
অরুণাচল ভ্রমণ (পর্ব- ২)

সকালে দমদম এয়ারপোর্টে সবাইয়ের নির্দিষ্ট সময়ে চনমনে উপস্থিতি বেশ আনন্দ নিয়ে উপভোগ করছি!
সিদ্ধার্থ কে জিজ্ঞেস করলাম কি কি শীত বস্ত্র নিলে?
“এই তো হাত কাটা সোয়েটার, ফুল হাতা সোয়েটার
দুটো করে। মাফলার একটা, জ্যাকেট একটা। একটা হাফ টুপি, একটা হনুমান টুপি! একটা মোটা শাল!”
“আর একটা সেগুন নাও নি?” মানবের কথায় সবাই হেঁসে উঠল।
আসলে আমাদের ট্যুর ম্যানেজার বলে দিয়েছিল, শীত ভালোই। তাই শীত বস্ত্র ভালো মত নেবেন। হাতের গ্লাভস, মোজা আর সবাই ছাতা একটা করে! পাহাড়ি এলাকায় যখন তখন বৃষ্টি পড়তে পারে!
এখানেই আলাপ হল, মানবের অমায়িক বন্ধু কমল ভট্টাচার্য ও তার স্ত্রী পিয়ার সঙ্গে।
কমল বলল “দাদা ডায়ামোক্স ২৫০, আপনার কথা মত খাচ্ছি।” সবাইকেই বলে দিয়েছিলাম যাবার আগে ওই ট্যাবলেট একটা করে খেতে, তাতে শ্বাসকষ্ট কম থাকে পাহাড়ে।
নির্দিষ্ট সময়ে সবাই গৌহাটি নামলাম। গৌহাটি বা তেজপুর হলো অরুণাচল ভ্রমণের প্রবেশদ্বার।
ব্রহ্মপুত্র তীরে গুয়াহাটি বা গৌহাটি অনেক প্রাচীন জনপদ। অতীতে এর নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষপুর আর রাজ্যের নাম ছিল কামরূপ।
আমরা এয়ারপোর্ট থেকে এসে পৌঁছলাম নন্দন হোটেল।
এখানে আজকের দিনটা থাকবো। মিলিত হলাম আরো
সহযাত্রী যাঁরা ট্রেন এ এসেছেন।
খানিক পরে রওনা দিলাম বিখ্যাত সতীপীঠ কামাখ্যা মন্দির দর্শনের জন্য। নীলাচল পাহাড়ের কোলে সতীপীঠ! প্রসঙ্গত বলি, এই মন্দিরে ঢোকার একটি সাধারণ লাইন, আর একটা পাঁচশো টাকার অনলাইন বুকিং দিয়ে টিকিট কেটে লাইন। এই অনলাইন টিকিট আগে কেটে রাখতে হবে, এবং টাইম স্লট বেছে নিতে হবে, ওই সময়ই যেতে হবে। আমরা দুটো থেকে চারটে স্লট নিয়েছি! এই সব অনলাইন ব্যাপার মানব আগে করে রেখেছে!
এই নিয়ে আমার তৃতীয় বার দর্শন সৌভাগ্য হল।
প্রথমবারের স্মৃতি ভোলা যায় না, এসেছিলাম ঠাকুমা কে নিয়ে, আমি ক্লাস ফাইভ এ পড়ি! এক কাকু এবং তাঁর মা এর সঙ্গে বাবা পাঠিয়েছিলেন! এসে এই মন্দিরের কাছে এক পান্ডার বাড়ি ছিলাম! সেই স্মৃতি আজও মনে আছে। না আছে ভিড়, না জাঁকজমক, ঢুকেই সোজা ভেতরে যেতে পেরেছিলাম। এর পর দশ বছর আগে কিছু লাইন ও লোহার খাঁচা পেয়েছি। তবে দুশো টাকার টিকিটে পান্ডাজি চট করে ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন!
আর এবার গাড়ী স্ট্যান্ড থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে, একজায়গায় নিজের ছবি সহ স্ক্যানার দেওয়া টিকিট নিয়ে এক দোতালায় অপেক্ষা প্রায় এক ঘন্টা!
আর চতুর্দিকে খাঁচার লাইন ওর ভেতরে সাধারণ দর্শনার্থী। পরে জেনেছি ওই লাইন এ থাকলে ছ, সাত ঘণ্টা লাগবে! কাবরা জি বললে “এই টিকিট টা কিন্তু আধার এর মত, সব ডকুমেন্ট, ছবি দিয়ে আছে। ভালো করে রেখে দেবেন!” সবাই মাথায় মা কামাখ্যা লেখা ফিতে আটকালাম। পরে আবার খাঁচায় ঢুকে প্রতীক্ষা!
সেই মেট্রো সিনেমায় ৪৫পয়সার টিকিটের খাঁচার মত মনে হোল। এখানেও প্রায় ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে,(মাঝে মাঝেই, সিট এ বসছি) মালা বলল “তারাপীঠ মন্দিরেও এক ব্যাবস্থা!
