা তাঁর অলঙ্কার। অতীতকে বর্তমানের সারথি করা তাঁর চলবে না! বেলুড়ে তাঁর পিতা, পথপ্রদর্শক অসুস্থ। অভিজ্ঞ ব্রহ্মানন্দজি বুঝতে পেরেছেন সময় বেশি নেই। এখানে স্বরূপানন্দের কাছে ক্রিস্টিন যোগাভ্যাস করছেন। অভ্যাস করছেন ধ্যানের। পাঠ করছেন বেদ, পুরাণ। ওকাকুরা চলে গেছেন ভারত দর্শনে। তাঁর Ideals of The East বইয়ের সম্পাদনার কাজটি করতে হবে নিবেদিতাকেই। নিবেদিতা মায়াবতীতে এনেছেন পাণ্ডুলিপিটি। অনেক জায়গায় পরিবর্তন পরিমার্জন করতে হচ্ছে। ওকাকুরার অনুরোধে বইটির ভূমিকাও লিখতে শুরু করেছেন। ‘এশিয়া ইজ ওয়ান’ এটাই বলতে চান ওকাকুরা। বলতে চান শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশের ধারার মধ্য দিয়েই সমগ্র এশিয়ার একক সত্তা। ইউরোপের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র এশিয়াকে একত্রিত শক্তি হিসেবে বিকশিত হতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিবেদিতার মননের এক প্রকোষ্ঠে স্বামীজি এবং আরেক প্রকোষ্ঠে জগদীশচন্দ্র। সকালের ধ্যান ও ব্রেকফাস্টের পর হাঁটতে বেরিয়েছেন নিবেদিতা। মাঝে মাঝেই একা বেরিয়ে পড়েন। মনটা আজ খুবই উতলা। স্বামীজির শরীর অন্যতম চিন্তার বিষয়। ফিরে যেতে হবে কলকাতায়। দ্রুত ফিরতে হবে। ক্রিস্টিন থেকে যাক এখানে গ্রীষ্মকালটা। স্বরূপানন্দ খুব ভাল শিক্ষক। একাই ফিরে যাবেন কলকাতা।

আর ঠিক এই মে মাসের প্রথমদিকেই এক বিজ্ঞানী সুদূর ইংল্যান্ডে বসে চিঠি লিখছেন তাঁর প্রিয় কবিবন্ধুকে।
৮ ই মে,১৯০২
বন্ধু,
তুমি আমার নিকট উপস্থিত হও। আমি কী কষ্টের ভিতর দিয়া যাইতেছি তুমি জানিবে না। তোমরা নিরাশ হইবে একথা মনে করিয়া আমি এখানে কীরূপ বাধা পাইতেছি তাহা জানাই নাই। তুমি মনেও করিতে পারো না। এই যে Royal Society-তে গত বৎসর মে মাসে Plant Response সম্বন্ধে লিখিয়াছিলাম, তাহা Waller ও Sanderson চক্রান্ত করিয়া Publication বন্ধ করিয়া দিলেন। আমার সেই আবিষ্কার চুরি করিয়া Waller গত নভেম্বর মাসে এক কাগজে বাহির করিয়াছেন। আমি এতদিন জানিতাম না। আমার Linnean Society-র Paper ছাপা হইবার কথা যখন Council-এ ওঠে, তখন Waller-এর বন্ধুরা তথায় আমার Paper বন্ধ করিবার চেষ্টা করেন — এই বলিয়া যে Waller গত নভেম্বরে এইকথা publish করিয়াছেন। Council-এর কথা confidential, সুতরাং এইসব চক্রান্তের কথা জানিতাম না। আর Royal Society-এর paper বাহিরে প্রকাশ পায় নাই, সুতরাং প্রমাণাভাবও বটে। ভাগ্যক্রমে আমার Royal Institute-এর lecture-এ একথা ছিল, এবং দৈবক্রমে Linnean Society-এর Secretary-এর কাছে আমার উক্ত কাগজ ছিল। অনেক ঝগড়ার পর শুনিতে পাইতেছি যে, আমার কাগজ ছাপা হইবে।”
