ধারবাহিক অনুবাদ গল্প সংকলন (৭ম পর্ব)

অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান
অনুবাদঃ

ইফতারি
‘যারা এখনও রোজা করে চলেছ তারা অন্যদের রোজা ভাঙতে সাহায্য করতে পার। আল্লা তোমাদের আশীর্বাদ করবেন!’, দেউড়ি থেকেও এই আওয়াজ শোনা গেল। সব থেকে ভাল সময়েও ডেপুটি সাহেবের বেগম সাহেবার মেজাজ খারাপ থাকে। ‘আল্লা জানেন সারাদিন এরা কোথায় থাকে। ঠিক এইসময় এরা যেন আকাশ থেকে নেমে পড়ে আর কাউকে শান্তিতে রোজা ভাঙতে দেয় না।’
‘ঈশ্বর তোমাদের আশীর্বাদ করুন!’ কম্পনের মত এই আওয়াজ বাড়ির অন্দরমহল ভেদ করে বেরিয়ে এল।
‘নাসিবান, আরে ও নাসিবান, গিয়ে দেখ…দুই দিন ধরে কয়েকটা জিলিপি পড়ে আছে। যা সেগুলো নিয়ে গিয়ে ভিখারিদের দিয়ে দে।’
নাসিবান জিজ্ঞেস করল, ‘আর কিছু?’
‘আর কি? তুই কি জিলিপির সঙ্গে পুরো বাড়িটাই দিয়ে দিতে চাস?’
দোপাট্টা ঠিক করতে করতে নাসিবান অন্দরমহলে প্রবেশ করল। বারান্দায় রাখা এক তখতের ওপর বেগম সাহেবা বসে আছেন। তাঁর সামনে পাতা আছে একখানি দস্তরখান। তার ওপর রাখা আছে ইফতারির জন্য প্রস্তুত বিভিন্ন রকমের পদ। কয়েকটি পদ এখনও ভাজা হচ্ছে। প্রত্যেক মিনিট পর পর তিনি ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। অপেক্ষা করছেন কখন উপবাস ভাঙ্গবেন এবং পান আর তামাক খাবেন।
সবচেয়ে ভাল সময়েও বেগম সাহেবার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়; রোজা চলাকালীন ভৃত্যদের মধ্যে এটা একটা প্রবাদে পরিণত হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বেশি ঝক্কি সামলাতে হয় নাসিবানকে। সে এই পরিবারে বেড়ে উঠেছে আর বেগম সাহেবা ছাড়া এই জগতে তার আর কেউ নেই। আর বেগম সাহেবা তাঁর মায়ের কর্তব্য পালন করেন নাসিবানকে প্রায়শ এবং পর্যাপ্তভাবে প্রহার করে। যদিও গরম কাল আর নেই তবুও বেগম সাহেবার পাশে একটি হাত-পাখা রাখা আছে। আর প্রয়োজন মত বেচারা নাসিবানকে প্রহার করতে সেই পাখার সদ্ব্যবহার হয়।
‘আর তুই কি ওখানে গিয়ে মরে গেলি? কেন তুই আসছিস না?’
নাসিবান তাড়াতাড়ি মুখ মুছে নিল আর জিলিপি নিয়ে দেউড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
‘দেখি কয়টা আছে?’