অবশেষে মায়ের মন্দিরে ঢুকে আশ্চর্য হলাম, কত আলো ভেতরে! আগে প্রায় অন্ধকার থাকতো! সামনেই বিরাট সুসজ্জিত সিংহাসন এ বিগ্রহ! প্রচুর ফুল মালায়
সজ্জিতা! পরিক্রমা সেরে, একটু নিচে প্রায়ন্ধাকার সিঁড়ি
দিয়ে নেমে মূল সতীপীঠ! সেখানে নীচু হয়ে হাত দিতে হয়। সর্বদা ঠান্ডা জলের স্রোত! মাথায় ঠেকিয়ে শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা জানালাম!
এর পর বেরিয়ে মূল মন্দির বাইরে থেকে দেখা ও ফটো তোলা হোল! বিরাট বিরাট পাঁঠা আগেও ছিল এখনও আছে, মনে হোলো পাঁঠারা অনেক বেড়ে গেছে!
মন্দিরের চারদিকে অনেক উন্নতি হয়েছে দেখলাম। ভিতরে একটা পবিত্র কুণ্ড আছে, আগে অপরিষ্কার থাকতো! এখন দেখলাম অনেক পরিষ্কার করা হয়েছে। ফোয়ারা তৈরি করে শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে! রাত্রে চারিদিকে আলোয় আলোকিত! মন্দিরের বাইরে প্রচুর দোকান, নানান পূজার উপকরণ, মিষ্টি, ফুল, মালা, তার সঙ্গে ছোট ছোট ফটো, দেবদেবীর মূর্তি, বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে যে রকম দেখা যায়, সব রয়েছে। টোকেন গিফটের দোকান ও অনেক!
বাইরে জুতো খুলে যেতে হয়েছিল। আবার সেগুলো পরে নিচে নেমে দেখি, কাবরা ডাকছে “এধার আইয়ে,
গরম গুটকে কচুরি খাইয়ে!”
তার পর চা খেয়ে গল্প করতে করতে হোটেল ফিরে এলাম।
আমাদের ট্যুর ম্যানেজার বলে দিয়েছিলেন, আমরা এই যে ৩৬জন যাচ্ছি, ছোট ছোট গাড়িতে ৬জন
৬জন করে বসবেন। পাহাড়ী অঞ্চলে বড় গাড়িতে একসঙ্গে যাওয়া যাবে না। আর সবাই প্রতি দিন একই গাড়িতে বসবেন। নিজেদের মধ্যে গাড়ি পরিবর্তন করতে পারেন, আর গাড়ির সামনে পিছনে বদলা বদলি করে
যাবেন। গাড়ির মাথায় মালপত্র ক্যারিয়ার এ বেঁধে নেবে।
তোলা নামানো সব আমাদের ড্রাইভার ও ছেলেরাই করবে। শুধু যে টাইম আগের দিন রাত্রে বলে দেওয়া হবে, সেই মত হোটেলের ঘরের বাইরে মাল পত্র বের করে দেবেন।
জানি গ্রুপ এ বেড়াতে গেলে, সবাই সময় আর নিয়ম মেনে চলেন! আমাদের দলেও দেখলাম প্রত্যেকে সময় মেনে চলেছেন!
কথা মত দেখলাম, টয়োটা ইনোভা গাড়ি এলো। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ দশ জন দুটো গাড়িতে ভাগা ভাগি করে বসতে থাকলাম! বয়োজ্যেষ্ঠ বলে আমাকে সব সময় ড্রাইভার পাশে বসতে বললো মানব! কি বাঁশ দিল পরে বলছি!
সকালে জলখাবার খেয়ে হই হই করে গাড়িতে উঠে বসলাম। আমাদের এই দশ জনের দলে সবাই আমুদে ও হুল্লোড়ে, তার মধ্যে এক কাঠি ওপরে দীনেশ কাবরা
ও তেমনি তার বউ ঊষা। কাল কেই সবাইকে মানে দশ জনকে ছেলেদের কালো আর মেয়েদের লাল টি শার্ট
উপহার দিয়েছে, এবং আজ সবাই একই রকম পোশাক পরে বেরতে হবে! এই মজা টা আমরা দারুন উপভোগ করলাম! এবং অন্যদের ও বাহবা পেলাম!(বলাবলি শুনছিলাম, কোম্পানি আমাদের দিল না তো!)
কোম্পানি আমাদের টুপি দিয়েছে (আক্ষরিক নয়)
সুন্দর সাইড ব্যাগ দিয়েছে!
যাত্রা শুরু হল, যাব ভালুকপং এর দিকে। পাহাড়ি রাস্তায় যত এঁকে বেঁকে উঠতে লাগলাম তত প্রকৃতির শোভা মনোরম হতে থাকল, আর ঠান্ডাও বাড়তে থাকল!