তাকিয়ে আছেন জগদীশচন্দ্র। নিবেদিতা নেই। নেই সারা বুল। নেই জোসেফাইন ম্যাকলয়েড। একা তিনি। যে গবেষণা পত্র রয়্যাল সোসাইটির আর্কাইভে রাখা সেই পেপার কীভাবে প্রকাশিত হয়ে যায় অপর এক বিজ্ঞানীর নামে? তবে তো এক বিরাট বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ! যুদ্ধাস্ত্র? শুধু নিরলস শ্রম ও গবেষণার কাজে নিষ্ঠ থাকা? কতদিন? যারা বিরোধিতা করছে আমি যা গবেষণা করে পেয়েছি! বলছে নিছক কল্পনা! বলছে, বিজ্ঞানের তুলনায় দর্শনের বিষয় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে! তবে সেই গবেষণা পত্র হুবহু ছাপা হলে মেনে নিতে হবে মান্যতা পেয়েছে।
তার মানে ড. ওয়ালার এবং ড.স্যান্ডারসন যে বিরোধিতা করছে সেটা অছিলা মাত্র! তারাও মান্যতা দিয়েছে এই গবেষণার সত্যকে। তাহলে তো এটাই সত্যি যে, জগৎ এক প্রাণময় লীলা। তার অর্থ ভারতবর্ষের যে মূল সুর বিশ্ব এক সুরে বাঁধা – অদ্বিতীয়, অদ্বৈত, একম্। আমার গবেষণার দ্বারা তার প্রমাণ বিশ্বের কাছে তুলে ধরার আগে এক ঘৃণ্য চৌর্যবৃত্তির ফলে অন্য আরেকজনের নামে প্রকাশ পাচ্ছে আর আমার গবেষণা পত্রটি প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। জগদীশচন্দ্র তাকিয়ে থাকেন শূন্য আকাশের দিকে। ড.ওয়ালার পরিকল্পনা করেই লিনিয়ান সোসাইটিতে বক্তৃতা দেওয়ার ঠিক এক মাস আগেই সে Journal of Physiology পত্রিকায় ছাপিয়ে দেয়। যে পেপার লিনিয়ান পত্রিকায় ছাপানোর জন্য প্রস্তুত, যে পেপার রয়্যাল সোসাইটির আর্কাইভে বন্ধদশায় আছে, সেই পেপার রয়্যাল সোসাইটিতে বক্তৃতা দেওয়ার আটমাস পরে ছাপা হল ড. ওয়ালার নামে! ভুলতে পারছেন না জগদীশচন্দ্র। রাগ, ক্ষোভ, অবসাদ, ঘৃণা সব একসঙ্গে মনকে অস্থির করে তুলেছে। জগদীশচন্দ্র মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। চিঠিটি লেখা শেষ করেন দ্রুত।
“President আমাকে লিখিয়াছেন, there are many queer things you have yet to learn. But I am glad that you have had fairplay. তাঁহার নিকট আরও অনেক কথা শুনিলাম। সে সব কথা বলিয়া আর কী হইবে! Ideal ভাঙিয়া গেলে আর কী থাকে! এতদিন এদেশের বিজ্ঞান – সভায় অনেক বিশ্বাস করিয়াছি — তাহা দূর করিয়া লাভ কী? অধিক দিন থাকিতে পারিলে আমি একাই ব্যূহ ভেদ করিতাম — কিন্তু আমার মন ভাঙিয়া গিয়াছে। আমি একবার ক’দিন আসিয়া ভারতের মৃত্তিকা স্পর্শ করিয়া জীবন পাইতে চাই। তাহার পর যদি পুনরায় আসিতে পারি তবে — ভবিষ্যতের কথা আর ভাবিব না।”
