
টিফিন পিরিয়ড
টিফিনের ঘণ্টা অনেক আগেই বেজে গেছিল। দেরি হয়ে যাচ্ছে বুঝলেও, নরেন বাবু, কিছুতেই গল্পের রাশ টানতে পারছিলেন না। ছাত্র ছাত্রীরাও, জীবন দৃষ্টান্ত গুলো বেশ গিলে খাচ্ছিল। স্যার, বেরিয়ে গেলেই, লুকানো মোবাইল হাতে উঠে আসবে একজনের, আর সবাই ঘিরে ধরবে। পালা করে একজন হবে পাহারাদার। আপাতত স্যার বেশ জমাটি কাহিনী বলছেন। বই এর পাতা বিরক্তিকর হলেও, নরেন বাবুর ক্লাস উলট-পুরাণ । যদিও কবি বলেছেন, “কাব্যরস আস্বাদনে পাঠকদের অত্যন্ত বেশি যত্নে পথ দেখিয়ে চলা স্বাস্থ্যকর নহে “।
ক্লাস থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে হাঁটেন নরেন বাবু। স্বাস্থ্যকর মিড ডে মিলের মায়া ছাড়িয়ে , ছেলেপুলেরা চাওমিন, পাস্তা, স্যান্ডউইচ বসে, পা ছড়িয়ে দিচ্ছে , কাড়ছে , খাচ্ছে, ফেলছে, মাখছে। তাঁদের আমলে, মা রুটি বা ব্রেডে খুব সামান্য মাখন লাগিয়ে চিনি ছড়িয়ে দিতেন। টিফিন বক্স খুলছে না, এই অজুহাতে বাড়ি ফেরত আসতো খাবার , আর জুটত মায়ের লাঠি। বাকিদের রকমারি টিফিনের সামনে ওই রুটি খোলা যায়! মা বোঝেই না।
স্টাফ রুমে গিয়ে বসলেন স্যার। আজ তাঁর মেনুতে ছাতুর বড়া আর টমেটো সস, সাথে শসা। একটি ষষ্ঠ শ্রেনীর বাচ্চা এলো, প্রায় ফাঁকা টিফিন বাক্স এগিয়ে দিলো নরেন বাবুর দিকে। দুটো ছোট্ট পাকা পেয়ারা। ওই দুটো তুলে, স্যার, দুটো বড়া আর শসার কটি স্লাইস তুলে দিলেন বক্সে। ” যা, খাবি কিন্তু “।
আগে প্লাস্টিক বক্স আনতো ছেলেটি। নরেন বাবু তাকে, স্টিল বক্স কিনে দিয়েছেন। বড্ড গরীব ছেলেটি। মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে। বাবা নিখোঁজ। দুবছর আগে, নরেনবাবুর প্রয়োজনে ওই মহিলার রক্ত গ্রুপ মিলে যাওয়ায়, নরেন বাবু প্রাণে বাঁচেন। প্রতিদানে, অর্থ মূল্য নয়, টিফিনে ছেলেটি মিড ডে মিল খায়, আর বিকেলে, মায়ের সাথে স্যার এর দেওয়া যাহোক কিছু ভাগ করে খায়।

কাজের বাড়ির থেকে জোগাড় করা, পেয়ারার মতো, রোজকার কিছু, গুরুপ্রণাম
মাইনাস ফর্টি
পদ্মপাতার মত নকশায় জমে থাকে জল। বাবলস্ ফরমেশন দেখে চিত্রকর ছবির ক্যানভাসে প্রতিকৃতি এঁকে ফেলবেন। ছেলেটা অসহায়ের মত তাকিয়ে ছিল জলটার দিকে। স্কুল ব্যাগ বাবার পিঠেই ছিল। সূর্য বেশ কিছুক্ষণ ধরে পরিষ্কার আলোছায়ায় সোনালী রঙ ছিটোচ্ছে পাহাড়ের চুড়ায়, বরফের উপরে। রুক্ষ শীতকালের তাপ মাইনাস তিরিশ বা চল্লিশ ডিগ্রী । আর উপত্যকার নদীর অনেকটা জুড়ে বরফের চাদর। হেঁটে অনেক দূরের গ্রাম থেকে বাবা রোজ আসেন, নিজের বানানো স্লেজ গাড়িতে ছেলে বসে। টানেন বাবা তাপ্পী দেওয়া জুতো পায়ে। চোখে স্বপ্ন আটকে , প্রতি পা দায়িত্বে এবং সন্তর্পনে ফেলা।
পাদুম, কার্গিল জেলার জাংস্কার মহকুমার প্রধান গ্রাম। আশে পাশে কত নাম কাম জানা বসতি এবং পরিবার। জুতোর নিচে স্পাইক না থাকলে, মসৃণ শক্ত বরফে পা হড়কাবেই। খুব সংকীর্ণ এক জায়গায় ছেলেকে তুলে পার করে দিতে গিয়ে, বাবা পিছলে জলে পড়লেন। ছেলেকে তুলে ছুঁড়ে ফেললেন দূরে। স্লেজ এবং ব্যাগ সমেত ডুবে গেলেন নিমেষে, জলের তোড়ে ভেসে যেতে থাকলেন। অসহায় অর্বাচীনের মতো দাঁড়িয়ে ছেলেটি। ভয়ে জমে ঠান্ডা। এরপর সম্বিৎ, ছুট লাগালো, স্রোতের অনুকূলে। পা ডুবে যাচ্ছে বরফে। বাবা বাবা ডাক বেশিদূর ধ্বনিত হচ্ছে না। একজায়গায় পাতলা চাদর এর নিচে বাবার অবয়ব দেখা গেলো। ভাঙল ছেলেটি। তারপর বহু কষ্টে বাবার ব্যাগ, চুল , জামা, যা যতটুক মুঠোয় এলো, সর্ব শক্তি দিয়ে বাবাকে টেনে তুললো সাদা বরফের গালিচায় । মুহূর্তে চলল হাত পা পিঠ ঘষা। জড়িয়ে ধরে পড়ে থাকা। দুটি ঘণ্টা।

