
শেষে দিল রা (অষ্টম পর্ব)

মাথার চুল কদমছাঁট, মাজা রঙ, চোখের দৃষ্টি আপাতত আমার দিকেই। ভেতরে ভেতরে সে উত্তেজিত। কয়েক মাস পরপরই আসে ও। হোমের বাইরে আসতে পারলে খুশিই থাকে কুসুম।
হোমের দিদি টেবিলের পাশেই দাঁড়িয়ে এর মধ্যেই কুসুমের বৃত্তান্ত দিচ্ছে, কি কি দুষ্টুমি করে সে, প্রেয়ারের ঘন্টার শব্দ শুনতেই পায়না, কখনও খুব খুবই রেগে যায়, ইত্যাদি।
কুসুম হাত মুঠো করে বসে থাকে। ও জানে, ওর কথাই হচ্ছে। যথাসম্ভব গুড গার্ল হয়ে বসে থাকে কুসুম। মাথা নড়ে, কাঁধ ঝাঁকায়।
-একটা গান হবে নাকি কুসুম?
বলামাত্র শুরু করে দেয় সে, ফুয়ে ফুয়ে দুয়ে দুয়ে। কথা বুঝে নিতে হয়, তবে সুর টনটনে তার। এ গানটা গেয়ে আনন্দ পায় কুসুম। ডাঁয়ে বাঁয়ে আন্দোলন শুরু হয় শরীরের। ক্লিনিকের ছোটখাট ঘরখানায় আলো ফোটে জোরদার।
এবার আসবে পান্নাভাই। সে নাকি পাটনার লোক, পাটনাভাই থেকে এখন সে পান্নাভাই হয়েছে। চেয়ারে বসার আগেই সে করমর্দন করবে, প্রত্যেক বার করে। আমি ভাল আছি কিনা জিগ্যেস করে, সে কেমন আছে জানতে চাইলে একগাল হাসে।
এরপর গব্বর। তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। টিঙটিঙে চেহারা,ফড়িংএর মতন। তেরো চলছে বয়েস। বিচ্ছু নাম্বার ওয়ান। মুখ দেখে মনে হবে ভাজা মাছটা উল্টে খায় না।
এইসব দেখি আমি। হোমের দাদা দিদিরা ঘরের লোকের মতোই ওদের নামে অভিযোগ করে। আমি একটু বকে দিই বড়জোর, ওরা পাত্তাও দেয়না। তবে এখানে আসতে ভালবাসে ওরা। বাইরে বেরোনোর খুশিও কি থাকেনা!
আরও একজন মলিনভাই, সে তবলা বাজাতে পারে। খবর পেলাম ক’দিন আগেই সে নাকি বিদেশেও ঘুরে এসেছে।
-কোথায় গেসলে মলিন?
-ফাঁস্! একগাল হাসি মলিনের।
–কি কি দেখলে সেখানে?
উৎসাহ দেখাই।
মলিনভাই কেবল হাসে, অতশত জানেনা সে। সময় শেষ হ’ল। উঠবে ওরা। প্রত্যেক বার ওরা নেমন্তন্ন করে যায় আমায়,
যাবে, যাবে, আমাদে ওখানে..পাশ থেকে প্রম্ট করে হোমের দিদি,
বলো, পুজো হবে, এগজিবিশন হবে!
ঘাড় নাড়ে ওরা। পৃথিবীর বাইরের কোনও গ্রহের জীব যেন সব, কী অল্পেই খুশি।

কাল এসেছিল অম্লানের মাসি। ডাক্তারবাবু,চিনতে পারছেন আমায়? আমি অম্লানের আরেকটা মা, জানেন তো?
— হুঁ, এইতো ক’দিন আগেই অম্লান এসেছিল, পুজোর আগে যেমন আসে…সব ঠিকঠাক তো?
হঠাৎই হাসিমুখের মানুষটা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অম্লান আর নেই ডাক্তারবাবু! কী কষ্টটাই পেল শেষটায়।
জল খেতে ভালবাসত সে, দেখত তো না দেখ্ জল দেখলেই হ’ল, সে খাবেই। মিস্ত্রির কাজ হচ্ছিল বাড়িতে, সে কাজের কারণেই খাবার জলের পুরোনো বোতলে রাখা ছিল বাথরুম পরিস্কার করার অ্যাসিড…কোন্ ফাঁকে যে…!!
কিছুক্ষণ চুপ হয়ে যাই। কীই বা বলব!
রাতে ফোন করেছিলেন ওর বাবা। একমাত্র সন্তান। বাড়িতেই বড় হচ্ছিল বরাবর।
কাঁদছিলেন আর মাঝে মাঝেই বলছিলেন, শেষ দুটোদিন চোখে দেখা যাচ্ছিল না স্যার! তার পর তো পোষ্ট মর্টেম টটেমও….ওর কাজের দিন একবার আসবেন ডাক্তারবাবু? ওর আত্মা একটু শান্তি পেত তাতে…আপনি বললে তো সব শুনত ও!
কি বলি,কীই যে বলি!
কিছু বলার সময় কি এটা?
ভিন্ গ্রহের এইসব দেবদূতদের মনটা কি আমিও বুঝেছি কখনও, পুরোপুরি?


খুব ভালো লাগলো।
গৌতম ভাই, তোমার এই লেখার চরিত্র গুলো, তোমার মন কে যে কতটা উদ্বেল করত, তা এই লেখা পড়ে বুঝতে পারছি।
আমাদের ও মনে কষ্ট হয়, এই ধরনের রোগী দের কথা শুনলে। লেখা চালিয়ে যাবার জন্য অনেক ধন্যবাদ।