
অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।
পূর্বানুবৃত্তিঃ পৃথিবী জুড়ে একটা ভয়ঙ্কর বিপদের পদধ্বনি ক্রমে আমাদের দেশেও ঢুকে পড়ল। শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। হঠাৎ আসা চাপে মানুষের ভেতরের গল্পগুলো খুলে যেতে থাকে। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। সমাজমাধ্যম হল একমাত্র মেলামেশার স্থান। গগনের বেতন কমে গেল। সনতের পুত্র আদিত্য আর পুত্রবধূ ধৃতি আলাদা হয়ে রয়েছে। ওদের ছেলে স্পন্দনের জন্মদিন পালন নিয়েও সংশয়। ধৃতির সামনে যেন এক অন্ধকারের চাদর।]
পর্ব – 8 – ভারতবর্ষ
দুই ভাই বিল্টু আর পল্টু, ভালো নাম বিপ্রদাস আর প্রাণবল্লভ। বিপ্রদাস নামটা নিজেরও মনে থাকে না। সবাই বিল্টু বাবু বলে ডাকে। নিজেকেও সে বিল্টুবাবু-ই ভাবে। সকালে আয়নার সামনে খানিক সময় কাটায় বিল্টু। চেহারায় বেশ ভারিক্কি ভাব এসেছে। ভুঁড়িটা নধর, গায়ের রঙেও চেকনাই। গলায় দশভরির চেন না বলে শিকল বলা যায়। বেশ নিজের মধ্যে একটা হোমরাচোমরা ভাব। একেই তো উন্নতি বলে। কেউ কেউ ঠোঁট উল্টায়। বিল্টুর কিছু এসে যায় না। রেশন আর মুদি দোকান সংলগ্ন পৈতৃক বাড়িতে পল্টুবাবু থাকে। বিল্টুবাবু নিজে বাড়ি করে চলে এসেছে। সে বাড়ি, কী আর যে সে বাড়ি? শহরের দামি আর্কিটেক্ট অবনী পালকে দিয়ে ডিজাইন করা ডুপ্লেক্স বাংলো। নিচ তলার বৈঠকখানার মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। নিজের উচ্চতায় নিজেই খুশি হয়। [COVID time]
রেশন দোকানে কর্মচারীরা আসতে আরম্ভ করায় আর কাউন্টারে বসতে হচ্ছে না। পল্টুবাবুও সেখানে সময় দিচ্ছে। বিল্টুবাবু নিজেকে ‘ইভেন্ট ম্যানেজার’ ভাবতে বেশি ভালোবাসে। তাই রেশন দোকানে বসে চাল, ডালের হিসেব করতে খুব খুশি হয় না। যদিও ব্যবসার আয় ব্যায়ের হিসেব, প্রতিদিন নিয়ম করে দেখে।
আজকাল ছুটির মরশুম। নিমন্ত্রণ বাড়ির কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বিল্টুরও এই মুহূর্তে দৌড়ঝাঁপ নেই। না হলে, প্রতিদিনই প্রায় সাত সকালে, হয় মানিকতলা না হয় নিউ মার্কেট যেতে হয় মাছ আনতে। লোক লস্কর থাকলেও কিছু কিছু কেনাকাটা এখনও নিজে হাতে করতে পছন্দ করে। বিশেষ করে আমিষ। এখন বেরতে হচ্ছে না বলে, প্রহ্লাদকে সকালেই আসতে বলে দিয়েছে। প্রহ্লাদই ওর ম্যাসিওর। আবার অনুষ্ঠান চলাকালীন ক্যাটারিং সার্ভিসের ছেলেদের নেতা।