নাসিবান হাত বাড়িয়ে দিল। মাত্র দুটি জিলিপি আছে।
‘দুটো? কিন্তু আরও বেশি ছিল! এখানে আয়,…বাকি জিলিপিগুলো সাবাড় করে দিয়েছিস?’ বেগম সাহেবা খেঁকিয়ে উঠলেন।
নাসিবান প্রতিবাদ করে বলল, ‘না, না।’ কিন্তু বেগম সাহেবা’র এক্স-রে চোখে নাসিবানের দাঁতে একটি জিলিপির খন্ড নজরে পড়ল। খেপে গিয়ে তিনি পাখাটা তুলে নিলেন এবং নাসিবানকে মারতে শুরু করলেন। ‘হারামজাদি, এই তোর রোজা! বদমাশ মেয়েছেলে…তুই আর আধ ঘন্টা অপেক্ষা করতে পারলি না? দাঁড়া… চুরি করার মজাটা তোকে দেখাচ্ছি।’
‘আর করবো না, বেগম সাহেবা, আর হবে না…আল্লা…আমাকে ক্ষমা করুন, বেগম সাহেবা, আর না…আর না…’ নাসিবান অনুনয় বিনয় করতে থাকল।
‘আর না…আর না…। দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি…দিনের আলোর বাকি সময়টা তোকে মেরে যাব…আমি তোকে রোজা ভাঙা শেখাব…’
‘আপনার সন্তানরা উন্নতি করুক! একজন উপবাসি মানুষকে রোজা ভাঙতে সাহায্য করুন।’
ক্লান্ত হয়ে এবং দম হারিয়ে, যেভাবে বেগম সাহেবা হাঁপাতে থাকেন, তিনি নাসিবানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন। আর বললেন, ‘দূর হ, হতচ্ছাড়ি! যা এই জিলিপিগুলি ভিখারিটাকে দে! ও অনেকক্ষণ ধরে চেঁচাচ্ছে। ওকে এই ডালটাও দে…’
বেগম সাহেবা নাসিবানের হাতের মুঠিতে কিছুটা ডাল দিলেন। ঘ্যানঘ্যান করে আর কাঁদতে কাঁদতে, নাসিবান দেউড়িতে পৌঁছল আর দুটো জিলিপি ও একমুঠো ডাল ভিখারিটাকে দিল।
‘নয়া রাস্তা’ একসময় নিশ্চয় নতুন ছিল। কিন্তু এখন সেটা পুরনো হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত অবস্থা তার এখন আর দুই দিকে সারি সারি বাড়ি উঠে গেছে। ভাল অবস্থায় থাকা দুয়েকটি বাড়ি ছাড়া, বেশির ভাগ বাড়িই পুরাতন, জরাজীর্ণ এবং এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কঠিন সময়ের বিশেষ সাক্ষ্য বহন করছে। রাস্তাটি চওড়া ছিল। এর ফুটপাত দখল করে নিয়েছে বিচিত্র একদল রঞ্জক, ধোপা, তাঁতি এবং কামার। এদের কাছে ফুটপাত যেন নিজের বাড়ির বর্ধিত উঠোন। বাস্তবে, গরমের মাসগুলিতে রাস্তার উপর অনেক বিছানা পাতা হয় যাতে একটা এক্কাগাড়ির পক্ষে সেখান দিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
বাড়িগুলি ছাড়া, এই মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে তিনটি মসজিদ আছে। এই মসজিদগুলির মোল্লাদের মধ্যে যেন একটা প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এরা প্রতিযোগিতা করতে থাকে কে বেশি সংখ্যক দরিদ্র অশিক্ষিত বাসিন্দাদের বোকা বানাতে পারবে এবং কত বেশি করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ লুটে নিতে পারবে। ছোট শিশুদের পবিত্র কোরান শেখানো থেকে কবচ তাবিজ এবং মন্ত্রদানের মত সব ফিকিরেই মোল্লারা অতি দক্ষ এবং এসবের মাধ্যমে তারা দরিদ্র কামার এবং তাঁতিদের প্রতারণা করে। এই তিন অপদার্থ এবং অলস মোল্লাদের পরিবার এইসব খেটে খাওয়া মানুষদের মাঝে ঘন জঙ্গলের মধ্যে উইপোকার মত বাস করে এবং দীর্ঘ চওড়া গাছগুলিকে একটু একটু করে খেয়ে ফেলে। মোল্লারা ধোপদুরস্ত পেশাজীবী আর যাদের অর্থে এরা বেচে থাকে তারা নোংরা এবং অপরিচ্ছন্ন। মোল্লারা সবাই সৈয়দ এবং তাদের অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে ফেলা হয়। অন্যদিকে খেটে খাওয়া মানুষদের নিচ এবং ইতর মনে করা হয়।
