
ঈশ্বরই ধ্রুবক (পর্ব ৩)
সন্ধ্যে নেমে আসছে, পশ্চিমে সাগরের নীল জলে লুকোচুরি খেলছে হলদে-কমলা মায়াবী আলপনা। দুটো সাদা সিগাল ডানা ঝাপটিয়ে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে…কোথায় ওরা বাসা বাঁধতে চায়, কেউ জানেনা। আপাত শান্ত সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে গোটা কয়েক পাল তোলা জাহাজ…
আস্তে আস্তে জাহাজগুলো এগিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমি দিকচক্রবালের দিকে…আরেকটু বাদেই আর দেখা যাবে না। আবার হয়তো জাহাজগুলো নোঙর বাঁধবে সুদূর কোনো বন্দরে বা নির্জন কোনো দ্বীপে। হয়তো সেখানে কোনো এক প্রেয়সী তার কোনো এক প্রিয়জনের প্রতীক্ষায় বুক বেঁধে আছে, হয়তো বা সেখানে জাহাজের খালাসিটার সাথে চকিতে চাহনি বিনিময় হয়ে যাবে কোনো এক নাম-না-জানা দ্বীপবাসিনীর! জাহাজগুলোকে ভেসে যেতে দেখলেই কেমন একটা অলস ঔদাস্য মনটাকে ক্ষনিকের জন্য হলেও স্থবির করে তোলে…
সামুদ্রিক হাওয়ার আদুরে সোহাগে পক্ককেশ বৃদ্ধের দাড়িগুলি চঞ্চল, সাদাটে টিউনিকটি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সমুদ্রের পাড়ের কাছে একটি পাথরে উপরের বসা, স্থিতধী বৃদ্ধের হঠাৎ নজরে এলো – জাহাজগুলো যখন দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন ছোট হতে হতে একেবারে হঠাৎ করে যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়… বরং প্রথমে গলুই, তারপরে মাস্তুল এবং সবশেষে জাহাজের পাল খানা গোচরের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমনটাতো হবার কথা নয়, কারণ তার নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী পৃথিবী চ্যাপ্টা ডিস্কের মত সমতল এবং মহাসাগরের উপর ভাসমান। পৃথিবী যদি সমতলই হত, তাহলে তো পুরো জাহাজটাই ক্রমশ ছোট হতে হতে একেবারে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া উচিত ছিল! কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাচ্ছে, তাতো হচ্ছে না! তবে কি তার নিজের বিশ্বাসকে বদলানোর প্রয়োজন, পৃথিবী কি তাহলে সমতল নয়; এতদিন ধরে যা ভেবে এসেছেন, তাহলে কি সব মিথ্যা, ভুল – এসব নিয়েই একমনে ভেবে যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ থালেস সাহেব। ইদানিং তাঁর যেন বড় বেশি মনে হচ্ছে, ক্রমশ তিনি এগিয়ে চলেছেন তাঁর অন্তিম পরিণতির দিকে, জড়া যেন ক্রমাগত আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণায়, চিন্তাশক্তি যেন ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে আসছে!
‘স্যার…শুনতে পাচ্ছেন…’
ভাবনার জাল আচমকা ছিন্ন হয়ে গেল থালেসের। সাধারণত ঋষিতুল্য থালেসকে সবাই মান্যিগন্যি করে চলে এই বন্দর শহর মাইলেটাসে। চিন্তামগ্ন মানুষটিকে পারতপক্ষে কেউ ঘাঁটায় না, কে জানে, নিশ্চয়ই নতুন কোনো নিগূঢ় তত্ত্ব বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন! তাই অনভ্যস্ত ব্যাঘাতে, বিরক্তি ভরা ঘোলাটে চোখ মেলে অশীতিপর থালেস দেখলেন – সামনে দাঁড়িয়ে পাতলুন পরা এক ছোকরা, সোনালি উসকোখুসকো চুল, নীল টলটলে চোখ, সারা মুখশ্রী জুড়ে এক অপূর্ব বুদ্ধিমত্তার ছাপ।
‘কে হে তুমি বাপু?’