বাড়ির নিচে শখ করে একটা আলাদা আপিস ঘর বানিয়েছে। খদ্দের এলে সেখানেই বসায়। নিজের জন্য একটা বড় টেবিল, ওপরে কাচ ঢাকা। সামনে তারা-মায়ের বড় ছবি বাঁধানো। সকালে সন্ধ্যায় ছবির সামনে ধূপ দিয়ে কাজ শুরু করে। এ ছাড়া নানা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে আসা বিখ্যাত মানুষের, হাতে খাবারের থালা নিয়ে ছবি। সেখানে শহরের নামী শিল্পপতি, মুম্বাই টালিগঞ্জের নায়ক, বাংলাদেশের নায়িকা, বিশিষ্ট ডাক্তার উকিল প্রোমোটার! কে নেই! বিল্টুর হাতের কাজের উচ্ছসিত প্রশংসা। নিজের ডেরায় বিল্টু যেন বাঘ। আজ প্রহ্লাদকে এই ঘরেই ডেকেছে। সতরঞ্চি বিছিয়ে, দু রকমের তেল, বাটিতে মিশিয়ে প্রহ্লাদ তৈরী। হাল্কা মিউজিক চালিয়ে বিল্টু পোশাক উন্মোচন করে। নধর শরীর প্রহ্লাদের হাতে ঠিক যেন কাদার তাল। বিল্টুর চোখ জুড়িয়ে আসে। ঘরে ফাইরমাশ খাটে একটি বাচ্ছা, নাম নুরুল। সে এসে খবর দিলে, কেউ একজন দেখা করতে এসেছে। প্রহ্লাদ বলে দেয়, “বাবু ব্যস্ত আছে, এখন হবে না বলে দে।” কথাবার্তায় ঘুম চটে যায় বিল্টুর, জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার?”
নুরুল বলে, “আজ্ঞে একজন দেখা করতে এসেছে”
“সেকি লকডাউনে কী করে এল?”
“বলছে, কাছেই থাকে, নাম গগন।”
“গগন?!”
এমন নামে কাউকে চেনে বলে মনে করতে পারলো না। লকডাউনের পর থেকে, এই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের আপিসে মানুষজনের মুখ দেখা বন্ধ হয়ে গেছে। একজন কেউ এসেছে শুনে বিল্টুর ভালোই লাগল। বলল, “তুই ওনাকে বাইরের ঘরে বসতে বল। চা দে। আমি আর পনেরো মিনিট পর ডেকে নেবো।”
তারপর প্রহ্লাদকে জিজ্ঞেস করে, “কত ক্ষণ হল?”
“তা প্রায় চল্লিশ মিনিট”
“বেশ আর পাঁচ সাত মিনিট করে ছেড়ে দে। কী?”
“চান করবেন তো?”
“হ্যাঁ, গিজার অন করে দিস। চান করে নেবো।”
স্নান সেরে চুল আঁচড়ে বিল্টু নিজের চেয়ার বসে। টেবিলের ওপর রাখা সুইচ টিপে গগনকে নিয়ে আসার জন্য নুরুলকে ডাক দেয়। গগন ভেতরে আসার পর বিল্টুর মনে হয়, একে কোথাও দেখেছে। কিন্তু কোথায় যে, কিছুতেই মাথায় আসছে না।
গগন একটু ইতস্ততঃ করে বলে, “লকডাউনের মধ্যে আপনার কাছে এসেছি বলে, কিছু মনে করবেন না”
বিল্টু হা হা করে হেসে ওঠে, সাথে হাত তালি দেয়। “আরে কী মজা! কী? সেই থেকে ঘরে বসে বসে লোকজনের মুখ দেখা বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চললে আমাদের চলবে? কী? আপনি এলেন ভালো লাগল।”
আবার সুইচ টিপে নুরুলকে ডাকে, “আজ কিচেনে কী হয়েছে জিজ্ঞেস কর?”
নুরুল ছুটে চলে যায়। খানিক বাদে মুশারফ এসে হাজির। মুশারফ বিল্টুর ক্যাটারিংএর খাস কারিগর। ওর হাতের রান্নাতেই বেশিরভাগ অনুষ্ঠান বাড়ি মাত হয়ে যায়। মুশারফের রোগাটে গড়ন। মাথায় বাবরি চুল। গোঁফ দাড়ি কামানো। নুরুল ওরই ছেলে। রান্নাঘরে কাজ শিখছে আর বিল্টুর ফাই ফরমাইশ খাটে। মুশারফের হাতে একটা গামছা। বোঝাই যাচ্ছে কাজ করতে করতে উঠে এসেছে। “আজ ভাত, মুগের ডাল, ভেটকি পাতুরি, কাতলার কালিয়া, চাটনি পাঁপড়। এইসব ঘরোয়া রান্না।”
বিল্টু বেশ গদগদ হয়ে বলে, “বেশ বেশ! দু প্লেট পাতুরি পাঠিয়ে দাও। আর সবাই কী খাচ্ছে?”