এলাকার মধ্যে, এক পুরনো ভাঙাচোড়া বাড়ির একতলায় ছিল এক বর্জ্য জিনিসপত্র বিক্রেতার দোকান। তার ওপরের তলায় প্রায় পনেরো থেকে বিশজন খান খাকত। ওপর তলার মুখ ছিল রাস্তার দিকে। খানেরা ছিল উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মানুষ এবং এদের সবার তেজারতি ব্যবসা। এরা সবাই ব্যতিক্রমিভাবে নোংরাও ছিল। আশপাশের সবাই ওদের থেকে সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকতো। কারণ তাদের প্রায় সবাই এদের কাছে ঋণী ছিল। আর একটি কারণ হল, এরা মেয়েদের দিকে খারাপ ভাবে তাকাত। কোন মহিলা একাকী সে বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে সাহস করত না।
সারাদিন খানদের ঘর তালাবন্ধ থাকত। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ওরা একটি পাত্রে কিছু মাংস সেদ্ধ করত এবং বাজার থেকে কিনে আনা নানের সঙ্গে সেই মাংস সরাসরি পাত্র থেকে তুলে খেত। রান্নার পাত্রে হাত চুবিয়ে মাংসের টুকরো তারা তুলে নিত এবং খাওয়ার পর মাংসের হাড় সরাসরি নিচের রাস্তায় ফেলে দিত। খানদের খাবারের সময় অনেক কুকুর নিচে জড় হত। তাদের গড়গড় এবং ঘেউ ঘেউ শব্দ দীর্ঘক্ষণ শোনা যেত।
খাবারের শেষে খানরা তাদের জাবেদা খাতা নিয়ে বসত এবং জমা-খরচের হিসেব শেষ করে রাখত। কয়েকজন কম্বল পাতত, হুক্কা জ্বালাত এবং রাতের মত শুয়ে পড়ত। অল্প কয়েকজন আবার একসঙ্গে মিলে আনন্দের উপভোগের জন্য শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াত।
তেজারতি ব্যবসা থেকে জীবিকা অর্জন করা এই খানরা নিজেদের ধর্মপ্রাণ মনে করত এবং রোজা পালন ও নমাজ পড়ায় খুব মনোযোগি ছিল। যদিও তাদের ধর্মে অর্থ ঋণ দিয়ে সুদ নেওয়া বিধিসম্মত নয়, তারা তাদের অর্জিত অর্থকে লাভ বলে অভিহিত করত এবং সর্বশক্তিমানের দরবারে ভক্তিনিবেদন রূপে তা দান করত। রমজানের মাস বলে সব খানরা উপবাস করত এবং ইফতারির জন্য তাড়াহুড়ো করে ঘরে ফিরত। সময় কাটানোর জন্য তারা বাড়ির ছাদে দাঁড়াত এবং নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত। ঘটনাচক্রে যদি কোন মহিলা সেখান দিয়ে যেত তারা উচ্চস্বরে মন্তব্য ছুঁড়ে দিত। রাস্তার উলটো দিকে অবস্থিত বাড়ির দরজা-জানালা সর্বদা বন্ধ থাকত। কখনও কখনও আলোর রেখা দেখা গেলে বোঝা যেন নতুন কোন ভাড়াটে এসেছে। কিন্তু কয়েকদিন বাদেই গাড়ি আর টাঙ্গা এসে দাঁড়াত এবং বাড়ি আবার খালি হয়ে যেত।
একদিন আসগর সাহেব ভাড়ায় ঘর খুঁজতে সেই এলাকায় পৌঁছন। তিনি এই বাড়িটিও দেখেন। সেই সময়ে খানরা বাড়ির বাইরে ছিল। বাড়িটি আসগর সাহেবের ভাল লেগেছিল। পরিষ্কার এবং রঙ করার পর তিনি মা, স্ত্রী এবং সন্তান নিয়ে সেই বাড়িতে এলেন। তাঁর স্ত্রী, নাসিমার, বাড়িটা দারুণ ভাল লেগেছিল। তিনি বলেছিলেন, আশপাশের অঞ্চল নোংরা এবং জরাজীর্ণ হলে কি আসে যায়, মাত্র কুড়ি টাকায় এত বড় বাড়ি কোথায় পাওয়া যাবে। তিনি অবিলম্বে বাড়ির সাজসজ্জার আয়োজন করলেন। সন্ধ্যায়, তিনি জানালায় কাছে দাঁড়িয়ে রাস্তায় ছেলেমেয়েদের খেলতে দেখছিলেন। তখন পাশে দাঁড়ান তাঁর শাশড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছিয়ে এলেন।
‘বহু, মোটা নচ্ছারগুলোর দিকে তাকাও। দেখ কীভাবে ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের চোখ খুবলে নেওয়া উচিত…দেখ কেমন করে ওরা তাকিয়ে আছে আর হাসছে!’
