চিকিৎসক জীবনের শুরুতে মাঝে মধ্যেই হাউস কলে যেতে হ’ত। কয়েক দশক আগের কথা হলেও সে সময়ের বহু ঘটনা আজও মনে আছে।

মফস্বলের প্র্যাকটিস। রোগীদের পরিজনদের মুখে মুখেই যতটুকু হয় আর কি!
একদিন দুপুরের দিকে বছর বিশেকের এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে এসে অনুরোধ জানাল, তার দিদিকে দেখতে যেতে হবে–আনা যাবে না চেম্বারে ।
একটা রিকশা আনল সে, আমার সঙ্গে সঙ্গেই সাইকেলে যেতে যেতে যা হিস্ট্রি পেলাম তাতে বোঝা গেল মেয়েটি গত ছ’সাত বছর ধরেই সাইকোসিস জাতীয় রোগে ভুগছে। চিকিৎসার চেষ্টা যে একেবারেই হয়নি তা নয়, তবে তাকে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো যায়না , ডাক্তারের চেম্বারেও নেওয়া যায়না, অথচ মাঝেমধ্যেই বাড়াবাড়ি হয়। আজকেই তো সে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিল, কোনও ক্রমে বাঁচানো গেছে- আপাতত বাড়িতেই আছে।
অনেকটা পথ পেরিয়ে ওদের বাড়ি পৌঁছে দেখলাম খোলার চালের সে ভিটেয় প্রবেশ করাই মুশকিল। চারপাশে বেশ কিছু কৌতুহলী চোখ। রোগীনি শুয়ে একটা তক্তাপোষে, ঘরের পুরোটাই যেন তক্তায় ভরা,ঢোকার উপায় নেই। অতএব রিকশায় বসে বসেই ঘরের জানলা দিয়ে দেখলাম তাকে, বেশ কাহিল সে। ভাগ্যিস জানলায় শিক ছিল না, তাই ওভাবেই পালস্, ব্লাড প্রেসারও দেখে একটিমাত্র ওষুধ লিখলাম। মেয়েটি ভালমানুষের মতন সব শুনল বটে, তবে ওর ভাইকে লিখিত এবং মৌখিক উপদেশে আমি হাসপাতালে ভর্তি করার অ্যাডভাইস দিয়ে স্টেশনে ফিরতে উদ্যোগী হলাম, ট্রেনের টাইম হয়ে এসেছে তখন।
ছেলেটি সংকুচিত মুখে ফি-র কথা তুলতে ওকে নিরস্ত্র করলাম। আমার ভিজিট তখন সামান্য হলেও সেটুকুও তো ওকেই বহন করতে হবে,সেটাও একটা চাপ! ফেরার সময় সে একইরকম ভাবে স্টেশন পর্যন্ত এলো এবং রিকশা ভাড়াটা জোর করেই দিল।
আশ্চর্যের কথা, এরপর থেকেই মেয়েটি ওষুধ খেতো এবং পরবর্তী সময়ে অনিয়মিত ভাবে হলেও চেম্বারেও আসত। অবশ্য নাম জিগ্যেস করলে তখনকার এক অভিনেত্রী র নাম বলত।
অনেক বছর পর ওই শহরেই একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে এক মাঝবয়সী অত্যন্ত বিনয়ী মাস্টারমশাই এর আতিথ্য পেলাম। ফেরার সময় অবাক হয়ে জানলাম সেদিনের সেই কলেজ ছাত্রটিই আজকের শিক্ষক, তাঁর দিদিও ভালই আছেন।

চিকিৎসক জীবনে পরবর্তী আরও বহুতর অভিজ্ঞতা হলেও রিকশায় বসে চিকিৎসার বিষয়টা অভিনব হওয়ায় সবটাই মনে রয়ে গেছে।

রোববার সকালটা আমার হাওড়ার শিবপুরের জন্য বরাদ্দ থাকত সে সময়। রুটিন চিকিৎসার পাশাপাশি পরিচিত মানুষজনের আবদার অথবা দাবীও থাকত।
তেমনই একটা অনুরোধ রাখতে গিয়ে একবার মহা বিপদে পড়লাম।
আদ্যিকালের বাড়ি। সে বাড়ির বড়ছেলে উন্মাদ, দু’বছর বাড়ি থেকে না বেরোলেও মাঝে মাঝেই উন্মত্ত হয়ে পড়ায় তাকে আগলে রাখতে হয়– মা ছাড়া সে বাড়িতে আর কেউ নেই।
দোতলার ঘরে রোগী – পাড়ার ছেলেপিলে দোতলার দরজাটা খুলে দিয়েই হাওয়া। জানলা দরজা বন্ধ থাকায় ঘরটা অন্ধকার। ঘরে ঢুকে আধা অন্ধকারে চোখটা সইয়ে নেওয়ার আগেই একটা কর্কশ আওয়াজ– হু আর ইউ? হু আর ইউ? ডক্টর? আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও!
বলতে বলতেই আমার দিকে তেড়ে আসতে গিয়েও কী যেন একটা দেখে উর্ধশ্বাসে ছুটে গিয়ে উল্টোদিকের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল সে। যুবকের চেহারাটা দিনের আলোয় তখন স্পষ্ট দেখতে পেলাম–ঝাঁকড়া চুল দাড়িতে অয়দিপাউস যেন!