তোমার
জগদীশ
মে মাসের গরমে ঝলসে যাচ্ছে ধু ধু খোয়াই। দাবদাহে ঝিম ধরে আছে চারিপাশ। রবীন্দ্রনাথ বসেছেন জানালার পাশে। হালকা সুতির কাপড় ছড়িয়ে আছে গায়ে। খালি গা। হালকা হাওয়া আসছে মাঝে মাঝে কোপাই থেকে। রবীন্দ্রনাথ আরেকবার পড়লেন জগদীশচন্দ্রের চিঠিটি। তাকালেন জানালা দিয়ে বাইরে। প্রখর রোদ্দুরে প্রকৃতি ঝলসে যাচ্ছে। তবুও তবুও গাছে গাছে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে মাটি থেকে টেনে নিচ্ছে জল। কী ভীষণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এই তীব্র গরমে। বন্ধুর চিঠির ছত্রে ছত্রে প্রবল হতাশার চিহ্ন। কিন্তু পিছিয়ে আসার বা ভেঙে পরার কোনও পথ নেই। বিজয়-টিকা নিয়ে ফিরে আসতে হবে জয়ের এত কাছে পৌঁছে। চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধেও তুলে ধরতেই হবে সত্য। এমন হীন চক্রান্তের কাছে ভারতীয় বিজ্ঞান প্রতিভার হতাশাজনক পরিসমাপ্তি কাঙ্ক্ষিত নয়। দ্রুত প্রিয় বন্ধুকে চিঠি লিখতে শুরু করলেন।
মে ১৯০২
“বন্ধু,
ঈশ্বর তোমার ললাটে বিজয় তিলক অঙ্কিত করিয়া তোমাকে পৃথিবীতে পাঠাইয়া দিয়াছেন —তুমি কি আমাদের মতো লোকের কাছ হইতে বলের বা উৎসাহের অপেক্ষা রাখো? যেখানে থাকো এবং যেমন করিয়াই হউক, উল্লাসে হউক, বাধায় হউক, নৈরাশ্যে হউক, তুমি নিজেকেও ব্যর্থ করিতে পারো না। যিনি ভিতরে থাকিয়া তোমার অজ্ঞাতসারে তোমার সকল জীবনকে সফলতার দিকে লইয়া গেছেন তাঁহার কর্মকে হঠাৎ মাঝখানে নিরর্থক করিবে কে? সীজারের নৌকা কখনও ডুবে না। নিরাসক্ত ভারতবর্ষের অবিচলিত স্থৈর্য তোমাকে তোমার কর্মের মধ্যে রক্ষা করুক। কোনও ক্ষুদ্র আকর্ষণ, কোনও ইচ্ছার চাঞ্চল্য তোমাকে তোমার মহৎ ব্রত হইতে ভ্রষ্ট না করুক। ভারতবর্ষের অশ্বমেধের ঘোড়া তোমার হাতে আছে, তুমি ফিরিয়া আসিলে আমাদের যজ্ঞ সমাধা হইবে। তুমি এখানে আসিয়া তপস্বী হইয়া নিভৃতে তোমার শিষ্যাদিগকে জ্ঞানের দুর্গম দুর্গের সন্ধান গোপন পথ সন্ধান করিতে শিখাইয়া দিবে। এই আমি আশা করিয়া আছি।”
থামলেন কবি। আরেকবার পড়লেন চিঠিটি। চিঠিটি দ্রুত শেষ করতে হবে। বিকেলে ছেলেদের মাঠে যেতে হবে। আজ ওদের কুস্তি খেলা হবে। তারপর উপাসনা। আজ কবি ওদের গান শেখাবেন। তারপর ইংরেজি ভাষা পড়াবেন। সামনে খোলা পাতায় মন দিলেন।