‘আমি পিথাগোরাস, সামোস দ্বীপের বাসিন্দা…’
‘কী চাও? কেন এসেছো আমার কাছে?’
‘আপনার নাম অনেকের কাছে শুনেছি…আমি জ্ঞান সংগ্রহ করতে এসেছি আপনার থেকে…’
মুচকি হাসলেন বৃদ্ধ থালেস, ছোকরাকে দেখে নিজের যৌবনের দিনগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল ওনার। কথায় কথায় জানতে পারলেন, ছোকরার বয়স বিশ, বাপ দু’বছর আগে ফৌত হয়েছে। কাকা কয়েকটা রুপোর আধুলি হাতে গুঁজে, পাঠিয়ে দিয়েছিল সামোস দ্বীপের পার্শ্ববর্তী, এজিয়ান সাগরের উপর আরেকটি দ্বীপ – লেসবসে। লেসবস হল সেই দ্বীপ যার নাম থেকে পরবর্তীকালে ‘লেসবিয়ান’ শব্দটি এসেছে, যদিও সেই শব্দের পুরোনো মানে কদাপি আজকের অর্থের সমতুল ছিল না! যাই হোক, ছোকরা সেখানে কিছুকাল আরেক দিকপাল দার্শনিক ফেরেসাইডের সঙ্গ করেছে এবং জন্মান্তরবাদ তথা অতীন্দ্রিয়বাদ সম্পর্কিত ধারণার বীজ তার মধ্যে অচিরেই রোপিত হয়েছে। থালেস দেখলেন, তার কাছে ছোকরা ফিলোসফি বা দর্শনের একটি বিশেষ ধারার বিষয়ে জানতে বেশি আগ্রহী। কীভাবে তিনি পিরামিডের উচ্চতা মেপে মিশর দেশের ফারাওকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তা ততদিনে লোকের মুখে মুখে ফেরে। ছোকরা জানতে চায় তার পেছনের যুক্তিকে, তত্ত্বকে…নিঙড়ে নিতে চায় তার অন্তর্যাস…
‘তুমি যে বিষয়ে জানতে আগ্রহী, সেই বিষয়কে কী বলে জানো?’
‘জানি…জিওমেট্রি…’
‘বাঃ, বাঃ, তা বাপু, সেই নাম কার রাখা জানো?’
‘আজ্ঞে যতদূর জানি – আপনার…’
পৃথিবীর বুকে এক আশ্চর্য দেশ মিশর, চারিদিকে ধূধূ বালির প্রান্তর আর সেই রুক্ষ মরুভূমির মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে এক অমৃতধারা – নীলনদ। প্রতি বর্ষায় নীলনদে বন্যা হত। তার ফলে সেই নদের চলনপথের পার্শ্ববর্তী জমিতে পলিমাটি জমত। বর্ষা শেষে সেই জমিই আবাদ হত, ফলত ফসল। সেকালে মিশরীয় জমি মালিকদের প্রতি বছর রাজকর দেওয়ার রীতি ছিল। এই কর ধার্য হত জমির মাপ এবং সে বছরে জমা পলিস্তরের উচ্চতা অনুযায়ী। রাজকর গণনার জন্য তাই জমির মাপ, সে আয়তাকারই হোক, কিম্বা বর্গাকার বা বৃত্তাকার, হিসেব করা জরুরি হয়ে পড়ে। প্রাচীন সেই মিশরীয় মাপজোকেরই অবিশ্বাস্য প্রয়োগ – বিস্তীর্ণ বালিরাশির মাঝে এক বর্গাকার ভিত, আর তার ওপরে চারটি ত্রিভুজাকৃতি তল যার শীর্ষবিন্দুটি মাটি থেকে প্রায় ৪৮০ ফুট উপরে – পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম, পিরামিড! সেই মিশর দেশে কয়েক বছর থাকাকালীন থালেস আহরণ করেছিলেন ‘ভূ পরিমাপ’ পদ্ধতি বা ‘geometry’-র ধারণা এবং অচিরেই, সেই বিষয়ে একটি মজবুত বুনিয়াদ গঠন করা যে আশু প্রয়োজন, তা অনুধাবন করেছিলেন। তৎকালীন মিশরীয় পরিমাপ পদ্ধতিতে শুধুমাত্র বিশেষ কিছু প্রয়োগের ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দেওয়া হত এবং সেই