মুশারফ হেসে বলে, “সবার জন্য একই, শুধু পাতুরি ছাড়া।”
বিল্টু এবার গগনের দিকে তাকিয়ে বলে, “দুপুর তো হয়েই গেল। কী? কতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। শুধু পাতুরিতে কী হবে? আপনি বরং দুটো ডাল ভাত খেয়ে যান।”
গগন অস্বস্তিতে পড়ে যায়। আসলে, সনৎবাবুর দূত হয়ে এসেছে। এতসবের মধ্যে জড়াতে চাইছে না। “না না, আপনি ব্যস্ত হবে না। আমি দুটো কথা বলেই চলে যাচ্ছি।”
“সে তো যাবেনই, আমি কি ধরে রাখবো? ভাত না খান, মুশারফের হাতের পাতুুরি চেখে যান। ভুলতে পারবেন না।” তারপর মুশারফের দিকে চোখ নাচিয়ে বলে, “কী?”
মুশারফ আর দাঁড়ায় না। রান্নাঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে। বিল্টু গগনের দিকে চেয়ে বলে, “এই সব নিয়েই আমার সংসার। লকডাউনে কাজ নেই। আমার সব কর্মচারীদের এখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ওরা কোথায় যাবে বলুন? কী?”
গগন বিল্টুর দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে মুখে একটা অতিরিক্ত তৈলাক্তভাব। পরিস্কার বোঝা যায়, সুখ গড়িয়ে পড়ছে। সেটা শুধু যে সাফল্যের, তা নয়। কিছুটা গলায় আটকানো সোনার শিকলের ঔজ্জ্বল্যে, কিছুটা মানুষের উপকারে আসার গর্বে। সব মিলিয়ে বিল্টু যেন এক প্রচ্ছন্ন ছটার মাঝে বসে আছে।
এবার গগন, তার এখানে আসার উদ্দেশ্যর কথা বলে। ও যে শুধু মুশারফের পাতুরির স্বাদ নিতে এসেছে, তা তো নয়।
“সনৎবাবু ওর নাতির জন্মদিনের কথা আপনাকে বলেছিলেন।”
সনৎএর নাম শুনে বিল্টু হেসে ওঠে, “এতক্ষণে মনে পড়েছে। আমি তখন থেকে ভাবছি, আপনাকে কোথায় দেখেছি?”
গগন বলে, “আমি আপনার রেশন দোকান থেকে মালও এনেছি।”
“ওই দোকানে সবসময় তো বসি না। তবে চেনা চেনা লাগছিল কিন্তু চেনাটা বন্ধুত্বের না ঝগড়ার মনে করতে পারছিলাম না। কী?”
“বাঃ শত্রু না মিত্র না বুঝেই পাতুরি খাওয়াচ্ছেন?”
আবার হো হো করে হেসে ওঠে বিল্টু, সাথে হাত তালি দেয়। হাসির চোটে ভুঁড়ি নাচতে থাকে। “ওই জন্যেই তো আরও বেশি করে খাওয়াবো। কী? আমার কাছে সাফ কথা। যেই আসুক, বিল্টুর হাতে খেতেই হবে। কী?”