“…বিদেশী আমাদিগের জ্ঞানের অগ্নি যেটুকু দেয় তাহা অপেক্ষা ঢের বেশি ধোঁয়া দিয়া থাকে — তাহাতে যে কেবল অন্ধকার বাড়ে তাহা নহে —আমাদের অন্ধতা বাড়িয়া যায় — আমাদের দৃষ্টি পীড়িত হয়। তোমার কাছে জ্ঞানের পন্থা ভিক্ষা করিতেছি — আর কোনও পথ ভারতবর্ষের পথ নহে — তপস্যার পথ, সাধনার পথ আমাদের।…”
ক্ষতবিক্ষত জগদীশচন্দ্রকে তাঁর কবিবন্ধুর এই চিঠি কতটা মানসিক জোর দিয়েছিল তার জবাব পাওয়া যায় পরবর্তীতে জগদীশচন্দ্রের অদম্য কাজের স্ফুরণে। কিন্তু এই কঠিন সময়ে জগদীশচন্দ্র একা। একদল ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর চরম কদর্য বাধাদান আর তাঁদের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের ব্রিটিশ শিক্ষা কর্মকর্তাদের ছুটি নিয়ে হেনস্থা। ইতিমধ্যে তাঁর লেখা ‘Response in The Living and Non-Living’ বইটির সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া হয়েছে Longmans, Green & Co. প্রকাশকের কাছে। ছাপার কাজ চলছে। নিবেদিতা যদিও পাণ্ডুলিপির সম্পূর্ণ কাজ করে দিয়েই ফিরে গেছেন ভারতবর্ষে। তবুও নানা কাজ থেকে যায়। প্রুফ দেখা। টুকিটাকি বিয়োজন সংযোজন পরিবর্তন থাকেই।
১৭ নম্বর বোস পাড়া লেনের বাড়ির ছাদটি খুব পছন্দের নিবেদিতার। ভোরে এখানেই তিনি ধ্যানে বসেন। মঠের দিকে মুখ করে ধ্যানে বসেন তিনি। এক আশ্চর্য আশীর্বাদের নরম ছোঁয়ার মতো হাওয়া এসে তাঁর মাথায় যেন পিতার হাতের স্পর্শ বুলিয়ে দেয়। খুব ভেতরে, নিভৃতে এক আশ্চর্য আলোর উদ্ভাস উপলব্ধি করেন। তারপর তিনি কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকেন মঠের দিকে। যেন এক আকাশবার্তা ভেসে আসে। নির্দেশ। কাজের নির্দেশ। ২০ জুন মায়াবতী থেকে রওনা হয়ে ২৬ জুন গভীর রাতে এসেছেন নিবেদিতা কলকাতায়। স্বামী সারদানন্দ তাঁকে হাওড়া স্টেশন থেকে আনতে গেছিলেন। বাড়িতে আসার পর সারদানন্দ একটি মৃগ-চামড়ার আসন নিবেদিতার হাতে দিলেন স্বামীজির উপহার-স্বরূপ। নিবেদিতা সারদানন্দকে দেখে আবেগে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার তাড়াতাড়ি ফিরে আসায় তিনি খুশি হয়েছেন?’
সারদানন্দ ছোট্ট উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ গতকাল গেছে ২৭ জুন। সারাদিন ঘর গোছানোর নানা কাজ করেছেন।
আজ ২৮ জুন, শনিবার সকাল।
“Saterday morning. I was going to the Math, but a note came early, to say He was coming to Town. He came at 9. ( Letters, p-491 to MacLeod)
দ্রুত পায়ে ঘাট থেকে ফিরে এসেছেন নিবেদিতা। স্বামীজি আসছেন! বিহ্বলতায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্থির। তাকিয়ে আছেন পথের দিকে। এই পথেই তিনি আসছেন!