প্রথম এসে পৌঁছালাম বালাজি মন্দির। অপূর্ব সাজানো চত্বর! চারিদিকে গাছপালা আর তাদের পরিচর্যা বোঝা যায়। ভেতরে অনেক গুলো মন্দির, সবই দাক্ষিণাত্যের
গঠন শৈলী। মূল বালাজি মন্দির অপূর্ব! দুঃখের কথা ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ, তাই মূল মন্দিরের বাইরে
গ্রুপ ছবি তোলা হলো। ভেতরে খানিক দূরে দূরে অন্নপূর্ণা মন্দির, গরুড় মন্দির, রয়েছে! চারিদিক কত বাহারি ফুলের শোভা! মুগ্ধ হয়ে দেখছি। তারমধ্যে ঊষা
পুজো দিয়ে হালুয়া প্রসাদ এনে সবার হাতে দিল।
আবার গাড়িতে বসে রওনা দিলাম। এলাম বশিষ্ঠ আশ্রম। এখানেই নাকি বশিষ্ঠ মুনি শাপগ্রস্ত হয়ে দেহ হীন হয়ে যান, ও কঠোর তপস্যা করে শাপ মুক্ত হন!
মূল মন্দির একটু ওপরে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। অবশ্যই জুতো খুলে। সেখানে পাথর অবস্থায় একটা স্তুপ নাকি মুনি! প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
এর চারপাশের প্রকৃতির শোভা অপূর্ব! একটু পাশে
পাহাড় থেকে নেমে আসছে তিনটে জলধারা! ললিতা,
কান্তা আর সন্ধ্যা! স্থানীয়দের কাছে তিন জলধারা যেখানে মিশেছে, খুব পবিত্র।
আমরা যেমন বিয়ের দিন ভোরবেলা গঙ্গায় জল সইতে যাই, সেইরকম স্থানীয় একদল সুসজ্জিত পুরুষ, নারী
কাঁড়া, নাকাড়া বাজিয়ে ওই খানে জল সইতে এলো!
হয়তো কারুর বিয়েই হবে। ঘটিতে ঘটিতে জল নিয়ে মাথায় ছিটানো হোলো। কাছে থাকায়, আমার টাকেও
জল পড়ল! এদিকে আমাদের ওই এক ড্রেস হেব্বি হিট!
ওদের অনেক ক্যামেরা ম্যান আমাদেরও ছবি তুললো। আর প্রাঙ্গণ চত্বরে ওই মহিলারা অনুরোধ করলো ওদের সঙ্গে নাচতে, আমাদের মেয়েদের!
বেশ ভালই নাচ হলো! রেকর্ডিং ও হোলো!
খানিক পরে আমরা এসে একটা পরিষ্কার ধাবায় এসে হাত মুখ ধুয়ে দুপুরের ভোজন করতে বসলাম।
বলা হয় নি, কোম্পানির একটা আলাদা গাড়ি সঙ্গে যাচ্ছে, তাতে রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম, রাঁধুনি, হেল্পার,
চাল ডাল সবজি ইত্যাদি ও রয়েছে। ওরা আগে এসে নির্দিষ্ট জায়গায় রেঁধে ফেলছে! একদম গরম গরম বাঙালি খাওয়া, এবং এতই সুস্বাদু রাঁধত যে মনে করে জিভে জল আসছে! আর গোটা বেড়ানো তে নিত্য নতুন জলখাবার, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার! ঘুরিয়ে
ফিরিয়ে! আবার সন্ধ্যে বেলা হলেই চা (চিনি ছাড়া, লাল চা, দুধ চা! চিনি দেওয়া লাল চা, দুধ চা!) যার যে রকম দরকার ঘরে ঘরে! একটু লোভ সামলাতে পারছিনা, লিখছি সন্ধ্যাবেলার টিফিন, এক এক দিন ভেজিটেবল
চপ, মাছের চপ, সিঙ্গাড়া, চাওমিন, পাস্তা, পাকোড়া, পিঁয়াজি ইত্যাদি ইত্যাদি!
খানিক পরে আবার যাত্রা শুরু। এসে পৌঁছালাম প্রায় সন্ধ্যার মুখে অপূর্ব এক নদীর তীরে! নাম জিয়াভরলি!
পশ্চিমের সূর্যের শেষ রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে! তীব্র খরস্রোতা নদী বয়ে চলেছে! দূরে উঁচুনিচু পাহাড়ের সারি। বুঝিবা কুয়াশার জমায়াতের সময় হয়েছে! অজস্র নুড়ি পাথর নদীর বুকে! চেষ্টা করছে চঞ্চলা নদী কে আটকাবার! পুরুষ রূপ পাথর
তাকিয়ে আছে চঞ্চলার চলে যাওয়ার দিকে!
কনে দেখা আলোয় সব মেয়েরাও সুন্দরী হয়ে উঠেছে!
কনকনে ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করে, নদী তীরে নেমে অনেক ছবি তুলে, আবার গাড়িতে।
খানিক পরে ভালুকপং এর হোটেল এ এলাম।