মুখে অশ্রাব্য গালিগালাজ। আওয়াজ পেয়ে বাকিরাও এবার ঘরে ঢুকে পড়েছেন। বৃদ্ধা মা, দরজাটা খুললে কে? ওকে ধরো, ধরো,এবম্বিধ কলরবের মধ্যেই দোতলার খোলা বারান্দা থেকে নিচের রাস্তায় এক লাফ দিলে সে ছেলে।
সকলের সাথে আমিও তখন নিচে। সম্ভবত একটা পা ভেঙ্গেছিল তার, তাই ছুটেও বেশি দূর যেতে পারেনি।

একটা ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হ’ল তাকে। মাস দুয়েক পর ফিরেও এল সে। ফলো আপও করেছি বেশ কিছুদিন। তার পর আর দেখিনি তাদের। বাজার বাসস্ট্যান্ড অঞ্চলের বাড়ি তো, একদিন সে বাড়ি ভেঙ্গে ফ্ল্যাট উঠছে দেখলাম।

হাওড়া শহরেই আরও একটা ঘটনা মনে পড়ছে।
তখন সদ্য দ্বিতীয় হুগলি সেতু চালু হয়েছে। মন্দিরতলায় নেমে রিকশায় বাড়ি ফিরছি। রাত হয়েছে- একটু এগোতেই একটা বিয়ে বাড়ির সামনের জটলায় রিকশার পথরোধ করল কয়েকজন তরুণ–যাদের দু একজনের মুখটা চেনা আমার।
সেই চেনাদেরই একজন বললে, একটু অসুবিধে হবে জানি স্যার,তবুও আপনাকে একবার ভেতরে আসতে হবে…!

–এভাবে? কেউ অসুস্থ? আমি তো…
ইতস্তত ভাবের মধ্যেই বাড়ির ভেতরে ঢুকি। ক্যাসেটে সানাই বাজছে। নিমন্ত্রিতরা ফিরছেন কেউ কেউ।

জানা গেল, অসুস্থ হয়েছে বাড়ির নতুন বৌ–আজ তার বৌভাতের দিন।
বিয়ে বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে বসে আছে সালাঙ্কারা বধূ, তাকেই দেখতে হবে আমায় ।
সন্ধে থেকে একটাও কথা বলেনি সে, বোবা হয়ে গেছে।
অতিথি অভ্যাগত এড়াতে এ ঘরে সরানো হয়েছে তাকে।

একটাও কথা নেই মুখে, খানিক পর চোখে জল দেখলাম । নানান কথা বলতে বলতে হঠাৎই আধখোলা জানলার দিকে আঙুল দিয়ে একটা বাড়ি দেখালো সে, ওটা আমাদের বাড়ি!
আবার চুপ।
সদ্য বিবাহিত স্বামীর ডাক পড়ল। প্রেমের বিয়ে তাদের, মেয়েটির বাপ মায়ের মতের বিরুদ্ধে। একই পাড়ায় বাড়ি,খুব আশা করেছিল আজ নিশ্চয়ই মা আসবে, বাবা আর ভাইও আসবে–কেউ আসেনি। তার মানে তো এ বিয়ের কোনও মানেই নেই! ব্যস্!!
সেদিন কথা বলতে বলতেই মেয়েটিকে সামান্য কিছু খাওয়াতেও পেরেছিলাম আমরা।
ক’দিন পর মিটমাটও হয়ে গেছিল দু’বাড়ির।

অন্য একজনের কথা বলে শেষ করব আজ।
হাওড়ার মানুষ, অশীতিপর। তাঁর ছেলের অনুরোধে যাওয়া সে বাড়ি।
বিকেল হয়ে গেছে তখন। সকাল থেকে জলস্পর্শ করেননি। খাটের এক কোনে বসে ক্রমাগত বলছেন, বাড়ি যাব।
আমাকে দেখে কাতর মুখে হাত জড়ো করে বললেন, স্যার, এবারটা আমায় ছেড়ে দিন, আমি বাড়ি যাব!
বাড়ি কোথায় জিগ্যেস করতে অনেকটা দূরের একটা বস্তির দিকে আঙুল দেখিয়েই আবার সেই অনুরোধ…বড়বাবু! বাড়ির সবাই চিন্তা করছে, আমায় ছেড়ে দিন এবার!
বৃদ্ধ প্রমথেশের মাথায় ছিল, এটা একটা থানা, সাইকেল চুরির কেসে তাকে ফাঁসিয়েছে কেউ।
তাঁর ছেলে যে মস্ত ব্যবসায়ী, এই চারতলা বাড়িটাও যে ওনাদেরই, মস্তিষ্কের অদ্ভুত ক্ষয় সেইসব ভুলিয়ে দিয়েছে তাঁকে।
ডিমেন্সিয়ায় হয় এমন কখনও কখনও।

কেউ সারাজীবন ঘর পায় না, আবার কেউবা ঘরে থেকেও অনিকেত।
সামান্য চিকিৎসক আমি– ঘুরপাক খেতে খেতে নিভৃত মহাকালের সেই সন্তানদের অভিযানেরই সাথী হয়ে পড়ি।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অক্টোবর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Nandita Sinha
Nandita Sinha
9 months ago

শুভ বিজয়া।
আশ্চর্য বিষয় পাই ডাক্তারবাবু আপনার লেখায়। কত বিচিত্র এই জীবনে কত না ঘাত প্রতিঘাত!
খুব ভালো লাগে আপনার লেখা ।

Dr Chandrakanta Chakraborty
Dr Chandrakanta Chakraborty
9 months ago

দারুণ ভালো লাগল পড়ে। মনে হল আরো কিছু অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ হলে ভালো হত। এ যেন শেষ হয়েও হল না শেষ।

Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
9 months ago

দারুন লিখছো ভাই! খুব ভালো লাগছে!
অনেক শুভেচ্ছা জানাই।