প্রস্তরবৎ দাঁড়িয়ে থাকেন। করজোড়ে বেশ জোরেই জোরেই বলতে থাকেন — ‘জয় গুরু মহারাজ কি জয়, জয় গুরু মহারাজ কি জয়।’ দু’পাশে দুই সন্ন্যাসীর কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন তিনি। নিবেদিতার চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। স্বামীজি কাছাকাছি আসতেই দৌড়ে গিয়ে পায়ের ধুলো নিলেন মাথায়। স্বামীজি দুই হাত নিবেদিতার মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন। নিবেদিতা চোখ বুজে সে আশীর্বাদ গ্রহণ করলেন। ক্লান্তির শরীরে এক লহমায় ঋণাত্মক তড়িৎ প্রবাহ বয়ে গেল। ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। স্বামীজি নিজেই আগে আগে একা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন। বাঁধানো উঠোন পেরিয়ে সোজা গেলেন উঠোনের কোণে ডুমুর গাছের কাছে। হাত বুলিয়ে দেন পাতায় পাতায়। হাত বোলাতে থাকেন খিলানের থামে, দেওয়ালে। সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন লাল-মেঝের বারান্দায়। সিঁড়ির দু’পাশে বেশ কয়েকটি টবে গাছ রয়েছে। নিবেদিতা সাজিয়ে রেখেছেন। দেওয়ালে দেওয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে তিনি একা উঠে এলেন দোতলায় নিবেদিতার ঘরে। মেঝেতে হরিণের চামড়ার আসনটি পাতা ছিল। স্বামীজি সেই হরিণের চামড়ার আসনে সটান বসলেন। এই চামড়ার আসনে বসেই নিবেদিতা ধ্যান করতেন ইদানীং। প্রিয় সেই আসনেই এসে বসেছেন।
“Sat down on His own rug here – played with some Lucknow figures I had brought. পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল নিবেদিতার ছাত্রীদের জন্য লক্ষ্ণৌ থেকে আনা কয়েকটি খেলনা। স্বামীজি সেইগুলি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে কথা শুরু করেন। শরীর খারাপ নিয়ে এতটা পথ আসার ধকল নিলেন স্বামীজি। জুন মাসের ভ্যাপসা গরম! নিবেদিতা একটা তালপাতার পাখা দিয়ে স্বামীজিকে হাওয়া করতে থাকেন।
‘বাড়িটি ভাল লাগল। তোমার কাজের উপযুক্ত হয়েছে। শিশুর মধ্যে যে ভগবান আছে, তাঁর অর্চনা করতে ভুলো না কখনও। ক্ষুদ্র কীটের মধ্যেও যে ব্রহ্মবস্তু লুকিয়ে আছেন।’
নিবেদিতা নিশ্চল তাকিয়ে আছেন। শুধু তার হাতের তালপাখা দুলে চলেছে।
‘ও বাবা! ওটা কী! মাইক্রোস্কোপ! বাহ্ দেখি দেখি! পরের দিন যেদিন মঠে যাবে এটা নিয়ে যেও!’ স্বামীজির চোখ দু’টি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
‘আমি ভাবছি মেয়েদের প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু করব। বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ গড়ে তোলার প্রাথমিক পাঠক্রম রাখব রুটিনে! আপনি কী বলেন?’ বেশ ধীরে ধীরে প্রশ্নটা রাখলেন নিবেদিতা।
‘ওদিকে ম্যাজিক-লন্ঠন আছে দেখছি! ক্যামেরাও এনেছ?’
‘হ্যাঁ গুরুদেব! আমি কি ভুল করছি কিছু?’
‘কাল একবার মঠে এসো। তোমার কাজের ছকটা মঠের সাধুদের একবার বুঝিয়ে দিও। তোমার কর্মপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানান! আমি এখন উঠি! আমাকে কোনও প্রশ্ন কোরো না। আমার কোনও উত্তর নেই। আমি এখন সেই মহান ডাকের অপেক্ষায় আছি। জাগতিক কিছু জিজ্ঞাসা কোরো না।’
‘পিতা! বিদ্যালয়ের দ্বারোদঘাটনে আপনাকে তো আসতেই হবে আশীর্বাদ করার জন্য!’
‘আমার আশীর্বাদ তো তোমার সঙ্গে সবসময় আছে। তোমার মধ্যে দুর্নিবার শক্তির উদ্বোধন হোক। আর সেই সঙ্গে অসীম শান্তিও! রোদ চড়া হবার আগেই আমাকে মঠে ফিরতে হবে। চল রে চল! এবারে একটু চাগাড় দিয়ে তোল দিকিনি!’