নাসিমা ফিরে তাকালেন। তিনি দেখলেন বেশ কয়েকজন খান তাদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছে। যে মুহূর্তে নাসিমা ওদের দিকে তাকালেন তিনি তাদের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ আলোড়ন লক্ষ করলেন। তারা সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মধ্যে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুরু করল। সৌভাগ্যবশত, দুটি বাড়ি পরস্পরের মধ্যে এমন কোণে অবস্থিত যে সবকিছুই ভাল ভাবে দেখা যায়।
‘বহু, জানালা বন্ধ করে দিয়ে সরে এস। কেমন এক পর্দাহীন বাড়ি আসগর আমাদের জন্য পছন্দ করল? আমি এখানে দুদিনও থাকতে পারব না।’
নাসিমা কোন উত্তর দিলেন না। পরিবর্তে তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে খানদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইলেন। বকবক করতে করতে শাশুড়ি চলে গেলেন। ‘মেয়েদের লজ্জা না থাকলে ছেলেদের কি আর বলবে?’
আসগর এবং নাসিমার জীবন তাদের পরস্পরের বাধাবিপত্তির বিষয়ে অবহিত ছিল। শৈশবেই তাঁদের সম্বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু যত তাঁরা বড় হলেন এবং পর্দার কঠোরতা বাড়তে থাকল, তাঁরা শিখে নিয়েছিলেন কী করে তা এড়ানো যায়। এমন অবস্থায় অন্য মুসলিম পরিবারের তরুণ ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে দেখা করতেন। বিষয়টা এতদূর গড়িয়েছিল যে তাঁরা পত্রবিনিময়ও করতেন।
আসগর যখন কলেজে পড়তেন তখন তিনি অন্য তরুণদের মত দেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তির যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ইংরেজদের নিষ্ঠুরতার এবং জমিদারদের অবিচারের উপর বলিষ্ঠ ভাষণ এবং উত্তেজক নিবন্ধের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে থাকত কৃষকদের কঠিন সময়, পুঁজিপতি এবং ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের শোষণের কথাও। ভাল বক্তৃতা দেবার কারণে তিনি ছাত্রদের কাছে খুব বিখ্যাত ছিলেন। আসগরের উপর দেশের অনেক আশা, নাসিমার তার থেকেও বেশি! আসগর নাসিমাকে কলেজ জীবনের সব কথা লিখতেন এবং যখন নাসিমা তাঁর কথা সংবাদপত্রে পড়তেন গর্বে তাঁর মাথা উঁচু হয়ে যেত। তাঁর বন্ধুবর্গের মধ্যে কেউ বা কোন বন্ধু বা তাঁদের বাগদত্তদের কেউ স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আসগরের সঙ্গে এক নতুন জীবনের জন্য নাসিমা নিজেকে তৈরি করছিলেন।
এক বুদ্ধিমান ব্যক্তির শুধুমাত্র একটি সংকেত প্রয়োজন। নাসিমা খুব স্মার্ট মেয়ে। তিনি তাঁদের সমাজের মন্দদিকগুলো ভালভাবে বুঝতে পারতেন। সেই সঙ্গে তিনি মনে মনে ভাবতেন তাঁর সমাজের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার কথা। নিজের দেশের স্বাধীনতা এবং মঙ্গলের জন্য তিনি সমস্ত রকম ত্যাগ স্বীকারের জন্য নিজেকে তৈরি করতে শুরু করলেন। দেশের স্বাধীনতার ধারণাকে তিনি এত ভালবাসতেন যে তিনি তাঁর দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন।
