
পায়ে পায়ে বজবজ (পর্ব ১)
“বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে
বন্ধুর বাড়ীর ফুলের গন্ধ, আমার বাড়ী আসে..”
অনেকক্ষণ পর্যন্ত মনকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে কলকাতার বুকে বেড়ে ওঠা চীনা পাড়াগুলোর হাতেখড়ি যাঁর হাত ধরে, তার পায়ের চিহ্ন, আজও ফিকে হয়ে যায়নি। ফল্গুর চোখের গর্ভে যেন উচ্ছল ফাল্গুন।

১৯৬২ এর ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী সীমান্ত যুদ্ধ বা “ইন্দো-চীন” যুদ্ধের কথা মায়ের কাছে শুনেছিলাম। ভারতের ভুখন্ডে চীনা আগ্রাসনের কাহিনী শুনে বুকটা দুঃখে চিন চিন করেছিল। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর মধ্যস্থতায় ভারত ও চীনের শান্তিচুক্তি স্থাপিত হয় এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চীন বহুবার সম্মানিত করে। তাই চীন সম্পর্কে আমার এক মিশ্র মনোভাব তৈরী হয়েছিল।
কিছুদিন আগে সেই বহু আলেচিত চীনের সঙ্গেই কলকাতার এক গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিষয়ে জানতে পারলাম এক বানিজ্যিক পত্রিকায়। সেই অধ্যায় কলকাতার টেরিটি বাজার বা চায়না টাউন কিংবা ট্যাংরার জন্মেরও বহু আগের সবচেয়ে প্রাচীন এক মূল্যবান নথি। মনটা এবার আনন্দে চিন-চিন করে উঠলো। বেরিয়ে পড়লাম পরিবার সহ, চীন ও কলকাতার সেদিনের গাঁঠছড়া বাঁধার গল্প ছু্ঁয়ে দেখতে।

গুগল ম্যাপ চিনে চিনে পৌঁছে গেলাম বজবজ থেকে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে আছিপুরে, চীনে-আঁতুড়ঘরে। ১৭৭৮ সালে এক চৈনিক ব্যবসায়ী Tong Achew (টং আছু)-র জাহাজ সুদূর চীন থেকে এসে ভিড়েছিল বাংলার এই বজবজ বন্দরে। উদ্দেশ্য ছিল বাংলার বুকে চীনা ব্যবসা গড়ে তোলা। তিনিই হলেন বাংলায় আগত প্রথম চৈনিক। তার নাম অনুসরণ করেই বজবজের অনতিদূরে এই অঞ্চলের নাম হয় আছিপুর।
তৎকালীন বাংলার জমিদার অবশ্য তার জন্য প্রথমেই এই জায়গাটির জমির দ্বার সাদরে খুলে দেন নি। কিন্তু আছু সাহেব তার দেশ থেকে আনা একরকম পানীয় পান করিয়ে অনায়াসে মন জয় করেছিলেন জমিদার সহ জমিদার পারিষদদের। এই পানীয় শরীর চাঙ্গা করে এ খবর তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস অবধি পৌঁছোয়। আছু সাহেবের দেশীয় এই পানীয় ওয়ারেন হেস্টিংসের গলা সহ মন ভিজিয়ে দেয়। চীনা সাহেবটির বাংলায় ব্যবসা করার অনুমতি গ্রাহ্য হয়। তিনি বছরে ৪৫ টাকার বিনিময়ে সাড়ে ছশো একর জমি পান গভর্নর হেস্টিংসের থেকে এবং নদীর উর্বর তীরে আঁখের চাষ শুরু করেন। সেইসঙ্গে গড়ে তোলেন চিনি-কল। সেই যাদু পানীয়ই আজ বাঙালীর প্রিয় “চা”। তারপরই নাকি চা-এর উৎপাদন এবং প্রচলন হয় বাংলা তথা ভারতে।

ঘড়িতে সকাল ৯টা। গরম ধোঁয়া ওঠা চা খেতে খেতে স্থানীয় এক প্রৌঢ়ের কাছে শুনছিলাম এইসব গল্প থুড়ি সত্যি ঘটনাগুলো। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মা কালীর উদ্দেশ্যে সেই Tong Achew এর নির্মাণ করা চীনা মন্দির দর্শন। মন্দিরের মূল ফটকের ওপর পাথরের গায়ে চীনা হরফে লেখা “Chinese Temple”। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে ভিতর পর্যন্ত ছুঁইয়ে নিচ্ছিলাম শ্রদ্ধাশীল দুচোখ। যেন টাইম ট্রাভেল করে পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছি ১৭৭৮ এর চৌকাঠে। বিস্ময় ভাঙল বাস্তব। গেটে ঝুলন্ত মস্ত বড়ো তালা আমাদের দেখে যেন চিনা ভাষায় ঠাট্টা-মস্করা করছে। জানতে পারলাম আছিপুরের এই চিনাম্যানতলায় প্রতিবছর চীনা নববর্ষ উৎযাপিত হয় ফেব্রুয়ারীর ১২ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত। কলকাতার চীনা কমিউনিটির মানুষরা এমনকি দেশের বাইরে থেকেও চীনা’রা এসে ভীড় জমান, উৎসবে মাতেন, বিখ্যাত ড্রাগন নাচে অংশ নেন তারা এই স্থানে। টং সাহেবের নির্মিত এই মন্দিরের ফটক তখনই খোলে।