আবার হাত তালি, সাথে হো হো করে ভুঁড়ি নাচিয়ে হাসি। হসির মধ্যেই একটা বড় ট্রে-তে দুই প্লেট পাতুরি সাজিয়ে নুরুল এসে উপস্থিত। পাতুরির সাথে কাসুন্দি, সালাড আর দুই গ্লাস জল। গন্ধতে উৎকর্ষতা মালুম হচ্ছে।
বিল্টু হাতের ইশারায় বলে, “নিন আর দেরী করবেন না। ঠান্ডা হয়ে গেলে, ভালো লাগবে না।”
গগন প্লেটে হাত বাড়ায়। সত্যি অপূর্ব স্বাদ। মুশারফের হাতের তারিফ করতেই হয়। খেতে খেতে কথাটা পাড়ে। “বুঝতেই পারছেন, লকডাউনের মধ্যে লোকজনকে কতটা ডাকা যাবে কি যাবে না ঠিক নেই…”
কথা শেষ করতে পারে না, এর মধ্যে বিল্টু বলে ওঠে, “তাই সনৎবাবু চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাই তো? এতগুলো টাকা অ্যাডভান্স করা আছে, তার কী হবে? তাই তো? কী?” বলে আবার হো হো করে হাসতে থাকে। হাসতে গিয়ে তার হাতের পাতুরি খসে জামায় পড়ে।
গগন কতকটা বোকা হয়ে যায়। ধরা পড়া হাসি হাসে। সনৎকে ঢাকার চেষ্টা করে, “আসলে বয়স্ক মানুষ। একটু বেশি সাবধানী হয়। নিজেই আসতেন, আমিই বললাম, এই রকম অবস্থায় কোথায় যাবেন? আমি ওদিকে যাবো।”
বিল্টুবাবু বলে, “আসার তো দরকারই ছিল না। ফোন করলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত। কী? আসলে তা নয়। অনেকগুলো টাকা! যদি আমি মেরে দিই? কী? আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। ও টাকা আমার কাছে গচ্ছিত আছে। ওনার অনুষ্ঠান না হলে আমি ফেরত দিয়ে দেবো।”
“ব্যাস! এটুকু বললেই, উনি নিশ্চিন্ত হবেন।”
শুনে বিল্টুবাবু বলে, “উঁহু, এতে উনি নিশ্চিন্ত হবেন না। ওনাকে বলবেন, আমায় ফোন করতে।”
“বেশ তাই বলব।”
খাওয়ার শেষে গগন উঠতে চায়। বিল্টু বলে, “আজ ন’টায় দিপাবলী করছেন তো?”
গগন বুঝতে পারে না। অবাক হয়ে তাকায়। বিল্টু বলে, “সেকি মশাই আপনি টিভি দেখেন নি? প্রাইমিনিস্টার ডাক দিয়েছে, জানেন না? রাত ন’টায় ঠিক ন’মিনিটের জন্য বাতি নিভিয়ে দেওয়া হবে। কী? বুঝতে পারছেন? সারা দেশের বাতি নিভে যাবে ন’মিনিটের জন্য। কত বিদ্যুত বেঁচে যাবে?”
“বিদ্যুত নিভিয়ে দেব? তাহলে এমারজেন্সি সার্ভিসগুলোর কী হবে?”
“তার নিশ্চই কিছু ব্যবস্থা হবে। আরে, আমি তো গত বছরের সব প্রদীপ, রঙমশাল, তুবড়ি বার করে রোদে দিয়েছি। ন’মিনিটে করোনাকে দেশ ছাড়া করে ছাড়বো।”
“ও বাবা! তা আবার হয় নাকি?”