আসগর বিএ পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। যখন তাঁরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন তখন তিনি দেখলেন যে আসগরের মুক্তমন এক ক্ষুদ্র গোষ্ঠির মধ্যে আবদ্ধ। সত্যিই তিনি তাঁর স্ত্রীকে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিলেন। বাস্তবে, এই বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার পরেই তিনি বুঝে যান তাঁর চারিপার্শ্বের জগতকে পরিবর্তন করতে হলে তাঁকেই এগিয়ে আসতে হবে।
এই পরিবর্তন সাধনের জন্য নাসিমার উৎসাহ এবং আবেগ দিনের পর দিন বাড়ছিল, কিন্তু আসগরের কমে আসছিল। তিনি বলতেন এক কিন্তু করতেন অন্য কিছু। বন্ধুদের কাছে তিনি যত সহজে অজুহাত দেখাতেন সেই ভাবে তিনি নাসিমাকে মিথ্যে কথা বলতেন না। প্রথমে তিনি বলতেন যে তাঁদের একটি সন্তান আসছে এবং সন্তান জন্মানোর পরে তিনি অজুহাত দেখাতে শুরু করলেন যে সন্তান খুব ছোট। তারপর তিনি বললেন যে আইনের পড়াশুনা শেষ করেই তিনি বৃহৎ আন্দোলনে নামবেন। আইনের ডিগ্রি পেয়ে তিনি একটি চাকরি নিলেন এবং তাও সরকারী, যা তাকে বন্ধুদের থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিল।
তাঁর হৃদয়ে কী আছে কতদিন তিনি তা নাসিমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবেন? স্ত্রী এবং সন্তানের অজুহাত দেখিয়ে তিনি বাইরের জগতের থেকে পালিয়ে থাকতে পারবেন? কিন্তু বাড়িতে তিনি কী বলবেন? নাসিমাও বুঝে গিয়েছিলেন যে তাঁর স্বামীকে দিয়ে আর কিছু হবার নয়, তিনি একজন কাগুজে বাঘ। ঘটনাচক্রে কোন পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে তিনি ভাষণ এবং কথার ফুলঝুরি ঝরাতে শুরু করবেন এবং তাঁর অরাজনৈতিক জীবনকে এমন এক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উল্লেখ করবেন যা তাঁর উপর প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। তিনি তাঁদের এই কথা বিশ্বাস করাতেন যে নাসিমার জন্যই তিনি বিপথে চলে গেছেন। তাঁদের দুজনের মধ্যেকার বন্ধন এই সুযোগসন্ধানীতা উপর দাঁড়িয়ে ছিল। নাসিমা আরো বেশি করে ক্ষুব্ধ এবং নীরব হয়ে যাচ্ছিলেন।

আসগরের এখনকার বন্ধুরা বেশির ভাগ আইনের পেশায় নিযুক্ত। কয়েকজন আছেন গড্ডালিকাপ্রবাহে গা-ভাসানো সরকারী কর্মচারি যাদের মধ্যে কয়েকজন কেন্দ্রীয় তদন্ত বিভাগে কাজ করেন। নাসিমা্র সঙ্গে একাকী থাকার সময় আসগর অস্বস্তি অনুভব করতেন। কারণে, মনের গভীরে তিনি চৌর্যবৃত্তির জন্য দোষী এবং নাসিমা জানতেন সেই চোর কে। ধীরে ধীরে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে নাসিমার কন্ঠনিসৃত সব কথাকেই তিনি বিদ্রূপ বলে কল্পনা করতেন। তাঁর শীতল মুখ তাঁকে বিরক্ত করত এবং তাঁর ইচ্ছে করত নাসিমার সুন্দর মুখে জোরে চড় মারেন। নাসিমা যদি লড়াই করতেন, অপমান করতেন বা তাঁর হৃদয়কে কাঁটা দিয়ে বিদ্ধ করতেন তাহলে তিনি তাঁর নীরব অভিব্যক্তির থেকে কম আঘাতপ্রাপ্ত হতেন।