দুই সন্ন্যাসী দু’দিক থেকে হাত দুটো ধরে তুলে দাঁড় করালেন স্বামীজিকে। স্বামীজির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন নিবেদিতা। স্বামীজি হাত রাখলেন নিবেদিতার মাথায়, ‘অফুরন্ত শক্তির আধার হও তুমি। স্বয়ং জগদম্বা তোমার দেহ-মনে আবিষ্ট হন। শান্তি ওঁ শান্তি।’
গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন নিবেদিতা। জল ভেঙে, জল ভেঙে নৌকা চলে যাচ্ছে স্বামীজিকে নিয়ে দূরে। যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায় ততক্ষণ অবধি দাঁড়িয়ে থাকলেন নিবেদিতা। সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই কাছ থেকে দূরে সরে যায়। আবার অনেক অধরা এসে পড়ে ধরার বৃত্তে। জীবন এক আশ্চর্য প্রবাহ।
খুব ভোর-ভোর নিবেদিতা রওনা হলেন নৌকায় মঠের উদ্দেশে। স্বামীজির নির্দেশে নিবেদিতা আজ মঠের সাধুদের বুঝিয়ে বলতে চান তিনি কী করতে চাইছেন বাংলার নারীদের জন্য তথা ভারতের সাধারণ মানুষের জন্য। একসঙ্গে দুপুরের খাওয়া সাঙ্গ হল।
ব্রহ্মানন্দের প্রতি নিবেদিতা শ্রদ্ধাশীল। এই একটি মানুষ যাঁর কথা ও নির্দেশ নিবেদিতার যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়। সারদানন্দ অনেকটাই বোঝেন নিবেদিতাকে। সারদানন্দের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কোনও সমস্যা হয় না নিবেদিতার। বোঝাপড়া ভাল। ভালবাসেন নিবেদিতা। নিবেদিতাও বুঝতে পারেন স্বামীজির পরেই এই দু’জন তাঁকে তাঁদের একজন করেই ভাবেন। দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের পর একে একে জড়ো হয়েছেন স্বামীজির ঘরে সবাই। বসে আছেন সবাই। স্বামীজিকে আজ বেশ উৎফুল্ল লাগছে। অন্যদিনের তুলনায় শরীর আজ ভাল। কাল রাতে ভাল ঘুম হয়েছে তাঁর। ভোরে ধ্যান করেছেন অনেকক্ষণ। ব্রহ্মানন্দ এইসব খবরাখবর দিতে দিতে নিবেদিতার সঙ্গে এলেন স্বামীজির ঘরে। অন্যান্য সকল সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীরা এসে বসে আছেন অনেকক্ষণ। স্বামীজি বসেছেন বিছানায়। একপাশে পা ঝুলিয়ে বসেছেন ব্রহ্মানন্দ ও আরেক পাশে সারদানন্দ। খাটের কোণে গিয়ে বসলেন নিবেদিতা। ধবধবে সাদা গাউন। গলায় ঝুলছে বড় রুদ্রাক্ষের মালা। সোনালি ব্রাউন চুল চূড়ো করে মাথার উপর বাঁধা।
‘আজ আমরা নিবেদিতার কাছে শুনতে চাই তাঁর বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা। এবং তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়েও যদি সামগ্রিকভাবে আলোকপাত করেন।’
ব্রহ্মানন্দ স্বামী বলা শেষ করে একটু ঝুঁকে স্বামীজিকে বললেন, ‘আপনি দু’-একটি কথা বলবেন স্বামীজি?’