প্রয়োগগুলি ছিল মূলত অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। কিন্তু আদতে সেই প্রয়োগের পিছনে যে যুক্তি, কারণ, গাণিতিক নীতি থাকতে পারে, সে বিষয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না! মিশরে থাকতে থাকতেই, থালেসই প্রথম সে বিষয়ে মাথা ঘামান এবং তাঁর সারগ্রাহী চিন্তাধারা অনায়াসেই খুঁজে পায় সেই প্রয়োগগুলির মূল চারিত্রিক সত্যকে।
থালেস পিথাগোরাসকে উপদেশ দেন, তাঁর প্রিয় মিশর দেশে যেতে; সেখান থেকে সংগ্রহ করে আনতে – সে দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অজস্র অমূল্য রতন, যার তাত্ত্বিক মূল্য তখনো অনুধাবন করে উঠতে পারেনি মিশরীয়রা। তাঁর কাজকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারার সম্ভাবনা থালেস দেখতে পেয়েছিলেন পিথাগোরাসের মধ্যে! পৃথিবীকে বোঝার জন্য…প্রকৃতিকে বোঝার জন্য যে পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধিৎসা এবং যৌক্তিক বিবেচনাবোধ প্রয়োজন, যুবক পিথাগোরাসের ব্যক্তিত্বে তার ঝিলিক থালেসের নজর এড়ায়নি।
থালেসের পরামর্শ মত মিশরে থাকাকালীন তেমনই এক রতনের সন্ধান পান পিথাগোরাস। পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্য – সমকোণী ত্রিভুজের লম্বের বর্গ এবং ভূমির বর্গের যোগফল ত্রিভুজটির তৃতীয় বাহু, যাকে কিনা আমরা অতিভূজ নামে জানি, তার বর্গের সমান। এই উপপাদ্য পিথাগোরাস সংগ্রহ করেছিলেন মিশর দেশ থেকে। তাহলে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে, পিথাগোরাসের নামে যে উপপাদ্য আমরা এতকাল ধরে জেনে এসেছি, সেটাকে কি জটায়ুর ভাষায় ‘পিথাগোরাসের প্লেগিয়ারিস্ম্’ বলা চলে? সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্য আরেকটু গভীরে যেতে হবে…

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে পড়ে মেসোপটেমিয়া এবং মিশরীয় সভ্যতা। আজকের যুগে ইরাকে, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ডে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। সেই সভ্যতার যেসব নিদর্শন আমরা পাই, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান – পোড়া মাটির ট্যাবলেট। সেইসব ট্যাবলেটে সে যুগের গণিতের বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়, যা যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবি রাখে। গণনা এবং পরিমাপ পদ্ধতি সম্পর্কে সেই যুগেও যথেষ্ট স্পষ্ট ধারণা ছিল। যেমন ধরুন, বাটখারার ব্যবহার, ব্যাবিলনের আশ্চর্য ঝুলন্ত উদ্যানের নির্মাণকালে গাছে জল দেবার জন্য পুলি-ব্যবস্থার আয়োজন! সেই সভ্যতার অবশেষ থেকে পাওয়া একটি ট্যাবলেটে, ক্যুনিফর্ম হরফে পাওয়া যায় – একটি ক্ষেত্রের (পড়ুন, আয়তক্ষেত্র) একটি বাহু ও কর্ণের দৈর্ঘ্য জানা থাকলে