ইফতারির সময় এগিয়ে আসছে। খানেরা জানালার কাছে গাদাগাদি করে আছে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, অন্যরা চা বানাচ্ছে। নাসিমাও ছেলে আসলামকে কোলে নিয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন। ইতিমধ্যে এবাড়িতে পা রাখার পরে দুমাস হয়ে গেছে। খানরা নাসিমার মুখ এবং তাঁর নির্লজ্জভাবে মুখ দেখানো দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন নাসিমা জানালায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা আর কোন নজর করে না। এই সময়, তাদের চোখ আর কান কাছের মসজিদের দিকে নিবদ্ধ হয়ে আছে।
ইফতারের আগে যখন সামান্য সময় বাকি, এক ভিখারি একটি গলি থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। সে যেভাবে ধীরে ধীরে পা ফেলে হাঁটছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল সে অন্ধ। তার শরীর কাঁপছিল। অবলম্বনরূপ লাঠিটাও সে ঠিক করে ধরতে পারছিল না। তার হাতের মুঠিতে কিছু ছিল। কিন্তু কাঁপুনির জন্য তা দেখা যাচ্ছিল না। ধীরে এগিয়ে সে অবশেষে নাসিমাদের বাড়িতে এল এবং বাড়ি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
‘ঠাকুমা, দেখো ভিখারিটার হাতে কি আছে।’
নাসিমা দেখে বলল, ‘মনে হচ্ছে কোন খাবার জিনিস।’
‘তাহলে সে খাচ্ছে না কেন?’
‘হয়তো সেও রোজা করছে। হতে পারে সে আজানের অপেক্ষা করছে।’
‘ঠাকুমা, তুমি রোজা কর না?’
নাসিমা ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং বললেন, ‘না।’
‘বাবা কেন দারোগাজীকে বলে যে সে রোজা করছে। বাবা কি মিথ্যা বলে?’
নাসিমা এক মিনিট চিন্তা করে বলল, ‘তুমি তাকে নিজেই জিজ্ঞেস কর না?’
‘তাহলে, ঠাকুমা, তুমি কেন রোজা কর না?’
নাসিমা তাঁর ছেলেকে খেপিয়ে বললেন, ‘কারণ তুমি কর না।’
‘আমি তো ছোট। আমার দিদিমা বলে যারা খুব বুড়ো এবং তবুও রোজা করেনা তারা নরকে ্যাবে। ঠাকুমা, নরক কী?’
‘নরক? কেন, এইতো এখানে…ঠিক তোমার সামনে!’
চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে আসলাম জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায়?’
‘ওইখানে…যেখান অন্ধ ভিখারি দাঁড়িয়ে আছে। ওইখানে…যেখানে তাঁতিরা বাস করে। ওইখানে…যেখানে কামাররা আর রঞ্জকরা বাস করে।’
‘কিন্তু আমার দিদিমা বলে নরকে আগুন আছে।’
‘হ্যাঁ, সেখানে আগুন আছে। কিন্তু উনুন জ্বালানোর আগুনের মত নয়। বাছা, নরকের আগুন হল ক্ষুধার আগুন। নরকে প্রায়ই তুমি কিছু খেতে পাবে না। আর যখন পাবে তা খুবই অল্প এবং খুব খারাপ মানের। সবাইকে নরকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। আর নরকের মানুষের গায়ের পোশাক খুব পুরনো আর ছিন্ন। তাদের ঘর ছোট ঘুপচি এবং অন্ধকারে পূর্ণ। সেখানে উকুন আর ছারপোকা ঘুরে বেড়ায়। শুধু তাই নয়, বাছা আসলাম মিয়াঁ, নরকের শিশুদের কাছে খেলনা নেই।’
‘ঠাকুমা, কালুর কোন খেলনা নেই। তার মানে সেও নরকে বাস করে, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর স্বর্গ?’