স্বামীজি এমন ভাব দেখালেন যেন তাঁর শারীরিক কোনও কষ্ট নেই! নিবেদিতা স্বামীজির দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছেন। স্বামীজির চোখে মুখে শারীরিক কষ্টকে ঢাকা দেওয়ার অভিব্যক্তি।
‘আমি জানি নিবেদিতাকে আমরা সবসময় বুঝে উঠতে পারি না। ভাষার থেকেও ওঁকে বোঝার প্রধান অন্তরায় ওঁর বহুমুখী প্রতিভা এবং ভাবনার বহুধা গতি। আমরা অনেক সময়েই সমগ্রটা ধরতে পারি না। গোল বাঁধে তখনই। ওঁর বহুমুখী ভাবধারাটা কেমন? আমরা জানি ভারতবর্ষের বিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে কী কঠিন তপস্যায় আছেন বাংলার এক বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর এই বিজ্ঞান জয়যাত্রার অন্যতম সৈনিক আমাদের মার্গট! রমেশচন্দ্র দত্ত আমাকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন মার্গট যেন আরও কিছুদিন ওখানে থেকে বিজ্ঞানীর বিজ্ঞান সাধনায় সহায়কের কাজ করে। মার্গটের এই কর্মসাধনার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? উদ্দেশ্য ছিল অদ্বৈত দর্শনের মূল সুরটিকে বৈজ্ঞানিকের আবিষ্কারের মাধ্যমে জগৎ সভায় প্রতিষ্ঠিত করা। অক্লান্ত পরিশ্রমে সে-কাজের সমাপনান্তে সে ফিরে এসেছে আবার ভারতবর্ষের কষ্টকর জীবনে ভারতের সেবার কাজে। বহুমুখী ভাবধারার বহু ব্যক্তিত্বের সমাহার ঘটেছে তার মধ্যে। আমারই মতন অনেকটাই। ব্যক্তিত্ব নানামুখী হলেও তাঁর হৃদয় আর বুদ্ধি কিন্তু একমুখী। আর্ত, দরিদ্র, ভারতবর্ষের সেবা। তার প্রতি আমার পূর্ণ আশীর্বাদ আছে সে যেন তার সমস্ত কর্ম সাধন করার অফুরন্ত শক্তির আধার হয়ে ওঠে।’ একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে হাঁফাতে থাকেন স্বামীজি । তিনি যতক্ষণ বলছিলেন ততক্ষণ নিবেদিতা হাত জোড় করে বসে ছিলেন। তাঁর দু’চোখ ভরে উঠছিল জলে। সারদানন্দ দু’বার সতর্ক করায় চোখের জল মোছেন নিবেদিতা। সন্ন্যাসীদের চোখের জল মানায় না!
নিবেদিতা হাত জোড় করে উঠে দাঁড়ালেন। এমনিতেই তিনি খুব দ্রুত কথা বলেন। উত্তেজিত হয়ে পড়েন দ্রুত। দ্রুত বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আজ তিনি শান্ত। ধীরে ধীরে বলা শুরু করলেন।
‘ভারতবর্ষের পথে পথে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি আমার পিতার হাত ধরেই। জনক জন্ম দেন, পিতা পালন করেন। ভারতবর্ষের বহুত্বের মধ্যে ঐক্য এবং অখণ্ডতা আমি চাক্ষুষ করেছি। অভুক্ত, নিরাশ্রয়, দরিদ্র, অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত ভারতবাসীকে আমি দেখেছি আমার পিতার চোখ দিয়ে। আমি সেই ভারতবাসীর অশ্রু মোচনের কাজে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছি। নারীশিক্ষার জন্য আমি বিদ্যালয় খুলতে চাই, যেখানে সূচিশিল্পের মতো হাতের কাজ, গার্হস্থ্য প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষা দেওয়া হবে, পুরাণ, শাস্ত্র, প্রাথমিক অঙ্ক, দেশের ভুগোল, দেশের ইতিহাস ইত্যাদি পড়ানোর কথা ভেবেছি। একটি পাঠক্রম তৈরি করব ওদের উপযোগী। বিধবাদের সামাজিক অবস্থান আমাকে খুব পীড়িত করেছে, তাঁদের জন্য একটি আবাসস্থল এবং অনাথদের জন্য একটি অনাথাবাস তৈরি করার ইচ্ছে আছে। তার আগে যে কাজের পরিকল্পনা করেছি, তা হল ভারতবাসীর নিজের জাতিসত্তা গঠনের কাজ। ভারতবাসীর জাতীয়তাবোধ তৈরির কাজ আমার কাছে অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। স্বামীজি যখন বিদেশে গিয়ে ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরম্পরার কথা বলেন, তাঁর এই জয় ভারতের প্রতিটি মানুষের জয় বলে ভারতবাসীকে জানাতে হবে। ভারতের প্রতিটি কোণে কোণে প্রচার করা প্রয়োজন ভারতের এই কথা। ভারতের, বিশেষ করে এই বাংলার, বিজ্ঞানীর প্রতিভার বিকাশের পথে, সত্য প্রকাশের পথে যেভাবে বাধা তৈরি করেছে বিদেশিরা এবং সেখানে ভারতবর্ষের প্রতিভার জয় সূচিত হচ্ছে — তার কথাও বলতে হবে। জাতীয়তাবোধ ছাড়া, স্বদেশ চেতনা ছাড়া বিদেশিদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের মহান বিষয়গুলি বিশ্বের দরবারে আনা সম্ভব নয়। সেই কাজের দিকে আমার সর্বশক্তি সমর্পণ করার লক্ষ্যে আমি স্থির-সংকল্প। জাগ্রত করতে হবে নিরন্ন, দরিদ্র, মূর্খ ভারতবাসীর অন্তরাত্মা। আমি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের কন্যা, তাঁদের অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করতেই আমি আমাকে নিবেদন করেছি। আমার পিতার আশীর্বাদ আমাকে শক্তি দিয়েছে। আগামী দিনেও সেই শক্তি নিয়েই আমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সহ শিক্ষা স্বাস্থ্য কৃষি শিল্প সংস্কৃতির বিকাশের জন্য সংগ্রাম আমার অভিষ্ট। সর্বশক্তিময়ী মহামায়া আমাদের সঙ্গে থাকুক এই আমার প্রার্থনা।
নিবেদিতা দ্রুত সবটুকু বলে যেন কিছুটা হালকা হলেন। রোদ চড়া হবার আগেই ফিরে আসতে হবে বাগবাজারের বাড়িতে। মায়াবতী থেকে ফিরেছেন সবে। শরীরের উপর ধকল গেছে খুব। তার উপর জীবন শুষে নেওয়া এই গরম। বলার পর নিবেদিতা স্বামীজিকে প্রণাম করলেন। স্বামীজি দু’হাত নিবেদিতার মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন। বেরিয়ে আসছেন। মঠের সন্ন্যাসীদের মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে। নিবেদিতা ব্রহ্মানন্দ স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে উঠলেন। স্বামীজি)র সামনে দাঁড়িয়ে একবার তাকালেন। চোখে অনুমতির প্রার্থনা। স্বামীজি আবার হাত তুললেন। নিবেদিতার চোখ দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে স্বামীজির চোখের তারায়। স্বামীজি দ্বিতীয় বার নিবেদিতার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। এক নীরব বরাভয় বার্তা পৌঁছে গেল নিবেদিতার হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে।
নিবেদিতা মঠ থেকে বেরিয়ে ঘাসের জমি পেরিয়ে এগিয়ে গেলেন ঘাটের দিকে। হাতে সেই মাইক্রোস্কোপ, যা স্বামীজি আনতে বলেছিলেন। স্বামীজি যে তাঁকে বুঝেছেন তার নিশ্চিত আশ্বাস পেয়েছেন তিনি। আজ আকাশ আশ্চর্য রাঙা হয়ে আছে। রৌদ্রে হাওয়ায় হাওয়ায় নাচানাচি করছে চারিপাশের গাছগাছালি। কলকল করে নদীর গল্প ভেসে আসছে। নৌকায় ভেসে চললেন এইসব কিছু নিয়েই।
আগামী সংখ্যায় সমাপ্য


ক্রিস্টিনের কথা জেনে ও ছবি দেখে সমৃদ্ধ হলাম।ফুরফুরে গদ্য পড়ে মনের আরাম!’মিউজিক অফ লিটারেচার’! সময় ও মানুষগুলোকে দেখতে পাচ্ছি।স্বামীজির পোষ্যদেরও খুব ভালো লাগল! কত নক্ষত্রের সমাবেশ এই উপন্যাসে!সাঁকোটা কিন্তু অনেকের মনেই অনেকদিন দুলবে!অভিনন্দন!
.. একটা শিরশিরানি খেলা করে, তোমার এই লেখাটা যখন পড়ি। সার্থক টাইম ট্রাভেল , সার্থক তোমার খাটুনি ..