অন্য বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় পদ্ধতি। ট্যাবলেটে বর্ণিত আয়তক্ষেত্রের একটি বাহু চার এবং তার কর্ণ পাঁচ (যে কোনো দৈর্ঘ্যের এককে)। পাঁচকে পাঁচ দিয়ে গুণ করলে হয় পঁচিশ, চারকে চার দিয়ে গুণ করলে হয় ষোল। এখন পঁচিশ থেকে ষোল বাদ দিলে হয় নয়…তাহলে কার সাথে সেই একই সংখ্যা গুণ করলে নয় হয়? তিনের সাথে তিন গুণ করলে হয় নয়; অতএব অপর বাহুটির দৈর্ঘ্য হবে তিন! কেমন মাথা গুলিয়ে গেল না! ভালো করে যদি খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন, আসলে এটা সেই পিথাগোরাসের উপপাদ্যের একটি নমুনা মাত্র। মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন বাসিন্দারা এরকম আরো বেশ কিছু তিনটি সংখ্যার খোঁজ পেয়েছিল, যেমন ৫, ১২, ১৩ কিম্বা ৩৪৫৬, ৩৩৬৭, ৪৮২৫ ইত্যাদি, যদি হিসেব করে দেখেন, তাহলে দেখবেন এই সংখ্যাগুলির ক্ষেত্রেও একই সম্পর্ক বিদ্যমান। এরকম সংখ্যার প্রয়োগ মিশরীয় সভ্যতাতেও দেখা যায়। মিশরীয় সভ্যতায় দড়িতে নির্দিষ্ট দূরত্বে গিঁট বেঁধে পরিমাপের প্রচলন ছিল এবং তারা যথাক্রমে ৩০, ৪০, ৫০ গজ দূরত্বে গিঁট বাধত এবং সেক্ষেত্রে তারা দেখেছিল এই তিনটি গিঁট দিয়ে যে ত্রিভুজ রচনা হচ্ছে, তার ৩০ এবং ৪০ গজের গিঁটের মাঝে সমকোণ (নব্বই ডিগ্রী) তৈরি হচ্ছে। দড়ি দিয়ে যারা এই মাপজোকের কাজ পরিচালনা করত, তাদের মিশরীয়রা হারপেডোনোপ্টা (Harpedonopta) নামে সম্বোধন করত। সেই সার্ভেয়ার, মানে হারপেডোনোপ্টার দড়ির তিনটি গিঁট সামলাবার জন্য থাকত তিনটি চাকর। এখানে উল্লেখ্য, সেই অদ্ভুত নাম থেকেই পরবর্তীকালে গ্রীক ভাষায় Hypotenuse (অতিভূজ) শব্দটির উৎপত্তি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পিথাগোরাস সাহেবের অনেক আগে থেকেই সমকোণী ত্রিভুজের এই বিশেষ ধর্মটি সম্পর্কে শুধু মিশর নয়, মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মানুষও ওয়াকিবহাল ছিল। সেক্ষেত্রে পিথাগোরাসের অবদান কী? আগেই বলেছি, মিশর বা মেসোপটেমিয়ার সেইসব মানুষরা আসলে শুধু বিশেষ কয়েকটি প্রয়োগ সম্পর্কেই ধারণা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু সেই ধারনার সামান্যিকরণ (generalization) করার ব্যাপারে তাদের কোনো উদ্যোগ সেই অর্থে ছিল না। পিথাগোরাস সেই সীমিত প্রয়োগ সেঁচে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন তার সারমর্মটিকে এবং দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছিলেন জ্যামিতির সেই বুনিয়াদি সত্যকে – এখানেই তার মুন্সিয়ানা। এক মুহুর্তে পিথাগোরাস তাঁর চিন্তালব্ধ সত্যের সাহায্যে আলোচ্য প্রয়োগটিকে কোনো বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতিরেকে চাড়িয়ে দেন প্রয়োগ সম্ভাবনাময় বিস্তীর্ণ আবাদি জমিনে!
