
ছেঁড়া জিনস্
কৌশান বাবু, কলকাতার মেট্রোতে উঠলেন বাড়ি ফেরার পথে, শিক্ষা জগতের এক সম্মেলনী শেষে। রবিবার, ছুটির দিন, এমনিই বেরোতে বিড়ম্বনা। পঞ্চাশোর্ধ হয়ে, ট্রেনে দাঁড়িয়ে থাকার আরো দশ বছর। তবে সিনিয়র সিটিজেনের সিট কপালে। ঠান্ডা এসি কোচে, হাতল ধরে, অনেক কিছুই ভাবছিলেন। কেউ উঠে যাক, আমি সিট পাই, এই দ্বন্দ্বে দুলছিল মন। এক এক করে আসন গ্রহীতাদের দিকে চোখ বোলালেন । একপাশ থেকে প্রথমেই এক স্থূল উদর ওনারই বয়সী পুরুষ যাত্রী।
কৃপা পাওয়া আজকাল বড় ব্রাত্য। দ্বিতীয় টি তে অল্প পূর্ণমাত্রার যুবতী। আনুমানিক কলেজের প্রথম বা মেরে কেটে দ্বিতীয় বিভাগের ছাত্রী। কিন্তু বড় বেশি, বেপরদা বক্ষদেশ। পাশেই বোধহয়, বয় ফ্রেন্ড। ঈষৎ কৃষ্ণ দুজনেই। মত্ত খুনসুটির আলাপে, চারদিক না পাত্তা দেওয়ার আড়ালে। চোখাচুখি হলো বয় ফ্রেন্ড আর কৌশান বাবুর। তাহলে , তিনি যে মেয়েটির দিক চোখ রেখেছিলেন, তা কি বয় ফ্রেন্ড ধরে ফেললো! না না, তিনি কোনো অশ্লীল মানসিকতায় তো তাকান নি। ছেলেটি বেশ মোটা গড়নের। জিনস্ এর হাঁটুর কাছে, স্টাইলিশ ছেঁড়া, পরনে টি শার্ট টিও কালো, এবং, ছিদ্রময়। অভাব অনটন নয়, আজকাল এর নাম ফ্যাশন। ছেঁড়া ফাটা নোট চলে না, বসন দৌঁড়ায়। কিছু আরো ভাবার আগেই, ছেলেটি উঠে এসে, ভরা ট্রেনে, প্রণাম করল। এই ছেলের বাইরের ফ্যাশন আর ভেতরের আন্তরিক সম্মান, মেলাতে পারলেন না স্যার। মেয়েটি উঠে চলে গেলো অন্যদিকে। মুহূর্তে সিট দখল করল অচেনা যাত্রীরা। কিন্তু স্যার কি বলছেন বা করছেন, চোখ কান খোলা রইলো সবার। যদিও না দেখা শোনার ভান।

কে ছেলেটি ?! কিছুতেই মনে করতে পারলেন না স্যার। তবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কাঁধে হাত রাখলেন ছেলেটির।
“এখন কি করছিস “? প্রশ্ন স্যার এর।
“স্যার, কলেজ এর থার্ড ইয়ার, কমার্স “।
“এরপর “?
“স্যার, এম.কম করব “।
বাফারিং চলছে স্যার এর ঘিলুতে। কিছুতেই মনে পড়ছে না। কোথায় যাচ্ছিস, কোথায় নামবি, এমন এদিক ওদিক কথা চলছে। এইরকম পোশাক, এইরকম স্থূল চেহারা…. নাহ্ তেমন কাউকে মনে পড়ছে না।
আজকাল মনে পড়েনা কিছুই সহজে।
“তোর মা কি করছেন এখন, ভালো আছেন “? অতি সাধারণ বোকা ধরনের অনির্দিষ্ট প্রশ্ন।
“ভালো আছে। স্যার, আপনার নাম্বার টা দেবেন, হারিয়ে গেছে “?
ইতস্তত কৌশান বাবুর। স্যার বললেন, ছেলেটি হাতে লিখে নিলো। মেট্রো থামছে, পরবর্তী স্টেশনে।
“স্যার, নামবো এখানে “।
“আয়”, বললেন স্যার। তাকালো ছেলেটি, স্যার এর দিকে।
কৌশান বাবু খুব কম আস্থার সুরে বললেন, ” চিত্রদীপ “?
“হ্যাঁ স্যার। চিনলেন, আসি “!
পোশাক বাহারি, শরীর বহরে ভারি । আগে সত্যিই চিনতে পারেন নি । কিন্তু চোখ, আগের মতোই সাবলীল, মা এর সাথে কোচিং এ আসত। পোশাক, ব্যবহার, সব আমূল পরিবর্তন। সাদা মাটা চোখটা এখনো বোঝায়, মা এর অমানুষিক পরিশ্রম আর পিতৃহীনতা। যোগাযোগের তার গুলো সব জিনস্ এর মতই রোজ ছিঁড়ে ফেটে যাচ্ছে।


খুব সুন্দর লেখা