আজ আর স্কুল যাওয়া হলো না। বাবা ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে, আর খুঁড়িয়ে ফিরতে লাগলেন বাড়ি। আবার কাল স্কুল। আর একটি বাবা বা মা এর নিরঙ্কুশ নিবিড় স্বপ্নের সাথে যুঝে চলার , সব মাইনাসের, আরো একটা দিন।
চাঁদ মামা
চাঁদ ছুটছিল। আজ ঘুম ভাঙ্গতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল। সন্ধ্যে থেকেই রাতভর বৃষ্টি, তুমুল। অনেকবার দরজা খুলে, উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে চাঁদ। লাভ হয়নি। তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা। মেঘই সরে না। মুখ দেখাবে কাকে?! একটু বৃষ্টির পর, পৃথিবী ঠান্ডা হলে, নবারুণ কবিরা, চাঁদের মুখ দেখতে পেলেই, কবিতা লিখতে বসে পড়েন। তাঁদের ঘুম কই! কিন্তু বৃষ্টি থামতে থামতে প্রায় রাত শেষ। তার আগেই, চোখ লেগে গেছিল চাঁদের। আচমকা ভাগ্যিস ঘুমটা ভাঙল।
একবার মুখ না দেখালে, সকাল সকাল সূর্যদা ওরফে ভানু প্যাঁক মেরে বলবে, ছি ছি রে ননি। মুখ ঝোঁকালো চাঁদ। মাটির পৃথিবীর দিকে। ওই তো, ভোলা ঠাকুরদা। গাছের মাথায় চড়ে বসে। নিচে সোদর বনের বাঘ। সূর্য উঠলেই ভুলে যাবে বাঘের কথা,আর সোজা হাঁটা মারবে, কাছের ওই টিলার দিকে। এইরকম ভুলোমনা! উনি নব্বই বছর পর যখন নিশ্বাস ত্যাগ করবেন, বোধহয় শ্বাস নিতে ভুলে যাবেন, তাই।
মুচকি হাসলো চাঁদ। দুদিন আগেই সূর্যদার গল্প, বাতাস এর সাথে, সে কী কম্পিটিশন রে ! পথিকের জ্যাকেট গা থেকে খুলে দেবে যে, জয় তাঁর। যতই বাতাস হুংকার করে, পথিক জ্যাকেট চেপে ধরে। তারপর, জুন মাসের গরম এর মেজাজ দেখালো, সূর্যদা। ব্যাস, জ্যাকেট খুলে গাছের ছায়া খুঁজতে দৌড়।

সূর্যের সাথে এই রকম গল্প কত্ত হয় রোজ। ভাগ্যিস সোশ্যাল মিডিয়া ছিল। নাহলে চাঁদ সূর্যের মুখোমুখি আলাপ, বিরল আর ঐতিহাসিক ঘটনা। বিজ্ঞানীরা অপেক্ষা করেন। ফটোগ্রাফাররা ছবি তোলেন। মিডিয়া বাইট পায়। রাহু এসে হাজির হয়। ওরা জানে, যখন সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ একটি সরলরেখায় থাকে, তখন তাকে সিজিজি বলে। ভূগোল তালগোল পাকিয়ে যায়। গল্প গুলোর জন্য ভাগ্যিস সোশ্যাল মিডিয়া ছিল। চাঁদ উঁকি দিলো মেঘের আড়াল থেকে মাটির দিকে। কবি কাগজ টেনে বসে লিখলেন, ” চাঁদ তুমি আসিয়াছ কাহাদের তরে, দাঁড়ায়েছ ফসলহীন মাঠের শিয়রে, ভরে গেছ জোছনায় পৃথিবীর ভাঁড় , তারপর ও চাওয়া থাকে কিছু নাহি আর”।


কি সুন্দর গল্প। মন ভাল হয়ে গেল। নিটোল,নির্মেদ,নির্মল। অসাধারণ।