গণিত পারদর্শী পিথাগোরাস যেকোনো পূর্ণ সংখ্যাকে নুড়িপাথরের হিসাবে কল্পনা করতেন। একদিন তিনি খেয়াল করলেন, বিশেষ কিছু সংখ্যার ক্ষেত্রে নুড়িপাথরগুলোকে এমনভাবে সাজানো যায়, যাতে সেখানে উপর-নীচে এবং পাশাপাশি সমান সংখ্যক সারি তৈরি হয়। যেমন ধরুন, চারটি নুড়িপাথর থাকলে দুটো নুড়ি পাশাপাশি, ঠিক তার নীচে আরো দুটো নুড়ি পাশাপাশি অর্থাৎ উপর-নীচ এবং পাশাপাশি, দুই ক্ষেত্রেই দুটি করে সারি তৈরি হচ্ছে। একইভাবে ন’টি নুড়িপাথর থাকলে উপর-নীচে এবং পাশাপাশি তিনটি করে সারি তৈরি হচ্ছে এবং প্রত্যেক সারিতে সমসংখ্যক নুড়িপাথর থাকছে। নীচের ছবি (ছবি ৩.১) দেখলে ভালো বুঝতে পারবেন। এই সাজানোর পর উনি দেখেন যে প্রত্যেক ক্ষেত্রে এগুলি একটি বর্গক্ষেত্রের রূপ ধারণ করছে। তিনি স্বাভাবিকভাবেই এই বিশেষ সংখ্যাগুলিকে বর্গ সংখ্যা বা Square Number হিসাবে চিহ্নিত করা শুরু করেন এবং যা আজও আমরা মেনে চলি!

একইভাবে পিথাগোরাস আবিষ্কার করেন ত্রিভুজাকার সংখ্যা বা Triangular Number। তিনি দেখেন যদি নুড়িপাথর গুলিকে এক, তার নীচে পাশাপাশি দুই, তার নীচে পাশাপাশি তিন… এরকমভাবে সাজানো যায়, তাহলে সেগুলি একটি ত্রিভুজের আকার ধারণ করছে (ছবি ৩.২)। তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অনায়াসেই উপলব্ধি করে যে এক থেকে যদি পরপর পূর্ণসংখ্যাগুলিকে (Natural Numbers) যোগ করা হয়, তাহলে ত্রিভুজাকার সংখ্যা পাওয়া যায়, যেমন ১, ১+২ = ৩, ১+২+৩ = ৬, ১+২+৩+৪ = ১০ ইত্যাদি। আবার পরপর দুটি ত্রিভুজাকার সংখ্যাকে যোগ করলে পাওয়া যায় একটি বর্গসংখ্যা, যেমন ১+৩ = ৪, ৩+৬ = ৯, ৬+১০ = ১৬ ইত্যাদি। একইভাবে এক থেকে যদি পরপর বিজোড় সংখ্যাগুলিকে (Odd Numbers) যোগ করা হয়, তাহলেও আবার বর্গসংখ্যা পাওয়া যায়, যেমন ১, ১+৩ = ৪, ১+৩+৫ = ৯, ১+৩+৫+৭ = ১৬ ইত্যাদি।

থালেস জ্যামিতির যে বিশেষ ধর্মের সাহায্যে পিরামিডের উচ্চতা মেপেছিলেন, তা ছিল – সদৃশকোণী দুটি ত্রিভুজের অনুরূপ বাহুগুলির অনুপাত সমান। সেই ধর্মকেই কাজে লাগিয়ে অবরোহ পদ্ধতিতে প্রমাণ করা যায়, সমকোণী ত্রিভুজের সমকোণ সংলগ্ন দুটি বাহু যদি a এবং b হয় এবং অতিভূজ যদি c হয়, তাহলে তাদের সম্পর্ক হবে – a2 + b2 = c2 । পিথাগোরাস হয়তো বা নুড়িপাথর সাজিয়ে সেই সত্যকে আবিষ্কার করেন। যেভাবেই করুন না কেন, সেই আবিষ্কারের প্রকাশ কী সুন্দর, সহজ এবং সর্বজনীন। যে থালেস এককালে জ্যামিতির সূচনা করেন সেই জ্যামিতিকেই সংখ্যাতত্ত্বের সাথে