সমীরুদ্দির হাউসবোটে শুধু কোলকাতা নয়, বাংলার দূর- দূরান্ত থেকেও উইকএণ্ডের ছুটি কাটাতে আসতো লোকে। বাঁওড়ের জলে হাউসবোটখানা সাজগোজ করে সূর্যের আলোয় যখন মরালগতিতে ভাসতো,দেখে মনে হতো দেবী চৌধুরানীর বজরা। আইডিয়াটা সমিরুদ্দির মাথায় এসেছিল কেরালা বেড়াতে গিয়ে।

ব্যাকওয়াটারের মতই বিস্তার ওদের বাঁওড়ের। তাহলে আর হাউসবোট ভাসালে ক্ষতি কি! সমস্যা ছিল বোটখানা বানানো। বেড়িয়ে ফিরে এক বসন্তের বিকালে,গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যে অবধি নিজের ছিপ নৌকাটা বাঁওড়ের মাঝখানে রেখে আকাশমুখো হয়ে শুয়ে রইলো সমীরুদ্দি। উদ্দেশ্য, অনুভূতিটা কেমন হয়, জানা। ফুরফুরে সান্ধ্য বাতাস, চাঁদের আলো, সমীরুদ্দির গা শিরশিরিয়ে উঠল। দূরের গাছপালাগুলো নিকষ অন্ধকারে ঢাকা, তার ভেতর ইতস্তত জোলাকির আলো ছোটাছুটি করছে, বাঁওড়ের জলে পড়ে ঠিকরে আসছে চাঁদের আলো, সে যেন এক স্বর্গীয় পরিবেশ, পরীরা নেমে এলেই হয়। সমীরুদ্দি সিদ্ধান্ত করেই ফেললো, হাউসবোট নামাবে বাঁওড়ের জলে। প্রথমে নিজের দুখানা মাছধরা ছিপ গায়ে গায়ে রেখে বাঁশ দড়ি দিয়ে বেঁধে,তার ওপর বাঁশ খড় দিয়ে ছাউনি বানিয়ে ভাড়া দিতে লাগলো পিকনিক করতে আসা শহুরে বাবুদের। শুধু দিনমানে, ঘণ্টাপিছু দরে নৌকা বিহার। চালক ও নিজেই। হাতে দু’ চার পয়সা জমতে হেতমপুরের জামশেদকে ডেকে পড়ামর্শ করলো একটা বড় নৌকা বানানোর। বেশ খেলানো নৌকা, অনেকটা চওড়া, তেমনি লম্বা।

ছবি তুলে এনেছিল কেরালা থেকে। কাঠ মিস্ত্রী দিগন্তকে দেখালো ছবিটা,বলল ঠিক এইরকম বানানো চাই। সামনের দিকে ছাউনিওলা একটা বসার জায়গা,সেখানে গোটা চারেক বেতের চেয়ার। সেখান থেকেই ঘরে ঢোকার দরজা। ঘর পেরিয়ে পেছন দিকে গোসলখানা, রান্নাঘর। ঘরে থাকবে পর্দা দেওয়া চারটে জানালা। সঙ্গে খাট – বিছানা, চেয়ার-টেবিল, সোফা। সামনের বসার জায়গার এক পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে যাবে রেলিং দেওয়া ছাদে। চাঁদের আলোয় মজলিশ বসতে পারে সেখানে।

কাঠ-কুটো দাও যদি সস্তায় বানিয়ে দেব, এলাকায় দেখবার মত জিনিস হবে একটা, দিগন্ত জানায়। লেবার আমি দেব, বলে সমীরুদ্দি। ঠিক আছে, কিন্তু তারপর হারানকে ধরে রঙ লাগিয়ে নিও। তা হয়েছিল বটে জিনিসটা। ব্যবস্থাও চমৎকার ; হিন্দুদের জন্য রান্নার ঠাকুর বহাল হল আর মুসলমানদের রান্না সমীরুদ্দির ঘরে। ছোঁয়াছুঁয়ির বালাই নেই। লোকের মুখে মুখে নাম ছড়ালো ক্রমশ। বুকিং দিয়ে উঠতে পারে না সমীরুদ্দি। বুড়ো- বুড়িরা এলো নির্জন বাসের সুখ পেতে, ছুঁড়ো ছুঁড়িরা এলো রাত জেগে প্রেম করতে, নবদম্পতির দল এলো মধুচন্দ্রিমা যাপনে। সমীরুদ্দি আনন্দে আত্মহারা। টাকা এলো দেদার। বাঁওড়ের একধারে বাদাম, আলুকাবলির দোকানই বসে গেল। পঞ্চায়েত ভাবলে, তবে আর কি, টিকিট বসালেই হয়। আর সুভাষ পতির দলবল এসে একদিন বলে গেল, ” কি রে সমরা, হিঁদুদেরও গোরুর মাংস দিচ্ছিস!” গুরুত্ব দেয়নি সমীরুদ্দি।

এরপর একদিন, যেদিন বুকিং এর চাপ নেই, সমীরুদ্দি নিজে বউ,মেয়েকে নিয়ে উঠলো হাউসবোটে, রাত কাটাবে বলে। তখন মাঝরাত হবে,বোটখানা ভাসতে বাঁওড়ের পাড়ে এসে গিয়েছিল; তখনই কারা যেন আগুন ধরিয়ে দিল বোটে। আগুন লাগিয়েছিল সামনের দিকে, যেদিকে দরজা। হাওয়ার টানে হু হু করে আগুন ছড়িয়েছিল নৌকা জুড়ে। সমীরুদ্দি বেরিয়ে সবাইকে টেনে বের করতে করতে ঝলসে গিয়েছিল বউ, মেয়ে। চিৎকার করে ডেকেছিল কাছে পিঠের মানুষ জনকে। কেউ সাড়া দেয়নি। বাঁচেনি মেয়ে বউ, একটা তীব্র হাহাকার গ্রাস করেছিল ওকে। শুধু শরীরে কশ ছিল বলে সমীরুদ্দি আধপোড়া হয়ে বেঁচে গেছিল কোনরকমে।

এখন পোড়া হাউসবোটখানা ভাসছে দেখলেই সমীরুদ্দির মনে হয় যেন ব্যাঙ্গ করছে ওকে।

আর বাঁওড়ের পাড়ে বসে ও ভাবে, আসলে গোরুর মাংস-টাংস নয়, আসল হল ওর বাড় বাড়ন্ত। একজন গরীব জেলে শুধু নিজের পরিশ্রম আর সততার জোরে মাথা উঁচু করে একটু অন্যভাবে বাঁচতে চেয়েছিল, জয় করতে চেয়েছিল নিজের ভবিতব্য। সফল হয়ে গিয়েছিল প্রায়। তাই দেখে চোখ টাটালো কিছু মানুষের, চোখ টাটালো সমাজপতিদের। শেষ পর্যন্ত তাদের অসূয়ার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ওর স্বপ্ন। এখন হাহাকার সঙ্গী ওর। বাকি জীবন চোখের জলই হবে ওর অবলম্বন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য