“কী যে বলেন? এসব আয়ুর্বেদের গুণ। সনাতন ধর্মের আবিষ্কার।”
“আয়ুর্বেদ?!” গগনের সব গুলিয়ে যেতে থাকে। কোন রকমে বলে, “ঠিক আছে চলি। আপনার কথা সনৎবাবুকে বলব। আর হ্যাঁ, মুশারফের জবাব নেই। পাতুরিগুলো দুর্ধর্ষ।”
“তবে? খেতে চাইছিলেন না, কী? [Sourav Story]
বিল্টুর প্রাসাদ থেকে বেরতে দুপুর গড়িয়ে গেল। লকডাউনের মধ্যে বেরিয়েছে বলে, পাড়ার ভেতরের গলি রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে। বড় রাস্তায় পুলিশ পাহারা। গলি দিয়ে যেতে যেতে, লক্ষ্য করে, একটা বাড়ির সামনে জটলা। ভীড় এড়িয়ে চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা আর্তচিৎকার কানে আসে। উঁকি মেরে দেখে এক বৃদ্ধ হাঁউমাউ করে কাঁদছে। “কী হয়েছে?” জিজ্ঞাসা করায় একজন জবাব দেয়, “দেখুন না, করোনা হয়েছে। সেই নিয়ে পাড়ায় ঢুকছে।” বৃদ্ধ অসহায় চোখে বলে, “বিশ্বাস করুন। আমার করোনা হয়নি। পড়ে গিয়ে কোমরে লেগেছিল, তাই হাসপাতালে ছিলাম। আজ ছাড়া পেয়েছি। এই দেখুন ডিসচার্জের কাগজ আছে।”
কে একজন ঠাস করে একটা চড় মারল গালে।
বৃদ্ধ কঁকিয়ে উঠল, কাঁদতে কাঁদতেই বলে, “বিশ্বাস করুন বাবা। আমার করোনা হয়নি।”

গগন কী করবে বুঝতে পারে না। এত লোকের মাঝখানে ওর কথা কে শুনবে? হঠাৎ কী মনে হল, বিল্টুবাবুর কথা মনে হল। ভীড় থেকে পিছিয়ে এসে ফোন করে, সব বলে।
ওদিক থেকে জবাব আসে, “আপনি ঠিক কোন জায়গায় আছেন? চিন্তা করবেন না। আমি আছি। কী?”
আজ গগনের কেন যেন বিল্টুবাবুকে খুব প্রভাবশালী বলে মনে হল। বৃদ্ধের কান্নাভেজা চোখ আর আর্ত কন্ঠস্বর ওকে আটকে দিল। ফুটপাথের পাশ ধরে সারি সারি বন্ধ দরজা। তারই একটা রুদ্ধ দোকানের ছাউনির নিচে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ায়।
খানিক অপেক্ষা করতে না করতে বাতি জ্বালিয়ে দুটো পুলিশের জিপ ঢুকলো। তারা এসে সরাসরি ভীড় সরিয়ে বৃদ্ধের কাছে পৌঁছয়। হঠাৎ করে পুলিশ কোথা থেকে খবর পেল, লোকজন হতভম্ভ হয়ে যায়।
“এখানে ভীড় করবেন না। যে যার বাড়ি চলে যান।” একজন পুলিশ কর্মী একটু গলা উঁচিয়ে কথাগুলো বলাতে কাজ হলো। ভীড় পাতলা হয়ে যেতে থাকে। বৃদ্ধের বাড়ি, এই পাড়া পেরিয়ে পরের রাস্তায়। দুজন ওকে ধরে ধরে গাড়িতে নিয়ে বসায়। একজন একটা বোতল করে কিছুটা জল দেয়। বৃদ্ধ কিছুটা খেলো, কিছুটা চোখে মুখে দিয়ে আবার মাস্ক পরে নেয়।
জিপদুটো যেমন এসেছিল তেমন বেরিয়ে গেল। পড়ন্ত বেলায় একলা রাস্তা পড়ে থাকে, কোন লোক নেই, কয়েকটা কুকুর এখানে ওখানে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমচ্ছে। গগন একাকী বাড়ির পথ ধরে। ফোন বেজে ওঠে। বিল্টু ফোন করেছে। “আপনার সমস্যার সমাধান হলো তো? কী?”
“অনেক ধন্যবাদ। আমি ঠিক বুঝেছি, আপনার কথাতেই পুলিশ এসেছিল।”
বিল্টুবাবু হেসে জবাব দেয়, “লকডাউন না থাকলে, নিজেই যেতাম। যাগগে কাজ হয়েছে তো?”
আরেক দফা ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রেখে দেয়। কিছুক্ষণ আগের সেই ন’মিনিটে করোনা তাড়ানোর গল্প শোনার পর, এভাবে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করায় বিল্টুবাবুর সম্পর্কে ধারনা অন্যরকম হয়।
ঘরে ফিরতে তিয়াসা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। “এতো বেলা করে কোথায় কাটিয়ে এলে?”
সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্নান করতে ঢুকে যায়। পাতুরি খেয়ে খিদেও মরে গিয়েছে। সামান্য কিছু মুখে দিয়ে দিনের মতো কাজ সারে।
দুপুরে শোনা ওই বৃদ্ধের কান্নার শব্দটা যেন কানে লেগে রয়েছে। আর যে ছেলেটি চড় মারলো, তার তো কোন শাস্তি হল না? কতইবা বয়স তার? বৃদ্ধের ছেলেও হয়তো ওর চেয়ে বয়সে বড়। এই রোগ, শরীরে না মনে? সমাজ এতো অসংবেদশীল হয়ে পড়ছে? কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না? রোগ যদি হয়েও থাকে, তাকে পাড়াতেও ঢুকতে দেবে না? এমন যদি গগনের সাথে হতো? হঠাৎ করে বিল্টুর কথা মনে হলো, না হলে ওই বিপদে কে সাহায্য করতো? গগনের অমন ক্ষমতাও নেই, যে ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধার করে আনবে। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন রাত নেমেছে গগনের খেয়াল নেই। দুজনের সংসারে বাহুল্য নেই। দুজনের কারোরই টেলিভিশন দেখার অভ্যাস নেই। তিয়াসা মেতে থাকে বই আর গাছ নিয়ে, গগন তার আপিস থেকে ফুরসত পায় না।
ঠিক এমন সময় ঝপ করে অন্ধকার হয়ে যায়। “এবাবা! লোডশেডিং? এখন মোমবাতি কোথায় পাই?” গগন নিজের মনে ভাবে। তখন বাইরে চোখ যায়। বহুতলের বারান্দায় বারান্দায় জ্বলে উঠেছে মোমবাতি। ঠিক যেন দীপাবলি। দুপুরে বিল্টুর কথা মনে পড়ল। বলেছিল বটে, আজ রাত নটায় ন’মিনিট। কেমন অবাক চোখে বাইরে তাকায়! গগন ভাবে, এই আমাদের দেশ, ভারতবর্ষ! কয়েক ঘন্টা আগে এক বৃদ্ধকে তার হাঁটুর বয়সী ছেলে চড় মারল। অসুস্থতা ছিল অপরাধ। এখন হাজার টাকার বাজির রোশনাই-এ আকাশ ভরে উঠছে।

ভাবতে ইচ্ছে করে, অসুস্থতার সংজ্ঞা কী? এসব চিন্তা প্রকাশ্যে করা যাবে না। চট করে কোন একটা রঙ দেগে দিয়ে যাবে। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, কোন ফুলকি থেকে কোন ঘরে আগুন লাগল? ন’মিনিট পার হতে বিদ্যুত ফিরে এল কিন্তু বাজির তান্ডব চলল আরও অনেক্ষণ। গগনের মনের মধ্যে সেই রেশ থেকে গেল। শুধু রাতের বালিশ জানলো। তিয়াসা একবার কপালে হাত দিয়ে বলে, “ঘুমিয়ে পড়ো, অনেক রাত হল।”
ঘুম না এলে গগন ফোন ঘাঁটতে থাকে। প্রশান্ত আজ বেশ কিছু তির্যক মন্তব্য পাঠিয়েছে। দেশে যদি এইসব বুজরুকি দিয়ে রোগ সারানো যেতো, তাহলে হাসপাতালগুলো তুলে দিয়ে পশুখাদ্যর চাষ করলেই পারে। বিকাশ সবসময় একটু আধ্যাত্মিক চিন্তা করে, ও লিখেছে “আত্মশক্তির ওপর ভরসা কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।” সুমন সাথে সাথে ফুট কাটে, “এই আত্মশক্তিটা কি জলবিদ্যুত বা সৌর বিদ্যুত থেকে পাওয়া যাবে?”
সকলে হাসির ইমোজি দিতে থাকে। গগন গুডনাইট জানিয়ে ফোন বিছানার পাশের টিপয়ের ওপর রেখে চোখ বোজার চেষ্টা করে। [a novel with document]
[ক্রমশঃ]