মন খারাপ করে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ আমাদের অনন্ত মন খারাপের অবসান হলো অনন্ত বাবুর জন্য। তিনি আছিপুরের পূজালী পৌরসভার সদস্য। এছাড়াও পৌরসভা কর্মী সেখ সরিফুদ্দিন বাবুও এলেন, আমাদের আশ্বস্ত করলেন ও চেষ্টা করে মন্দিরের গেট খুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ওনাদের আন্তরিক প্রয়াসে যেন আমরা মনখারাপের মরুভূমিতে সত্যিকারের জলের সন্ধান পেলাম। পর্যটকদের জন্য যে দরজা শুধুমাত্র বিশেষ উৎসবের সময় ছাড়া খোলার রীতি নেই, সেই দরজা খোলা হল এই অসময়ে। এ সত্যি আমাদের সৌভাগ্য। যেন আছু সাহেব স্বয়ং বলছেন “আমি আজও আছি”! এককালের বিখ্যাত চিনির অঞ্চলে এসে মন তেঁতো করে ফিরে যাব এ বোধহয় আছু সাহেব নিজেও সেদিন চান নি।
এরপর মন্দিরে প্রবেশ করতেই দেওয়ালের পাথরে পাথরে চীনা হরফে লেখা বহু বানী চোখে পড়লো। চোখে পড়লো বটে কিন্তু চোখ তা পড়তে অক্ষম হলো। গুগল ট্রান্সলেটরই একমাত্র অন্ধের যষ্টি তখন। মানে উদ্ধার হল শেষমেষ…
“Skin, Heart, Communicate, silent prayer.” অথবা “A wisp of incense binds the feeling of home”. মন প্রশান্তিতে ভরে উঠলো।

সামনে এগোতে একটি চৌখুপির ভিতর দুটি মূর্তি চোখে পড়লো। অনন্ত বাবু বললেন এনারা হলেন চিনাদের পূজ্য ঈশ্বর “পাকুমপাহ” বা “খোদা-খুদি”। রঙিন বসনে সজ্জিত দেব-দেবীর মগ্নচৈতন্য বিগ্রহ- যেন শান্তি বার্তা ধ্বনিত, চরাচর জুড়ে। নতমস্তকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আরও এগোলাম মন্দিরের চাতাল ধরে। ডান হাতে আরও এক চৈনিক দেবতা কনফুসিয়াসের ঘর। এছাড়াও চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চীনা হরফের নানা কথা। কোলকাতার বুকে এই একফলি চিনা সাম্রাজ্য যেন আমাদের সঙ্গে জীবন্ত কথা বিনিময়ে রত।
মন্দির থেকে বেরিয়ে মিনিট চারেক হেঁটে পৌঁছে গেলাম টং আছু’র পবিত্র সমাধির কাছে। বীরত্বের লাল রঙে অশ্বক্ষুরাকৃতি এই সমাধি, সম্মুখের প্রশস্ত গঙ্গার সঙ্গে পুরোনো স্মৃতি বিনিময়ে মশগুল যেন!
শান্ত, পবিত্র, এই জায়গা ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না। তবু, ফিরতে হবেই চীনা ছন্দ থেকে চেনা জীবনের ছন্দে। ফিরে আসতে আসতে মনে পড়ছিল, এই চীনা সাহেব( Tong Achew) তার খুদে চোখ দিয়েই দেখেছিলেন সেই সময়ের কলকাতাবাসীর যাপনের কষ্ট। ব্রিটিশদের ফিটন গাড়ী বা বাবুদের জুড়িগাড়ি ছাড়াও কলকাতার রাস্তায় প্রথম নামলো টানা রিক্সা- সেও এই উদার আছু সাহেবের ঔদার্য্যেই। খুলে গেল সেই সময়ের মানুষের রুজিরুটির আরও এক রাস্তা।

১৭৭৮ এর এই চিনা অধ্যায়ের পরবর্তীতে আরও অনেক অধ্যায় জুড়ে রয়েছে চীন থেকে বহু মানুষের ব্যবসার কাজে কলকাতায় আসা এবং পাকাপাকি ভাবে থেকে যাওয়ার গল্প। তবে আছু সাহেবের গল্প আমাদের জীবনে প্রথম প্রেমের গল্পের মতোই অক্ষত-উজ্জ্বল।
[বি.দ্র.- Tong Atchew সাহেবের আগমনকাল আনুমানিক ১৭৭৮ সাল হলেও তা বিতর্কমূলক। তাঁর নির্মিত মন্দিরের নির্মাণ সময় ফটকে উল্লিখিত ১৭১৮ সাল।]


Nice One
লেখাটি খুবই ভালো হয়েছে। অনেক তথ্য জানা গেলো। আমার কিছু জায়গায় মনে হয়েছে লেখায় আর একটু আকর্ষণীয় করা যেতে পারত। কিছু জায়গায় তাই মনোযোগ এর বিচ্ছেদ ঘটে পড়তে গিয়ে। আর ধন্যবাদ এমন অজানা তথ্য তুলে ধরার জন্য।
বাহ দারুন একটি তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাসনির্ভর লেখা ৷ পড়তে পড়তে একসময়ে মনে হল আমাদের ভারতভূমি যে সবসময় বিভিন্ন ধারার সংস্কৃতি, বিভিন্ন জাতির মানুষদের আপন করে নিয়েছে এবং সেই বৈচিত্র্যের রঙে অচিরেই নিজেকেও রাঙিয়ে নিয়েছে, এটি তারই আরও একটি উদাহরণ ৷ লেখিকা মহাশয়ার আগ্রহ এবং প্রয়াস উভয়কেই সাধুবাদ জানাই ৷