‘স্বর্গ হল এইখানে যেখানে তুমি আর আমি কাকা আর কাকিমাদের সঙ্গে বাস করি। স্বর্গ আমাদের এই বিশাল পরিষ্কার বাড়িতে যেখানে তুমি অঢেল সুস্বাদু খাবার যেমন মাখন, টোস্ট, ফল, ডিম, মাংস, দুধ খেতে পার। শিশুদের পরার জন্য সুন্দর পোশাক আর খেলার জন্য মোটর গাড়ি আছে।’
‘তাহলে, ঠাকুমা সবাই কেন স্বর্গে বাস করে না?’
‘কারণ, যারা স্বর্গে বাস করে তারা অন্যদের সেখানে যেতে দেয় না। তারা এই অন্য মানুষদের দিয়ে সব রকমের কাজ করায়, কিন্তু অবশেষে নরকের দিকে ঠেলে দেয়।’
‘আর তারা অন্ধও?’
‘হ্যাঁ, বাছা, নরকে অজস্র অন্ধ মানুষ আছে।’
‘তাহলে তারা কী করে খায়?’
আজানের শব্দ শোনা গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি বন্দুকের আওয়াজ হলঃ এইবার ইফতারের সময় হয়েছে। খানরা তাদের চায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর সেই বৃদ্ধ ভিখারি তাড়াতাড়ি মুখের কাছে হাতে ধরা জিলিপি নিয়ে এল। তার হাত তখন ভীষণভাবে কাঁপছে এবং তার মাথা উপরে আর নিচে ওঠা নামা করছে। অনেক কষ্টে সে হাত মুখের কাছে নিতে পারল। কিন্তু জিলিপি পিছলে গেল এবং মাটিতে পড়ে গেল। ভিখারিও মাটিতে পড়ে গেল। সে চার হাতপায়ের উপর ভর করে জিলিপির সন্ধান করতে লাগল। ঠিক সেই সময় এক রাস্তার কুকুরের আবির্ভাব হল আর সে জিলিপিগুলি মুখে তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলল। ক্লান্ত এবং হতাশ বৃদ্ধ মানুষ মাটিতে বসে শিশুর মত চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
খানরা এই দৃশ্য দেখে হো হো করে হেসে উঠল। এই দৃশ্য দেখে তারা মজা অনুভব করল।
এই দৃশ্য দেখে ভীত ছোট্ট আসলাম মায়ের কাপড় ধরে বলল, ‘ঠাকুমা।’ তার শিশুমন প্রথম বারের মত নরকের আসল ছবি দেখল।
নাসিমা খানদের দিকে ক্রুদ্ধ ভাবে তাকালেন এবং বললেন, ‘এই হতভাগ্য পাপিষ্ঠদের দল!’ আবার আসলাম নিচু স্বরে বলল, ‘ঠাকুমা।’
নাসিমা অবনত হয়ে ছেলেকে তুলে নিল এবং তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলিষ্ঠ স্বরে বললেন, ‘সোনামণি, তুমি যখন বড় হবে তখন তোমার কর্তব্য হবে এই নরককে দূর করা।’
‘আর তুমি কী করবে?’
‘আমি? আমি আমার বন্দিশালা থেকে কোথায় যেতে পারি?’
‘কেন না? তুমি তো ঠাকুমার মত বুড়ো নও যে তুমি হাঁটতে পারবে না। তুমিও আমার সঙ্গে আসবে,’ মায়ের গম্ভীর স্বরের প্রতিধ্বনি করে শিশু আসলাম উত্তর দিল।
‘ঠিক আছে, সোনামণি। আমিও তোমার সঙ্গে আসব।’


খুব ভালো পত্রিকা