মিলিয়ে দিয়ে এক নতুন খাতে বইয়ে দেন পিথাগোরাস। কিন্তু বলে না, চাঁদ থাকলে চাঁদের কলঙ্কও থাকে, পিথাগোরাসের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় দেখা যায় না – আগেই লিখেছিলাম, পিথাগোরাসের সত্ত্বায় গাণিতিক যুক্তিবাদ ছাড়াও আরেকটি দিক ছিল জন্মান্তরবাদ তথা অতীন্দ্রিয়বাদে বিশ্বাস। ফলত জ্যামিতিকে তিনি যেমন সংখ্যাতত্ত্বের মোড়কে প্রতিষ্টা করতে চেয়েছিলেন, তেমনই বিশেষ বিশেষ সংখ্যাকে তিনি অতীন্দ্রিয়বাদের রসে জারিত করেছিলেন! তাঁর এই ভিন্নধর্মী চিন্তাধারার অভিঘাত পরবর্তীকালে দুটি ভিন্ন পথের সূচনা করে। সেগুলি নিয়ে পরবর্তী পর্বে আলোচনা করার চেষ্টা করব। সেই সাথে কীভাবে উপরে বর্ণিত পিথাগোরাসের সমীকরণটি পরবর্তীকালে এক অসামান্য সংকটের সৃষ্টি করে এবং তার ফলাফলই বা কী হয়, সেই বিষয়গুলিও আলোচনায় স্থান পাবে…বিজ্ঞান এবং অবিজ্ঞান, তার মধ্যে যে টানাপোড়েন, তার হদিশ পেতে গেলে সেই বিষয়গুলি জানা জরুরি!
থালেসের হাত দিয়ে যে ফিলোসফির যে নতুন ধারা – জিওমেট্রি-র গোড়াপত্তন, সেই জিওমেট্রিকে সংখ্যার সাথে সম্পৃক্ত করে পিথাগোরাস পরবর্তীকালে সূচনা করেন ফিলোসফি-র আরেক নতুন শাখা। গ্রিক শব্দ ‘ম্যাথেমা’ অর্থাৎ বিজ্ঞান থেকে সেই নতুন শাখার নাম রাখেন ‘ম্যাথামেটিক্স’ – গণিতশাস্ত্র! থালেসের প্রতি এ যেন পিথাগোরাসের এক অর্থে গুরুদক্ষিনা বলা চলে; গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এ যেন এক বৃত্ত সম্পূর্ন হওয়ারই উদাহরণ!
বৃত্ত বলতে গিয়ে মনে পড়ল, আগে এক জায়গায় বলেছিলাম, মিশরীয়রা বৃত্তাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করার পদ্ধতিও আবিষ্কার করে ফেলেছিল – যেকোনো বৃত্তের ক্ষেত্রফল বৃত্তটির ব্যাসের ন’ ভাগের আট ভাগ দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট একটি বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের সমান। হিসেব করে যদি দেখেন, তাহলে দেখবেন আমাদের চেনা বৃত্তের ক্ষেত্রফলের যে ফর্মুলা অর্থাৎ πr2 অনুযায়ী π এর মান এক্ষেত্রে দাঁড়ায় ৩.১৬! নিশ্চ’ই এই সংখ্যায় তারা উপনীত হয়েছিল তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল, এই সাংখ্যমান মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম গাণিতিক ধ্রুবকের জন্ম দেয়, শুরু হয় বিজ্ঞানের রাজ্যে ধ্রুবকের পথ চলা!
এবার আপাতত এইটুকু থাক… আশা করি, সামনের পর্বগুলিতেও আপনাদের পাশে পাবো…সবাই ভালো থাকবেন।।

